সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের (একীভূত পাঁচ ব্যাংক) গ্রাহকদের জন্য বড় সুখবর দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীরা প্রয়োজন অনুযায়ী নিজ নিজ হিসাব থেকে টাকা তুলতে পারবেন। একই সঙ্গে আমানতের মুনাফায় কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ বা কর্তন করা হবে না— বিষয়টি গ্রাহকদের স্পষ্টভাবে অবহিত করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান কাজী শায়রুল হাসান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবেদুর রহমান সিকদার সাক্ষাৎ করতে গেলে এ নির্দেশনা দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান।
যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে, সেগুলো হলো—ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক।
গভর্নর বলেন, জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমানতকারীদের মুনাফার ওপর কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে এ বিষয়ে আমানতকারীদের মধ্যে এখনো কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েছে। তাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সব আমানতকারীকে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে যে তাদের মুনাফার ওপর কোনো ধরনের হেয়ারকাট থাকবে না।
তিনি আরও জানান, গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে ঘোষিত নীতিমালা অনুযায়ী ইতোমধ্যে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তিগত আমানতকারীরা যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের ‘আল-ওয়াদিয়াহ’ চলতি হিসাব, ‘মুদারাবা’ সঞ্চয়ী হিসাব এবং ‘মুদারাবা’ মেয়াদি আমানতের মূল অর্থ উত্তোলন করতে পারেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গভর্নর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক ব্যাংকিং কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণেরও নির্দেশ দেন।
এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান, ড. মো. কবির আহমেদ, মো. সরোয়ার হোসেন ও মো. আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ভারত-বাংলাদেশ ‘ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের’ ৭২তম চালানের অংশ হিসেবে দিনাজপুরের পার্বতীপুর রিসিভিং টার্মিনাল ডিপোতে আনুমানিক চার হাজার মেট্রিক টন (প্রায় ৪৭ লাখ ৫ হাজার ৮৮০ লিটার) ডিজেল এসে পৌঁছেছে। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় এই ডিজেল স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ৮টায় পার্বতীপুর ডিপোতে সম্পূর্ণ সরবরাহ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল স্বাক্ষরিত এক দ্বিপক্ষীয় চুক্তির অধীনে ভারত ও বাংলাদেশ যৌথভাবে ১৫ বছর মেয়াদে মোট প্রায় ২০ লাখ (২ মিলিয়ন) মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির প্রতিশ্রুতি দেয়। ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ পাইপলাইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধনের পর থেকে এ পর্যন্ত এই চ্যানেলের মাধ্যমে সর্বমোট ৩ লাখ ৩০ হাজার ৮৭ মেট্রিক টন ডিজেল বাংলাদেশ আমদানি করেছে। আমদানিকৃত এই ডিজেল বাংলাদেশের তিন রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল, মেঘনা পেট্রোলিয়াম এবং যমুনা অয়েল কোম্পানির মধ্যে প্রায় সমান ভাগে বণ্টন করা হয়। ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের বাংলাদেশ অংশটির দৈর্ঘ্য ১২৬.৫৭ কিলোমিটার। এটি পঞ্চগড় জেলার তেঁতুলিয়া, পঞ্চগড় সদর ও বোদা উপজেলা, নীলফামারী সদর উপজেলা এবং দিনাজপুরের চিরিরবন্দর উপজেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে পার্বতীপুরের রিসিভিং টার্মিনালে পৌঁছেছে। পাইপলাইনটি ভূগর্ভের প্রায় ৫ থেকে ৮ ফুট গভীরে স্থাপন করা হয়েছে। এ প্রকল্পটি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার একটি চলমান দ্বিপক্ষীয় জ্বালানি সহযোগিতা উদ্যোগ, যা জ্বালানি খাতে উভয় দেশের আন্তঃসীমান্ত অবকাঠামোগত যৌথ সহযোগিতার ধারাবাহিকতাকে প্রতিফলিত করে।
দেশের তরুণ সমাজকে স্বাবলম্বী উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করতে একটি নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি চালু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। রবিবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট থেকে ‘উদ্যোগ: উপজেলাভিত্তিক তরুণ উদ্যোক্তা অনুসন্ধান, চিহ্নিতকরণ ও অর্থায়ন কর্মসূচি’ শীর্ষক এই নতুন নীতিমালা জারি করা হয়। দেশের সকল তফসিলি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে পাঠানো এই নীতিমালার আওতায় নির্বাচিত তরুণ উদ্যোক্তারা সম্পূর্ণ বিনা জামানতে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন সুবিধা লাভ করবেন। নীতিমালা অনুযায়ী, এই তহবিলের সুফল পেতে হলে আবেদনকারীর বয়স আবেদনের শেষ তারিখে সর্বোচ্চ ২৮ বছর হতে হবে এবং তাকে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা ও বাংলাদেশি নাগরিক হতে হবে। তবে ঋণখেলাপি ব্যক্তি, পূর্বে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসায়িক ঋণ গ্রহণকারী এবং সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এই কর্মসূচির আওতাভুক্ত হবেন না। কারিগরি স্টার্টআপ, কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও হস্তশিল্পসহ যেকোনো বৈধ নতুন বা বিদ্যমান ব্যবসায়িক উদ্যোগ এই অর্থায়নের জন্য বিবেচিত হবে। ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স: অর্ধেক ঋণ ও অর্ধেক অনুদান: ব্যবসায়ের প্রকৃত প্রয়োজন ও সম্ভাব্য ব্যয় মূল্যায়ন করে একজন উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘ব্লেন্ডেড ফাইন্যান্স’ প্রদান করা হবে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং বাকি ১০ লাখ টাকা ম্যাচিং গ্র্যান্ট বা অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। উদাহরণস্বরূপ—কোনো উদ্যোক্তার ব্যবসায় ১২ লাখ টাকার প্রয়োজন হলে তিনি ৬ লাখ টাকা ঋণ এবং ৬ লাখ টাকা অনুদান পাবেন, যা একই সময়ে তার ব্যাংক হিসাবে জমা হবে। তবে শর্ত রয়েছে যে, ঋণের অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে কিংবা অর্থের কোনো অপব্যবহার করা হলে অনুদানের অংশটিও সুদমুক্ত ঋণে রূপান্তরিত হবে এবং পরবর্তী সময়ে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তা আদায় করা হবে। উদ্যোক্তা বাছাই প্রক্রিয়া ও অতিরিক্ত সহায়তা: স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য উদ্যোক্তা বাছাইয়ের জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে লিড ব্যাংক নির্ধারণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখা থেকে আবেদন ফরম সংগ্রহ ও জমা দেওয়া যাবে। পরবর্তীতে উপজেলা ও জেলা লিড ব্যাংকের মাধ্যমে আবেদনগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে পাঠানো হবে। ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার সম্ভাবনা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, শিল্প খাত ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বিশেষ প্যানেল কাজ করবে। চূড়ান্ত বাছাইয়ের পর মনোনীত উদ্যোক্তাদের ১৭ কার্যদিবসের মধ্যে ঋণ অনুমোদনের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া, শুধু অর্থায়ন প্রদানই নয়, বরং অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো উদ্যোক্তাদের আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং, বাজার সংযোগ এবং ট্রেড লাইসেন্স বা ব্যবসা নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করবে।
বাংলাদেশকে ঋণনির্ভর ও দুর্নীতিগ্রস্ত অবস্থা থেকে বের করে উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে নিয়ে যেতে চায় সরকার। এই লক্ষ্য সামনে রেখে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘এই লক্ষ্য অর্জনে সরকার পঞ্চবার্ষিকী অর্থনৈতিক কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। অতীতের পরিকল্পনাগুলোর মতো এটি যেন শুধু অনুমোদনের পর মৃত দলিলে পরিণত না হয়, সে লক্ষ্যেই নতুনভাবে পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।’ অতীতে ঋণ বাড়ানো হলেও অনেক ক্ষেত্রে তার যথাযথ মূল্য পাওয়া যায়নি উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, একই সঙ্গে বড় প্রকল্পের নামে বড় ধরনের দুর্নীতি হয়েছে। সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার নতুন অর্থনৈতিক মডেলের কথা বলছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের নতুন মডেল হচ্ছে বিনিয়োগ। সেটি হচ্ছে উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ। আমরা বাংলাদেশকে ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে পরিণত করতে চাই এবং ম্যানুফ্যাকচারিং গেটওয়েতে পরিণত করতে চাই।’ অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্নের কারণে শিল্পনীতির দিকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। উৎপাদন বাড়লে কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সেই কর্মসংস্থানের বড় অংশ আনুষ্ঠানিক খাতে হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তিনি বলেন, সরকারের পরিকল্পনাগুলো তথ্যনির্ভরভাবে তৈরি করা হচ্ছে। ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, অতীতের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা হয়নি। অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও একটি দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো প্রতিষ্ঠান। তার প্রশ্ন, ‘প্রতিষ্ঠানটা কার জন্য? কে আইন তৈরি করছে? কে আইনের বা প্রতিষ্ঠানের ফলে লাভবান হচ্ছে বা সুবিধাবাদী হচ্ছে এবং কে আসলে পরিবর্তন করতে পারে?’ তিনি বলেন, জ্বালানি খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বজনতোষী ও পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর সংস্কৃতি চালু ছিল। এর ফলে একদিকে বেকারত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে বৈষম্য। বর্তমান সরকারের লক্ষ্য অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ে তোলা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দর্শন হচ্ছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ এবং সবার বাংলাদেশ। ড. তিতুমীর বলেন, অতীতে একটি অলিগার্কিক ও পৃষ্ঠপোষকতানির্ভর শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে শুরু করে উপজেলা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগবাটোয়ারার একটি ব্যবস্থা চালু ছিল। এই ব্যবস্থার প্রভাব এখনো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে রয়ে গেছে। বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক, মানবিক ও কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকারের একটি সুস্পষ্ট ভিশন রয়েছে। সেই ভিশনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৌশল ও লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রসঙ্গে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, অতীতে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদে অনুমোদনের পর অনেক পরিকল্পনাই কার্যত মৃত দলিলে পরিণত হতো। এবার সেই অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন অর্থনৈতিক কৌশল তৈরি করা হয়েছে। ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য সামনে রেখে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থাও নেই। ড. তিতুমীর বলেন, বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী আগের শাসনামলের শেষ দিকে প্রায় এক কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে। অথচ কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ন্যাশনাল সোশ্যাল সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি তৈরি করা হলেও এর শেষ বছরে এত মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে সরকারের পঞ্চবার্ষিক অর্থনৈতিক কৌশলে তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এগুলো হলো, পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং দ্রুত পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে যাত্রা। তিনি বলেন, ‘প্রথম বিষয় হচ্ছে পুনরুদ্ধার, অর্থাৎ রিকভারি। দ্বিতীয় হচ্ছে রেস্টোরেশন, অর্থাৎ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। আর তৃতীয় হচ্ছে রিকনস্ট্রাকশন ফর এক্সিলারেশন, অর্থাৎ দ্রুততার সঙ্গে পুনর্গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধির পথে যাত্রা।’ সরকারের লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা বলেও জানান প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, উৎপাদন ঠিক হলে কর্মসংস্থান হবে এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়লে অর্থনীতির কাঠামোও শক্তিশালী হবে।