বিএনপি চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। খালেদা জিয়া ১৯৮১ সালে স্বামী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর রাজনীতির ‘হাইওয়ে’তে প্রবেশ করেন। নিতান্তই একজন গৃহবধূ ছিলেন তিনি, রাজনীতির চৌকাঠ মাড়ানোর কথা হয়ত কল্পনাতেও ছিল না।
বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির চেয়ারপারসন, যিনি ১৯৯১ সাল থেকে তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নির্বাচিত নারী সরকার প্রধান।
বেগম জিয়া ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট দিনাজপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা ভারতের জলপাইগুড়ি থেকে বিভক্তির পর পশ্চিম পাকিস্তানে চলে আসেন। তার আদি বাড়ি বাংলাদেশের ফেনী জেলায়। তিনি দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন।
জিয়াউর রহমান যখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হন, তখন বেগম জিয়া ফার্স্ট লেডি হিসেবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার ও নেদারল্যান্ডের রানি জুলিয়ানার সঙ্গে বিশ্ব নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
১৯৮১ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর, তিনি ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপিতে সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালের মার্চে ভাইস-চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৪ সালের আগস্টে দলের চেয়ারপারসন হন।
সেনাবাহিনীর অভ্যুত্থানের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তিনি সর্বাত্মক আন্দোলন শুরু করেন। তিনি ১৯৮৩ সালে সাত দলীয় জোটের স্থপতি ছিলেন এবং ১৯৮৬ সালের কারচুপির নির্বাচনের বিরোধিতা করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাতবার আটক করা হয়, তবে তার দৃঢ় নেতৃত্বে ছাত্রসংগঠন শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং দেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। প্রধানমন্ত্রীত্বকালে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নারী ক্ষমতায়ন এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
তিনি জাতিসংঘে গঙ্গার পানি বিতরণের সমস্যা উত্থাপন করেন এবং হোয়াইট হাউসে রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থীদের সমস্যা তুলে ধরেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপির বিজয়ের পর টানা দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন, যদিও এক মাসের মধ্যে পদত্যাগ করেন।
২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের প্রতিশ্রুতি পূরণে কাজ শুরু করেন। ফোর্বস ম্যাগাজিন ২০০৫ সালে নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নে তার ভূমিকার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় তাকে স্থান দিয়েছে।
২০০৬ সালে তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। ২০০৭ সালে তার ও পরিবারের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে অভিযোগে গ্রেপ্তার চেষ্টা হয়, কিন্তু ব্যর্থ হয়।
ক্ষমতায় থাকাকালীন তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা, নারী শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষা উপবৃত্তি এবং খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেন। সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ান এবং শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করেন।
বেগম খালেদা জিয়া কোনো আসনে পরাজিত হননি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সালের নির্বাচনে পাঁচটি পৃথক আসনে জয়ী হয়েছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জয়ী হন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আজ (১১ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন। মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। ইসি সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাষণ রেকর্ড করা হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতারসহ দেশের সব বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ও রেডিওতে একযোগে এটি সম্প্রচার করা হবে। ধারণা করা হচ্ছে, ভাষণে সিইসি নির্বাচনের সার্বিক প্রস্তুতি সম্পর্কে দেশবাসীকে অবহিত করবেন। একই সঙ্গে ভোটারদের নিরাপদে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগের আহ্বান জানাবেন। এছাড়া নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ, ৪২ হাজার ৬৫৯টি ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৯ লাখ ৫৮ হাজার সদস্য মোতায়েন, ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন এবং ড্রোন নজরদারির মাধ্যমে সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ও ভাষণে উঠে আসবে। ভাষণে নির্বাচন কমিশন একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করবেন। উল্লেখ্য, গত বছরের ১১ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে সিইসি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করেছিলেন।
গণভোট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রংপুর বিভাগে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে ৬ স্তরের নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে পুলিশ। ভোটকেন্দ্রগুলোতে গোয়েন্দা পুলিশের নজরদারির পাশাপাশি ব্যবহার করা হবে পুলিশের বডিওর্ন ক্যামেরা। রংপুর বিভাগের ৩৩টি সংসদীয় আসনে এক কোটি ৩৪ লাখ ৫৪ হাজার ৪৫৬ ভোটারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে ৪ হাজার ৫৪৬টি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৬১টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন। এসবের মধ্যে ৮২৭টি কেন্দ্রকে ধরা হয়েছে অতিঝুঁকিপূর্ণ। চরাঞ্চল, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকা এবং কোনো কোনো প্রার্থীর বাড়ির কাছাকাছি কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি সতর্কতা নেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র জানায়, এসব কেন্দ্রে অতীতে ভোটকেন্দ্র দখল, সংঘর্ষ, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ ছিল। সে কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, অতিরিক্ত অস্ত্রধারী পুলিশ ও আনসার সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ভিজিলেন্স টিম ও স্ট্রাইকিং ফোর্স কাজ করবে। রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে পুলিশ। প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন থাকবে এবং পুলিশ সদস্যদের শরীরে থাকা বডিওর্ন ক্যামেরার লাইভ মনিটরিং করা হবে ঊর্ধ্বতন পর্যায় থেকে। এদিকে জেলা পুলিশ সুপার মারুফাত হুসাইন জানান, জেলার আওতাধীন ৬৬৯টি কেন্দ্রে পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি ইউনিয়ন ও পৌরসভা এলাকায় মোবাইল টিম, স্ট্রাইকিং ফোর্স, সাব-সেক্টর ও সেক্টর ভাগ করে ভোটার, প্রার্থী ও নির্বাচনি সরঞ্জামের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। ৩১৫টি কেন্দ্রে পুলিশের কাছে থাকবে বডিওর্ন ক্যামেরা। তিনি আরও বলেন, নির্বাচনে পুলিশ ছাড়াও সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। রংপুর জেলায় মোট ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৬৬৯টি জেলা পুলিশের আওতাধীন এবং এসব কেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। রংপুর জেলায় ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ২১৬টি রংপুর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ৮৭৩টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ২১৬টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১২১টি এবং আট উপজেলায় ৯৫টি কেন্দ্র রয়েছে। ভোটার সংখ্যা বেশি, অতীতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর, সীমানা প্রাচীর না থাকা, প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বাড়ির নিকটবর্তী কেন্দ্র এবং দূরবর্তী ও জনবহুল এলাকা—এসব বিবেচনায় কেন্দ্রগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক জানান, ছয়টি আসনে মোট ভোটার ২৫ লাখ ৯৯ হাজার ২০২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১৩ লাখ ৬ হাজার ৩৩৩ জন, পুরুষ ভোটার ১২ লাখ ৯২ হাজার ৮৩৮ জন এবং হিজড়া ভোটার ৩১ জন। মোট ৪ হাজার ৯৮৮টি বুথে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে, যেখানে ৪৪ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। প্রস্তুত সেনাবাহিনীর কমান্ডো গ্রুপ নির্বাচনের দিন যেকোনো ধরনের উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় রংপুরে প্রস্তুত রয়েছে সেনাবাহিনীর ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের কমান্ডো গ্রুপ। প্রত্যন্ত এলাকায় প্রয়োজন হলে হেলি ড্রপের মাধ্যমে তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করবে। চার জেলায় ৩ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধা—এই চার জেলায় ৩ হাজার বিজিবি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ২৬টি বেজ ক্যাম্পে ৭৪ প্লাটুন বিজিবি মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে কাজ করছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারির পাশাপাশি তল্লাশি কার্যক্রম, ডগ স্কোয়াড, টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ, বিজিবি ও সেনাবাহিনীর পাশাপাশি র্যাব, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীও নির্বাচনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠে কাজ করছে।
আগামী জাতীয় নির্বাচনে উৎসবমুখর পরিবেশে দ্বিধাহীন চিত্তে ভোট প্রদানের জন্য দেশবাসীর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি বলেন, ‘আপনারা দলে দলে, সপরিবারে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে দ্বিধাহীন চিত্তে আপনার ভোটাধিকার প্রয়োগ করুন। আপনার মূল্যবান ভোট দিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দরজা খুলে দিন। দেশের চাবি আপনার হাতে। সে চাবিটি সঠিকভাবে ব্যবহার করুন। আল্লাহ আমাদের সঠিক পথে পরিচালিত করুন।’ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের ওপর গণভোট বিষয়ে আজ সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতার প্রধান উপদেষ্টার ভাষণটি সরাসরি সম্প্রচার করে। এবারের ভোটের দিন নতুন বাংলাদেশের জন্মদিন হবে—এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আসুন, উৎসবমুখর নির্বাচন বাস্তবে রূপায়িত করে এই দিনটিকে ইতিহাসের এক স্মরণীয় দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করি।’ তরুণ ভোটার ও নারী ভোটারদের উদ্দেশে বিশেষ আহ্বান জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘ভয়কে পেছনে রেখে, সাহসকে সামনে এনে ভোটকেন্দ্রে যান। আপনার একটি ভোট শুধু একটি সরকার নির্বাচন করবে না; এটি ১৭ বছরের নীরবতার জবাব দেবে, বাধাহীন ফ্যাসিবাদের জবাব দেবে, জাতিকে নতুনভাবে গঠিত করবে এবং প্রমাণ করবে—এই দেশ তার তরুণ, নারী ও সংগ্রামী জনতার কণ্ঠ আর কোনোদিন হারাতে দেবে না।’ তিনি বলেন, আমাদের তরুণরা—যাদের স্বপ্ন, মেধা ও শক্তিই আগামী বাংলাদেশের ভিত্তি—এই ভোট আপনাদের প্রথম সত্যিকারের রাজনৈতিক উচ্চারণ। তরুণদের উদ্দেশে অধ্যাপক ইউনূস আরও বলেন, ‘আপনারাই সেই প্রজন্ম, যারা গত ১৭ বছর ধরে ভোটাধিকার থাকা সত্ত্বেও ভোট দিতে পারেননি। আপনারা বড় হয়েছেন এমন এক বাস্তবতায়, যেখানে ভোটের মুখোশ ছিল—কিন্তু ভোট ছিল না; ব্যালট ছিল—কিন্তু ভোটার ছিল না। এই দীর্ঘ সময়ের বঞ্চনা ও অবদমনের সবচেয়ে বড় মূল্য জাতিকে প্রতিদিন দিতে হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘তবু আপনারা আশা ছাড়েননি, অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। আন্দোলনে, প্রতিবাদে, চিন্তায় ও স্বপ্নে আপনারা একটি নতুন বাংলাদেশের আকাঙ্ক্ষা লালন করেছেন। আজ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ইতিহাসের গতিপথ বদলানোর সেই দিনটি এসেছে।’ নারীদের ভূমিকার কথা তুলে ধরে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের নারীরা মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সব গণআন্দোলনে, পরিবার থেকে রাষ্ট্র—সবখানেই শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছেন। নারীরাই ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখসারির যোদ্ধা। নারীরাই এ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের শক্ত ভিত।’ তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণ, কুটির শিল্প ও নারী উদ্যোক্তার পেছনে রয়েছে পরিবর্তনের গল্প, পরিবার ও সমাজে সাবলম্বী হওয়ার গল্প। অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘আপনারা ঘরে ও রাজপথে সমানভাবে সংগ্রাম করেছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ আগলে রেখেছেন, সমাজকে টিকিয়ে রেখেছেন। অথচ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তে নিজেদের মত প্রকাশের সুযোগ থেকে দীর্ঘদিন বঞ্চিত ছিলেন। এই নির্বাচন আপনাদের জন্য এক নতুন সূচনা।’