নদীর বুক চিরে অবৈধ ড্রেজারের তাণ্ডব ও রাতে ভারী ট্রাকের বিকট শব্দ। বিপরীতে স্থানীয় মানুষের বুকফাটা আর্তনাদ। এমন চিত্র সারা দেশের বালুমহালে। শুধু তাই নয়, সহিংস নানা ঘটনায় বালুমহালগুলো পরিণত হয়েছে এক একটি ত্রাসের রাজত্বে। ক্ষমতার পালাবদলে কেবল সাইনবোর্ড আর মুখের ভাষা বদলায়, কিন্তু বদলায় না অপরাধ। শুধু ব্যক্তির বদল। অপরাধীরা থেকে যায় অধরা। এর নেপথ্য কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ত্রিভুজ সিন্ডিকেটের ভয়ংকর তৎপরতা।
সংঘবদ্ধ এই অপরাধের পেছনে আশ্রয়দাতা হিসাবে সামনে রয়েছে বিএনপি, পেছনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চক্র। অন্যদিকে রক্ষাকবচ হিসাবে অদৃশ্য সুরক্ষার চাদর বিছিয়ে রেখেছে প্রশাসন। জড়িত একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। এখানেই শেষ নয়। এসব অপরাধ আড়াল করতে আছে একশ্রেণির সুবিধাভোগী সাংবাদিকও। সব মিলিয়ে এ চক্রের অপতৎপরতায় বেসামাল সব ক’টি বালুমহাল। আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে চলছে ইজারাদারদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্য। ফলে নদীভাঙনের কবলে পড়ে বিলীন হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা। এর প্রভাবে ভেঙে পড়েছে পরিবেশ-প্রতিবেশের ভারসাম্য। সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন ও যুগান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য।
এদিকে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করলে জামানত বাজেয়াপ্ত ও ইজারা বাতিলে স্পষ্ট আইনি বিধান থাকলেও বাস্তবে প্রয়োগ নেই। আবার কোনো ঘটনায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) প্রত্যাহার করা হয়। অনেক সময় আসল অপরাধীকে আড়াল করতে এভাবে লোক দেখানো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা দাপটের সঙ্গে বালু লুট করেছেন, তারা এখন আত্মগোপনে থেকে নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে গোপন আঁতাতে সফল হয়েছেন। এই দুই পক্ষের যোগসাজশ এবং পেশিশক্তির জোরে দেশের অধিকাংশ বালুমহাল এখন গুটিকয়েক সন্ত্রাসীর পৈতৃক সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বালুমহালকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী ঘটনাগুলো যেন কোনো থ্রিলার সিনেমাকেও হার মানায়। মানিকগঞ্জের শিবালয়ে যমুনা নদীর দুর্গম চরাঞ্চলে প্রকাশ্য দিবালোকে স্পিডবোটে এসে বালুমহালের ম্যানেজারকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা প্রমাণ করে পরিস্থিতি কতটা ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে অবৈধ বালু উত্তোলনে বাধা দেওয়ায় স্পিডবোট থেকে সাধারণ গ্রামবাসীর ওপর বৃষ্টির মতো গুলি ছোড়ার ঘটনা আরও ভয়াবহ।
জানা গেছে, পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা থেকে শুরু করে সুরমা, যাদুকাটাসহ অনেক নদীর বুকে চলছে শত শত অবৈধ ড্রেজারের তাণ্ডব। ধ্বংসযজ্ঞ চলছে স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায়। মাঝে মধ্যে দিনের বেলায় লোকদেখানো অভিযান পরিচালনা করা হলেও রাতে দ্বিগুণ উৎসাহে শুরু হয় বালু চুরি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা ভয়ংকর ত্রিভুজ সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে বালুসন্ত্রাস আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্ট অনেকের।
আরও জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত এক বছর মেয়াদে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর থানাধীন যাদুকাটা নদীতে যাদুকাটা-১ (৮৯.৫৬ একর) বালুমহালটি ইজারা পান তাহিরপুর উপজেলা বিএনপি নেতা (দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি) নাছির মিয়া। একই সময়ের জন্য যাদুকাটা-২ (৩৯৮.০৪ একর) বালুমহালের ইজারা পান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেল আহমেদ। কিন্তু মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও আইনের ফাঁক গলে ইজারাদাররা এখনো বালু উত্তোলন করছেন। সিন্ডিকেট সদস্যরা এখান থেকে দিনে কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে। এক্ষেত্রে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে শতাধিক ক্যাডার। চাঁদা আদায়ে ক্যাডার বাহিনীর সক্রিয় সদস্যরা হলেন-রাণু মেম্বার, মোশাহিদ হোসেন, পাথর মুত্তালিব, ফিরোজ আলী, মোশালম, মান্না শাহ, আতাউর, রুবেল মিয়া, রাকাব উদ্দিন, হাকিকুল, আক্কাছ, লোকমান, মোবাশ্বির, আবুল হোসেন, রতি মিয়া, ইসলাম উদ্দিন, সেলিম চৌধুরী, ইদু মিয়া, আবু ইসলাম, ইকরাম, সুমন, গোলাম রব্বানী, বোরহান, হাসান, হাবিবুর, আব্দুল কাইয়ুম, মনসুর, সাজ্জাদ (বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্য) ও কয়েকটি গণমাধ্যমের কয়েকজন বিতর্কিত কর্মীসহ অনেকেই।
সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ আমলে যাদুকাটা নদীর বালু সিন্ডিকেটের মূল নিয়ন্ত্রণ ছিল সুনামগঞ্জ জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক মুজিবুর রহমান এবং জেলা আওয়ামী লীগ নেতা রতন মিয়ার হাতে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ শুরু করেন। বিএনপির একজন সংসদ-সদস্যের ছত্রছায়ায় নাছির মিয়া ও বিদেশে পলাতক আওয়ামী লীগ নেতা নূরুল হুদা মুকুটের প্রতিনিধি শাহ রুবেল এই সিন্ডিকেট সক্রিয় রেখেছেন। রুবেলের সঙ্গে আওয়ামী অংশে আছেন আলমগীর ও মোবারক হাজিসহ অনেকেই। আর নাছিরের সঙ্গে বিএনপি অংশে আছেন জুনাব আলী, আনিসুল হক, মুস্তাক আহমদ, শাখাওয়াত প্রমুখ।
বালু লুটে আরও যাদের নাম বেরিয়ে এসেছে তারা হলেন-চাঁন মিয়া মাস্টার ওরফে চান্দু, আবু সাঈদ, সামসু আলম, আকাশ, মনর, আব্দুল্লাহ, সুবেল, আব্দু হান্নান, এমামুল, মাসুক সর্দার, রায়হান উদ্দিন রিপন, জামাল, বিল্লাল, রহিছ ওরফে টেরা রহিছ, মান্নান, মালেক, ফারুক, খাজা মাইনুদ্দীন, জাহাঙ্গীর, আলম সাব্বির, তমিজ উদ্দিন, শফিকুল ইসলাম, সাইতু, ইসমাইল, খোকন, সবুজ প্রমুখ।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিলেটের স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল তালুকদার জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন নির্বিঘ্নে চালু রাখতে প্রতিমাসে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের অসাধু কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকা ঘুস বা মাসোহারা হিসাবে দেওয়া হয়। মাসোহারা দিতে হয় নৌপুলিশ, থানা পুলিশ, ক্যাম্প পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সাংবাদিকদের। কতিপয় সাংবাদিক ও স্থানীয় মিডিয়া প্রতিনিধিদের ৩টি স্তরে মাসোহারা দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, যাদুকাটা নদীর বালুমহাল থেকে তাহিরপুরের স্থানীয় অসাধু সাংবাদিকরা প্রতিমাসে দুই হাজার থেকে পাঁচ হাজার, জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিরা পাঁচ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং সিলেটে ব্যুরো অফিসের দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন সাংবাদিক মাসে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা পান। এদের মধ্যে তাহিরপুরের একজন প্রভাবশালী সাংবাদিক দিনে চাঁদা নেন ১০ হাজার টাকা। এছাড়া পরিবারের এক সদস্যকে দিয়ে রাতের বেলা নয়টি ড্রেজার চালিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করেন। এ খাত থেকে দৈনিক আয় করেন পাঁচ লাখ টাকা। এর বাইরে তিনি চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে ঢাকায় অবস্থানরত কয়েকজন সাংবাদিকের মাসোহারা ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। তিনি বলেন, অবিশ্বাস্য হলেও এসব তথ্য সত্য। অলিখিত এই প্র্যাকটিস চলে আসছে দুই-তিন দশক ধরে। ফলে বালুমহাল থেকে রাজনীতিবিদ, পুলিশ সদস্য, স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমকর্মীদের অবৈধ সুবিধা নেওয়া যতদিন বন্ধ হবে না, ততদিন এই বালু সন্ত্রাস চলতে থাকবে। বরং আরও বাড়বে।
সূত্র জানায়, সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ-সদস্য (এমপি) কামরুজ্জামান কামরুল সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া এক ডিও লেটারে (আধাসরকারি পত্র) বালু সন্ত্রাস বন্ধে হস্তক্ষেপ কামনা করেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, স্থানীয় প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে অসাধু চক্র দিনের পর দিন যাদুকাটা নদীর তীর কেটে অবাধে বালি বিক্রি করে আসছে। এর ফলে হুমকির মুখে পড়েছে নদীতে নির্মাণাধীন সেতু, এশিয়ার বৃহত্তম শিমুল বাগান এবং লাউড়ের গড়, ঘাগটিয়া, ঘরঘাটি ও বিন্নাকুলি বাজারসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি গ্রাম ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে পুলিশ ফোর্স কেবল দায়সারা দায়িত্ব পালন করে। দু-একদিন দু-চার মিনিটের জন্য পুলিশ উপস্থিত হলেও বাস্তবে কোনো কাজেই আসছে না। পুলিশের এই ঢিলেঢালা ভূমিকার সুযোগে দুষ্কৃতকারীরা রাতের অন্ধকারে প্রতিনিয়ত নদীর তীর কেটে অবৈধভাবে বালি ও পাথর উত্তোলন চালিয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য : জানতে চাইলে পুলিশের মুখপাত্র (এআইজি, মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন যুগান্তরকে বলেন, সারা দেশের বালুমহালে নিয়মিত অভিযান চলছে। পুলিশের সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে এ বিষয়ে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা বিশ্লেষণ করে দেখা হচ্ছে। জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা চাই না, মেয়াদ শেষ হওয়া ইজারাদাররা বালু তুলুক। এ কারণে হাইকোর্টের আদেশের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে আপিল দায়ের করা হয়েছে। যে কোনোদিন আপিলের শুনানি অনুষ্ঠিত হতে পারে। শুনানি শেষ হলে নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বান করা হবে।’ সাবলিজ এবং অবৈধ চাঁদা আদায়ের তথ্য তার জানা নেই বলে তিনি যুগান্তরকে জানান।
স্থানীয় বিএনপি নেতা ও যাদুকটা-১ বালুমহালের ইজারাদার নাছির মিয়া বলেন, দেশের অন্যান্য বালুমহাল থেকে যেভাবে বালু উত্তোলন করা হয়, যাদুকাটা নদী থেকেও একইভাবে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকারি নথিতে এপ্রিলের ১৩ তারিখ মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও আমরা গত ফেব্রুয়ারিতে সময় বাড়ানোর (এক্সটেনশন) আবেদন করেছি। সে অনুযায়ী আরও প্রায় দেড় মাস মেয়াদ রয়েছে।
যাদুকাটা-২ এর ইজারাদার শাহ রুবেল আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, নির্ধারিত সময়ে আমরা ইজারা বুঝে পাইনি। নির্ধারিত সময়ের প্রায় পাঁচ মাস পর, অর্থাৎ সেপ্টেম্বরে আমাদের নদীর দখল হস্তান্তর করা হয়। ফলে নিয়মানুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত আমাদের ইজারার মেয়াদ বহাল রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুতে মোনায়েম হোসেন (৫০) নামে এক ইউপি সদস্যকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার ভায়না বাজার সংলগ্ন কালিশংকরপুর নামক স্থানে এ ঘটনা ঘটে। নিহত মোনায়েম হোসেন ভায়না ইউনিয়নের কালীশংকরপুর গ্রামের মৃত আবুল মন্ডলের ছেলে। তিনি ভায়না ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ওয়ার্ড সভাপতি। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিকালে কুষ্টিয়ার আব্দালপুরে খেলা দেখতে যান ইউপি সদস্য মোনায়েম হোসেন। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে স্থানীয় ভায়না বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। পথে কালীশংকরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উত্তর পাশে পৌঁছালে আগে থেকে ওৎ পেতে থাকা অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। এ সময় তাকে ধারালো দেশীয় অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করা হয়। এতে তিনি গুরুতর আহত হন। এসময় তার চিৎকার শুনে আশেপাশের লোকজন ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে পৌছানোর পরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। বর্তমানে মরদেহ কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে রয়েছে। ভায়না ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আক্তার হোসেন বলেন, “বিকালে মোলাম হোসেন খেলা দেখতে আব্দালপুরে গিয়েছিলেন। রাতে বাজারের কাজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে স্কুলের উত্তর পাশে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা তার ওপর হামলা চালায়। কুষ্টিয়া নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।” নিহতের স্ত্রী শিল্পী খাতুন বলেন, “আমার স্বামী বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন। গ্রামের স্কুলের পিছনে তাকে মেরে ফেলেছে। আমি বিধবা হয়ে গেলাম। সন্তানরা এতিম হয়ে গেলো। আমি এর বিচার চাই।” হরিণাকুণ্ডু থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসুম খান বলেন, “এ ঘটনা কে বা কারা ঘটিয়েছে তা এখনও নিশ্চিত নই। তবে ধারণা করা হচ্ছে, পূর্ববিরোধের জেরে তার প্রতিপক্ষের লোকজন এ ঘটনা ঘটিয়েছে। আমরা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখবো। মরদেহ কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে থেকে ফেরার পরে আমরা ময়নাতদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।”
মহাসড়কে স্লিপার বাস চালানোর অনুমতি চেয়ে বাস মালিক সমিতির করা আবেদনে সাড়া দেননি হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যেসব বাস চলাচলের অনুমতি দিয়েছে, কেবল সেসব বাসই সড়কে চলাচল করতে পারবে। বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি কে এম হাফিজুল আলমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে বিআরটিএর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. রাফিউল ইসলাম। পরে তিনি বলেন, স্লিপার বাস মালিক অ্যাসোসিয়েশন সড়কে এসব বাস চালানোর অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছিল। শুনানিতে তিনি আদালতকে জানান, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৪০ ধারায় যানবাহনের কারিগরি বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নির্ধারিত কারিগরি বৈশিষ্ট্য লঙ্ঘন করলে তা আইনের ৮০ ও ৮৪ ধারায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এ অপরাধে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তিনি আরও বলেন, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ২৮ ধারায় রুট পারমিট ছাড়া কোনো গাড়ি সড়কে চলাচল করতে পারবে না বলে স্পষ্ট করা হয়েছে। আইনজীবী মো. রাফিউল ইসলাম বলেন, ‘আদালত বলেছেন, শুধুমাত্র বিআরটিএ যেসব বাস চলাচলে পারমিশন দিয়েছে, সেগুলোই রাস্তায় চলাচল করবে। স্লিপার বাস চালানোর তো পারমিশন নেই। হাইকোর্টও পারমিশন দেয়নি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ভূমি মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন পদে সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রলোভন দিয়ে আসছিল একটি চক্র। দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা তাদের এজেন্টরা চাকরি প্রার্থীদের টার্গেট করে পরিচিতজনদের মাধ্যমে টোপ ফেলতো। শুরুতে বলা হতো মাস্টার রোলে নিয়োগে ৩ মাস চাকরি করতে হবে। এরপর নিয়োগের প্রজ্ঞাপন দেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ওই প্রজ্ঞাপনেই পূর্ণাঙ্গ সরকারি চাকরি হবে। চাকরির মাধ্যম হিসেবে মধ্যবয়সী একজনকে সাজানো হতো যুগ্ম সচিব। এরপর সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের ওয়েটিং রুমে ডাকা হতো চাকরি প্রত্যাশীদের। সেখান থেকে ক্যান্টিনে বা আশপাশের কোনো রেস্টুরেন্টে নিয়ে হাতে দেওয়া হতো চাকরির নিয়োগপত্র। অনেককে সংশ্লিষ্ট অফিসের সামনে ডেকে হাজিরা নেওয়া হতো। কাউকে কাউকে গ্রেড অনুযায়ী একমাসের বেতন অগ্রিমও দেওয়া হতো। ১৪ লাখ টাকার বিনিময়ে অফিস সহকারী পদের চাকরি দেওয়ার নামে ভুয়া কাগজ ও অভিনব কৌশলে প্রতারণা করা একটি চক্রের ৩ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন-মূলহোতা নিশিথ ওরফে রুবেল, তার দুই সহযোগী মিজানুর রহমান ওরফে মিজান ও রিংকু হোসেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় ভূমি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের চাকরির নিয়োগপত্র, নিয়োগের পর কথিত হাজিরা খাতা, প্রজ্ঞাপন এবং পরিচয়পত্র। মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) ডিসি মোল্লা মোহাম্মদ শাহিন এসব তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, পল্লবী থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলার সূত্র ধরে সোমবার পৃথক অভিযানে এই চক্রের সদস্যদের গ্রেফতার করা হয়। তারা মাত্র ৬ জন চাকরি প্রত্যাশীর কাছ থেকেই হাতিয়ে নিয়েছে অর্ধকোটি টাকা। ডিসি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন জেলায় এই চক্রের সদস্যরা চাকরি প্রার্থীদের ফাঁদে ফেলছে। এই চক্রের হাতে প্রতারণার শিকার হয়েছেন সাবেক পুলিশ সদস্যের সন্তান থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও অন্য পেশার সন্তানরা। অনেকে জমিজমা বিক্রি করে মোটা অঙ্কের টাকা তুলে দিতো এই প্রতারক চক্রের সদস্যদের কাছে। প্রতারণার শিকার চাকরি প্রত্যাশীরা জানিয়েছেন, অধিদপ্তরে ডেকে ৭-৮ জনের একটি চক্র এমন অভিনয় করতো মনে হতো তারা ওই অফিসের প্রভাবশালী কেউ। এই চক্রে সংশ্লিষ্ট অফিসের কেউ জড়িত কিনা সেটি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। মোল্লা মোহাম্মদ শাহিন বলেন, কেউ যদি বিশেষ সুবিধায় চাকরি দেওয়ার প্রস্তাব দেয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট অফিস বা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করে যাচাই করা উচিত। তাহলে এই প্রতারণা কমে আসবে।