ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে রাজধানী কারাকাস থেকে সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মাদক পাচারসংক্রান্ত একাধিক অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বিচার চলবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। এই নাটকীয় ঘটনার পর ভেনেজুয়েলার শাসনব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা মাদুরো পরিবারকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
নিকোলাস মাদুরোর বর্তমান স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার ক্ষমতাকেন্দ্রে প্রভাবশালী একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সিলিয়াকে বিয়ের আগে মাদুরোর আরেকটি বিয়ে হয়েছিল। প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি সিলিয়া ফ্লোরেসকে বিয়ে করেন।
প্রথম স্ত্রীর ঘরে মাদুরোর একমাত্র সন্তান নিকোলা মাদুরো (জুনিয়র) গুয়েরা, যিনি ‘নিকোলাসিতো’ বা ‘রাজপুত্র’ নামেও পরিচিত। তার বয়স ৩৫ বছর। যুক্তরাষ্ট্রে দায়ের করা মামলার নথিতেও এসব নাম উল্লেখ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্র অনুযায়ী, নিকোলা মাদুরো গুয়েরার বিরুদ্ধেও মাদক পাচারসংক্রান্ত অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি বর্তমানে ভেনেজুয়েলার ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলি বা পার্লামেন্টের একজন সদস্য।
নিকোলা মাদুরো গুয়েরার জন্ম ১৯৯০ সালে। তার মায়ের নাম আদ্রিয়ানা গুয়েরা আঙ্গুলো। নিকোলাস মাদুরোর সঙ্গে আদ্রিয়ানার বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় তাদের বিচ্ছেদ ঘটে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মাদুরো পরিবারের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হিসেবে নিকোলা মাদুরো গুয়েরাকেই এগিয়ে রাখা হচ্ছিল। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সমাজতান্ত্রিক আদর্শ এবং ‘চাভিসমো’ আন্দোলনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তাকে প্রস্তুত করা হচ্ছিল বলেও ধারণা করা হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
লেখক ও সাবেক ম্যাগাজিন কলামিস্ট ই জিন ক্যারলকে যৌন নিপীড়ন ও মানহানির দায়ে অভিযুক্ত করে দেওয়া দেওয়ানি মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আপিলের আবেদন দ্বিতীয়বারের মতো খারিজ করেছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার (১৭ আগস্ট) প্রকাশিত আদালতের আগস্টের আদেশ তালিকায় ট্রাম্পের পুনর্বিবেচনার আবেদন নাকচ করা হয়। এর আগে জুন মাসে আদালত ২০২৩ সালের রায়ের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের আপিল শুনতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ওই রায়ে একটি জুরি ট্রাম্পকে ১৯৯৬ সালে ক্যারলকে যৌন নিপীড়ন এবং পরে তাকে মানহানি করার জন্য দায়ী করে প্রায় ৫০ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ক্যারলের আইনজীবী রবার্টা ক্যাপলান এক বিবৃতিতে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট আবারও মামলাটি শুনতে অস্বীকৃতি জানানোয় তারা সন্তুষ্ট। তার ভাষ্য অনুযায়ী, জুরির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এখন চূড়ান্ত এবং কোনো আদালতে আর চ্যালেঞ্জ করা যাবে না। তবে আদালত কেন আবেদনটি খারিজ করেছে, সে বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি। ওইদিন আদালত মোট ৩৩টি পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করে। জুনে ট্রাম্পের আপিল খারিজ হওয়ার পর ক্যারল প্রায় ৫৮ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ ও সুদ পেয়েছেন। ক্যারল ও ট্রাম্পের আইনি লড়াই শুরু হয় ২০১৯ সালে। সে বছর ক্যারল তার স্মৃতিকথার একটি অংশ প্রকাশ করে অভিযোগ করেন, ১৯৯৬ সালে নিউইয়র্কের বার্গডর্ফ গুডম্যানের একটি পোশাক পরিবর্তনকক্ষে ট্রাম্প তাকে ধর্ষণ করেছিলেন। ট্রাম্প অভিযোগ অস্বীকার করে ক্যারলকে ‘পাগল’ এবং ‘তার পছন্দের নারী নন’ বলে মন্তব্য করেন। ২০২৪ সালে পৃথক মানহানি মামলায় একটি জুরি ক্যারলকে আট কোটি ৩৩ লাখ ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধেও ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টে আপিল করছেন। তার দাবি, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় করা বক্তব্যের ক্ষেত্রে তিনি সাংবিধানিক দায়মুক্তির অধিকারী। ৫৮ লাখ ডলারের মামলাটি মূলত ২০২২ সালে সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্পের করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সে সময় তিনি ক্যারলের অভিযোগকে ‘ভুয়া’ ও ‘প্রতারণা’ বলে অভিহিত করেছিলেন। সূত্র: আলজাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা ভেস্তে গেলে নিজেদের নীতি বদলাবে ইরান। ‘প্রতিরক্ষামূলক’ অবস্থান থেকে সরে এসে তারা ‘পুরোপুরি আক্রমণাত্মক’ নীতি গ্রহণ করবে। কূটনীতি ব্যর্থ হলে মার্কিন নৌ অবরোধ ভাঙতে একটি নিখুঁত সামরিক হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তেহরান। সোমবার রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই তথ্য জানান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ বন্ধের কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধের ফলে কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলের ট্যাংকার চলাচলও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে গত ১৭ জুন একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছিল। সেখানে ৬০ দিনের একটি সময়সীমা দেওয়া ছিল, যা সোমবার শেষ হয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কারণে চুক্তিটি বেশি দূর এগোয়নি। তেহরানের দাবি, চুক্তির ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এই জলপথ তাদের পরিচালনার কথা। কিন্তু ওয়াশিংটন তা মানতে রাজি নয়। সমঝোতা না হওয়ায় অনুমোদনহীন পথে চলা জাহাজে ইরান গুলি চালানো শুরু করলে পরিস্থিতি আবার ঘোলাটে হয়। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত ৭ জুলাই এই চুক্তিকে ‘অতীত’ বলে ঘোষণা দেন। সম্প্রতি তিনি জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি, ইরানকে হারানোর পর হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণার ইচ্ছাও প্রকাশ করেন তিনি। সোমবার তিনি জানান, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেওয়া হবে না। ইরানের ওই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রকে চুক্তির শর্তগুলো মানার জন্য অল্প কয়েক সপ্তাহের একটি সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হবে। এটি পূরণ না হলে হরমুজ প্রণালি ও এর আশপাশের অঞ্চলে তারা যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত রয়েছে। মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই সময়সীমার কথা ওয়াশিংটনকে জানিয়ে দেওয়া হবে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। যৌথ এই হামলার জবাবে তেল আবিব উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে, বিশেষ করে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) বিভিন্ন এলাকায় পালটা আক্রমন চালায় তেহরান। ইরানের হামলায় দুবাই, আবুধাবি, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নিরাপত্তার কারণে ইউএই, কাতার, বাহরাইন ও কুয়েত নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে এক সপ্তাহ পর ধীরে ধীরে আকাশসীমা খুলে দেওয়া হয়। তবে যুদ্ধের প্রভাব এখনো মধ্যপ্রাচ্যের বিমান চলাচলে রয়ে গেছে। যাত্রী ও পণ্য পরিবহণ কমেছে, ব্যক্তিগত উড়োজাহাজের ফ্লাইটও কমেছে। একই সঙ্গে জেট জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বব্যাপী বিমান পরিবহণ খাতেও। বড় আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা ইন্টারন্যাশনাল এয়ার ট্রান্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইএটিএ) জুনের পূর্বাভাসে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিমান সংস্থাগুলো ২০২৫ সালে ৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার নিট মুনাফা করলেও ২০২৬ সালে তাদের ৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার নিট লোকসান হতে পারে। এমিরেটস, ইতিহাদ ও কাতার এয়ারওয়েজের মতো বড় আঞ্চলিক বিমান সংস্থাগুলো বেশিরভাগ রুটে আবারও ফ্লাইট চালু করেছে। তবে এখনো পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। এমিরেটসের প্রধান নির্বাহী টিম ক্লার্ক জুনে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে জানিয়েছিলেন, তাদের উড়োজাহাজগুলো প্রায় ৭৫ শতাংশ সক্ষমতায় চলাচল করছে। অন্যদিকে, ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক বিমান সংস্থা এখনো মধ্যপ্রাচ্যে ফ্লাইট পুরোপুরি চালু করেনি। এয়ার ফ্রান্স আগস্টের শেষ দিকে এবং লুফথানসা সেপ্টেম্বরে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে। ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ক্যাথে প্যাসিফিক ও সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স অক্টোবরের শেষ দিকে ফ্লাইট চালুর লক্ষ্য ঠিক করেছে। এয়ার কানাডা ২০২৭ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝির আগে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা করছে না। অনেক বিমান সংস্থা এখনো ফ্লাইট পুনরায় চালুর কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করেনি। আকাশসীমা খুললেও ঝুঁকি কাটেনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের আকাশসীমা খুলে দেওয়া হলেও এখনো মাঝে মাঝে তা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এভিয়েশন সেফটি এজেন্সির (ইইউএএসএ) সর্বশেষ সতর্কবার্তায় ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, ইউএই এবং ওমান উপসাগরের একটি অংশের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে যাত্রীদের ভ্রমণের সুযোগও কমে গেছে। সেপ্টেম্বরে ইউএই থেকে লন্ডনে এক সপ্তাহের যাওয়া-আসার ভ্রমণে দুবাইগামী এমিরেটস, আবুধাবিগামী ইতিহাদ অথবা শারজাহগামী এয়ার অ্যারাবিয়াই মূল বিকল্প হিসেবে রয়েছে। একই সময়ে দোহা থেকে টোকিও যেতে কাতার এয়ারওয়েজই একমাত্র সরাসরি বিকল্প। হুমকিতে উপসাগরীয় বিমান সংস্থার ব্যবসায়িক মডেল উপসাগরীয় বিমান সংস্থাগুলো মূলত ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ মডেলে ব্যবসা পরিচালনা করে। অর্থাৎ, দুবাই, দোহা বা আবুধাবির মতো একটি বড় বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করে বিশ্বের বিভিন্ন গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। যাত্রীরা ওই কেন্দ্রীয় বিমানবন্দরে নেমে অন্য ফ্লাইটে নিজেদের গন্তব্যে পৌঁছান। ইউরোপ ও এশিয়ার মাঝামাঝি ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবসায়িক মডেল থেকে সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু চলমান যুদ্ধ সেই ব্যবস্থাকেই ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বাকিংহামশায়ার নিউ ইউনিভার্সিটির এভিয়েশন লেকচারার নাভিদ কাপাডিয়া বলেন, কাতার এয়ারওয়েজ ও এমিরেটসের মতো বিমান সংস্থার প্রতিযোগিতা অনেকটাই কমে যাওয়ায় তারা বাজারের বড় অংশ ধরে রাখতে এবং তুলনামূলক ভালো ভাড়া নিতে পারছে। তবে তাদের ব্যবসা মূলত দুবাই ও দোহা দিয়ে বিপুলসংখ্যক যাত্রী দ্রুত ও দক্ষতার সঙ্গে পরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। আইএটিএর জুনের তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যাত্রী পরিবহণ চাহিদা গত বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। বিপরীতে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল বেড়েছে ১১ শতাংশ। এতে উপসাগরীয় বিমান সংস্থাগুলোর প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেলের ওপর চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাড়ছে খরচ, কমছে ফ্লাইটের সক্ষমতা যুদ্ধের কারণে অনেক বিমানকে দীর্ঘ বা তুলনামূলক কম কার্যকর পথে চলতে হচ্ছে। এতে জ্বালানি খরচ বাড়ছে, পাইলট ও ক্রুদের দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে এবং উড়োজাহাজের ব্যবহারও কমে যাচ্ছে। এ ছাড়া সম্ভাব্য বিঘ্নের কথা মাথায় রেখে অনেক বিমান অতিরিক্ত জ্বালানি বহন করছে। এতে যাত্রী ও পণ্য বহনের জন্য উড়োজাহাজে জায়গা কমে যাচ্ছে। ‘হাব অ্যান্ড স্পোক’ ব্যবস্থার আরেকটি বড় দুর্বলতাও এখন সামনে এসেছে। কোনো একটি রুটে সমস্যা হলে উড়োজাহাজ ও ক্রুরা দূরবর্তী কোনো বিমানবন্দরে আটকে যেতে পারে। এর ফলে পুরো নেটওয়ার্কে একের পর এক ফ্লাইট বিলম্বিত বা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সব মিলিয়ে, যুদ্ধের সরাসরি প্রভাব কমে এলেও মধ্যপ্রাচ্যের বিমান পরিবহণ খাত এখনো বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি উপসাগরীয় বিমান সংস্থাগুলোর ব্যবসায়িক মডেল ও আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগ—দুই ক্ষেত্রেই বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই