মাতৃভাষার অধিকার রক্ষায় ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি (৮ ফাল্গুন) বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক। যা ঐতিহাসিক এক দৃষ্টান্ত হয়ে বিশ্ব দরবারে দৃপ্তি ছড়াচ্ছে। রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতির দাবিতে আন্দোলনে নেমে সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতসহ অসংখ্য সাহসী সন্তান জীবন উৎসর্গ করেন। তাঁদের আত্মত্যাগ কেবল একটি ভাষার জন্য নয়—একটি জাতির আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের প্রতীক। সেই সংগ্রামের স্থাপত্যরূপই আজকের শহীদ মিনার। অমর একুশের শহীদ মিনার আমাদের অহংকার।
প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণ
১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয়। ভাষাশহীদদের স্মরণে গড়ে ওঠা সেই অস্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ দ্রুতই তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের রোষানলে পড়ে ভেঙে ফেলা হয়। তবে দমন-পীড়ন আন্দোলনের অঙ্গীকারকে থামাতে পারেনি। ১৯৫৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পুনরায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং ১৯৬৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম আনুষ্ঠানিকভাবে শহীদ মিনার উদ্বোধন করেন। বর্তমান শহীদ মিনারের প্রধান স্তম্ভের উচ্চতা প্রায় ১৪ মিটার (৪৬ ফুট)। এর বাঁকানো স্তম্ভ যেন মায়ের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সন্তানের প্রতীক—মাতৃভাষার জন্য প্রাণ দেওয়া শহীদদের স্মরণে এক শিল্পিত স্থাপত্যভাষা।
নকশা ও বিতর্ক: শিল্পের ভেতরের ইতিহাস
শহীদ মিনারের নকশা প্রণয়নে যুক্ত ছিলেন শিল্পী হামিদুর রহমান এবং ভাস্কর নভেরা আহমেদ। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন-এর নির্দেশনায় স্কেচ ও মডেল প্রস্তুতের কাজ এগোয়।
নকশা নিয়ে সময়ের সঙ্গে নানা বিতর্ক তৈরি হলেও ইতিহাসে তাঁদের অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। গবেষকদের মতে, প্রাথমিক নকশায় একাধিক মুরাল ও শিল্পভাষা যুক্ত ছিল, যা পরবর্তী বাস্তবতার বিবেচনায় রূপান্তরিত ও সংযত করা হয়।
শহীদ মিনার কেবল একটি স্মৃতিস্তম্ভ নয়—এটি আধুনিক বাংলাদেশের স্থাপত্য-চিন্তার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার ও গবেষকদের মতামত
কবি, গল্পকার, প্রাবন্ধিক ও তাত্ত্বিক সাখাওয়াত টিপু বলেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার বাঙালি জাতির গৌরবের একটি স্মারকচিহ্ন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতি রক্ষার্থে শহীদ মিনারের নকশা নিয়ে বিতর্ক এখনও সুরাহা হয়নি। হামিদুর রহমান ও নভেরা আহমেদের ভাষ্যমতে, প্রথমে মাটি দিয়ে প্রাথমিক শহীদ মিনারের নমুনা বানান নভেরা।
নকশা ও মডেল জমা দেয় হামিদুর রহমান। নভেরার মডেলে মূল ভূমিকা ছিল ‘আনত মায়ের মতন কার্ভ’। ওইটা মূলত নভেরাই বানান। শহীদ মিনার নির্মাণের প্রাথমিক নকশায় অনেক মূর্যাল ছিল। আমরা যেটা দেখি বর্তমানে যে শহীদ মিনার রয়েছে তাতে অনেক রিফাইন করা হয়েছে।
নকশাকার সাঈদ হায়দারের এক লেখনিতে জানা যায়, ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেলে ইটের গাঁথুনি দিয়ে ভাষাসৈনিক সাঈদ হায়দারের নকশায় তৈরি হয়েছিল ‘স্মৃতিস্তম্ভ’। এর দু’দিন পর তৎকালীন সরকার সেটি ভেঙ্গে দেয়।
জানা যায়, ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান শহীদ মিনারের পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য প্রধান প্রকৌশলী জব্বার এবং শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে অনুরোধ জানান। শহীদ মিনারের জন্য নকশা আহ্বান করা টেন্ডার খবরের কাগজে কোনো বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়নি। কেন না সে সময়ে শহীদ মিনার নির্মাণটা খুবই স্পর্শকাতর ছিল। জয়নুল আবেদিন সরাসরি চিত্রশিল্পী হামিদুর রহমানকে স্কেচসহ মডেল দিতে নির্দেশনা দেন। স্থাপত্য ভাস্কর্যের মূল নকাশা প্রণয়নে যুক্ত হন নভেরা আহমেদও। শহীদ মিনারের নকশা নিয়ে হামিদ ও নভেরা কাজ শুরু করেন। যদিও নথিপত্রে শহীদ মিনারের নশকাকার হিসেবে শিল্পী হামিদুর রহমানের নাম উল্লেখ রয়েছে।
একুশে পদক প্রাপ্ত স্থপতি মেরিনা তাবাশ্যুম বাসসকে বলেন, শিল্পী হামিদুর রহমান এবং নভেরা আহমেদের শহীদ মিনারের মূল নকশা সম্পর্কে আমি খুব বেশি কিছু জানি না। কিন্তু কোনো কোনো প্রবন্ধ এবং কারো ব্যক্তিগত বিবরণ থেকে জানা গেছে যে, বর্তমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি তাদের দু’জনের মূল নকশা পুরোপুরি অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি। তিনি বলেন, তৎকালীন প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিবেশে স্মৃতিস্তম্ভ, ভাস্কর্য, স্থাপত্য প্রায়শই নিপীড়িত ও নিপীড়কদের রোষের সম্মুখীন হয়েছে। যেমনটি আমরা অতীতে এবং আমাদের সাম্প্রতিক সময়ের অভিজ্ঞতায়ও দেখেছি। নভেরা আহমেদ বাংলাদেশের শিল্পজগতের অত্যন্ত সম্মানিত নাম। শহীদ মিনারের সহ নকশাকার হিসাবেও তার নাম সুপ্রতিষ্ঠিত।
রাজশাহীতে গোপন নির্মাণের ইতিহাস
ভাষা আন্দোলনের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে ঢাকার বাইরেও। রাজশাহী কলেজ ও মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষার্থীরা ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রাতে মুসলিম হল প্রাঙ্গণে কাদামাটি, বাঁশ ও ইট দিয়ে গোপনে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। পরদিন ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটিও ভেঙে দেয় পুলিশ। দীর্ঘ সময় পর, ২০০৯ সালে সেই ঐতিহাসিক স্থানে একটি স্মারক ফলক নির্মিত হয়, যা আজও ভাষা সংগ্রামের স্মৃতি বহন করছে।
রাজশাহীর ভাষা সৈনিক মোশারফ হোসেন আকুঞ্জি বলেন, রাজশাহী কলেজে অবস্থিত এই শহীদ মিনার ঢাকার শহীদ মিনারের আগে হয়েছে। ২১শে ফেব্রুয়ারি রাতেই আমরা এই স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে তুলেছিলাম। এজন্য আমরা রাজশাহী কলেজের মুসলিম হোস্টেলের পাশে নির্মিত তৎকালীন শহীদ মিনারটি দেশের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে সরকারের কাছে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দাবি করছি।
বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাকে দাবির জন্য ছাত্ররা আগে থেকেই আন্দোলন করছিল। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারিও শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছিল। সে সময়ে রাজশাহী থেকে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এরকম এত ভালো ছিল না। তখন আমারা কাছ থেকে এই খবরটা সঠিকভাবে পাই। যে খবরটা দিল সে বলল যে, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে। ঢাকায় গুলি বর্ষণ হয়েছে; অনেক ছাত্র মারা গেছে।
এবং তারা সংসদ ভবনে মিছিলকে যেতে দেয় নাই।’ এই খবর পেয়ে আমরা সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীর যত ছাত্রবাস ছিল সেই ছাত্রবাসের ছাত্রদেরকে খবর দিই। তাদেরকে বলি, আপনারা আসুন এরকম নির্মমভাবে এই মুসলিম লীগ সরকার খুনি সরকার রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য গুলি করেছে এবং আমাদের ভাইয়েরা; আমার ছাত্রীরা নিহত হয়েছে।
প্রবীণ এ ভাষাসৈনিক বলেন, ‘এজন্য আমরা কি করতে পারি আসুন রাজশাহী সরকারি কলেজের নিউ হোস্টেলের ভেতরে মিটিং হবে এবং এই খবর পেয়ে সমস্ত ছেলেরা এবং যারা হোস্টেলে থাকতো তারা উপস্থিত হয়। অন্তত কয়েক’শ ছাত্র সেখানে ছিল তার মধ্যে ডাক্তার গাফফার, এসএম আব্দুল গাফফার, এডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু এবং বিখ্যাত একজন নাট্যকার অধ্যাপক মমতাজউদ্দিন আহমদ, অ্যাডভোকেট মহসিন প্রামাণিক এবং উপস্থিত ছিলেন লুতফুর রহমান মল্লিক, সাইদউদ্দিন আহমদ,আব্দুর রাজ্জাক এবং আমি মোশারফ হোসেন আকুঞ্জিসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলাম।
তিনি বলেন, শহীদদেরকে আমরা কিভাবে স্মরণ রাখব এটা নিয়ে মিটিং হয়। পরে সবার মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত হয় যে, আমরা একটা শহীদ মিনার করব। তাৎক্ষণিকভাবে আশেপাশের সমস্ত ইট পাটকেল সংগ্রহ করে কাদা মাটির গাথনি দিয়ে রাত ১২ টা পর্যন্ত আমরা এই শহীদ মিনার গড়ে তুলি এবং তাতে আমরা একটা কাগজের পোস্টার বানিয়ে তাতে লিখে দেই ‘ভয় নাই, ওরে ভয় নাই, সে প্রাণ যে করি বিধান, ক্ষয় নাই তার ভয় নাই।’
আকুঞ্জি বলেন, অনেক রাতে আমরা সবাই যে যার বাসায় চলে যাই। পরে শুনতে পাই যে তখন এই মুসলিম লীগের গুন্ডারা শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু করার কিছু ছিল না; আমাদের নীরব থাকতে হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, আমাদের দাবি এই শহীদ মিনারটিকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ মিনার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এসেছে। এর ন্যায্যতা এবং সত্যতা আছে।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও বৈশ্বিক প্রতীক
১৯৫২ সালের পর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি ‘শহীদ দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছিল। ১৯৯৯ সালে ইউনেস্কো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস বিশ্বজনীন মর্যাদা পায়। আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শহীদ মিনারের আদলে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে সেখানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর মধ্য দিয়ে ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক অধিকার রক্ষার বার্তা উচ্চারিত হয়।
সর্বোচ্চ শহীদ মিনার: প্রতীকের ভেতরে ইতিহাস
দেশের সর্বোচ্চ শহীদ মিনারটি অবস্থিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়-এ। স্থপতি রবিউল হুসাইন-এর নকশায় নির্মিত এ মিনারের উচ্চতা ৭১ ফুট—মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রতীক। ৫২ ফুট ব্যাসের ভিত্তিমঞ্চ ভাষা আন্দোলনের স্মারক; আটটি সিঁড়ি ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত স্বাধীনতার পথে ধারাবাহিক সংগ্রামের ইঙ্গিত দেয়। তিন ভাগে বিভক্ত স্তম্ভ ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি, মাটি-মানুষ-সংগ্রাম এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব-গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
চেতনার স্থাপত্য
শহীদ মিনার কেবল ইট-পাথরের নির্মাণ নয়; এটি বাঙালি জাতির আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক।
একুশের প্রথম প্রহরে খালি পায়ে ফুল হাতে মানুষের যে স্রোত সেখানে সমবেত হয়, তা প্রমাণ করে—ভাষার জন্য দেওয়া রক্ত বৃথা যায়নি। অমর একুশ আমাদের শিখিয়েছে—ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। শহীদ মিনারের স্তম্ভ তাই আজও দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে— বাংলার অহংকার, অমর একুশের অমলিন প্রতীক হয়ে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে আগামী বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মুহাম্মদ শেহবাজ শরীফের সঙ্গে এক আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেবেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং সূত্রে জানা গেছে, নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আধা ঘণ্টাব্যাপী এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সচিবালয় ভবনের ৩৪তম তলায় দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে এটিই হতে যাচ্ছে প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের দিনই অর্থাৎ ২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত সদর দপ্তরের জেনারেল অ্যাসেম্বলি হলে অধিবেশনের পর্বটি অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে নিউইয়র্ক সময় বিকেল সাড়ে ৫টায় প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য ভাষণের সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। ওই দিন বিকেল ৩টায় শুরু হওয়া অধিবেশনে নির্ধারিত ১৮ জন বক্তার মধ্যে তারেক রহমান বক্তব্য রাখবেন ১১তম বক্তা হিসেবে। ভাষণের আগে বৃহস্পতিবার সকালে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অস্তিত্বগত সংকট মোকাবেলাবিষয়ক একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নিয়ে পাঁচ মিনিটের উদ্বোধনী বক্তব্য রাখবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর দুপুরে মাতৃ ও নবজাতকের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু রোধে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মিডওয়াইফারি অন্তর্ভুক্তিবিষয়ক আরেকটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে তিনি উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন। এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণীর সমাপনী বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবারের অন্যান্য কূটনৈতিক সূচির অংশ হিসেবে দুপুর ১টা ১০ মিনিটে সুইডেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বিনিময় ও ফটোসেশনে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর দুপুর ২টা ১৫ মিনিট থেকে ২টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে বৈঠক করবেন তিনি। পরবর্তীতে দুপুর আড়াইটা থেকে ৩টা পর্যন্ত ‘ইউএন বাইল্যাটেরাল বুথে’ থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নেবেন সরকারপ্রধান। প্রেস উইং আরো জানায়, সাধারণ অধিবেশনে ভাষণদান শেষে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন অথবা নিজের আবাসন হোটেল ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্কে’ ফিরবেন। রাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধির কার্যালয়ে আয়োজিত এক আনুষ্ঠানিক নৈশভোজে যোগ দেবেন তিনি। পরদিন শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) সকালে ম্যানহাটনে জেপি মরগানের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিষ্ঠানটি আয়োজিত ওয়াল স্ট্রিটের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক প্রাতঃরাশ বৈঠকে মিলিত হবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর সকাল ১১টায় কুয়েতের স্থায়ী মিশনে দেশটির ক্রাউন প্রিন্স শেখ সাবাহ খালেদ আল-হামাদ আল-সাবাহর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন তিনি। দুপুরে ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট প্রিন্স জায়েদ আল হুসেইনের সঙ্গে এক মধ্যাহ্নভোজে অংশ নিয়ে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি, বৈশ্বিক প্রবণতা ও ঝুঁকি নিয়ে মতবিনিময় করবেন প্রধানমন্ত্রী। মধ্যাহ্নভোজ শেষে হোটেল গ্র্যান্ড হায়াতে যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের কথা রয়েছে তার। জাতিসংঘ সফর সমাপ্ত করে ওই দিনই (২৫ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় রাত ১১টায় এমিরেটস এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দুবাই হয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফ্লাইটটি ২৬ সেপ্টেম্বর রাত ৮টায় (দুবাই সময়) দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবে। পরবর্তীতে ২৭ সেপ্টেম্বর রাত ২টায় দুবাই থেকে ঢাকার পথে রওনা হয়ে বাংলাদেশ সময় সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে ফ্লাইটটির হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের কথা রয়েছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) হিসেবে মোহাম্মদ রুহুল কবির খানকে বদলি করা হয়েছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার সদর দপ্তর ও প্রশাসন শাহরিয়ার আলী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এই তথ্য জানানো হয়। আদেশে বলা হয়, ডিএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ রুহুল কবীর খানকে গুলশান বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার হিসেবে বদলি করা হয়েছে। এ আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করা হবে বলে উল্লেখ করা হয়।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার জামতৈল রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় কয়েকজন যুবকের অস্ত্রসদৃশ বস্তু হাতে তৈরি করা একটি পুরোনো ভিডিও নতুন করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রায় পাঁচ মাস আগে ধারণ করা ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট যুবকদের থানায় ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ভিডিওতে দেখা অস্ত্রগুলো আসল আগ্নেয়াস্ত্র নয়। এগুলো কাঠ দিয়ে তৈরি খেলনা অস্ত্র। অ্যাকশনধর্মী ভিডিও তৈরির অংশ হিসেবেই যুবকেরা এসব খেলনা ব্যবহার করেছিলেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মতো দেখতে বস্তু হাতে নিয়ে ভিডিও ধারণ এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পরে কামারখন্দ থানা পুলিশ সংশ্লিষ্টদের ডেকে এনে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চায় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড না করার জন্য সতর্ক করে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট যুবকেরা দীর্ঘদিন ধরে তামিল সিনেমার আদলে বিভিন্ন অ্যাকশন ও বিনোদনমূলক ভিডিও তৈরি করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বেশ কিছু ভিডিও দর্শকদের মধ্যে জনপ্রিয়ও হয়েছে। ভিডিও তৈরির সঙ্গে যুক্ত এস কে শাহিন বলেন, জামতৈল স্টেশনে ধারণ করা ভিডিওটি প্রায় পাঁচ মাস আগের। পুলিশ তাদের থানায় ডেকে নিয়ে বিষয়টি জানতে চেয়েছে এবং তারা ভিডিও তৈরির বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। ভবিষ্যতে জনসম্মুখে এ ধরনের কর্মকাণ্ড না করার আশ্বাসও দিয়েছেন তারা। কামারখন্দ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হাশমত আলী বলেন, অস্ত্র হাতে মহড়ার একটি ভিডিও পুলিশের নজরে আসে। পরে যাচাই করে দেখা যায়, ভিডিওতে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো কাঠের তৈরি খেলনা। ভিডিওটিও প্রায় পাঁচ মাস আগের। ওসি জানান, সংশ্লিষ্ট যুবকদের থানায় ডেকে আনা হয়েছিল। তারা মুচলেকা দিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে জনসম্মুখে খেলনা অস্ত্র প্রদর্শন করে এ ধরনের ভিডিও তৈরি করবেন না বলে জানিয়েছেন। সিরাজগঞ্জ জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা বা বেশি ভিউ পাওয়ার উদ্দেশ্যে অস্ত্রসদৃশ বস্তু ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি ও প্রচার না করতে সবাইকে সতর্ক করা হচ্ছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিও এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা হচ্ছে। তদন্তে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।