রপ্তানিমুখী শিল্পে বৈচিত্র্য আনতে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ চালু করলেও প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছে না সরকার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ সুবিধা চালু করে। নতুন ব্যবস্থায় আমদানিকারকদের প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে জমা দিয়ে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। তবে আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রপ্তানিকারকদের।
ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান বলেন, কাঁচামাল আমদানির আগে অনুমতি নেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানির পর ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করতেও আবার অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে মূল্য সংযোজনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করলে ব্যবসায়ীরা বেশি উপকৃত হবেন।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরি টাওয়েলসহ আরও কয়েকটি খাতে এই সুবিধার পরিধি বাড়িয়েছে।
আসবাব প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ছোট ছোট রপ্তানি আদেশের ক্ষেত্রে প্রতিবার আলাদা অনুমতি নেওয়া বাস্তবে কঠিন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কিছু কাঁচামাল সুবিধার আওতার বাইরে থাকায় তাঁর প্রতিষ্ঠান এ ব্যবস্থার সুবিধা নিচ্ছে না।
এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, সুবিধাটি চালুর পর অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করেছে। তবে বাস্তব প্রয়োগে ব্যবসায়ীদের সমস্যার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন হলে নীতিমালা পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
রপ্তানিমুখী শিল্পে বৈচিত্র্য আনতে ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়াই শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ চালু করলেও প্রত্যাশিত সাড়া পাচ্ছে না সরকার। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জটিল অনুমোদন প্রক্রিয়া ও প্রশাসনিক শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এ সুবিধা গ্রহণে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এ সুবিধা চালু করে। নতুন ব্যবস্থায় আমদানিকারকদের প্রযোজ্য শুল্ক ও করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক গ্যারান্টি হিসেবে জমা দিয়ে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়। তবে আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমোদন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকায় প্রক্রিয়াটি সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে বলে অভিযোগ রপ্তানিকারকদের। ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান বলেন, কাঁচামাল আমদানির আগে অনুমতি নেওয়ার পাশাপাশি রপ্তানির পর ব্যাংক গ্যারান্টি অবমুক্ত করতেও আবার অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তাঁর মতে, এ ধরনের প্রশাসনিক জটিলতা দূর করে মূল্য সংযোজনভিত্তিক ব্যবস্থা চালু করলে ব্যবসায়ীরা বেশি উপকৃত হবেন। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকার মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার, স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরি টাওয়েলসহ আরও কয়েকটি খাতে এই সুবিধার পরিধি বাড়িয়েছে। আসবাব প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ছোট ছোট রপ্তানি আদেশের ক্ষেত্রে প্রতিবার আলাদা অনুমতি নেওয়া বাস্তবে কঠিন। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় কিছু কাঁচামাল সুবিধার আওতার বাইরে থাকায় তাঁর প্রতিষ্ঠান এ ব্যবস্থার সুবিধা নিচ্ছে না। এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, সুবিধাটি চালুর পর অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এটি ব্যবহার করেছে। তবে বাস্তব প্রয়োগে ব্যবসায়ীদের সমস্যার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন হলে নীতিমালা পুনর্বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে আস্থাহীনতা, কারসাজি, দুর্বল সুশাসন এবং ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানির সংকটে ভুগছে দেশের পুঁজিবাজার। এ অবস্থায় লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরাসরি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সরকারি উদ্যোগকে বাজার-সংশ্লিষ্টরা সম্ভাবনাময় একটি নীতিগত পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, পরিকল্পনাটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হবে, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়বে, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হবে। সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পুঁজিবাজার উন্নয়নে ১৭ দফা অগ্রাধিকার কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। এর অন্যতম প্রধান উদ্যোগ হলো— লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং বহুজাতিক কোম্পানিকে সরাসরি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা। একইসঙ্গে বাজারে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, কারসাজির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, কর-সুবিধা এবং বাজার সংস্কারের মতো পদক্ষেপও নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কেন গুরুত্বপূর্ণ সরকারি কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো উচ্চমানের ও বড় মূলধনের কোম্পানির স্বল্পতা। বর্তমানে তালিকাভুক্ত বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের বাজার মূলধন তুলনামূলক ছোট এবং অনেক কোম্পানির আর্থিক ভিত্তিও দুর্বল। ফলে দেশীয় ও বিদেশি বড় বিনিয়োগকারীরা পর্যাপ্ত বিনিয়োগের সুযোগ পান না। অপরদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত অনেক প্রতিষ্ঠান— বিশেষ করে জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, টেলিযোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতের কয়েকটি কোম্পানি নিয়মিত মুনাফা করে, শক্তিশালী সম্পদভিত্তি রয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল আয় করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ পুঁজিবাজারে এলে বাজারের মানগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ভালো কোম্পানি শুধু নতুন শেয়ারই যোগ করে না; বরং পুরো বাজারের মান ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দেয়। এ প্রসঙ্গে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবু আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও অনেক আগেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করা উচিত ছিল। তবে বিলম্ব হলেও সরকারের এই উদ্যোগ দেশের পুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’’ তিনি বলেন, ‘‘অতীতেও এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময় লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার পরিকল্পনা করা হলেও বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ নেয়। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও লাভজনক সরকারি কোম্পানিগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার বিষয়ে আগ্রহী।’’ আবু আহমেদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠানগুলো শেয়ারবাজারে এলে বাজারের গভীরতা ও স্থিতিশীলতা বাড়বে, নতুন ও মানসম্মত শেয়ার যুক্ত হবে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও সুশাসন নিশ্চিত হবে। তালিকাভুক্তির ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলকভাবে পরিচালিত হওয়ার সুযোগ পাবে— যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও ইতিবাচক প্রভাব বয়ে আনবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর সুযোগ গত এক যুগে একাধিক শেয়ার কেলেঙ্কারি, মূল্য কারসাজি, দুর্বল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং নীতিগত অসামঞ্জস্যের কারণে লাখো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। লাভজনক সরকারি কোম্পানি বাজারে এলে বিনিয়োগকারীদের সামনে তুলনামূলক কম ঝুঁকির নতুন বিকল্প তৈরি হবে। নিয়মিত লভ্যাংশ প্রদানকারী এবং আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়লে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের সংস্কৃতি গড়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, ভালো কোম্পানির সরবরাহ বাড়ানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাজারের গভীরতা বাড়বে বর্তমানে দেশের পুঁজিবাজারে কয়েকটি খাতের আধিপত্য থাকলেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতের প্রতিনিধিত্ব নেই। যদি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার, পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি, নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস কিংবা কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশনের মতো বড় সরকারি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হয়, তাহলে বাজারে নতুন খাত যুক্ত হবে। এর ফলে বাজার মূলধন বৃদ্ধি পাবে। প্রতিদিনের লেনদেন বাড়তে পারে। বড় দেশীয় ও বিদেশি তহবিল বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। সূচকের ওপর কয়েকটি কোম্পানির নির্ভরতা কমবে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের পরিবেশ শক্তিশালী হবে। সরকারেরও লাভ হবে সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার আংশিক বিক্রি মানেই রাষ্ট্রীয় মালিকানা হারানো নয়। বরং সরকার নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেই সাধারণ জনগণকে অংশীদার হওয়ার সুযোগ দিতে পারে। এতে সরকারের কয়েকটি সুবিধা হবে— রাষ্ট্রীয় সম্পদের মূল্যায়ন বাজারভিত্তিক হবে, বাজেটে অতিরিক্ত অর্থের সংস্থান হবে, উন্নয়ন প্রকল্পে অর্থায়নের নতুন উৎস তৈরি হবে এবং তালিকাভুক্তির কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা বাড়বে। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং শেয়ারহোল্ডারদের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ায় করপোরেট সুশাসনও শক্তিশালী হবে। বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা সাধারণত বড়, লাভজনক এবং স্বচ্ছ কোম্পানিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন। বাংলাদেশের বাজারে যদি রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস কিংবা অবকাঠামো খাতের বড় প্রতিষ্ঠান যুক্ত হয়, তাহলে বিদেশি পোর্টফোলিও বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। একইসঙ্গে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর জন্যও এটি ইতিবাচক বার্তা হতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অফলোডের মাধ্যমে সরাসরি তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে। এতে বাজারে আন্তর্জাতিক মানের কোম্পানির সংখ্যা বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে। শুধু তালিকাভুক্ত করলেই হবে না বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি কোম্পানি বাজারে আনাই শেষ কথা নয়। এর সঙ্গে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি। প্রথমত, কোম্পানিগুলোর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত করপোরেট পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, ছোট শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর আইন প্রয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, বাজার কারসাজি, অভ্যন্তরীণ তথ্যের অপব্যবহার এবং কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি কঠোরভাবে দমন করতে হবে। অন্যথায়, ভালো কোম্পানিও বাজারে এসে প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারবে না। বর্তমান বাস্তবতা বর্তমানে দেশের শেয়ারবাজারে সরকারি মালিকানাধীন প্রায় ২২টি কোম্পানি তালিকাভুক্ত রয়েছে। তবে এর মধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠানের লেনদেন সীমিত, কিছু প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থাও দুর্বল। অন্যদিকে তিতাস গ্যাস, পদ্মা অয়েল, যমুনা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবল, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরেই বিনিয়োগকারীদের কাছে মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে পরিচিত। সরকার এখন আরও কয়েকটি লাভজনক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে বাজারে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি বাজার সংস্কার, কর-সুবিধা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, ব্লকচেইন প্রযুক্তি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল এবং পুঁজিবাজার সংস্কার কমিশন গঠনের মতো উদ্যোগও বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে টেকসই ও আধুনিক করতে শুধু কারসাজি দমন করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ভালো মানের কোম্পানির সংখ্যা বৃদ্ধি। লাভজনক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শেয়ারবাজারে আনার উদ্যোগ সেই লক্ষ্য পূরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এই উদ্যোগের প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। যদি স্বচ্ছতা, সুশাসন, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করপোরেট পরিচালনা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সরকারি লাভজনক কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা কাটিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। অন্যথায় এটি কেবল আরেকটি ঘোষণাতেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
২০১২ সালে ইলেকট্রনিক্স ও গৃহস্থালি পণ্য (অ্যাপ্লায়েন্স) প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান সিঙ্গার বাংলাদেশের বার্ষিক রাজস্ব ছিল ৬৭০ কোটি টাকা, যেখান থেকে নিট মুনাফা এসেছিল ৪৯ কোটি টাকা। এর দীর্ঘ ১৩ বছর পর, কোম্পানিটির রাজস্ব বেড়ে ২,১৩৩ কোটি টাকায় উন্নীত হলেও সিঙ্গারকে পড়তে হয়েছে ২২৫ কোটি টাকার এক বিপুল নিট লোকসানের মুখে। পতনের এই ধারা চলতি বছরেও অব্যাহত রয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে: বাজারের একসময়ের এই শীর্ষ জায়ান্ট কোম্পানিটি কীভাবে লোকসানের এত গভীরে তলিয়ে গেল এবং নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ২০২৫ সালের আয় থেকে শেয়ারহোল্ডারদের কোনো লভ্যাংশ (ডিভিডেন্ড) দিতে ব্যর্থ হলো? পুঞ্জভূত লোকসান কোম্পানির মূলধনের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সম্প্রতি কোম্পানিটির শেয়ারকে কমিয়ে অবনমন করে জাঙ্ক বা 'জেড' ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দিয়েছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) কোম্পানিটির বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, সিঙ্গার বাংলাদেশ মূলত ক্রমবর্ধমান ঋণের খরচ বা সুদ পরিশোধের চাপে পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এই ঋণের বিপুল ব্যয় বর্ধিত বিক্রি থেকে আসা তাদের পুরো পরিচালন মুনাফাকেই সম্পূর্ণরূপে গ্রাস করেছে। তুরস্কের বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী 'আর্সেলিক'-এর সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানাধীন এবং দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ডিএসইতে তালিকাভুক্ত এই কোম্পানিটি, ২০২৫ সালের জন্য কর-পরবর্তী ২২৫ কোটি টাকার নিট লোকসান দেখিয়েছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে লোকসানের পরিমাণ ৫০ কোটি টাকার কম ছিল, অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে তা অনেকটাই বেড়ে গেছে। এর ফলে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি আয় (ইপিএস) আরও নেতিবাচক অবস্থানে নেমে গেছে। ২০২৪ সালে যেখানে ইপিএস ছিল ঋণাত্মক ৪.৯১ টাকা, ২০২৫ সালে তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ২২.৫৬ টাকায়। তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এই বিশাল লোকসান এমন সময়ে হয়েছে যখন তাদের নতুন কারখানায় বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হওয়ার হাত ধরে, পুরো বছরের রাজস্ব ১৪.৩ শতাংশ বেড়ে ২,১৩৩ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। পাশাপাশি কোম্পানিটির মোট মুনাফাও (গ্রস প্রফিট) আগের বছরের ৪৭১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৫১৬ কোটি টাকা হয়েছে। বার্ষিক প্রতিবেদন অনুসারে, কোম্পানির চূড়ান্ত লাভ-ক্ষতির খতিয়ানকে মূলত ধসিয়ে দিয়েছে অর্থায়নের তীব্র বোঝা বা ঋণের সুদের চাপ। ২০২৫ সালে কোম্পানির অর্থায়ন ব্যয় (ফাইন্যান্স কস্ট) আগের বছরের ১৪৩ কোটি টাকা থেকে লাফিয়ে এক লাফে ৩২২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে; যা কোম্পানিটির অর্জিত মাত্র ৫৫ কোটি টাকার পরিচালন মুনাফার চেয়ে বহুগুণ বেশি। কোম্পানির প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, মূলধনী বিনিয়োগ ও কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিঙ্গার মূলত স্বল্পমেয়াদি ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল, যা তাদের তারল্য সংকটের মূল কারণ। ব্যাংক ওভারড্রাফটসহ কোম্পানিটির নেওয়া স্বল্পমেয়াদি ঋণের পরিমাণ– আগের বছরের ১,১৯১ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১,৩৯৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। সিঙ্গার মূলত দেশের কয়েকটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের একটি কনসোর্টিয়াম বা জোটের কাছ থেকে এই ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি ঋণের বড় অংশই নেওয়া হয়েছে কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন থেকে ৩০৫ কোটি টাকা; পূবালী ব্যাংক থেকে ২৪৯ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৯৯ কোটি টাকা ওভারড্রাফট; ডাচ-বাংলা ব্যাংক থেকে ১৭৭ কোটি টাকা ও প্রাইম ব্যাংক থেকে ১০০ কোটি টাকা। বছরজুড়ে এই বিপুল পরিমাণ ঋণ এবং লিজের সুদ বাবদ সরাসরি নগদ অর্থ চলে গেছে ২৬৪ কোটি টাকা। ফলস্বরূপ, বছরের শেষে এসে ব্যাংক ওভারড্রাফটের সমন্বয় শেষে—সিঙ্গারের হাতে থাকা নগদ ও নগদ সমতুল্য অর্থের (ক্যাশ অ্যান্ড ক্যাশ ইকুইভ্যালেন্ট) পরিমাণ ঋণাত্মক ১,৩২৮ কোটি টাকার গভীর গর্তে গিয়ে ঠেকেছে। তবে কিছুটা স্বস্তির বিষয় ছিল শেয়ার প্রতি নিট পরিচালন নগদ প্রবাহ। শক্তিশালী টার্নওভার বা বিক্রির টাকা আদায়ের ওপর ভর করে আগের বছরের ঋণাত্মক ৭.৯৬ টাকা থেকে এটি ঘুরে দাঁড়িয়ে শেয়ার প্রতি পজিটিভ বা ধনাত্মক ১৪.৫৬ টাকায় উন্নীত হয়েছে। তবে দেশের উচ্চ সুদ হারের ধাক্কা সামলাতে কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদ – তাদের স্বল্পমেয়াদি ঋণের পোর্টফোলিও পুনর্গঠনের কোনো তাৎক্ষণিক পরিকল্পনা, ২০২৫ সালের এই বার্ষিক প্রতিবেদনে তুলে ধরেনি। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে রাজস্ব বাড়লেও – সামগ্রিক মুনাফা চরম চাপের মধ্যে ছিল। বাজারে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বর্ধিত উৎপাদন খরচের কারণে মোট মুনাফার প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল, যার পরিমাণ প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা। এর ফলে কোম্পানির মোট মুনাফার মার্জিন (গ্রস মার্জিন) ২৭ শতাংশ থেকে সংকুচিত হয়ে ২৪ শতাংশে নেমে এসেছে। এটি মূলত তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ বাজারে ভোক্তাদের ওপর বর্ধিত খরচের পুরো বোঝা চাপিয়ে দিতে সিঙ্গারের অক্ষমতাকেই তুলে ধরছে। "তা সত্ত্বেও, এই গ্রস মার্জিন সামগ্রিক খাতের মধ্যে বেশ প্রতিযোগিতাপূর্ণ, যা আমাদের অন্তর্নিহিত মূল্য নির্ধারণের স্থিতিস্থাপকতাকে প্রমাণ করে," বলা হয়েছে বার্ষিক প্রতিবেদনে। লভ্যাংশ প্রদানের বিষয়ে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, বছরজুড়ে নিট লোকসান এবং মূলধনী ব্যয়ের কারণে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত ঋণের বোঝার কারণে, পরিচালনা পর্ষদ ২০২৫ সালের জন্য কোনো লভ্যাংশ প্রস্তাব না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিষয়ে সিঙ্গার বাংলাদেশ জানিয়েছে, নিকটমেয়াদি প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তারা দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ওপর মনোযোগ ধরে রাখছে। তাদের নতুন কারখানা চালু উৎপাদন খরচ কমাবে বলে আশা করা হচ্ছে, পণ্যের গুণগত মান উন্নত হবে এবং স্থানীয়করণের পরিমাণ বাড়বে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও ক্রমবর্ধমান ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন ভোক্তাদের আরও ভালোভাবে সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এই সংকটের বিষয়ে বক্তব্য জানতে টিবিএস-এর পক্ষ থেকে সিঙ্গার বাংলাদেশের কোম্পানি সচিব কাজী আশিকুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে, তিনি টেক্সট মেসেজের জবাব দেননি এবং বারবার টেলিফোন করা হলেও ফোন ধরেননি। সংশ্লিষ্ট শিল্পের অভ্যন্তরীণরা বলছেন, দেশীয় ইলেকট্রনিক্স প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর, বিশেষ করে ওয়ালটন এবং প্রাণ-আরএফএল-এর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে সিঙ্গারের ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ছে। ওয়ালটনের একজন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্যমতে, দেশের রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজের বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশই এখন ওয়ালটনের দখলে, যে খাতে একসময় সিঙ্গারের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। একই সময়ে, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপও দেশজুড়ে তাদের খুচরা বিক্রয় কেন্দ্রের (রিটেইল আউটলেট) আগ্রাসী সম্প্রসারণের মাধ্যমে হোম অ্যাপ্লায়েন্স বাজারে নিজেদের অবস্থান ক্রমাগত শক্তিশালী করে চলেছে। চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদন যা বলছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে দাখিল করা ত্রৈমাসিক আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সিঙ্গার বাংলাদেশের মোট টার্নওভার বা বিক্রি সামান্য বেড়ে ৫৭৮ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৫৫৯ কোটি টাকা। এই প্রবৃদ্ধির পুরোটাই মূলত এসেছে রপ্তানি আয় থেকে। প্রথম প্রান্তিকে যেখানে অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে আয় আগের বছরের ৫৫৮ কোটি টাকা থেকে সামান্য কমে ৫৫৫ কোটি টাকায় নেমেছে; সেখানে রপ্তানি থেকে কোম্পানির আয় হয়েছে ২১.৭ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিকে কার্যত শূন্য ছিল। বিক্রি বাড়লেও কোম্পানির পরিচালন মুনাফা ১৭.৩ কোটি টাকা থেকে কমে ১৫.৮ কোটি টাকায় নেমে এসেছে, কারণ এই সময়ে সিঙ্গারের পরিচালন ব্যয় ১১৯ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১২৭ কোটি টাকা হয়েছে। তবে কোম্পানির মুনাফাকে সবচেয়ে বেশি গ্রাস করেছে অর্থায়ন ব্যয় বা ঋণের সুদ খরচ। নিট অর্থায়ন ব্যয় বার্ষিক ভিত্তিতে প্রায় ৬০ শতাংশ উল্লম্ফন করে ৪৭ কোটি টাকা থেকে ৬৭ কোটি টাকায় পৌঁছেছে এবং কোম্পানির বিশাল ঋণ প্রয়োজনীয়তার কারণে মোট অর্থায়ন খরচ ৭২ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। ফলস্বরূপ, জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে সিঙ্গারের নিট লোকসানের পরিমাণ আরও বেড়ে প্রায় ৫৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫ কোটি টাকা। এর সাথে পাল্লা দিয়ে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি লোকসানও আগের বছরের ৩.৫০ টাকা থেকে বেড়ে ৫.৬০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। এই দুর্বল আর্থিক ফলাফল বিনিয়োগকারীদের আত্মবিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। গতকাল সিঙ্গার যখন তাদের প্রথম প্রান্তিকের এই ফলাফল প্রকাশ করে, এরপর ডিএসইতে সিঙ্গারের শেয়ার কেনার জন্য কার্যত কোনো ক্রেতা খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা সিঙ্গারের ধসে পড়া আর্থিক পারফরম্যান্স নিয়ে পুঁজিবাজারে নেতিবাচক মনোভাব বা আস্থার সংকটকে তুলে ধরে।