‘প্রশাসন বা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের কাছে যে কেউ চাইলেই যে কারও বিরুদ্ধে মামলা করে কী করে? কীভাবে প্রশাসন টিস্যুর মতো ব্যবহৃত হতে পারে? মামলা করতে চাইলেই কি মামলা করা যাবে? এখানে কি কোনো ভেরিফিকেশন সিস্টেম নেই?’ এই প্রশ্নগুলো করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শিশির মনির।
আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে এক আলোচনায় অংশ নিয়ে শিশির মনির এ কথাগুলো বলেন। ভুক্তভোগী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৬১টি ভুয়া মামলা দায়েরের প্রসঙ্গ টেনে তিনি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। মানবাধিকার সংস্থা ‘অধিকার’ এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
শিশির মনির জানান, ওই ভুক্তভোগী পেশায় একজন সাধারণ লবণ ব্যবসায়ী। তাঁর বিরুদ্ধে একে একে মোট ৬১টি মামলা করা হয়। সব কটি মামলাতেই ‘মানব পাচারের’ অভিযোগ আনা হয়। এই আইনজীবীর সহায়তায় সম্প্রতি ওই ব্যক্তি সব মামলা থেকে জামিন পেয়েছেন।
শিশির মনির বলেন, আইনি হেফাজতে নির্যাতনের ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারই প্রতিফলন। সতর্ক করে তিনি বলেন, বিচারব্যবস্থার আধুনিকায়ন, পর্যাপ্ত বিচারক নিয়োগ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে এই পুরো ব্যবস্থাটি একটি ‘নির্যাতনের যন্ত্র’ (টর্চার মেকানিজম) হয়েই থাকবে। এমন ব্যবস্থা গড়তে হবে, যেখানে দ্রুততম সময়ে মানুষের বিচার পাওয়া বা না পাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
আইনি হেফাজতে মৃত্যু ৪৮৬
আলোচনাসভায় ‘নির্যাতন প্রতিরোধ, প্রতিকার, ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ ও ন্যায়বিচার: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট ও করণীয়’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধিকারের পরিচালক (প্রোগ্রাম) মো. সাজ্জাদ হোসেন। প্রতিবেদনে ২০০১ থেকে ২০২৬ সালের ২২ জুন পর্যন্ত আইনি হেফাজতে মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরা হয়। অধিকার জানায়, এই দীর্ঘ সময়ে দেশে সরকার পরিবর্তন হলেও হেফাজতে মৃত্যু থামেনি। গত ২৫ বছরে হেফাজতে নির্যাতনের শিকার হয়ে ৪৮৬ জন মারা গেছেন।
প্রবন্ধের তথ্য অনুযায়ী, ২০০১-০৬ মেয়াদে বিএনপি আমলে ১৮৪ জন আইনি হেফাজতে মারা গেছেন, যা মোট মৃত্যুর ৩৮ শতাংশ। আর বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মারা গেছেন ২১৩ জন বা ৪৪ শতাংশ। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের (৬ শতাংশ)। এ ছাড়া বর্তমান বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এখন পর্যন্ত আইনি হেফাজতে দুজনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
অধিকার আরও জানায়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৪৮টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছেন প্রায় ১ হাজার ৪০০ জন। সংস্থাটির মতে, শাসনামল বদলালেও আইনের কাঠামোগত ত্রুটির কারণে মানবাধিকার সংকট কাটছে না।
নির্যাতন প্রতিরোধে সুপারিশ
নির্যাতন প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য ‘অধিকার’ ১০টি সুপারিশ তুলে ধরেছে। এর মধ্যে রয়েছে নির্যাতনবিরোধী আন্তর্জাতিক সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন, স্বাধীন তদন্ত সংস্থা ও মনিটরিং সেল গঠন এবং একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা। এ ছাড়া গুম ও নির্যাতন রোধে বিশেষ আইনি সংস্কার, ‘শূন্য সহনশীলতা নীতি’ বাস্তবায়ন, ভুক্তভোগীদের জন্য ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানায় সংস্থাটি।
অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব এবং ‘ডেইলি ওয়াদা’র এডিটর ইন চিফ শফিকুল আলম বলেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ছাড়াও বড় বড় মামলায় নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। এতে সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি আদৌ প্রকৃত অপরাধী কি না, তা নিয়ে জনমনে সংশয় থেকে যায়। তিনি বলেন, শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সই করলেই হবে না; বরং পুরো নিরাপত্তা বাহিনী, তদন্তব্যবস্থা ও প্রসিকিউশন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। বিচারব্যবস্থাকে গণমুখী করতে সংস্কারের বিকল্প নেই।
এনসিপির সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন বলেন, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পেছনে যারা যুক্ত ছিল, তাদের অপরাধের বিচার না হলে দেশ এগোবে না। পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর মানুষের বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রবণতা ফ্যাসিবাদের সময়ে গড়ে উঠেছিল। রাষ্ট্রযন্ত্র যেভাবে দানব হয়ে উঠেছিল, সংস্কার ছাড়া তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা বলেন, বিগত সরকারের সময়ে গুম, খুন ও নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনা হবে। তিনি ন্যায়বিচারের স্বার্থে সবাইকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক শরীফুল ইসলাম সতর্ক করে বলেন, জুলাই সনদের সঙ্গে প্রতারণা করা হলে পুরোনো নির্যাতনের সংস্কৃতিই ফিরে আসবে। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক ফয়েজুল হাকিম বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংস্কারের যেসব উদ্যোগ ছিল, নতুন সরকার সংসদকে সব ক্ষমতার উৎস ভেবে সেগুলো বাদ দিয়েছে। তিনি আইনি হেফাজতে মৃত ব্যক্তিদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান।
অধিকারের পরিচালক তাসকিন ফাহমিনার সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন দ্য ডেইলি স্টারের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জাইমা ইসলাম, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী, মিরপুরে নির্যাতনে নিহত ইশতিয়াক হোসেন জনির ভাই ইমতিয়াজ হোসেন, জুলাই আন্দোলনের ভুক্তভোগী মুহাইমিন পুলক এবং শহীদ শেখ শাহরিয়ারের মা মমতাজ বেগম। বক্তারা দলমত–নির্বিশেষে সবার জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে উদ্ধার করা আফগান নাগরিক হাসমত মোহাম্মদির দাফনের সাড়ে চার মাস পর লাশ নিতে বাংলাদেশে এসেছেন তার ভাই ইমাল মোহাম্মদি। তিনি দেড় মাসের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে অবস্থান করলেও দাপ্তরিক জটিলতায় কবর থেকে লাশ উত্তোলনের বিষয়টি আটকে রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমতির পর নিহতের ভাই প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্তসহ সোমবার ঝিনাইদহে এসে পৌঁছালেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা না পাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছে হাসমত মোহাম্মদির পরিবার। ইমাল মোহাম্মদির বাংলাদেশি আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাহমুদুল হাসান মাসুম জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বহিরাগমন শাখা-১-এর উপসচিব কাজী আরিফুর রহমান গত ১১ আগস্ট (স্মারক নং-৮১৯) পররাষ্ট্রসচিব, ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে নিহতের লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে আফগানিস্তানে পাঠানোর বিষয়ে অনাপত্তি প্রকাশ করেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমতির চিঠি না পাওয়ায় ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাশ উত্তোলনের প্রক্রিয়াটি থমকে রয়েছে। ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, যেহেতু বিষয়টির সঙ্গে বিদেশি রাষ্ট্রের এক নাগরিক জড়িত, সে কারণে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠির পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত মরদেহ উত্তোলন ও হস্তান্তর করা সম্ভব হচ্ছে না। মহেশপুর থানার ওসি মেহেদী হাসান জানান, গত ১৩ এপ্রিল ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তের ইছামতী নদী থেকে এক অজ্ঞাত ব্যক্তির ভাসমান লাশ উদ্ধার করে পুলিশ ও বিজিবির যৌথ দল। পরবর্তীতে পিবিআই মরদেহের আঙুলের ছাপ নিয়ে বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে মেলাতে না পারায় লাশটি বেওয়ারিশ হিসেবে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে গত ১৪ এপ্রিল ঝিনাইদহ পৌর গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় ১৪ এপ্রিল মহেশপুর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা (মামলা নম্বর: ২০) দায়ের করা হয়। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাশের ছবি দেখে নিহতের স্বজনেরা নিশ্চিত হন যে লাশটি আফগানিস্তানের কাবুলের পাঞ্জাশির এলাকার কন্দুস গ্রামের ইয়াসিন মোহাম্মদি ও সকিনা মোহাম্মদি দম্পতির ছেলে হাসমত মোহাম্মদির। লাশ উদ্ধারের পর তার লন্ডনপ্রবাসী ভাই মীর ওয়াইস মোহাম্মদী লন্ডন থেকে ঝিনাইদহে আসলেও আইনি জটিলতার কারণে লাশ না পেয়ে ফিরে যেতে বাধ্য হন। দাফনের ৪ মাস ১০ দিন পর গত সোমবার (২৪ আগস্ট ২০২৬) নিহতের আরেক ভাই ইমাল মোহাম্মদী নিজ সহোদরের লাশ আফগানিস্তানে ফিরিয়ে নিতে ডিএনএ টেস্টের নথিপত্র, মন্ত্রণালয়ের চিঠি ও পরিচয়পত্রসহ ঝিনাইদহে আসেন। বর্তমানে ঝিনাইদহের একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থানত ইমাল মোহাম্মদি বলেন, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে তার ভাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। তারা কেবল চান ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী লাশটি নিজ দেশে ফিরিয়ে নিয়ে দাফন করতে। এমন শোকার্ত অবস্থায় এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরতে হওয়া স্বজনদের জন্য অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। এ বিষয়ে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক নোমান হোসেন জানান, ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসন সব ধরনের সহযোগিতার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক চিঠি পাওয়া মাত্রই লাশ উত্তোলনের পর হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
বহুল আলোচিত মাগুরার আট বছরের শিশু আছিয়া হত্যা ও ধর্ষণ মামলায় আসামি হিটু শেখের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের ওপর শুনানি শেষ হয়েছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ শুনানি শেষে রায়ের জন্য আগামীকাল (মঙ্গলবার) দিন ধার্য করেছেন। আদালতে আসামিপক্ষে রয়েছেন রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী হাফিজুর রহমান খান। রাষ্ট্রপক্ষে রয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ইমাম হোসেন তারেক। গত বছরের ৫ মার্চ রাতে মাগুরা শহরের নিজনান্দুয়ালী এলাকায় বোনের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে ধর্ষণের শিকার হয় শিশুটি। বোনের শ্বশুর হিটু শেখ মেয়েটিকে শুধু ধর্ষণই করেননি, হত্যারও চেষ্টা চালান। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে মৃত্যু হয় আট বছর বয়সী শিশুটির। এ ঘটনায় ভিকটিমের মা বাদী হয়ে হিটু শেখসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল আলোচিত এ মামলায় অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ২৩ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২৭ এপ্রিল। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২৯ জন সাক্ষ্য দেন। গত বছরের ৭ মে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়। মাত্র ১৩ কার্যদিবসে শেষ হয় আলোচিত এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম। এক বছর আগে ১৩ মে মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক এম জাহিদ হাসানের আদালতে মামলার শেষ দিনের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে একই বছরের ১৭ মে রায় ঘোষণা করা হয়। শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় প্রধান আসামি হিটু শেখকে (৪৭) মৃত্যুদণ্ড দেন মাগুরার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। একইসঙ্গে তাকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। রায়ে বাকি তিন আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। খালাসপ্রাপ্ত আসামিরা হলেন, নিহত শিশুর বোনের স্বামী সজীব শেখ (১৯), সজীব শেখের ছোট ভাই (১৭) এবং সজীবের মা জাহেদা বেগম (৪০)। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলে তা অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় কার্যক্রম উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সে অনুসারে এ মামলার নথিও গত বছরের ২১ মে উচ্চ আদালতে পাঠানো হয়। পরে সব যাচাই-বাছাই শেষে পেপারবুক তৈরির জন্য বিজি প্রেসে পাঠানো হয়। প্রস্তুতের পর পেপারবুক ৮ জুন হাইকোর্টে পাঠানো হয়। এরপর শুনানির জন্য বিশেষায়িত বেঞ্চের কার্যতালিকাভুক্ত হয়।
নাটোরের লালপুরে প্রতারণার শিকার আব্দুলপুর সরকারি কলেজের সেই ৮ শিক্ষার্থী অবশেষে এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম বিষয়ের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন। সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ১০টায় রাজশাহী নিউ গভর্নমেন্ট ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রে বিশেষ ব্যবস্থাপনায় তারা বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আব্দুলপুর সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মামদুদুর রহমান। তিনি জানান, গত বুধবার শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রতারণার শিকার এসব শিক্ষার্থীর পরীক্ষা গ্রহণের নির্দেশনা কলেজে পৌঁছায়। পরবর্তীতে দ্রুত শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানানো হয় এবং বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। শিক্ষার্থী ইসরাত জাহান সূচির বাবা ইমামুল হক বলেন, বাড়ি থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে কেন্দ্র হওয়ায় মেয়েকে নিয়ে রাজশাহীতে আত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করতে হচ্ছে। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে তার কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে নিজ জেলার বাইরে পরীক্ষা কেন্দ্র নির্ধারণ করায় শিক্ষার্থীদের কিছুটা ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ইফফাত জেরিন জানান, আব্দুলপুর সরকারি কলেজের আট শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন জেলার মোট ৪৬ শিক্ষার্থী বিশেষ ব্যবস্থায় পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন। বাংলা, পদার্থ বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যাসহ বিভিন্ন বিষয়ের পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা শিক্ষার্থীদের জন্য বোর্ডের নিকটবর্তী কেন্দ্রে এ বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। জানা যায়, আব্দুলপুর সরকারি কলেজের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের এসব শিক্ষার্থী ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের সময় সার্ভার জটিলতায় পড়েন। পরে গত ১২ মার্চ বিলম্ব ফি-সহ ফরম পূরণের জন্য কলেজে গেলে গ্রন্থাগারের অফিস সহায়ক অমিত কুমার সরকার তাদের ফরম পূরণের আশ্বাস দিয়ে প্রত্যেকের কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা করে নেন। কিন্তু পরবর্তীতে জানা যায়, তাদের ফরম পূরণই করা হয়নি। ফলে প্রবেশপত্র না পাওয়ায় গত ৩ জুলাই শুরু হওয়া এইচএসসি পরীক্ষার বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় তারা অংশ নিতে পারেননি। বিষয়টি প্রকাশিত হলে তা শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের নজরে আসে। তার নির্দেশনায় বিশেষ ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীদের ফরম পূরণ সম্পন্ন করে প্রবেশপত্র দেওয়া হয় এবং তারা পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে অংশগ্রহণের সুযোগ পান। তবে প্রথম পরীক্ষায় অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে শিক্ষা বোর্ডের উদ্যোগে আজ তারা বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নিতে সক্ষম হন। এদিকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণার ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. মামদুদুর রহমান। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।