মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন) বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। যা ঐতিহাসিক এক দৃষ্টান্ত হয়ে বিশ্ব দরবারে দৃপ্তি ছড়াচ্ছে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনে নেমে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ অসংখ্য সাহসী সন্তান জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁদের আত্মত্যাগ কেবল একটি ভাষার জন্য নয়—একটি জাতির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের প্রতীক। সেই সংগ্রামের স্থাপত্যরূপই আজকের শহীদ মিনার। অমর একুশের শহীদ মিনার আমাদের অহংকার।
প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়। ভাষাশহীদদের স্মরণে গড়ে ওঠা সেই অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ দ্রুতই তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে ভেঙে ফেলা হয়। তবে দমন-পীড়ন আন্দোলনের অঙ্গীকারকে থামাতে পারেনি। ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুনরায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। বর্তমান শহীদ মিনারের প্রধান স্তম্ভের উচ্চতা প্রায় ১৪ মিটার (৪৬ ফুট)। এর বাঁকানো স্তম্ভ যেন মায়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সন্তানের প্রতীক—মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণে এক শিল্পিত স্থাপত্যভাষা।
নকশা ও বিতর্ক: শিল্পের ভেতরের ইতিহাস
শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন শিল্পী হামিদুর রহমান এবং ভাস্কর নভেরা আহমেদ। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন-এর নির্দেশনায় স্কেচ ও মডেল প্রস্তুতের কাজ এগোয়।
নকশা নিয়ে সময়ের সঙ্গে নানা বিতর্ক তৈরি হলেও ইতিহাসে তাঁদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গবেষকদের মতে, প্রাথমিক নকশায় একাধিক মুরাল ও শিল্পভাষা যুক্ত ছিল, যা পরবর্তী বাস্তবতার বিবেচনায় রূপান্তরিত ও সংযত করা হয়।
শহীদ মিনার কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়—এটি আধুনিক বাংলাদেশের স্থাপত্য-চিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও গবেষকদের মতামত
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও তাত্ত্বিক সাখাওয়াত টিপু বলেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাঙালি জাতির গৌরবের একটি স্মারকচিহ্ন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনারের নকশা নিয়ে বিতর্ক এখনও সুরাহা হয়নি। হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের ভাষ্যমতে, প্রথমে মাটি দিয়ে প্রাথমিক শহীদ মিনারের নমুনা বানান নভেরা।
নকশা ও মডেল জমা দেয় হামিদুর রহমান। নভেরার মডেলে মূল ভূমিকা ছিল ‘আনত মায়ের মতন কার্ভ’। ওইটা মূলত নভেরাই বানান। শহীদ মিনার নির্মাণের প্রাথমিক নকশায় অনেক মূর্যাল ছিল। আমরা যেটা দেখি বর্তমানে যে শহীদ মিনার রয়েছে তাতে অনেক রিফাইন করা হয়েছে।
নকশাকার সাঈদ হায়দারের এক লেখনিতে জানা যায়, ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেলে ইটের গাঁথুনি দিয়ে ভাষাসৈনিক সাঈদ হায়দারের নকশায় তৈরি হয়েছিল ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। এর দু’দিন পর তৎকালীন সরকার সেটি ভেঙ্গে দেয়।
জানা যায়, ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান শহীদ মিনারের পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্রধান প্রকৌশলী জব্বার এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে অনুরোধ জানান। শহীদ মিনারের জন্য নকশা আহ্বান করা টেন্ডার খবরের কাগজে কোনো বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি। কেন না সে সময়ে শহীদ মিনার নির্মাণটা খুবই স্পর্শকাতর ছিল। জয়নুল আবেদিন সরাসরি চিত্রশিল্পী হামিদুর রহমানকে স্কেচসহ মডেল দিতে নির্দেশনা দেন। স্থাপত্য ভাস্কর্যের মূল নকাশা প্রণয়নে যুক্ত হন নভেরা আহমেদও। শহীদ মিনারের নকশা নিয়ে হামিদ ও নভেরা কাজ শুরু করেন। যদিও নথিপত্রে শহীদ মিনারের নশকাকার হিসেবে শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম উল্লেখ রয়েছে।
একুশে পদক প্রাপ্ত স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম বাসসকে বলেন, শিল্পী হামিদুর রহমান এবং নভেরা আহমেদের শহীদ মিনারের মূল নকশা সম্পর্কে আমি খুব বেশি কিছু জানি না। কিন্তু কোনো কোনো প্রবন্ধ এবং কারো ব্যক্তিগত বিবরণ থেকে জানা গেছে যে, বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি তাদের দু’জনের মূল নকশা পুরোপুরি অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। তিনি বলেন, তৎকালীন প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্য, স্থাপত্য প্রায়শই নিপীড়িত ও নিপীড়কদের রোষের সম্মুখীন হয়েছে। যেমনটি আমরা অতীতে এবং আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতায়ও দেখেছি। নভেরা আহমেদ বাংলাদেশের শিল্পজগতের অত্যন্ত সম্মানিত নাম। শহীদ মিনারের সহ নকশাকার হিসাবেও তার নাম সুপ্রতিষ্ঠিত।
রাজশাহীতে গোপন নির্মাণের ইতিহাস
ভাষা আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও। রাজশাহী কলেজ ও মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে মুসলিম হল প্রাঙ্গণে কাদামাটি, বাঁশ ও ইট দিয়ে গোপনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। পরদিন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটিও ভেঙে দেয় পুলিশ। দীর্ঘ সময় পর, ২০০৯ সালে সেই ঐতিহাসিক স্থানে একটি স্মারক ফলক নির্মিত হয়, যা আজও ভাষা সংগ্রামের স্মৃতি বহন করছে।
রাজশাহীর ভাষা সৈনিক মোশারফ হোসেন আকুঞ্জি বলেন, রাজশাহী কলেজে অবস্থিত এই শহীদ মিনার ঢাকার শহীদ মিনারের আগে হয়েছে। ২১শে ফেব্রুয়ারি রাতেই আমরা এই স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তুলেছিলাম। এজন্য আমরা রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলের পাশে নির্মিত তৎকালীন শহীদ মিনারটি দেশের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে সরকারের কাছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করছি।
বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে দাবির জন্য ছাত্ররা আগে থেকেই আন্দোলন করছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছিল। সে সময়ে রাজশাহী থেকে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এরকম এত ভালো ছিল না। তখন আমারা কাছ থেকে এই খবরটা সঠিকভাবে পাই। যে খবরটা দিল সে বলল যে, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে। ঢাকায় গুলি বর্ষণ হয়েছে; অনেক ছাত্র মারা গেছে।
এবং তারা সংসদ ভবনে মিছিলকে যেতে দেয় নাই।’ এই খবর পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীর যত ছাত্রবাস ছিল সেই ছাত্রবাসের ছাত্রদেরকে খবর দিই। তাদেরকে বলি, আপনারা আসুন এরকম নির্মমভাবে এই মুসলিম লীগ সরকার খুনি সরকার রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য গুলি করেছে এবং আমাদের ভাইয়েরা; আমার ছাত্রীরা নিহত হয়েছে।
প্রবীণ এ ভাষাসৈনিক বলেন, ‘এজন্য আমরা কি করতে পারি আসুন রাজশাহী সরকারি কলেজের নিউ হোস্টেলের ভেতরে মিটিং হবে এবং এই খবর পেয়ে সমস্ত ছেলেরা এবং যারা হোস্টেলে থাকতো তারা উপস্থিত হয়। অন্তত কয়েক’শ ছাত্র সেখানে ছিল তার মধ্যে ডাক্তার গাফফার, এসএম আব্দুল গাফফার, এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু এবং বিখ্যাত একজন নাট্যকার অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমদ, অ্যাডভোকেট মহসিন প্রামাণিক এবং উপস্থিত ছিলেন লুতফুর রহমান মল্লিক, সাইদউদ্দিন আহমদ,আব্দুর রাজ্জাক এবং আমি মোশারফ হোসেন আকুঞ্জিসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলাম।
তিনি বলেন, শহীদদেরকে আমরা কিভাবে স্মরণ রাখব এটা নিয়ে মিটিং হয়। পরে সবার মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয় যে, আমরা একটা শহীদ মিনার করব। তাৎক্ষণিকভাবে আশেপাশের সমস্ত ইট পাটকেল সংগ্রহ করে কাদা মাটির গাথনি দিয়ে রাত ১২ টা পর্যন্ত আমরা এই শহীদ মিনার গড়ে তুলি এবং তাতে আমরা একটা কাগজের পোস্টার বানিয়ে তাতে লিখে দেই ‘ভয় নাই, ওরে ভয় নাই, সে প্রাণ যে করি বিধান, ক্ষয় নাই তার ভয় নাই।’
আকুঞ্জি বলেন, অনেক রাতে আমরা সবাই যে যার বাসায় চলে যাই। পরে শুনতে পাই যে তখন এই মুসলিম লীগের গুন্ডারা শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু করার কিছু ছিল না; আমাদের নীরব থাকতে হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের দাবি এই শহীদ মিনারটিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এসেছে। এর ন্যায্যতা এবং সত্যতা আছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক প্রতীক
১৯৫২ সালের পর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্বজনীন মর্যাদা পায়। আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শহীদ মিনারের আদলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার বার্তা উচ্চারিত হয়।
সর্বোচ্চ শহীদ মিনার: প্রতীকের ভেতরে ইতিহাস
দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনারটি অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এ। স্থপতি রবিউল হুসাইন-এর নকশায় নির্মিত এ মিনারের উচ্চতা ৭১ ফুট—মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক। ৫২ ফুট ব্যাসের ভিত্তিমঞ্চ ভাষা আন্দোলনের স্মারক; আটটি সিঁড়ি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথে ধারাবাহিক সংগ্রামের ইঙ্গিত দেয়। তিন ভাগে বিভক্ত স্তম্ভ ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, মাটি-মানুষ-সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
চেতনার স্থাপত্য
শহীদ মিনার কেবল ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; এটি বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক।
একুশের প্রথম প্রহরে খালি পায়ে ফুল হাতে মানুষের যে স্রোত সেখানে সমবেত হয়, তা প্রমাণ করে—ভাষার জন্য দেওয়া রক্ত বৃথা যায়নি। অমর একুশ আমাদের শিখিয়েছে—ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। শহীদ মিনারের স্তম্ভ তাই আজও দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে— বাংলার অহংকার, অমর একুশের অমলিন প্রতীক হয়ে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে আগারগাঁও পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থানান্তরের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। রোববার (১৮ অক্টোবর) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে তথ্য অধিদপ্তরের (পিআইডি) সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। কেমন হবে নতুন সচিবালয়? প্রস্তাবে যা আছে- এ বিষয়ে একনেক সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে, লুই আই কান-এর মাস্টার প্ল্যান অনুযায়ী ঢাকার শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপনের লক্ষ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তর কর্তৃক ধারণাগত স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করা হয়। প্রণীত নকশা অনুযায়ী- শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠের প্রায় ৩১.৫৮ একর জায়গায় মোট প্রায় ৩৩.১৬ লাখ বর্গফুট স্পেস সংবলিত ৩টি বেজমেন্টসহ (২০০টি ভূ-উপরিস্থ পার্কিংসহ ৩,৮০০টি গাড়ি পার্কিং) ১৪টি ১২ তলা ভবন (মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন ২টি মাল্টিপারপাস হল, ১টি ক্যাফেটেরিয়া, ১টি ডাকঘর ইত্যাদি) নির্মাণ করা হবে। প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৩০% জায়গায় সবুজায়ন ও জলাধারের সংস্থান রাখা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধন কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন। রোববার দুপুরে তিনি ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজারে সড়কের দুই পাশে গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি এ কথা জানান।
বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করছে বাংলাদেশ। দুর্বল তথ্যব্যবস্থা, পর্যাপ্ত প্রচারের অভাব এবং টিকাদানে ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের হার কমে গেলে প্রাণঘাতী এই রোগের প্রাদুর্ভাব কতটা ভয়াবহ হতে পারে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি তার একটি সতর্কবার্তা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে গত মার্চের মাঝামাঝি হাম ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ৯ অক্টোবর পর্যন্ত সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২ হাজারে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২২ হাজার রোগীর হাম শনাক্ত হয়েছে। চলতি বছরে বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা বেশি। ডব্লিউএইচও জানিয়েছে, এ রোগে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ১৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের ৯৪ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশু। বাংলাদেশের পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, টিকাদানের হার ৯৫ শতাংশের নিচে নেমে গেলে হাম নিয়ন্ত্রণ করা কতটা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে টিকাদানের এই হার প্রয়োজন বলে মনে করে ডব্লিউএইচও। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ এই লক্ষ্যমাত্রার কাছাকাছি পৌঁছেছিল। তবে ২০২৫ সালে টিকাদানের হার কমে যায়। ডব্লিউএইচওর নথি পর্যালোচনা এবং এক ডজনের বেশি বিজ্ঞানী, স্বাস্থ্যকর্মী ও কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে আরও কয়েকটি সমস্যার মুখে পড়তে হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কোটি কোটি শিশুর তথ্য তালিকায় না থাকা, পর্যাপ্ত প্রস্তুতির অভাব এবং যথেষ্টসংখ্যক অভিভাবকের কাছে পৌঁছাতে না পারা। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব গ্লোবাল পাবলিক হেলথের অধ্যাপক ও ডব্লিউএইচওর টিকা-বিষয়ক উপদেষ্টা মার্ক জিট বলেন, ‘এটি প্রতিটি দেশের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা।’ তিনি বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার চেয়ে টিকাদানের মাধ্যমে প্রাদুর্ভাব ঠেকানো সহজ, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ। মার্ক জিট বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত এই কার্যক্রম প্রাদুর্ভাব থামাতে পারবে। কিন্তু এর মধ্যে অনেকেই হামে আক্রান্ত হবেন এবং কেউ কেউ মারাও যাবেন।’ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার সেপ্টেম্বরে রয়টার্সকে বলেছিলেন, প্রাদুর্ভাব বন্ধ করতে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে এ প্রতিবেদন তৈরির জন্য অক্টোবরে পাঠানো অতিরিক্ত প্রশ্নের জবাব দেয়নি সরকার। ‘ছেলেকে দাফন করার পর তারা এসেছিলেন’ ১৭ কোটি ৮০ লাখ মানুষের বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর একটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট। এ অঞ্চলে গত জুলাইয়ে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় দুই বছর বয়সি আরমান হোসেন। তাকে টিকা দেওয়া হয়নি। হাসপাতালে ভর্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তার মৃত্যু হয়। চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারকে তাদের তিন চাকার অটোরিকশাটি বিক্রি করতে হয়েছিল। আরমানের চার বছর বয়সি বোনও টিকা পায়নি, তবে সে বেঁচে গেছে। আরমানের বাবা ২৬ বছর বয়সি আমিন মিয়া বলেন, সিলেটের প্রত্যন্ত গ্রামে সময়মতো টিকা দিতে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আসেননি। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলেকে দাফন করার পর তারা এসেছিলেন।’ ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত প্রতি এক হাজার হাম আক্রান্তের মধ্যে দুই থেকে তিনজনের মৃত্যু হয়। তবে অপুষ্টিসহ বিভিন্ন কারণে দরিদ্র দেশগুলোতে এ রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি। সিলেট অঞ্চলের ছাতক শহরেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। সেখানে গত জুনে ৯ মাস বয়সি লাবিবা আক্তার হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। তার বাবা ৩০ বছর বয়সি কাঠমিস্ত্রি হুমায়ুন রশিদ জানান, মেয়েকে টিকা দেওয়া হয়নি। এপ্রিল মাসে একটি জরুরি কর্মসূচির আওতায় হামের টিকা দেওয়ার ন্যূনতম বয়স ৯ মাস থেকে কমিয়ে ছয় মাস করা হয়েছিল। ফলে লাবিবা ওই সময় টিকা পাওয়ার সুযোগ ছিল। হুমায়ুন রশিদ বলেন, ‘কোনো স্বাস্থ্যকর্মী আমাদের জানাতে আসেননি।’ গত মে মাসে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হুসাইন বলেছিলেন, জরুরি টিকাদান কর্মসূচির ফলে সংক্রমণের হটস্পটগুলোতে রোগীর সংখ্যা ‘প্রায় শূন্যে’ নেমে এসেছে এবং প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কিন্তু সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ১ হাজার ১৯৮ জন নতুন হাম রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। উচ্চ জ্বর, কাশি ও শরীরে বিশেষ ধরনের ফুসকুড়ি সৃষ্টিকারী এ রোগে আক্রান্তের দৈনিক সংখ্যা ছিল মে মাসের পর সর্বোচ্চ। বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব এমন এক সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যখন বিশেষ করে ধনী দেশগুলোতে টিকা নেওয়ার বিষয়ে অনীহা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি জুনিয়রের মতো ব্যক্তিরাও টিকা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে টিকা পাওয়ার সুযোগ ও এ বিষয়ে সচেতনতার অভাবই বড় বাধা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সম্প্রতি পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের সাফল্য ছিল উল্লেখযোগ্য। ডব্লিউএইচও ও জাতিসংঘের শিশু তহবিল ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার হার ছিল ৯৬ শতাংশ এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৯৩ শতাংশ। প্রথম ডোজ নেওয়ার পরও অল্পসংখ্যক শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয় না। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। তবে একই বছর শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটানো আন্দোলনের পর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেয়। এর প্রভাবে স্বাস্থ্যকর্মীরা ধর্মঘটে যান, টিকা কেনার আদেশে বিলম্ব হয় এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত পরবর্তী কার্যক্রম ব্যাহত হয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে প্রকাশিত ডব্লিউএইচও ও ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে হামের প্রথম ডোজ টিকা দেওয়ার হার কমে ৯০ শতাংশে এবং দ্বিতীয় ডোজের হার ৮৬ শতাংশে নেমে আসে। প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় ৯৫ শতাংশ টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এই হার কয়েক শতাংশ কম। প্রতিবেদনে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হামসহ বিভিন্ন রোগের টিকাদান নিয়ে সরকারি তথ্যের মান নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। এতে বলা হয়, প্রাথমিক কিছু হিসাবে দেখা গেছে, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় টিকা পাওয়া মানুষের সংখ্যা ১০০ শতাংশেরও বেশি। এতে টিকার ডোজ অথবা লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গণনাগত ভুলের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জরুরি কর্মসূচির বাইরে লাখ লাখ শিশু হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার পর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছিল বাংলাদেশ। প্রাথমিক পর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে বলেও মনে হয়েছিল। এপ্রিল ও মে মাসে প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকা দেওয়ার পর নতুন রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। জরুরি কর্মসূচির আওতায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সি লক্ষ্যমাত্রাভুক্ত প্রতিটি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছিল সরকার। কিন্তু বাস্তবে কর্মসূচিটি লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারেনি। জুন মাসে পরিচালিত আরেকটি নিয়মিত স্বাস্থ্য কার্যক্রমের তালিকায় একই বয়সসীমার শিশুদের সংখ্যা হামের টিকাদান কর্মসূচির তুলনায় ৪০ লাখ বেশি পাওয়া যায়। ১৪ সেপ্টেম্বর রয়টার্সকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘এখানে একটি ঘাটতি রয়েছে।’ তিনি বলেন, অভিভাবকদের টিকা নিয়ে অনীহা কিংবা শিশুদের অসুস্থতার কারণে অনেক শিশু টিকা নিতে পারেনি। তবে এর বাইরেও বেশ কিছু সমস্যা সামনে এসেছে। এপ্রিল ও আগস্টে সরকার, ডব্লিউএইচও এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য সহযোগী সংস্থার মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকের নথি পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। এসব নথি আগে প্রকাশিত হয়নি। এগুলোতে দেখা যায়, দ্রুত কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টায় প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি থেকে যেতে পারে। ১৯ এপ্রিলের বৈঠকের কার্যবিবরণীতে বলা হয়, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে প্রচলিত চার দফা প্রস্তুতি যাচাইয়ের পরিবর্তে মাত্র এক দফা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এসব যাচাইয়ের মধ্যে টিকা সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা রয়েছে কি না, কতসংখ্যক শিশুকে টিকা দিতে হবে, তা নির্ধারণসহ বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকে। বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, এক দফা যাচাইয়ে দেখা গিয়েছিল, অধিকাংশ জেলা প্রস্তুত থাকলেও সব জেলা প্রস্তুত ছিল না। সবচেয়ে দরিদ্র শিশুরাই ‘ভুগছে’ বাংলাদেশের হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রমের জাতীয় যাচাই কমিটির চেয়ারম্যান ও মহামারিবিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ‘প্রস্তুতি যাচাই যথাযথভাবে না হলে সাধারণত সবচেয়ে দরিদ্র ও দুর্গম এলাকার শিশুরাই টিকা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয় এবং এর মূল্য দিতে হয় তাদেরই।’ জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, চার সপ্তাহের মধ্যে এপ্রিলের টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল। তবে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের টিকাদান কার্যক্রমের নেতৃত্ব দেওয়া তাজুল ইসলাম আবদুল বারী বলেন, এ ধরনের কর্মসূচির জন্য সাধারণত কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা করতে হয়। আগস্টের বৈঠকে কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিভিন্ন ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়। কার্যবিবরণীতে বলা হয়, হামে আক্রান্ত হয়ে পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়া যেসব শিশু টিকা পায়নি, তাদের অনুপাত কর্মসূচির আগে ৮২ শতাংশ এবং পরে ৮৫ শতাংশ ছিল। অর্থাৎ, কর্মসূচির পরও এই অনুপাত প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। নথিতে বলা হয়, ‘এটি টিকাদানের ক্ষেত্রে স্থায়ী ঘাটতির বিষয়টি তুলে ধরে।’ এপ্রিল ও আগস্টের বৈঠক নিয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি ডব্লিউএইচও। তবে বাংলাদেশে সংস্থাটির উপপ্রতিনিধি ডা. রাজেশ নারওয়াল বলেন, ঝুঁকিতে থাকা প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য পূরণে সরকারকে সহায়তা দিতে ডব্লিউএইচও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিকে আরও কার্যকর ও সহনশীল করে তুলতে হবে, যাতে এ ধরনের ঘাটতি আবার তৈরি না হয়।’ সিলেটে সরকারি হিসাব অনুযায়ী, হামে ১৮০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সেপ্টেম্বরে রয়টার্সের সাক্ষাৎকার নেওয়া ১৬টি পরিবারের মধ্যে আটটি পরিবার জানিয়েছে, টিকা দেওয়ার জন্য কোনো স্বাস্থ্যকর্মীকে তারা এলাকায় আসতে দেখেনি। অন্তত ছয়টি পরিবার বলেছে, তাদের এলাকায় কোনো শিশু হামে মারা যাওয়ার পরই স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে গিয়েছিলেন। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে সরকার নতুন একটি টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। এর লক্ষ্য, আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়া ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা। এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো শিশু যাতে বাদ না পড়ে, সে জন্য আমরা গ্রাম পর্যায়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করব।’ প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনাই বড় চ্যালেঞ্জ তবে প্রতিটি শিশুর কাছে পৌঁছানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ শিশুর জন্মনিবন্ধন হয় না। অন্যদিকে সরকারি তথ্য বলছে, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পদ শূন্য রয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পাঁচ বছরের বেশি বয়সি শিশুদেরও টিকাদান কর্মসূচির আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন। ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, এই বয়সসীমার শিশুরা মোট হাম আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশ। এ ছাড়া ছয় মাস বা তার কম বয়সি শিশুদের শরীরে প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করছেন বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত এ বয়সের শিশুরা মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে রোগের বিরুদ্ধে সুরক্ষা পেয়ে থাকে। ডব্লিউএইচওর মতে, হামে আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা বাংলাদেশের জন্য এটিও বড় চ্যালেঞ্জ। সেপ্টেম্বরে সিলেটের ১০০ শয্যাবিশিষ্ট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে হাম রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল। রয়টার্সের সাংবাদিকরা হাসপাতালটি পরিদর্শনের দিন সেখানে ১৭৮ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। হাসপাতালের প্রতিটি ওয়ার্ডেই রোগীর চাপে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।