বিভিন্ন পক্ষের দাবি ও জুলাই যোদ্ধাদের বিক্ষোভের পরিপ্রেক্ষিতে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’-এর অঙ্গীকারনামার পঞ্চম দফা সংশোধন করা হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের মতে, এই সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই যোদ্ধাদের দাবি বাস্তবায়িত হয়েছে।
শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) ঢাকায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় আন্দোলনরত জুলাই বীর যোদ্ধাদের উদ্দেশে বক্তব্যে এই সংশোধনের ঘোষণা দেন ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি জানান, জুলাই বীর যোদ্ধাদের সঙ্গে আলোচনার পর এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নিয়ে অঙ্গীকারনামার ৫ নম্বর দফা সংশোধন করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে কমিশনের সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. মো. আইয়ুব মিয়া, এবং প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার উপস্থিত ছিলেন।
পূর্বের দফা
আগের ভাষ্যে বলা ছিল—
> “গণ-অভ্যুত্থানপূর্ব ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকালে সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান ও শহীদ পরিবারগুলোকে যথোপযুক্ত সহায়তা প্রদান এবং আহতদের সুচিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করব।”
সংশোধিত ভাষ্য
অধ্যাপক আলী রীয়াজ ঘোষিত সংশোধিত দফায় বলা হয়েছে—
> “গণঅভ্যুত্থানপূর্ব বাংলাদেশে ১৬ বছরের আওয়ামী ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানকালে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত সকল হত্যাকাণ্ডের বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা প্রদান, শহীদ পরিবারকে ও জুলাই আহতদের রাষ্ট্রীয় বীর ঘোষণা, আহত জুলাই বীর যোদ্ধাদের মাসিক ভাতা, সুচিকিৎসা, পুনর্বাসন ব্যবস্থা এবং শহীদ পরিবার ও আহত বীরদের আইনগত দায়মুক্তি, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবো।”
কমিশনের সহসভাপতি জানান, এই সংশোধিত দফা সরকারের কাছে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করা হবে। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দল ও ঐকমত্য কমিশনের মধ্যে কোনো মতপার্থক্য নেই।
এর আগে, নিজেদের ‘জুলাই শহীদ পরিবার ও আহত যোদ্ধা’ পরিচয়ে কিছু ব্যক্তি দফাটি নিয়ে আপত্তি জানান এবং বৃহস্পতিবার রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বিক্ষোভ করেন। শুক্রবার সকালে তারা সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অবস্থান নেন।
এদিন সকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদও পঞ্চম দফা সংশোধনের পক্ষে অবস্থান জানান। তিনি তার ভেরিফায়েড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে এ প্রস্তাব প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, দুপুরে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তির দাবিতে সংসদ ভবন এলাকায় প্রবেশ করতে গেলে জুলাই যোদ্ধা ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সরে যেতে সতর্ক করার পর কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে এলাকা খালি করে দেয়। এ সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে।
বিকেল ৪টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ স্বাক্ষর অনুষ্ঠান, যেখানে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) জানিয়েছে, তারা এ অনুষ্ঠানে অংশ নেবে না।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং লোকসান কমানোর লক্ষ্যে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন বেসরকারি অপারেটরদের কাছে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে চারটি ট্রেনের দরপত্র গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্য ট্রেনগুলোর জন্যও দরপত্র আহ্বান করা হবে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, পার্বতীপুর-রংপুর রুটের ‘রমনা কমিউটার’, বোনারপাড়া- পার্বতীপুর রুটের ‘রামসাগর মেইল’, লালমনিরহাট-বুড়িমারী রুটের ‘বুড়িমারী কমিউটার’ এবং পার্বতীপুর-লালমনিরহাট রুটের ‘লালমনি কমিউটার’ ট্রেনের দরপত্র প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তী ধাপে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে চলাচলকারী ‘পূর্ণভবা’ ও ‘মল্লিকা’ ট্রেনসহ আরও কয়েকটি ট্রেন ইজারার আওতায় আনা হবে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়েতে বর্তমানে ছয়টি আন্তর্জাতিক ট্রেন, ৬২টি আন্তনগর ট্রেন, ৫৫টি মেইল ও কমিউটার ট্রেন এবং ১২টি লোকাল ট্রেন চলাচল করছে। এর মধ্যে ২৪টি মেইল, কমিউটার ও লোকাল ট্রেন ইতোমধ্যে বেসরকারি অপারেটরদের কাছে ইজারা দেওয়া হয়েছে। এসব ট্রেন থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১ কোটি ৩৩ লাখ টাকা রাজস্ব আয় করছে রেলওয়ে। রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, লোকাল ট্রেনগুলোতে তুলনামূলকভাবে রাজস্ব আয় কম। এর অন্যতম কারণ হিসেবে যাত্রীদের টিকিট না কাটার প্রবণতাকে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় সব মেইল ও লোকাল ট্রেনে নিয়মিতভাবে টিকিট পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। এতে রেলওয়ে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক আহসান উল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, লোকাল ট্রেন থেকে প্রত্যাশিত রাজস্ব পাওয়া যাচ্ছে না। রাজস্ব বৃদ্ধি এবং যাত্রীসেবার মান উন্নত করার লক্ষ্যেই ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন বেসরকারি অপারেটরদের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে চারটি ট্রেনের দরপত্র পাওয়া গেছে। পর্যায়ক্রমে বাকি ট্রেনগুলোর দরপত্রও আহ্বান করা হবে। বর্তমানে পশ্চিমাঞ্চলে সাত জোড়া বা ১৪টি ট্রেন বেসরকারিভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের মুখে লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে পালিয়ে আসার মধ্য দিয়ে ২০১৭ সালের ২৫ অগাস্ট থেকে যে সংকট শুরু হয়েছিল, তা এ বছর দশম বছরে পড়েছে। একদিকে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আর অন্যদিকে ক্রমে কমতে থাকা আন্তর্জাতিক সহায়তা, এই দুইয়ে মিলে এ সংকট বাংলাদেশের জন্য ক্রমবর্ধমান এক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এশিয়ার পরাশক্তি ও বৃহৎ দেশ হিসেবে চীন অনেকবারই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে উদ্যোগ নিলেও তা কার্যকর হয়নি। তারপরও বাংলাদেশ বারবার চীনকে এ সংকট সমাধানে জোরাল ভূমিকার রাখার জন্য অনুরোধ করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ লাইনস ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসির ডিরেক্টর অব স্পেশাল ইনিশিয়েটিভস কলামিস্ট ড. আজিম ইব্রাহিম মনে করছেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সহায়তা করলে চীন বহুমাত্রিকভাবেই লাভবান হতে পারে। গত বৃহস্পতিবার আরব নিউজে প্রকাশিত এক কলামে তিনি লেখেন, “প্রায় এক দশক ধরে বারবার প্রত্যাবাসন প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর, বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের জন্য আবার আঞ্চলিক কূটনীতির দিকেই ঝুঁকছে। চলতি মাসে ঢাকা ঘোষণা করেছে, তারা চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার পরিকল্পনা করছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর জোর দিয়ে বলেছেন, দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার এই বাস্তুচ্যুতির চূড়ান্ত সমাধান কেবল রাজনৈতিক পথেই সম্ভব। তবে বাংলাদেশ শুরু থেকেই বলে আসছে, যে কোনো প্রত্যাবাসন অবশ্যই হতে হবে নিরাপদ, স্বেচ্ছায়, সম্মানজনক এবং টেকসইভাবে। “এই প্রক্রিয়ায় চীনের অংশগ্রহণ অত্যন্ত স্বাভাবিক ও প্রত্যাশিত। কারণ বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই দেশের সঙ্গেই বেজিংয়ের জোরাল সম্পর্ক রয়েছে। দুই দেশেই তাদের বড় আকারের অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন অঞ্চলে আধিপত্য বজায় রাখার প্রত্যক্ষ তাগিদ আছে। এছাড়া বেইজিং বহু বছর ধরে রোহিঙ্গা কূটনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০১৯ সালে তারা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সাথে একটি ত্রিপক্ষীয় প্রক্রিয়া গঠনে সহায়তা করেছিল, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন সহজ করা এবং রাখাইন রাজ্যের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া। “সুতরাং নতুন করে শুরু হতে যাওয়া আলোচনা রোহিঙ্গা সংকটকে কেবল একটি মানবিক সংকট বা বোঝা হিসেবে না দেখে, বরং এমন একটি আঞ্চলিক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ করে দেয়, যেখানে চীনের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ দিন দিন আরও একই বিন্দুতে মিলিত হচ্ছে।” মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য আরও স্থিতিশীল হলে চীন একাধিক উপায়ে লাভবান হবে মন্তব্য করে আজিম ইব্রাহিম এর কয়েকটি দিক তুলে ধরেন। অর্থনৈতিক দিক পর্যালোচনা করে তিনি বলছেন, “চীন তার আঞ্চলিক সংযোগ ও যোগাযোগ বিস্তারের যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা নিয়ে এগোচ্ছে, তাতে রাখাইন এক গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে। বেইজিং ও মিয়ানমার সরকার ‘চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের’ উদ্যোগ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিয়াউকফিয়ু গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্পও আছে। “এছাড়া মিয়ানমার উপকূলের সঙ্গে চীনকে যুক্ত করা তেল ও গ্যাসের পাইপলাইনগুলো ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলকে বিশাল কৌশলগত গুরুত্ব দিয়েছে। চলতি বছরের জুনে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং এর চীন সফরকালে দুই দেশের সরকারই এই করিডোর এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। “রাখাইনে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতা তাই কোনোভাবেই চীনের অর্থনৈতিক স্বার্থের অনুকূলে যায় না। কিন্তু অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন দরকার সীমানা সংক্রান্ত বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া, কার্যকর স্থানীয় অর্থনীতি, নিরাপদ পরিবহন রুট এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। এর বিপরীতে ক্রমাগত সংঘাত ও বাস্তুচ্যুতি ঠিক উল্টো পরিবেশ তৈরি করে। ফলে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি অর্থবহ রাজনৈতিক সমাধান চীনের অর্থনৈতিক লক্ষ্যগুলোকে ব্যাহত করার বদলে বরং আরও পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।” একই কথা বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য মন্তব্য করে তার ভাষ্য, বেইজিং ও ঢাকার মধ্যে দ্বিপাক্ষীয় সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলতি বছরের চীন সফরে অবকাঠামো, বিনিয়োগ, সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি এবং বৃহত্তর অর্থনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন এখন ‘বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর’ গঠনের সম্ভাবনাও পরীক্ষা করছে; যা নিয়ে ঢাকা ও বেইজিংয়ের কর্মকর্তারা চলতি মাসেও আবার আলোচনা করেছেন। এখানেই রোহিঙ্গা সংকট সরাসরি অর্থনৈতিক ভূগোলের সঙ্গে এসে মিলে যায়। বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে যুক্তকারী যে কোনো করিডোরকে এমন একটি অঞ্চলের ওপর দিয়ে যেতে হবে, যেখানকার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এতদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতা ও রাজনৈতিক বিভক্তির কারণে থমকে আছে। সে জন্য রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি হতে পারে আরও গভীর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতি গড়ে তোলার মূল ভিত্তি। আজিম ইব্রাহিমের মতে, এখানে একটি দরকারি শিক্ষার বিষয় রয়েছে। কারণ মানবিক সংকট এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রায়ই দুটি ভিন্ন নীতিগত ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবে, দীর্ঘায়িত বাস্তুচ্যুতি পুরো অঞ্চলের ওপরই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে। চীন এর আগেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের মধ্যকার পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করতে পেরেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বেইজিং আগের ত্রিপক্ষীয় ফ্রেমওয়ার্কে প্রত্যাবাসন ও সংলাপের পাশাপাশি রাখাইন সংকটের সমাধানের ক্ষেত্রে উন্নয়নকে একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেই দৃষ্টিভঙ্গিটি এখন গভীর বিবেচনার দাবি রাখে। “শরণার্থীদের শুধু সীমান্ত পার করলেই প্রত্যাবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। প্রত্যাবাসনের পর সমাজ টিকিয়ে রাখতে মানুষের জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অবকাঠামো এবং নিরাপত্তার প্রয়োজন হয়। কাজেই অর্থনৈতিক পুনর্গঠন কেবল রাজনৈতিক অধিকারের বিকল্প হতে পারে না। সঠিকভাবে রূপরেখা তৈরি করা গেলে, এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে যেখানে রাজনৈতিক সমাধান টেকসই রূপ নেয়। “এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে চীনের বিশেষ সক্ষমতা রয়েছে। খুব কম দেশেরই মিয়ানমারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ, বাংলাদেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং একই সাথে বড় আকারের অবকাঠামো ও উন্নয়নমূলক বিনিয়োগ সচল করার সক্ষমতা রয়েছে। তাই এই সমন্বয় এমন সব সম্ভাবনার দরজা খুলে দেয়, যা কেবল কূটনৈতিক চাপ বা মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে থাকা অন্য কোনো পক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়।” আজিম ইব্রাহিমের মতে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের আরেকটি বড় সুবিধা হল, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে সরাসরি পৌঁছানোর সুযোগ। কারণ মিয়ানমারের সামরিক জান্তার সঙ্গে পশ্চিমা দেশগুলোর সরাসরি যোগাযোগ নিষেধাজ্ঞা ও রাজনৈতিক কারণে সীমিত। কিন্তু বেইজিং মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আবার বাংলাদেশের সঙ্গেও তারা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে বেইজিংয়ের সফল কূটনৈতিক মধ্যস্থতা তাদের বিশ্বব্যাপী বৃহত্তর কূটনৈতিক লক্ষ্যগুলোকেও জোরাল করবে বলেও মনে করেন তিনি। আজিম ইব্রাহিম বলছেন, “চীন ক্রমেই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং রাজনৈতিক সংলাপকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার পরিপূরক হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছে। রোহিঙ্গা সংকট বেইজিংকে তা বাস্তবে করে দেখানোর এমন সুযোগ দিচ্ছে, যা দ্বারা তারা পরীক্ষা করতে পারে তাদের এই মডেলটি ঠিক কতটা কার্যকর।” রোহিঙ্গা সংকট সমাধান হলে বাংলাদেশের ওপর তৈরি হওয়া প্রবল চাপ হ্রাস পাবে। সেইসঙ্গে মিয়ানমার তাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চলে স্থিরতা ফিরে পাবে বলেও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। এই কলামিস্ট বলেন, “এতে চীন আরও নিরাপদ অবকাঠামো, শক্তিশালী আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি এবং উভয় দেশের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্কের সুফল ভোগ করবে। বিস্তার ঘটবে আঞ্চলিক বাণিজ্যের। সর্বোপরি বঙ্গোপসাগর পুরো এশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে আরও সমন্বিত ও সংযুক্ত হয়ে উঠবে।”
থিম্পু যাওয়ার পথে ঢাকায় যাত্রাবিরতি করেছেন ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং টোবগে। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টা ৫৫ মিনিটে তাকে বহনকারী ড্রুক এয়ারের একটি ফ্লাইট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, বিমানবন্দরে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আব্দুল মঈন খান। এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরও উপস্থিত ছিলেন। প্রায় দুই মাসের মধ্যে ভুটানের শীর্ষ নেতৃত্বের দ্বিতীয়বারের মতো ঢাকায় যাত্রাবিরতি এটি। এর আগে গত ২৬ আগস্ট ভোরে ভুটানের রাজা জিগমে খেসার নামগেল ওয়াংচুক ঢাকায় যাত্রাবিরতি করেছিলেন। সেবার ভুটানের রাজাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিমানবন্দরে অবস্থানকালে ভিভিআইপি লাউঞ্জে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ হয়। এ সময় দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। ভুটানের রাজাকে বহনকারী বিশেষ উড়োজাহাজটি সিঙ্গাপুর থেকে ভুটান যাওয়ার পথে ঢাকায় যাত্রাবিরতি করেছিল।