পদ্মা সেতু চালুর পর মোংলা বন্দর দিয়ে হিমায়িত খাদ্য রফতানি কমে গেছে। সময়মতো জাহাজ পাওয়া ও বায়ারদের সিডিউল ঠিক রাখতে ব্যবসায়ীরা চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। এ কারণে গত তিন বছরে মোংলা বন্দর দিয়ে হিমায়িত খাদ্য রফতানি অর্ধেকে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় ঢাকা থেকে গার্মেন্টস পণ্য রফতানিতে ব্যবসায়ীরা মোংলা বন্দরের দিকে ধাবিত হচ্ছেন। এ কারণে গত তিন বছরে মোংলা বন্দরে গার্মেন্টস পণ্য রফতানি শুরু হয়েছে। পদ্মা সেতু চালুর আগে মোংলা বন্দর দিয়ে গার্মেন্টস রফতানি ছিলো না।
মোংলা বন্দর সূত্রে জানা গেছে, পদ্মা সেতু চালুর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ হাজার ৬৪৮ বক্সে ৩ হাজার ৮১ টিইইউ কনটেইনারে ৩৩ হাজার ৩১৬ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য রফতানি হয়। আর ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ৪৪৬ বক্সে ২ হাজার ৮৩৩ টিইইউ কনটেইনারে ৩১ হাজার ৭১৫ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য রফতানি হয়।
পদ্মা সেতু চালু হয় ২০২২ সালের ২৫ জুন। এ অবস্থায় ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ২৮ বক্সে ২ হাজার ১৯ টিইইউ কনটেইনারে ২২ হাজার ৫৭৫ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য রফতানি হয়। পাশাপাশি গার্মেন্টস পণ্য রফতানি শুরু হয়। এ সময়ে ৩৭ বক্সে ৭৪ টিইইউ কনটেইনারে ৪৫৪ মেট্রিক টন গার্মেন্টস পণ্য রফতানি হয়।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৭৮৭ বক্সে ১ হাজার ৫২৯ টিইইউ কনটেইনারে ২২ হাজার ৫৭৬ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য রফতানি হয়। এ সময়ে গার্মেন্টস পণ্য রফতানি আগের বছরের তুলনায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়। ৩৫৪ বক্সে ৭০৬ টিইইউ কনটেইনারে ৪ হাজার ৭৩০ মেট্রিক টন গার্মেন্টস পণ্য রফতানি হয়।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে হিমায়িত পণ্য রফতানি নেমে আসে অর্ধেকে। এ সময়ে ৭৬৮ বক্সে ১ হাজার ৫২৯ টিইইউ কনটেইনারে ১৭ হাজার ২৬২ মেট্রিক টন হিমায়িত খাদ্য রফতানি হয়। পাশাপাশি ৩২৬ বক্সে ৬৫২ টিইইউ কনটেইনারে ৪ হাজার ১৮১ মেট্রিক টন গার্মেন্টস পণ্য রফতানি হয়।
এরপরও মোংলা বন্দর রাজস্ব আয়ে নতুন সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বন্দরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। অর্জন হয়েছে ৩৮৭ কোটি ৯৫ লাখ ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি আয়ের পাশাপাশি আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব বেড়েছে ৪০ কোটি ৮২ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। যা গত অর্থবছরের চেয়ে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বেশি।
বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, খুলনার ভাইস প্রেসিডেন্ট এস কে কামরুল আলম বলেন, হিমায়িত খাদ্য রফতানিতে বায়ারদের সিডিউল থাকে, টাইম বেরিয়ার থাকে। মোংলা বন্দরে ওই সিডিউল অনুযায়ী জাহাজ সব সময় থাকে না। কিন্তু চট্টগ্রামে পাওয়া যায়। তাই বায়ারদের সিডিউল ঠিক রাখতে কিছু পণ্য চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে রফতানি করতে হয়। বায়ারদের সিডিউলের সঙ্গে মোংলা বন্দরে জাহাজ থাকলে আমরা মোংলা বন্দরই ব্যবহার করছি।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আরিফ আহাম্মেদ মোস্তফা বলেন, পদ্মা সেতু চালুর পর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হয়। ঢাকা থেকে মোংলা আসতে চার ঘণ্টা লাগে। আর চট্টগ্রাম যেতে লাগে সাড়ে সাত ঘণ্টা। এ কারণে গার্মেন্টস রফতানিতে মোংলা বন্দর গুরুত্ব পেয়েছে। কিন্তু এই উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে হিমায়িত পণ্য দ্রুত রফতানিতে চট্টগ্রাম বন্দরে যেতে শুরু করেন ব্যবসায়ীরা। হিমায়িত পণ্য রফতানিতে সিডিউল অনুযায়ী জাহাজ দরকার হয়।
চেয়ারম্যান জানান, সংকটের মধ্যেও শুধু রাজস্ব আয় নয়, জাহাজ আগমন, কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়েও প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
মোংলা বন্দর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে মোংলা বন্দরের বার্ষিক জাহাজ হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ হাজার ৫০০টি। কিন্তু বিদায়ী অর্থবছরে জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে ৮১৫টি। যা সক্ষমতার ৫৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ।
কার্গো হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন। বিদায়ী অর্থবছরে কার্গো হ্যান্ডলিং হয়েছে ১ কোটি ২২ লাখ ৫১ হাজার মেট্রিক টন। যা সক্ষমতার ৮১ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ১ লাখ টিইইউ। বিদায়ী অর্থবছরে কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়েছে ২৯ হাজার ৭১৪ টিইইউ। যা সক্ষমতার ২৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। রিকন্ডিশন্ড গাড়ি হ্যান্ডলিং সক্ষমতা ২০ হাজার ইউনিট। বিদায়ী অর্থবছরে গাড়ি আমদানি হয়েছে ১২ হাজার ৭৫টি। যা সক্ষমতার ৬০ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, জাহাজ আগমন বাড়াতে ‘ইন্টারনাল বিজনেস ডেভেলপমেন্ট স্ট্যান্ডিং কমিটি’র মাধ্যমে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মস্পৃহা ও কার্যক্রমে গতি আনতে বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে নিয়মিত সভা করে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করা হচ্ছে।
বন্দরের সক্ষমতা আরও বাড়াতে বন্দরের জন্য সহায়ক জলযান সংগ্রহ, মোংলা বন্দরের আপগ্রেডেশন এবং কনটেইনার টার্মিনাল ও ইয়ার্ড নির্মাণসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
সহায়ক জলযান সংগ্রহ প্রকল্পের আওতায় দুটি টাগবোট, একটি বয়া লেইং ভেসেল, একটি সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ ভেসেল, একটি পাইলট মাদার ভেসেল এবং একটি সার্ভে অ্যান্ড রিসার্চ ভেসেল সংগ্রহের কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতীয় এলওসি-৩-এর অর্থায়নে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ প্রকল্পের আওতায় আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল, কনটেইনার হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড ও ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব অবকাঠামো বাস্তবায়িত হলে বন্দরকেন্দ্রিক শিপিং, সিঅ্যান্ডএফ, স্টিভেডরিং ও শ্রম খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে।
মোংলা বন্দরে জাহাজ ও শিল্পকারখানা থেকে উৎপন্ন বর্জ্য সংগ্রহ এবং নিঃসৃত তেল অপসারণে আধুনিক ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হয়।
এ ব্যবস্থার ফলে জাহাজের বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে ফেলা বন্ধ করার পাশাপাশি পশুর চ্যানেল ও আশপাশের নদ-নদীর দূষণ কমানো এবং সুন্দরবনের পরিবেশ সুরক্ষায় সহায়তা করবে।
বন্দরের সামনে অন্যতম চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ১৪৪ কিলোমিটার চ্যানেলের নাব্যতা বৃদ্ধি ও তা ধরে রাখা। একই সঙ্গে নিরাপদ ও দূষণমুক্ত নৌপথ নিশ্চিত করা, পুরোনো সহায়ক জলযান প্রতিস্থাপন, নতুন জলযান সংগ্রহ, দক্ষ জনবল তৈরি এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের আরও বেশি করে মোংলা বন্দর ব্যবহারে উৎসাহিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ছাড়া মোংলা বন্দরকে সরাসরি ‘ফার্স্ট কলিং পোর্ট’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা, কনটেইনারবাহী জাহাজের সংখ্যা বাড়ানো, সিঙ্গাপুরসহ গুরুত্বপূর্ণ বন্দরে সরাসরি ফিডার জাহাজ চলাচল এবং খুলনা-মোংলা ও খুলনা-ভাঙ্গা সড়ক যোগাযোগের সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
রিয়ার অ্যাডমিরাল আরিফ আহমেদ মোস্তফা বলেন, এসব কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য হলো মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করা। এ লক্ষ্যে সরকারের মহাপরিকল্পনা রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে ২ হাজার ৪৪৬টি মামলা করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ । রবিবার ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. আকতার হোসেন এ তথ্য জানান। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ট্রাফিক-রমনা বিভাগে তিনটি বাস, দুটি ট্রাক, তিনটি কাভার্ডভ্যান, ছয়টি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ২৩টি মোটরসাইকেলসহ মোট ৭৪টি মামলা হয়েছে। ট্রাফিক-লালবাগ বিভাগে ১২টি বাস, একটি ট্রাক, দুটি কাভার্ডভ্যান, ১১টি অটোরিকশা ও ৯২টি মোটরসাইকেলসহ মোট ১৫৮টি মামলা হয়েছে। ট্রাফিক-মতিঝিল বিভাগে ২৩টি বাস, একটি ট্রাক, ২৩টি কাভার্ডভ্যান, ৬৭টি অটোরিকশা ও ১৮৩টি মোটরসাইকেলসহ মোট ৩৬১টি মামলা হয়েছে। ট্রাফিক-ওয়ারী বিভাগে ২০টি বাস, ২১টি ট্রাক, ২৮টি কাভার্ডভ্যান, ৭৭টি অটোরিকশা ও ১৭০টি মোটরসাইকেলসহ মোট ৪২২টি মামলা হয়েছে। অন্যদিকে ট্রাফিক-তেজগাঁও বিভাগে সাতটি বাস, একটি ট্রাক, ছয়টি কাভার্ডভ্যান, ১২টি অটোরিকশা ও ৪২টি মোটরসাইকেলসহ মোট ১১২টি মামলা হয়েছে। ট্রাফিক-মিরপুর বিভাগে নয়টি বাস, সাতটি ট্রাক, ১৮টি কাভার্ড ভ্যান, ৩৪টি অটোরিকশা ও ৮৯টি মোটরসাইকেলসহ মোট ২০৪টি মামলা হয়েছে। ট্রাফিক-উত্তরা বিভাগে ১৯টি বাস, ১১টি ট্রাক, ১২টি কাভার্ডভ্যান, ৪৬টি অটোরিকশা ও ১০৬টি মোটরসাইকেলসহ মোট ৩১০টি মামলা হয়েছে। ট্রাফিক-গুলশান বিভাগে ১১০ টি বাস, আটটি ট্রাক, ৩৫টি কাভার্ডভ্যান, ১০৫টি অটোরিকশা ও ২৭৫টি মোটরসাইকেলসহ মোট ৮০৫টি মামলা হয়েছে। এছাড়াও অভিযানকালে ৬০৬টি গাড়ি ডাম্পিং ও ৩৪৭টি গাড়ি রেকার করা হয়েছে। শনিবার ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ কর্তৃক রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে এসব মামলা করা হয়। ঢাকা মহানগর এলাকায় ট্রাফিক শৃঙ্খলা রক্ষায় ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
রাজধানীর মোহাম্মদপুর-বসিলা সড়ক কার্যত অচল করে দিয়েছেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালকরা। রোববার সকাল থেকে তাদের অবরোধে বন্ধ হয়ে গেছে সড়কটির যান চলাচল। এর প্রভাব পড়েছে আশপাশের সড়কগুলোতেও। তীব্র যানজটে আটকে পড়েছেন অফিসগামী মানুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যাত্রীরা। জরুরি কাজে বের হয়েও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না অনেকে। রোববার (১১ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে মোহাম্মদপুর চার রাস্তার মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ করেন অটোরিকশাচালকেরা। এরপর থেকে ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আশপাশের সড়কেও যানবাহনের চাপ বাড়ে, ব্যাহত হয় স্বাভাবিক চলাচল। অবরোধে আটকে পড়ে ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী মানুষসহ বিভিন্ন গন্তব্যের যাত্রীরা। তাদের একজন বলেন, আমি নিউমার্কেট যাব। আধা ঘণ্টা ধরে সিএনজিতে বসে আছি; কিন্তু সামনে এগোতে পারছি না। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে এক যাত্রী বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিয়ে সরকারের নতুন করে ভাবা উচিত। চালকেরা যখন-তখন সড়ক বন্ধ করে দিলে সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে এ ধরনের অবরোধে অফিসগামী মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। অটোরিকশাচালকেরা জানান, তিন দিনের মধ্যে ঢাকা শহরে অটোরিকশা চলাচল বন্ধ করা হবে, সড়ক ও সেতুমন্ত্রীর এমন হুঁশিয়ারির প্রতিবাদে তারা সড়ক অবরোধ করেছেন। অবরোধে অংশ নেওয়া এক চালক বলেন, আমাদের প্রধান দাবি, যেসব সড়কে অটোরিকশা চলাচলের অনুমতি রয়েছে, সেসব সড়কে নির্বিঘ্নে গাড়ি চালানোর সুযোগ দিতে হবে। পুরো শহরে অটোরিকশা চালানোর দাবি আমাদের নেই। সরকার যেসব সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ করেছে, আমরা সেসব সড়কে গাড়ি চালাই না। আমরা চাই, নির্ধারিত সড়কে অন্তত নির্বিঘ্নে অটোরিকশা চালানোর সুযোগ দেওয়া হোক।
বারবার ফোন ব্যবহার করে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের প্রশাসনিক বৈঠকে ধমক খাওয়া বাগেরহাটের বিতর্কিত সিভিল সার্জন ডা. এ. এস. মো. মাহবুবুল আলম এবার বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ডক্টর ফরিদুল ইসলামের অনুষ্ঠানে ঘুমিয়ে পড়ে আলোচনায় এসেছেন। হাইপ্রোফাইল অনুষ্ঠানে বারবার বিতর্কিত কাণ্ড ঘটানোয় এই কর্মকর্তার মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। বিএনপির প্রয়াত নেতা সাদেক হোসেন খোকার এপিএস মনিরুল ইসলাম শনিবার (১০ অক্টোবর) সিভিল সার্জনের ঘুম নিয়ে ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, এমন অসুস্থ ব্যক্তিকে চায় না বাগেরহাটবাসী। এসব আচরণের বাইরে মো. মাহবুবুল আলমকে নিয়ে বাগেরহাটে বিতর্ক বহু পুরোনো। সম্প্রতি কালবেলা, ডিবিসি এবং যমুনা টিভির অনুসন্ধানে বাগেরহাটে মাহমুদুল হাসান নামের যে ভুয়া এমবিবিএস চিকিৎসকের সন্ধান মিলেছে, সেই চিকিৎসককে অবাধে রোগী দেখার অনুমতি দেওয়ার অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। স্থানীয় কথিত ফেসবুক সাংবাদিক কামরুজ্জামান শিমুল নামের এক বিএনপি নেতার প্রশ্রয়ে ওই ভুয়া চিকিৎসক দিনের পর দিন বাগেরহাটে রোগী দেখছিলেন। যমুনা টেলিভিশনে এই সংবাদ প্রচারের অনেক আগে কালবেলা, ডিবিসিসহ বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে মাহমুদুল হাসানকে নিয়ে দীর্ঘ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে শিমুল গণমাধ্যমগুলোর সাংবাদিকদের নিয়ে নিজের ফেসবুকে অপপ্রচার চালাতে থাকেন। চাঁদাবাজ আখ্যা দেন। এরপর যমুনা টেলিভিশন দীর্ঘ তদন্ত শেষে মাহমুদুল হাসানকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে চক্রটি কিছুটা স্থবির হয়ে পড়ে। যমুনা টেলিভিশনের আলোচিত ওই প্রতিবেদনে যেভাবে প্রতিবেদককে চাঁদাবাজ আখ্যা দেওয়া হয়, ঠিক একইভাবে কালবেলা এবং ডিবিসি নিউজের সাংবাদিকদের আক্রমণ করা হয়। কালবেলা এবং ডিবিসির সংবাদের পরও ভুয়া চিকিৎসককে নিয়ে বাগেরহাটের সিভিল সার্জন কোনো ব্যবস্থা নেননি। সেই সুযোগে বিএনপি নেতা শিমুলের প্রশ্রয়ে থাকা ওই ভুয়া চিকিৎসক আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। এসব নেতাকে মাসোহারা দিয়ে ম্যানেজ করে তিনি চেম্বার করতে থাকেন বলে অভিযোগ আছে। যমুনার প্রতিবেদনে আরও গোমর ফাঁস হলে ভুয়া চিকিৎসক বাগেরহাট ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান। তবে শিমুল এখনো এলাকায় আছেন। আর দায়িত্বে আছেন সেই সিভিল সার্জনও। ফোনকাণ্ডের পর এবারের ঘুমকাণ্ড দেখে সিভিল সার্জনকে নিয়ে মনিরুল ইসলাম লিখেছেন, ‘বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার আমাদের গ্রাম ক্যান্সার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের উদ্যোগে ‘ক্যান্সার স্ক্রিনিং ও মূল্যায়ন সেবা’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বন, পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ডক্টর ফরিদুল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা পরিষদ প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মো. জাকির হোসেন। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসন, পুলিশ সুপার, সমাজসেবাসহ বিভিন্ন দপ্তরের প্রধান ও জেলা-উপজেলার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। ক্যান্সার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চিকিৎসকেরা প্রেজেন্টেশন দেন। অনুষ্ঠানে সামনের সারিতে বসা একজন বারবার ঘুমিয়ে পড়ছিলেন। দেখে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের সংসদে বসে ঘুমানোর কথা মনে পড়ল।’ তিনি আরও লেখেন, ‘জেলা-উপজেলার সব হাসপাতালের দায়িত্বে নিয়োজিত এই ব্যক্তির বেহাল দশা দেখে অনেকেই বলছিলেন, নিজেই শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ। তাঁর কারণে জেলার সব হাসপাতালের বেহাল দশা হয়েছে। আমি অনতিবিলম্বে বাগেরহাটের দায়িত্বে নিয়োজিত সিভিল সার্জনকে অপসারণ করে সুস্থতার জন্য হাসপাতালে ভর্তি এবং উদ্যমী একজনকে দায়িত্ব প্রদানের জন্য সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রীর প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।’