৭ অগাস্ট ঢাকার শান্তিনগরে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে অটোরিকশায় ওঠার সময় তার ওপর হামলা চালানো হয়। কর্মস্থল থেকে বের হতেই কেন তাকে বেদম মারধর করা হল, সেটি এখনো স্পষ্ট হয়নি।
তবে এ চিকিৎসক বলছেন, হামলার আগে শীর্ষ এক সন্ত্রাসীর নাম করে তার কাছে ১৫ হাজার ডলার চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। তা দিতে সময়ও বেঁধে দেওয়া হয়। সেই সময় পার হয়ে যাওয়ার দুদিন পরই রাতের বেলায় তার ওপর অতর্কিত আক্রমণ হয়।
গত মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন জায়গায় অন্তত পাঁচজন চিকিৎসককে মারধরের খবর এসেছে সংবাদমাধ্যমে।
চিকিৎসকরা বলছেন, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ তুলে জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও চিকিৎসকদের হামলার ঘটনা ঘটে, যেগুলো সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয় না, কিংবা আলোচনা হয় না।
দিন আগে ১৬ মে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে দায়িত্বরত চিকিৎসক নাসির ইসলামকে মারধর ও হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ভাঙচুর করা হয়।
গত ১৬ এপ্রিল পঞ্চগড় সদর হাসপাতালে ভুল চিকিৎসার অভিযোগে চিকিৎসক সঞ্জয় কুমার রায়কে দুই দফায় মারধর করা হয়।
চার দিন পর ২০ এপ্রিল বিকালে অফিস শেষে ফেরার সময় মহাখালীর জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপপরিচালক আহমদ হোসেনের ওপর হামলা চালানো হয়।
বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম ২২ অগাস্ট এক মানববন্ধন কর্মসূচিতে বলেন, “এক গবেষণায় দেখা গেছে, বর্তমানে ৭৮ শতাংশ চিকিৎসক কর্মস্থলে সেবা দিতে গিয়ে শঙ্কিত। কারণ তারা বিভিন্নভাবে হেনস্তকার শিকার হচ্ছেন। হামলার বিরাট একটা সংখ্যা নানা কারণে রিপোর্টিং হয় না।”
চিকিৎসকরা বলছেন, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ, হাসপাতালের প্রকল্পের কাজ নিয়ে বিরোধ, চাঁদাবাজি আর ব্যক্তিগত শত্রুতাসহ নানা কারণে চিকিৎসকদের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে। এ অবস্থায় হামলাকারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং বিচার, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের সুরক্ষায় আইনপ্রণয়ন, নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনসহ কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন তারা।
ঢাকা মেডিকেলের চিকিৎসক অধ্যাপক আসাদুর রহমানকে সপ্তাহখানেক আগে দেখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ হামলাকারীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার কথা বলেন। অপরাধীদের ধরতে যারা ব্যর্থ হবে, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন তিনি।
অপরাধী চক্রের ধরন সম্পর্কে তিনি বলেন, “একটা সংঘবদ্ধ চক্র, দুর্বৃত্তরা—এরকম ‘হাই-ভ্যালু’ টার্গেট করে যারা বড় বড় হাসপাতাল এবং বড় বড় ডাক্তার বা অন্যান্য পেশায় বড় পেশাজীবী, তাদেরকে টার্গেট করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বার্তা দিয়ে। সর্বশেষ আঘাত (আসাদুর রহমানের ওপর) করে চাঁদাবাজির একটা উদ্দেশ্য তাদের ছিল।”
হামলা নিয়ে যা বলছেন চিকিৎসকরা
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আকরাম এলাহী বলেন, ‘‘ইমারজেন্সিতে (জরুরি বিভাগ) অনেক সময় একজন ডাক্তার কাজ করেন। কিন্তু রোগীর সঙ্গে অনেক লোকজন আসেন। তাদের মনমত চিকিৎসা না হলে বা তাদের চিকিৎসা পছন্দ না হলেই হামলার ঘটনা ঘটে। সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের একার কিছু করার থাকে না।”
এ হাসপাতালটিতে গত ১৬ মে এক চিকিৎসকের ওপর হামলার ঘটনা নিয়ে আকরাম এলাহী বলেন, “হামলাকারীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তারা জেল থেকে জামিনে বের হয়েছে। দেখা যাক কী শাস্তি আদালত দেয়।”
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতাল এর ইন্টারভেনশনাল নিউরোলজিস্ট হুমায়ুন কবির হিমু বলেন, “বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবায় ওষুধ থেকে শুরু করে সব কিছুর সংকট রয়েছে। যার দায় শুধু ডাক্তারদের ওপর পড়ে। এক্ষেত্রে চিকিৎসকদের কেউ ‘ঔন’ করেন না।”
ভুল চিকিৎসার অভিযোগ নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের উপাধ্যক্ষ মুসাররাত সুলতানা সুমী বলছেন, ঘটনা তদন্তের আগেই ভুল বলা উচিৎ নয়।
“দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভুল চিকিৎসার নামে ডাক্তারদের বিরুদ্ধে যে ‘মিডিয়া ট্রায়াল’ হচ্ছে, সেটি খুবই দুঃখজনক। পৃথিবীর কোনো দেশের ডাক্তারদের ওপর এবং হাসপাতালে হামলা হয় না। কোনো বিষয়ে ত্রুটি দেখা দিলে সেটার তদন্ত হওয়া উচিত। এটির আগে ভুল চিকিৎসা হওয়া উচিত বলা উচিত নয়।”
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শনের ঘটনা চিকিৎসকদের ওপর হামলার ‘উস্কানি’ হিসেবে কাজ করে বলেও মনে করেন চিকিৎসকদের কেউ কেউ।
সরকারি একটি ইনস্টিটিউটের এক চিকিৎসকের দাবি, “স্বাস্থ্যমন্ত্রী দেশের বিভিন্ন জায়গায় ‘সস্তা জনপ্রিয়তা নিতে’ পরিদর্শনের পর থেকে চিকিৎসকদের ওপর হামলা বেড়েছে।”
তিনি বলেন, “স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ ব্যক্তি যদি সবসময় ডাক্তারদের হুমকি দেন তাহলে তো জনগণ সেটা দেখে আরও বেশি সাহস পায়। কোনো জায়গায় চিকিৎসা সেবার পর্যাপ্ত সবকিছু না দিয়ে জনগণ এবং চিকিৎসকদের মুখোমুখি করছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু এটার দায় কেউ নিচ্ছে না বা নেয় না।”
মন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শনের সঙ্গে হামলার সম্পর্ক কী, এ প্রশ্নে তিনি বলেন, “একটি পরিবারের প্রধান বা বাবা যদি সন্তানদের প্রতিদিন শাসন করে এবং সেটি সবাইকে দেখিয়ে করে, তাহলে তো প্রতিবেশীরা মারতে আসবেই। আর সেটা স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে হয়েছে।”
স্বাস্থ্যসেবায় সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করে ওই চিকিৎসক বলেন, “স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কথা বলা হচ্ছে, আইসিইউ উদ্বোধনসহ বিভিন্ন কিছু হচ্ছে, কিন্তু জনবল নিয়োগ হচ্ছে না। তাহলে এসব চলবে কীভাবে?”
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি ধরেননি।
‘আস্থার সংকট তৈরি করতে’ হামলা?
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক হুমায়ুন কবির হিমু বলেন, ‘‘বাংলাদেশের যে চিকিৎসা ব্যবস্থা তাতে প্রায় ৯৯ শতাংশ রোগীর চিকিৎসা দেশে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু একটা মহল আছে যারা দেশের স্বাস্থ্য সেবার সংকট দেখাতে পারলে লাভবান হয়।
“কারণ আমরা কোভিডের সময় দেখেছি, রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা নিতে যেতে হয়নি। সেই সময় সবাই চিকিৎসা পেয়েছে, কারণ ডাক্তাররা আন্তরিকতার সঙ্গে কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন।”
গত ২২ অগাস্ট এক কর্মসূচিতে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, ‘‘দেশের চিকিৎসা সেবায় আস্থার সংকট দেখাতে পারলে পাশের দেশে রোগীরা চলে যাবে। এটার ফলে অনেকে লাভবান হবেন। তাদের একটা অংশ হাসপাতালে ও চিকিৎকদের ওপর হামলার ইন্ধন যোগান।”
চিকিৎসা সেবায় আস্থার সংকটসহ আরও বহুবিধ বিষয় রয়েছে বলে মনে করেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মির্জা মো. জিয়াউল ইসলাম।
তার কথায়, “দেশে চিকিৎসা ব্যবস্থায় অস্থিরতা থাকলে পাশের দেশের লাভ, এটা কিছু ক্ষেত্রে সত্য। তবে এটি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে দেশের মানুষের। কারণ প্রান্তিক পর্যায়ে আর ডাক্তাররা সেভাবে চিকিৎসা দিতে পারছেন না ভয়ে। তারা ঢাকায় রোগী রেফার করে দিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে পুরো চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে।”
সুরক্ষায় আইন চান চিকিৎসকরা
চিকিৎসক, স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ও রোগীদের সুরক্ষায় আইন প্রণয়ন এবং তা বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছেন চিকিৎসকরা। এছাড়া কিছু ঘটলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে পারবে, এমন ‘র্যাপিড অ্যাকশন টিম’ রাখার কথাও বলছেন তারা।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের পরিচালক জিয়াউল ইসলাম বলেন, “কিছুদিন আগে পাগলা ঘণ্টার মত কিছু একটা চালুর কথা হচ্ছিল। আমি এটির পক্ষে নই। কারণ কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাকে ধরে মারধর এটিও যৌক্তিক নয়। বরং একটি র্যাপিড অ্যাকশন টিম থাকা দরকার, যারা বিভিন্ন জরুরি দুর্ঘটনায় কাজ করবে।”
ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) মুখ্য সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির হিমু বলেন, “শুধু ডাক্তার নয়, রোগীদের সুরক্ষারও আইন থাকা দরকার, যাতে রোগী ও চিকিৎসকদের অধিকার সমুন্নত থাকে। এর আগে অন্তবর্তীকালীন সময়ে আইন তৈরির কাজ অনেকদূর এগিয়েছে বলে জানি। তবে দীর্ঘদিন আর সেই কমিটির সভা হয়নি। এটা হওয়া প্রয়োজন।”
বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে আমরা কাজ করি। তবে চিকিৎসকদের ওপর যে হামলা হচ্ছে সেটি মেনে নেওয়ার মতো নয়।”
শুধু আইন প্রণয়নের মাধ্যমে হামলা বন্ধ করা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আসলে ডাক্তাররা এত সংকটের মাধ্যমে যে সেবা দেয়, সেটা সবার জানা উচিত। আর চিকিৎসকের বিষয়ে জনগণের ভেতরে ইতিবাচক চিন্তা না আসলে হামলা থামবে না।
“এর জন্য সরকারের বিভিন্ন সেবার তালিকা হাসপাতালে প্রচার করে সাধারণ মানুষদের পরিষ্কার বার্তা দেওয়া, যাতে সামাজিক এক ধরনের পরিবর্তন আসে। তাহলে এসব হামলা হবে না।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, “আমরা চিকিৎসকদের সুরক্ষা আইনের খসড়া তৈরি করেছি। বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলাপ চলছে। আশা করি দ্রুত এটা বাস্তবায়ন হবে।”
চিকিৎসকদের নিরাপত্তা ও হাসপাতালের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঢাকার বাইরের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন করে সশস্ত্র আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন চিকিৎসকরা।
শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আকরাম এলাহী বলেন, ‘‘আনসার নিয়োগের বিষয়টি ইতিবাচক। আমরা এখনো তাদের পাইনি। দ্রুতই জনবল পাব বলে জেনেছি। তারা আসলে অবশ্যই আগের চেয়ে হাসপাতালে নিরাপত্তা ভালো হবে।”
গত ১৯ মে রাজধানীর কেন্দ্রীয় ঔষধাগারে (সিএমএসডি) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, “বেশ কয়েকটি স্বাস্থ্য সংস্থা ও হাসপাতাল মহাখালী এলাকায় হওয়ায় সেখানে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে সরকার। চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীদের নিরাপত্তায় দেশের চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে সেন্ট্রাল ইমারজেন্সি অ্যালার্ম সিস্টেম বা ‘পাগলা ঘণ্টা’ চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার।”
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হলেন নন্দদুলাল সাহা বলেন, “এখনো এই ঘণ্টা চালু হয়নি। এটি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধানদের একটি সভায় তাদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী সেগুলায় ১০ জন করে আনসার প্রদান করেছেন।
“চিকিৎসক এবং রোগীরদের সুরক্ষায় একটি আইন প্রণয়নের কাজ চলছে। তবে আইন প্রণয়নের বিষয়ে অনেকগুলো ধাপ পেরোতে হয়, তার মধ্যে কেবল খসড়া হয়েছে।”
চিকিৎসকদের ওপর হামলার বিষয়ে তিনি বলেন, “সবশেষ ঢাকা মেডিকেলের অধ্যাপকের ওপর হামলার ঘটনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সবাই আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। যাতে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা যায়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
নরসিংদীর মাধবদীতে নামাজরত অবস্থায় বৃদ্ধা জাহানারা বেগমকে (৭৩) হত্যা মামলার তিন আসামিকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে মাধবদী থানা কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান নরসিংদীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আশিকুর রহমান । গ্রেফতারকৃতরা হলো- মাধবদী থানার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের স্বর্ননিগৈড় গ্রামের মৃত হারুন মিয়ার ছেলে হৃদয় মিয়া (২৭), একই গ্রামের ছায়েদের ছেলে কাদির মিয়া (২৭) ও আকমান মিয়ার ছেলে আবু মিয়া (২৯)। সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানায়, গত ৩০ জুলাই সন্ধ্যায় মাধবদী থানার মেহেরপাড়া ইউনিয়নের স্বর্ননিগৈড় গ্রামে নিজ বাড়ির বারান্দায় নামাজরত অবস্থায় জাহানারা বেগমকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় নিহতের ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল মিয়া বাদী হয়ে মাধবদী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলা দায়েরের পরেই তদন্ত শুরু করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পরে তথ্যপ্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা হয়। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত হৃদয় মিয়াকে ৯ আগস্ট, কাদির মিয়াকে ৩০ আগস্ট এবং আবু মিয়াকে ১৬ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাদের আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানান, নিহত জহুরা খাতুনের গলার সোনার চেইন চুরির উদ্দেশ্যে প্রায় ৭ থেকে ৮ মাস আগে স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় বসে পরিকল্পনা করা হয়। গত ৩০ জুলাই ঘটনার দিন বিদ্যুৎ না থাকার সুযোগে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় তারা। পরে আসামিরা জহুরা খাতুনের বাড়িতে প্রবেশ করে। তিনি নামাজরত অবস্থায় থাকাকালে তার ওপর হামলা চালানো হয়। এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ চলে আসে এবং তাদের চিনে ফেলে এবং বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার পিঠ ও মাথায় আঘাত করা হয়। পরে তার গলার সোনার চেইন নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় তারা। তিনি আরো জানান, লুণ্ঠিত সোনার চেইন উদ্ধার ও এর সাথে জড়িতদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যহত রয়েছে। গ্রেপ্তার হ্নদয় ও কাদিরের বিরুদ্ধে এর আগেও পৃথক মামলা রয়েছে। এসময় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) সজীব শাহরীন এবং মাধবদী থানার ওসি মো. কামাল হোসেন উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর বনশ্রীতে মোটরসাইকেল থেকে ছিটকে পড়ে দুই বাসের চাপায় পিষ্ট হয়ে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষিকা নিহত হয়েছেন। বুধবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে বনশ্রীর ফরাজী হাসপাতালের সামনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহত শিক্ষিকার নাম তাসপিয়া আহমেদ তিসা (৩১)। তিনি মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের আফতাবনগর শাখার শিক্ষক ছিলেন। তার গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর সদর উপজেলার প্রফেসর পাড়ায়। তিনি পরিবারের সঙ্গে খিলগাঁওয়ের মেরাদিয়া নোয়াপাড়ায় বসবাস করতেন। নিহতের ভাই এনাম আহমেদ জানান, তাসপিয়া তার পেশাগত কাজে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন। সন্ধ্যায় তারা খবর পান, ফরাজী হাসপাতালের সামনে মোটরসাইকেলের পেছন থেকে পড়ে গিয়ে দুই বাসের চাপায় তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। খিলগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) অনয় চন্দ্র পাল জানান, রমজান পরিবহন ও অন্য আরেকটি বাসের চাপায় পড়ে ঘটনাস্থলেই তাসপিয়া আহমেদ মারা যান। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে রাত ৯টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এসআই অনয় চন্দ্র পাল আরো জানান, ঘটনার পরপরই রমজান পরিবহনের একটি বাসসহ দুর্ঘটনাকবলিত দুটি বাসই জব্দ করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাস দুটির চালক ও হেলপারদের আটক করেছে পুলিশ।
রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের মিছিলকে কেন্দ্র করে এবার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হলো ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে। বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) পরবর্তী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার কাছে দায়িত্ব অর্পণ করে তাকে ডিএমপি সদর দপ্তরে রিপোর্ট করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদের সই করা এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, গুলশান বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার এম তানভীর আহমেদকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রশাসনিক কারণে ঢাকা মেট্রোপলিটন সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হলো। এর আগে, একই দিন গুলশান মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়। ওসির প্রত্যাহার আদেশে বলা হয়, প্রশাসনিক কারণে ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্বাহ্নে ডিএমপি সদর দপ্তর ও প্রশাসন বিভাগের কেন্দ্রীয় সংরক্ষণ দপ্তরে দাউদ হোসেনকে সংযুক্ত (ক্লোজড) করা হলো। গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) দুপুর পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর গুলশান থানাধীন ৩ নম্বর সড়কের কেএফসি-সংলগ্ন সড়কে মিছিল করে কার্যক্রমে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। মিছিল ছত্রভঙ্গ করতে গেলে মিছিলকারীরা পুলিশের দিকে ককটেল নিক্ষেপ করে। এসময় হাতেনাতে দুজনকে গ্রেপ্তার ও পাঁচটি ককটেল উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনার পর এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মিছিলের বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য ছিল। তবে শুক্রবার পুলিশ হয়তো আন্দাজ করতে পারেনি যে ওই সময় ওই এলাকায় জুমার নামাজ পড়তে এসে তারা এরকম একটা কিছু করতে পারে। গুলশানে মিছিলের বিষয়ে তিনি বলেন, সকাল ১১টার দিকে জুমার নামাজ আদায়ের কথা বলে সেখানে কিছু লোক জড়ো হয়েছিল। পরে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।