রক্তস্নাত জুলাই অভ্যুত্থানের পর এই প্রথম, দীর্ঘ দেড় দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আগামীকাল বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) উদিত হতে যাচ্ছে এক নতুন সূর্য। ভোটাধিকারবঞ্চিত কোটি মানুষের দীর্ঘ আক্ষেপ ঘুচিয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ঐতিহাসিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার সংক্রান্ত সাংবিধানিক গণভোট’। ফ্যাসিবাদের পতনের পর আগামীর বাংলাদেশ কেমন হবে— তা ব্যালটের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে উন্মুখ হয়ে আছে গোটা জাতি।
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে তরুণ প্রজন্ম। মোট ভোটারের প্রায় ৪৫ শতাংশ ১৮ থেকে ৩৩ বছর বয়সী তরুণ। এছাড়া, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিয়েছেন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধারা।
শুরু হচ্ছে ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থীর ভোটযুদ্ধ:
সংসদ ভোটে ২৯৯টি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে (শেরপুর-৩ আসনে প্রার্থীর মৃত্যুতে ভোট স্থগিত)। এ নির্বাচনে মোট ২ হাজার ২৮ জন প্রার্থী ভোটযুদ্ধে লড়ছেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৭৩ জন।

মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৩ জন। এবারের নির্বাচনে সারাদেশে মোট ৪২ হাজার ৭৭৯টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ২১ হাজার ৫০৬টি কেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই ঝুঁকি সামলাতে নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।
মোট ভোটার ১২ কোটি, এগিয়ে পুরুষরা:
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, চলতি বছর তিনবার ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে ভোটেরযোগ্য মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন, নারী ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন এবং হিজড়া ভোটার ১ হাজার ২৩২ জন।
এই বিশাল ভোটারকে সামলাতে ৪২ হাজার ৭৭৯ জন প্রিজাইডিং অফিসার নিয়োগ করেছে ইসি। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার রয়েছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৮২ জন, পোলিং অফিসার ৪ লাখ ৯৪ হাজার ৯৬৪ জন। আর ভোটারদের ভোট নিতে ৭ লাখ ৮৫ হাজার ২২৫ জন দায়িত্ব পালন করবেন।
ইসি জানিয়েছে, আগামীকালের সংসদ ভোটে সেনাবাহিনী (১ লাখ ৩ হাজার), পুলিশ (১ লাখ ৮৭ হাজার), আনসার (৫ লাখ ৬৭ হাজার ৮৬৮ জন), বিজিবি (৩৭ হাজার ৪৫৩), নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র্যাব, কোস্টগার্ড ও বিএনসিসি মিলিয়ে মোট ৯ লাখ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এবার নির্বাচনে সেনাবাহিনী ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতাসহ ভোটের মাঠে দায়িত্ব পালন করছে।
ভোটের মাঠে ৫৪০ বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক:
নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে বাংলাদেশে এসেছেন ৫৪০ জন বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক। এর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২২৩ জনসহ কমনওয়েলথ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি রয়েছেন। আল জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্স ও এপির মতো নামকরা প্রতিষ্ঠানের ১৫০ জন সাংবাদিক সংবাদ সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।

নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ জানিয়েছেন, নির্বাচন আয়োজনে কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে অনেক ভালো এবং সন্তোষজনক। তবে, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এ পর্যন্ত ৩০০টি মামলা দায়ের এবং ৫০০টিরও বেশি তদন্ত করা হয়েছে। এছাড়া ১৩ ডিসেম্বর থেকে এ পর্যন্ত ৮৫০টি অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। দুষ্টচক্র সহিংসতা ঘটাতে চাইলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তা নিয়ন্ত্রণে সফল হয়েছে। কুমিল্লা, যশোর ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন স্থানে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান তারই প্রমাণ।
ফিরে দেখা নির্বাচনী ইতিহাস:
প্রথম সংসদ নির্বাচন:
স্বাধীন বাংলাদেশে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। ওই নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন জয় পায় আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে ১১টি আসনে দলটির প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ১৪টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশ নেয়। বিরোধীদের মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় লীগ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল একজন করে এবং স্বতন্ত্র পাঁচজন প্রার্থী বিজয়ী হন। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৫.৬১ শতাংশ। এই সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর ছয় মাস।
দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন:
১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রক্ষমতায় থেকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বিএনপির নামক রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের অধীনে ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ ২৯টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫১.২৯ শতাংশ। এতে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। বাকি ৯৩ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি, জাতীয় লীগ দুটি, আওয়ামী লীগ (মিজান) দুটি, জাসদ আটটি, মুসলিম ও ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি, ন্যাপ একটি, বাংলাদেশ গণফ্রন্ট দুটি, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল একটি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দল একটি এবং জাতীয় একতা পার্টি একটি আসনে জয়ী হয়। ১৬টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল তিন বছর।
তৃতীয় সংসদ নির্বাচন:
১৯৮৬ সালে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টির অধীনে তৃতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিলেও প্রথমবারের মতো ভোট বর্জন করে বিএনপি। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। ভোটের হার ছিল ৬৬.৩১ শতাংশ। অংশ নেয় ২৮টি রাজনৈতিক দল। জাতীয় পার্টি বাদে অন্য দলগুলো পায় ১১৫টি আসন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৭৬টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) পাঁচটি, ন্যাপ (মোজাফফর) দুটি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পাঁচটি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) তিনটি, জাসদ (রব) চারটি, জাসদ (সিরাজ) তিনটি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ১০টি, মুসলিম লীগ চারটি এবং বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি তিনটি আসন পায়। বাকি ৩২টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল ১৭ মাস।

চতুর্থ সংসদ নির্বাচন:
১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির নেতৃত্ব চতুর্থ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুটি দলই বর্জন করে। নির্বাচনে ক্ষমতায় আসে এরশাদের দল জাতীয় পার্টি। পরে ১৯৯০ সালে গণআন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য হয় এরশাদ। এ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫১.৮১ শতাংশ। জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। নির্বাচনে আটটি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। ১৯টি আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেন সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ)। এছাড়া জাসদ (সিরাজ) তিনটি ও ফ্রিডম পার্টি দুটি আসনে জয় পায়। বাকি ২৫টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস।
পঞ্চম সংসদ নির্বাচন:
এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৭৫টি দল অংশ নেয়। এ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৫.৪৫ শতাংশ। বিএনপি ১৪০টি আসনে জয় পায়। আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) পাঁচটি, জাসদ (সিরাজ) একটি, ইসলামী ঐক্যজোট একটি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, সিপিবি পাঁচটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি একটি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) একটি, গণতন্ত্রী পার্টি একটি ও ন্যাপ (মোজাফফর) একটি আসন পায়। বাকি তিনটি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। পরে বিএনপি-জামায়াতের চারদলীয় জোট ক্ষমতা যায়। আর আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকে। সংসদের মেয়াদ ছিল চার বছর আট মাস।
ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন:
১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়রির অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ দুটি দল অংশ নেয়। দলীয় সরকারের অধীনে হওয়া এ নির্বাচন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ অনেকগুলো দল বর্জন করে। বিএনপি ২৭৮টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। এর মধ্যে ৪৯টি আসনে বিএনপি প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। নির্বাচনে ফ্রিডম পার্টি একটি আসন পায়। বাকি ১০ আসনে জয়লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এছাড়া ১০টি আসনের ফলাফল অসমাপ্ত ছিল এবং একটি আসনের নির্বাচন আদালতের আদেশে স্থগিত করা হয়। এ নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ২৬.৫৪ শতাংশ। এ সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১২ দিন।
সপ্তম সংসদ নির্বাচন:
১৯৯৬ সালের ১২ জনু সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধয়াক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৮৮ দল নির্বাচনে অংশ নেয়। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ২৫৪৭ জন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে জোটগতভাবে ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৭৪.৯৬ শতাংশ। ৮১ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী তিনটি, ইসলামী ঐক্যজোট ও জাসদ একটি করে আসন পায়। বাকি একটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করে। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।
অষ্টম সংসদ নির্বাচন:
২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ ৫৪টি রাজনৈতিক দল অংশ নেয়। নির্বাচনে ১৯৩৯ জন প্রার্থী ছিলেন। ভোট পড়েছিল ৭৫.৫৯ শতাংশ। এ নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি, জাতীয় পার্টি (নাজিউর) চারটি, জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) একটি, ইসলামিক ঐক্যজোট দুটি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একটি আসন পায়। বাকি ছয়টি আসন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।

নবম সংসদ নির্বাচন:
২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মহাজোট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটসহ ৩৮ দল অংশ নেয়। রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পদ্ধতি চালু হওয়ার পর এটি প্রথম ভোট। নির্বাচনে ১৫৭৬ জন প্রার্থী ছিলেন। নির্বাচনে ভোট পড়ে ৮৭.১৩ শতাংশ। আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি, জাসদ তিনটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি দুটি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) একটি, জামায়াতে ইসলামী দুটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) একটি আসন পায়। বাকি চারটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেন। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।
দশম সংসদ নির্বাচন:
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে দশম সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো। নির্বাচনে আওয়ামী লীগসহ সাতটি দল অংশ নেয়। এতে ১৫৩টি আসনে প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়। আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩৪টি আসনে জয় পায়। অন্য দলগুলোর মধ্যে জাতীয় পার্টি ৩৪টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ছয়টি, জাসদ (ইনু) পাঁচটি, তরিকত ফেডারেশন দুটি, জাতীয় পার্টি (জেপি) দুটি, বিএনএফ একটি আসনে জয় পায়। বাকি ১৬টিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করেন। নির্বাচনে ভোট পড়েছিল ৪০.০৪ শতাংশ। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।
একাদশ সংসদ নির্বাচন:
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় একাদশ সংসদ নির্বাচন। কাগজে–কলমে এটি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হলেও ‘রাতের ভোট’ হিসেবে বেশি পরিচিত এই নির্বাচন। আওয়ামী লীগের মহাজোট ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্টসহ নিবন্ধিত ৩৯টি দল নির্বাচনে অংশ নেয়। প্রার্থী ছিল ১৮৬৫ জন। ভোট পড়েছিল ৮০.২০ শতাংশ। আওয়ামী লীগ ২৫৮টি আসন নিয়ে টানা তৃতীয়বার রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। আর ২২টি আসন নিয়ে সংসদের বিরোধী দল হয় এরশাদের জাতীয় পার্টি। বিএনপি ছয়টি, গণফোরাম দুটি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা তিনটি আসনে জয়ী হন। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন:
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগসহ নিবন্ধিত ২৮টি দল এতে অংশ নেয়। বিএনপিসহ ১৬টি নিবন্ধিত দল ভোট বর্জন করে। মোট প্রার্থী ছিল ১৯৭০ জন। ভোট পড়েছিল ৪১.৮ শতাংশ। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২২২টি, জাতীয় পার্টি ১১টি আসনে জয় পায়। বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ ও কল্যাণ পার্টি একটি করে আসন পায়। বাকি ৬২টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়লাভ করে। এটি ‘আমি’ ও ‘ডামি’ নির্বাচন নামে পরিচিত লাভ করে। সংসদ স্থায়ী হয় মাত্র ছয় মাস সাত দিন।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। ওই দিন রাতেই রাষ্ট্রপতি সংসদ বিলুপ্ত ঘোষণা করেন। ৮ আগস্ট নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
সমকালীন বাংলা সাহিত্যের ‘রাজপুত্র’ হুমায়ূন আহমেদ। বিস্ময়কর প্রতিভাধর এই সব্যসাচী তাঁর জিয়নকাঠির আলো ছড়িয়ে জনপ্রিয়তায় নিজেকে অসামান্য উচ্চতায় স্থাপন করেছিলেন। ‘নন্দিত নরকে’ দিয়ে সাহিত্য গগনে অতি অকস্মাৎ ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব ঘটেছিল কিংবদন্তী হুমায়ূন আহমেদের। ক্ষণজন্মা হুমায়ূন আহমেদ (১৯৪৮-২০১২) উজ্জ্বলপ্রভ এক অভিনব কণ্ঠস্বর নিয়ে স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে প্রবেশ করেন যাদু বাস্তবতা নিয়ে। নাগরিক মধ্যবিত্ত, তারুণ্য-শাসিত আবেগে-আকাঙ্ক্ষায় উচ্চকিত হুমায়ূন আহমেদ জীবনার্থ সন্ধানে স্বপ্নময় ভবিষ্যতে বিশ্বাসী ছিলেন। শুরু থেকেই তাঁর উপন্যাসের ভাষা ছিল সহজ-সরল, স্বচ্ছন্দ ও গতিময়। গল্প বলার অসাধারণ এক সম্মোহনী শক্তি ছিল তাঁর। এই গল্প বলার জাদুকরী শক্তিই তাঁকে অতিদ্রুত খ্যাতির চূড়ায় স্থাপন করেছিল। উত্তরকালে হুমায়ূন আহমেদ হয়ে ওঠেন জীবনরসিক, রূপদক্ষ এক অসাধারণ জননন্দিত কথাশিল্পী। তিনি অনিবার্যভাবে বাংলা সাহিত্যে মধ্যবিত্ত শ্রেণির যাপন ও দিনবদলের কথাকার। আজন্ম তিনি লিখে গেছেন মধ্যবিত্ত প্রেম এবং তার টানাপড়েন। তিনি আপন প্রতিভার ক্ষুরধারে দ্রুত হয়ে ওঠেন সময়ের শ্রেষ্ঠ এবং জনপ্রিয় কথাশিল্পী। কাহিনি-বর্ণনায় টানটান উত্তেজনা, কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনার বিন্যাস, চমকপ্রদ নাটকীয়তা, বৈচিত্র্যময় ও বিশ্বাসযোগ্য চরিত্র সৃষ্টি এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টি হুমায়ূন আহমেদকে পাঠকপ্রিয়তার তুঙ্গে তুলে আনে। স্বাধীনতা-উত্তর শহরকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা নতুন মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তের শিক্ষিত শ্রেণিই মূলত হুমায়ূন আহমেদের প্রধান পাঠক। একাধারে উপন্যাস, ছোটগল্প, ভ্রমণ-আখ্যান, ব্যক্তিগত রচনা, আত্মজীবনী, রস-রহস্য, কবিতা, গান, নাটক, চলচ্চিত্র, ছবি আঁকা, ছোটদের রচনা, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনি, হিমু, শুভ্র, মিসির আলি, রুপা, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস, রাজনৈতিক উপন্যাস, ঐতিহাসিক উপন্যাস– বিচিত্র সৃষ্টিসম্ভারে তিনি আমাদের সাহিত্যকে সমৃদ্ধ সুশোভিত করেছেন। তিন শতাধিক গ্রন্থের জনক এ মানুষটিকে বলা হয় বাংলা সায়েন্স ফিকশনের পথিকৃৎ। বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি অসম সমাদৃত। বাদ যায়নি গীতিকার কিংবা চিত্রশিল্পীর পরিচয়ও। সৃজনশীলতার প্রতিটি শাখায় তাঁর সমান দক্ষতার বিচরণ ছিল। অর্জন করেছেন সর্বোচ্চ সফলতা এবং তুমুল জনপ্রিয়তা। স্বাধীনতা পরবর্তী বাঙালি জাতিকে হুমায়ুন আহমেদ উপহার দিয়েছেন তাঁর অসামান্য গল্প উপন্যাস, নাটক এবং চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রের বদৌলতে মানুষকে করেছেন হলমুখী। হুমায়ূন আহমেদের কল্যাণে এ দেশের প্রকাশনাশিল্প জেগে ওঠে, পাঠক তৈরিতে নতুন এক ইতিহাস রচনা করেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রতিটি নতুন বইয়ের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে পাঠক অধীর অপেক্ষায় থাকতেন। প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে তিনি ক্রমাগত লিখে গেছেন, পাঠক-তৃষ্ণা মিটিয়েছেন। ঘটনাপ্রধান, পরিবারভিত্তিক উপন্যাসগুলোতে হুমায়ূন আহমেদ আত্মকথন বা উত্তমপুরুষে বর্ণিত রীতিকে ব্যবহার করেছেন। যেমন নন্দিত নরকে, শঙ্খনীল কারাগার, এইসব দিন রাত্রি, বহুব্রীহি, কোথাও কেউ নেই ইত্যাদি। চরিত্রকথন রীতির উপন্যাসগুলোতে তিনি সংলাপের মাধ্যমে যেমন চরিত্রকে জীবন্ত করে তোলেন, তেমনি ঘটনাপ্রবাহকে এগিয়ে নিয়ে যান। চরিত্রের নাটকীয় বাঁক পরিবর্তন ও কাহিনির সফল পরিণতি দান করতে এ-পদ্ধতির জুড়ি মেলা ভার। মিসির আলি এবং হিমু চরিত্র সিরিজের উপন্যাসগুলোতে হুমায়ূন আহমেদ এই চরিত্রকথন রীতির সফল প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। বর্ণনামূলক রীতির উপন্যাসেও হুমায়ূন আহমেদ অভিনবত্ব দেখিয়েছেন। বর্ণনার ধরাবাঁধা পথে তিনি হাঁটেননি। কাহিনি বর্ণনার প্রথাবদ্ধ পথে চলার বাধ্যবাধকতা না থাকায় পাঠক নিজের কল্পনাকে অবাধে মেশানোর সুযোগ পান বলে পাঠক নিজেই একাত্ম হয়ে ওঠেন। এ-ধারার উপন্যাসগুলোর মধ্যে রয়েছে জোছনা ও জননীর গল্প, বাদশা নামদার, দেয়াল, মধ্যাহ্ন ইত্যাদি। নাট্য গঠনরীতির উপন্যাসে হুমায়ূন আহমেদ কথার পিঠে কথা সাজিয়ে সংলাপের পথ ধরে পৌঁছে যান চরিত্রের গভীরে। উঠে আসে আবেগ আর অনুভূতির চিরন্তন সত্যগুলো। মানবজীবনের চিরন্তন সুখ-দুঃখ, আলো-অন্ধকারে ঘেরা জীবনের আত্মোন্মোচন ঘটে এ-পদ্ধতিতে। কথাসাহিত্যের সাফল্য বহুলাংশে নির্ভর করে চরিত্র সৃষ্টির ওপর। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে বলতেই হয়, হুমায়ূন আহমেদ বাংলা কথাসাহিত্যে বেশকিছু অবিস্মরণীয় চরিত্র উপহার দিয়েছেন। হিমু, মিসির আলি, শুভ্র, রুপা– কালজয়ী, প্রভাব সঞ্চারী অমর চরিত্র। তাঁর উপন্যাসের আঙ্গিক-প্রকরণের নিরীক্ষাও কম নয়। যে আঙ্গিকেই তিনি সাহিত্য রচনা করেন না কেন, আগাগোড়াই তাঁর সাহিত্য দ্যুতিময়। কোনো লেখকেরই সব রচনা সেরা হয় না, সমান মর্যাদা পায় না। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদের বৈশিষ্ট্য, তাঁর সব ধরনের লেখার মধ্যে একটা সাধারণ মান বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছেন। এভাবে যুগের সব অভিজ্ঞানকে আত্মস্থ করে তিনি হয়ে ওঠেন সমকালের আশ্চর্য এক কথক। ফলে তাঁর সৃষ্টিমালা এখনো সমানভাবে জনপ্রিয়। তাঁর লেখা উপন্যাস-সায়েন্স ফিকশন আজও বেস্ট সেলার। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ৬৩ বছর বয়সে নিউইয়র্কের বেলভিউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। আর মাত্র ক’দিন পরেই তাঁর ১৪ তম মৃত্যুবার্ষিকী পালিত হবে। বর্ণাঢ্য জীবনের জননন্দিত সাহিত্য কর্তার বাহ্যিক মৃত্যু হলেও তিনি বেঁচে থাকবেন বহু যুগ শতাব্দী অমর সাহিত্যকীর্তির মাধ্যমে। একজন হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদে পরিণত হয়েছেন। তাঁর প্রতি জীবন-কর্ম,কাজের পরিবেশ, বাস্তুভিটা, রুচিবোধ এবং তাঁর সময়কার সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা গ্রহণে বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়ের মধ্যে কৌতূহল অনিঃশেষ। গুণী লেখক ও শিল্পীদের বাড়ি এবং স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণ করা একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ইতিহাস ও সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীর বাড়ি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্মৃতিকেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, আবার কিছু স্থান এখনো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশ্বের বিখ্যাত ব্যক্তিদের স্মৃতি সংরক্ষণে তাদের বাসস্থানগুলোকে প্রায়শই স্মৃতি জাদুঘর বা ‘হাউস মিউজিয়াম’-এ রূপান্তর করা হয়। এই বাড়িগুলো শুধু ইতিহাসই ধরে রাখে না, বরং দর্শনার্থীদের সেইসব মনীষীদের ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মক্ষেত্রের খুব কাছাকাছি নিয়ে যায়। সংরক্ষিত বাস্তুভিটাগুলো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে, যা দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন খাতের উন্নয়ন ঘটায়। দীর্ঘদিন ধরে হুমায়ূন আহমেদের মুগ্ধ পাঠক, শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতি বোদ্ধা, সুধীজনরা দাবি করে আসছেন আমাদের দেশের বিখ্যাত-প্রখ্যাত শিল্পী সাহিত্যিক গুনীজনদের বাস্তুভিটা-বাড়ি-ঘর, স্মৃতিবিজড়িত স্থানসমূহ সংরক্ষণ করতে হবে। স্মৃতি যাদুঘর করতে হবে। দেশের প্রত্নতত্ত্ব আইন ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার আওতায় এনে তাদের স্থাপনা দখল বা ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা করার পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।তাদের সৃষ্টিকর্ম, তাদের পাণ্ডুলিপি, তাদের বাড়িগুলোর স্থাপত্যশৈলী এবং ব্যবহৃত সামগ্রী থ্রিডি স্ক্যানিং ও ডিজিটাল ক্যাটালগের মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে। দেশের সর্বস্তরের মানুষ জানেন, হুমায়ূন আহমেদের হাতে গড়া গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামের রূপকথার রাজ্য নুহাশ পল্লী। তাঁর ধানমন্ডির দখিন হাওয়া। তাঁর জনপ্রিয় বই ও নাটকের আবহ ও গল্পে এই পরিচিত ঠিকানা ঘুরেফিরে এসেছে। নুহাশ পল্লীতে বসে লিখেছেন উপন্যাস গল্প নাটক। তাঁর নাটক এবং সিনেমার সুটিং হয়েছে। তাঁর সময় যাপনের প্রিয় ঠিকানা ছিল নিজ ও প্রিয়তম সন্তান নুহাশ হুমায়ূনের নামে প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর অবস্থিত ‘নুহাশ পল্লী’ হুমায়ূন আহমেদের নিজ হাতে গড়া এক স্বপ্নভূমি ও প্রকৃতিপ্রেমের অনন্য নিদর্শন। প্রায় ৩০০ প্রজাতির ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছ, এখানে হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় বৃষ্টিবিলাস কটেজ, ট্রি-হাউস, সুইমিং পুল এবং তার সমাধি রয়েছে। নুহাশ পল্লীতে ঢুকলেই বাম দিকে চোখে পড়বে এক মনোরম সবুজ প্রান্তর। তারই পাশে লিচু বাগানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি প্রায়শই নুহাশ পল্লীতে চলে আসতেন সময় কাটাতে। কখনো আসতেন সপরিবারে, কখনো আসতেন বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে রাতভর আড্ডা দিতে। প্রতি বছর ১লা বৈশাখে নুহাশ পল্লীতে বৈশাখি মেলার আয়োজন করা হতো। নুহাশ পল্লীতে হুমায়ূন আহমেদ শুটিং স্পট, লীলাবতী দিঘি আর তিনটি সুদৃশ্য বাংলো গড়ে তুলেছেন। একটিতে তিনি থাকতেন আর বাকি দুটিতে তিনি তার শৈল্পিক চিন্তাধারার বিকাশ ঘটিয়েছিলেন। শানবাঁধানো ঘাটের দিঘির দিকে মুখ করে বানানো বাংলোকে তিনি ‘ভূত বিলাস’ নাম দিয়েছিলেন। দুর্লভ সব ঔষধি গাছ নিয়ে যে বাগান তৈরি করা হয়েছে তার পেছনেই রূপকথার মৎস্যকন্যা আর রাক্ষসের ভাস্কর্য রয়েছে। আরও রয়েছে পদ্মপুকুর ও অর্গানিক শৈলীতে নকশা করা এবড়োথেবড়ো সুইমিং পুল। ‘বৃষ্টি বিলাস’ বাংলো থাকতেন তিনি।এক সময়ে এই বরেণ্য সাহিত্যিক তাঁর অতিথিদের নুহাশ পল্লী ঘুরে দেখাতেন। বিভিন্ন গাছের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। কথার জাদুকর হুমায়ূন আহমেদের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিলো এই নুহাশ পল্লি। তাঁর মৃত্যুর পরে নুহাশ পল্লীর দখল ও মালিকানা নিয়ে বিতর্ক ও বিরোধ চলে আসছে। লেখকের দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন বিগত পতিত আওয়ামী লীগ সরকারি প্রভাবে নুহাশ পল্লী করায়ত্ব করে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ করেছেন নুহাশের পরিবার। সচেতন মহলের অনেকে মনে করেন, লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতি সংরক্ষণে তাঁদের বাড়ি বা আবাসস্থল সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে কবি-সাহিত্যিকদের স্মৃতিবিজড়িত অনেক ঐতিহাসিক স্থান রয়েছে, যেগুলো তাঁদের সৃষ্টি ও জীবনকর্মের অমূল্য দলিল হিসেবে টিকে আছে। লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িঘর তাদের সৃষ্টি ও জীবনাদর্শের অনন্য দলিল। বাড়িগুলোকে জাদুঘর বা সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে রূপান্তর করে পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইতিহাস সংরক্ষণ করা যায়। তবে বর্তমানে অনেক ঐতিহাসিক ভিটা, যেমন হুমায়ুন আহমেদ বিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে আবির্ভূত একজন প্রখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক। তাঁর স্মৃতিবিজড়িত নুহাশ পল্লী, অবহেলার শিকার হচ্ছে। পৃথিবীর সেরা লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয় তাঁদের সৃষ্টিকর্ম, ব্যবহৃত জিনিসপত্র এবং বাসভবনকে জাদুঘরে রূপান্তরের মাধ্যমে। এছাড়া, তাঁদের জীবন ও সৃষ্টি নিয়ে গবেষণা, জীবনীগ্রন্থ রচনা এবং প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে তাঁদের অবিনশ্বর সৃষ্টি ও আদর্শ চিরকাল বাঁচিয়ে রাখা হয়। বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীদের শেষ জীবন বা কর্মজীবন কাটানো বাড়িগুলো সাধারণত জাদুঘরে রূপান্তরিত করা হয়। লেখক ও শিল্পীদের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িগুলো আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। সাহিত্য-সংস্কৃতিকে অমরত্ব দান করতে হলে তাদের ভালোবাসতে হবে। অজানা বিস্মৃত অধ্যায় স্বজাতির সাহিত্য-সংস্কৃতির অতীত ইতিহাস উপলব্ধি করতে হবে। স্মৃতিকে সংরক্ষণ করতে হবে। বাংলাদেশে সরকারি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও বিভিন্ন ট্রাস্ট অনেক বাড়ি সংরক্ষণ করে থাকে। দেশ বরেণ্য সাহিত্যিক কিংবদন্তি হুমায়ূন আহমেদের বাস্তুভিটা জাতির স্মৃতির বাতিঘর। নুহাশ পল্লী অধিগ্রহণ করে হুমায়ুন আহমেদ স্মৃতি জাদুঘর বা ‘হাউস মিউজিয়াম করা জরুরি। সেইখানে ফিল্ম ইনস্টিটিউট থাকবে ক্রিয়েটিভ রাইটিং ইনস্টিটিউট থাকবে। একটা ট্রাস্টের অধীনে চলবে ৷ হুমায়ূন আহমেদের পুত্র নুহাশকে ট্রাস্টি বোর্ডে রাখা যায়। দেশ-বিদেশে এরকমটাই হয়ে আসছে। বিখ্যাত নাট্যকার উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের জন্মভিটা ও জীবনের শেষ সময় কাটানোর বাড়িটি বর্তমানে অতি যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এটি দেখার জন্য সারা বিশ্বের পর্যটকরা ছুটে যান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালবার্ট আইনস্টাইনের জীবনের শেষ ২২ বছর কাটানো বাড়িটি একটি সংরক্ষিত ঐতিহাসিক স্থান। তলস্তয়ের এস্টেট ‘ইয়াসানায়া পলিয়ানা’ আজ রাশিয়ার অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক তীর্থস্থান। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের শেষ জীবনের বাড়িটি একটি জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে, যেখানে তার ব্যবহৃত বিখ্যাত সাইকিয়াট্রিস্টের কোচ এবং বইয়ের সংগ্রহ সংরক্ষিত আছে। বিখ্যাত আমেরিকান লেখক নাথানিয়েল হথর্ন-এর অনুপ্রেরণায় এই বাড়িটিকে পরবর্তীতে জাদুঘর ও স্থানীয় অভিবাসীদের কল্যাণে সেটেলমেন্ট হাউস হিসেবে গড়ে তোলা হয়। নেলসেল ম্যান্ডেলার ঐতিহাসিক বাড়িটি ‘ম্যান্ডেলা হাউস’ নামে পরিচিত। এটি একটি মিউজিয়াম হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র ও সংগ্রামময় জীবনের ইতিহাস প্রদর্শিত হয়। ফ্রান্সে ভিক্টর হুগোর বাড়ি বা পাবলো পিকাসোর মিউজিয়াম। এটি অনুরাগীদের তাঁদের কাজের পরিবেশ অনুভব করতে সাহায্য করে, তাঁদের অরিজিনাল পাণ্ডুলিপি, চিত্রকর্ম এবং দুর্লভ স্কেচগুলো ডিজিটাল আর্কাইভ ও আর্ট গ্যালারিতে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে সংরক্ষণ করা হয় যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তা থেকে শিক্ষা নিতে পারে। বাংলা সাহিত্যের প্রথম ঔপন্যাসিক মীর মশাররফ হোসেনের স্মৃতি রক্ষার্থে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার পদমদী গ্রামে এই স্মৃতি কেন্দ্র ও জাদুঘর নির্মিত হয়েছে। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের স্মৃতিধন্য ত্রিশালের দরিরামপুর এবং কাজীর শিমলা গ্রামের দারোগা বাড়িকে “নজরুল স্মৃতিকেন্দ্র” হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে কবির ব্যবহৃত ঐতিহাসিক খাট ও অন্যান্য জিনিসপত্র রয়েছে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়ি এবং সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর কাচারিবাড়ি দর্শনীয় স্থান হিসেবে সংরক্ষিত। শান্তিনিকেতনের আদি বাড়ি ও অন্যান্য বাসভবনও সুরক্ষায় রয়েছে। নোবেলজয়ী মার্কিন লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্প্যানিশ উপনিবেশ আমলের বাড়িটি এখন একটি জনপ্রিয় জাদুঘর, যেখানে তার লেখালেখির ঘর এবং বিড়ালদের বংশধরদের দেখা মেলে। বাংলাদেশের নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামে ভাষাবিদ ও গবেষক ভাই গিরিশ চন্দ্র সেনের বাড়িটি জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুর মুন্সীগঞ্জের রাঢ়ীখালের পৈত্রিক বাড়িটি বর্তমানে বিজ্ঞান কমপ্লেক্স ও জাদুঘর হিসেবে সংরক্ষিত। কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগড়দাঁড়িতে অবস্থিত মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িটিকে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর “মধুপল্লী” হিসেবে রূপান্তর করে কবির স্মৃতিচিহ্ন ও জীবনালক্ষ্য সংরক্ষণ করছে। এটি একটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র এবং সেখানে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাস ও সাহিত্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও শিল্পীর বাড়ি সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে ঐতিহাসিক স্মৃতিকেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, আবার কিছু স্থান এখনো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের স্মৃতিবিজড়িত এক অনিন্দ্য সুন্দর নন্দন কানন গাজীপুরের নুহাশ পল্লী দ্রুত সংরক্ষণের বন্দোবস্ত করার দাবি উচ্চারিত হচ্ছে সর্বস্তর থেকে। এই প্রসঙ্গে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, সাহিত্য সংস্কৃতি জগতের অনেকেই বলেছেন এবং আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে, বরেণ্য লেখক হুমায়ূন আহমেদ আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি অঙ্গনে একজন মহিরুহ ব্যক্তিত্ব। হুমায়ূন আহমেদ পাঠকের মনোজগৎ বদলে দিয়েছেন। তরুণ সম্প্রদায়কে বইমুখী করার অভাবনীয় কীর্তি তার। চলচ্চিত্রের গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছে তার চলচ্চিত্র। হলমুখী করেছিল দর্শকদের। টেলিভিশনে তার নাটক পারিবারিক বিনোদনের নতুন অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। তাঁর প্রতি মানুষের মুগ্ধতা ছিল। তার একটি অমর কীর্তি নুহাশ পল্লী। এ কারণে অনেকে হুমায়ূন আহমেদের এই নন্দন কাননকে জাতীয়ভাবে সংরক্ষণ করার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছে। তবে দাবি জানালেই তো হয় না, বাস্তবতা ও আইনগত বিষয় আছে। নুহাশ পল্লী হয়তো কোনো ব্যক্তি মালিকানাধীন বা পরিবারের মালিকানায় আছে, আমরা ঠিক জানি না। এটা আমাদের খতিয়ে দেখতে হবে। আইনগত দিকগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে হবে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণের ক্ষেত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণের অবকাশ রয়েছে। আমার মনে হয়, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ কীর্তি জাতীয়ভাবে সংরক্ষণের যৌক্তিকতা রয়েছে। এটি জনদাবি হলে সরকার খতিয়ে দেখবে।
পাঁচ দিনের টানা বৃষ্টিতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলায় ১৫৩টি ইউনিয়নে ৯ হাজার ৯৩৩টি পুকুর-দিঘি এবং ৩২০টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে শুক্রবার (১০ জুলাই) পর্যন্ত আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার। চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এদিকে, জেলা প্রশাসনের হিসাবে জেলার ১৫টি উপজেলা ও নগর মিলিয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৫০৩ জন মানুষ। তাদের মধ্যে নগরীতে রয়েছেন ৮ হাজার এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রয়েছেন ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০৩ জন। জেলার মধ্যে সাতকানিয়ায় সবচেয়ে বেশি ২ লাখ ১৮ হাজার ৬১০ জন পানিবন্দি রয়েছেন। এ ছাড়া হাটহাজারীতে ৭০ হাজার, সন্দ্বীপে ৫০ হাজার, বাঁশখালীতে ৩৮ হাজার, চন্দনাইশে ১২ হাজার, পটিয়ায় ৭ হাজার ১০ জন, সীতাকুণ্ডে ৫ হাজার ৬০৩ জন, রাউজানে ৫ হাজার, লোহাগাড়ায় ৪ হাজার, আনোয়ারায় ৩ হাজার ৫০০, মীরসরাই ও রাঙ্গুনিয়ায় ৩ হাজার করে, বোয়ালখালীতে ২ হাজার ৫৫০, ফটিকছড়িতে ২ হাজার ২৩০ এবং কর্ণফুলীতে ২ হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। জেলা মৎস্য কর্মকর্তারা কার্যালয় সূত্র জানিয়েছে, জেলার পটিয়া উপজেলায় বন্যায় ১৫টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৩৫টি পুকুর ও দিঘি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একইভাবে রাউজান উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৯০টি, চন্দনাইশে ১০টি ইউনিয়নের ৩৮৩টি, লোহাগাড়ায় ৯টি ইউনিয়নে ১ হাজার ৬২০টি, মীরসরাইয়ে ৩টি ইউনিয়নে ৯৭টি, সীতাকুণ্ডে ৩টি ইউনিয়নে ১০টি, সন্দ্বীপে ১৩টি ইউনিয়নে ৪১২টি, বোয়ালখালীতে ৯টি ইউনিয়নে ৭৫৬টি, আনোয়ারায় ১১টি ইউনিয়নে ১ হাজার ১০০টি, বাঁশখালীতে ১৪টি ইউনিয়নের ২৫০০টি, ফটিকছড়িতে ১৮টি ইউনিয়নে ৫৩৩টি, হাটহাজারীতে ৮টি ইউনিয়নে ১৭০টি, কর্ণফুলীতে ৫টি ইউনিয়নে ৫৫৭টি এবং রাঙ্গুনিয়ায় ১২টি ইউনিয়নে ২৭০টি পুকুর-দিঘির মাছ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সালমা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জেলার ১৫টি উপজেলায় মৎস্য খাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে ৩ হাজার ২১১ দশমিক ৯২ হেক্টর পুকুর-দিঘি ও ৯০০ হেক্টর মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শুক্রবার পর্যন্ত ৯১ কোটি ৪১ লাখ ৫৩ হাজার টাকার ক্ষতি হওয়ার তথ্য উঠে এসেছে।’ এ ক্ষয়ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলেও জানান তিনি।
লেবার পার্টির এমপিদের ব্যাপক সমর্থনে যুক্তরাজ্যের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন অ্যান্ডি বার্নহাম। এর মাধ্যমে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়া তার এখন প্রায় সময়ের ব্যাপার। বৃহস্পতিবার মনোনয়ন প্রক্রিয়ার প্রথম দিনে লেবার পার্টির ৪০৩ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ৩২২ জনেরই মনোনয়ন পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন বার্নহাম। একমাত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করতে তার আর মাত্র ১টি মনোনয়ন প্রয়োজন। নিজের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার কথা জানিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও ক্লিপে বার্নহাম বলেন, সবকিছু এখন খুব বাস্তব মনে হতে শুরু করেছে। লেবার পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী বৃহস্পতিবার। আগামী শুক্রবার বার্নহামকে আনুষ্ঠানিকভাবে লেবার পার্টির নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে এবং আগামী ২০ জুলাই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। বার্নহাম ৩২৩টি মনোনয়নে পৌঁছে গেলে অন্য কোনও প্রার্থীর পক্ষে এই প্রতিযোগিতায় নামার আর সুযোগ থাকবে না। কারণ স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হলে অন্তত ৮১ জন এমপির সমর্থনের প্রয়োজন হবে, যা বাকি থাকা এমপিদের সংখ্যা অনুযায়ী আর কারও পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। লেবার পার্টির কয়েকজন সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার তারা ভোট দিতে পারেননি, তবে আগামী সোমবার পার্লামেন্টে ফিরে তারা বার্নহামকেই সমর্থন দেবেন। বুধবার রাতে সাবেক জুনিয়র প্রতিরক্ষামন্ত্রী আল কার্নস বার্নহামের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করার ঘোষণা দিলে বার্নহামের নেতৃত্ব পাওয়ার পথটি কার্যত নিশ্চিত হয়ে যায়। গত মে মাসে অনুষ্ঠিত স্থানীয় নির্বাচনে দলের বিপর্যয়কর ফলাফলের পর দলটির আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব ও নীতি পরিবর্তনের জোরালো দাবি ওঠে। এর প্রেক্ষিতে গত মাসে পদত্যাগের ঘোষণা দেন কিয়ার স্টারমার। সূত্র: রয়টার্স