পুরোনো অবস্থানেই অনড় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। দলের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা কিংবা পুরোনো রাজনৈতিক অবস্থান বদলের লক্ষণ নেই। ‘রিফাইন্ড’ বা ‘পরিশুদ্ধ’ আওয়ামী লীগের ধারণা ঘিরে দলটির ভেতরে আলোচনা আছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে টিকে থাকা ও আবার সক্রিয় হওয়ার সম্ভাব্য সবচেয়ে ভালো বিকল্প পথ হিসেবে এই ধারণাকে সামনে আনছেন কেউ কেউ। তবে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব, বিশেষ করে শেখ হাসিনা, এ ধারণার প্রতি একেবারেই অনাগ্রহী।
এই পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকের কাছেই দলটির রাজনীতিতে ফেরার পথ কী, তা স্পষ্ট নয়। অনেকের মধ্যে হতাশাও কাজ করছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বর্তমান সরকার যদি বড় ধরনের ভুল করে বা অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ বা সুযোগ তৈরি হবে।
আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘রিফাইন্ড’ বা সংস্কারের মাধ্যমে অপেক্ষাকৃত কম বিতর্কিতদের নেতৃত্বে আনার বিষয়টি বন্ধুপ্রতিম দেশ ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছানো হয়েছিল। নির্বাচনের পরও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে নিজের সভাপতি পদ ছাড়তে নারাজ শেখ হাসিনা। বড়জোর সাধারণ সম্পাদকের বিকল্প হিসেবে মুখপাত্র হিসেবে এক বা একাধিক নেতাকে দায়িত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। সেটাও তাঁর পছন্দের এবং বিদেশে থাকা নেতাদের মধ্য থেকেই করার পক্ষে তিনি, যা শুভাকাঙ্ক্ষীদের কোনোভাবেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি। ফলে সংস্কারের সব ধারণা আপাতত ‘মৃত’ বলেই মত সবার।
আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের অনেকের কাছেই দলটির রাজনীতিতে ফেরার পথ কী, তা স্পষ্ট নয়। অনেকের মধ্যে হতাশাও কাজ করছে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, বর্তমান সরকার যদি বড় ধরনের ভুল করে বা অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে, তখন আওয়ামী লীগের ফিরে আসার পথ বা সুযোগ তৈরি হবে।
আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক তৎপরতা ও অনলাইন আলোচনা থেকে দলটির বর্তমান অবস্থান সম্পর্কে একটা ধারণা পাওয়া যায়। ওয়াকিবহাল সূত্র বলছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকারের পতনের পর এখন দলে সবচেয়ে বিতর্কিত ও কট্টরপন্থীরা বেশি সক্রিয়। যাঁরা নিজেদের ভুল স্বীকার কিংবা অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য অনুশোচনা দেখাতে মোটেও প্রস্তুত নন। বরং দেশের ভেতর ঝটিকা মিছিল ও বিচ্ছিন্ন স্লোগান দিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি এবং সংগঠিত হওয়ার পক্ষে। এ ছাড়া প্রশাসনের ভেতর সরকারবিরোধী মত প্রবল করাও তাঁদের লক্ষ্য। এই পরিস্থিতিতে রিফাইন্ড বা নতুন করে শুরু করার বিষয়ে যাঁরা আশা দেখছিলেন, তাঁরা অনেকটাই চুপসে গেছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বলছে, শেখ হাসিনা নিজেই দলের নীতি নির্ধারণ করছেন। পরিবারের সদস্যরা এতে যুক্ত থাকেন। আর দেশের ভেতর ও আত্মগোপনে থাকা নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে বেশি সক্রিয় সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম। আর সরকারের ভেতরের বিভিন্ন সংস্থায় থাকা দলঘনিষ্ঠদের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী। তিনি কলকাতায় অবস্থান করছেন। এর বাইরে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ, চিঠিপত্র আদান-প্রদানসহ কিছুটা ‘সফট’ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়াসহ কিছু নেতা। বাকিরা অনলাইনে দলীয় প্রধান কিংবা অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।
আওয়ামী লীগ যদি গায়ের জোরে ফিরে আসার চিন্তা করে, সে ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি যৌথভাবে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করবে। এ ধরনের চিন্তা আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতিকর, দেশের জন্য ভয়াবহ হবে, সংঘাতপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসবে।
আলতাফ পারভেজ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি অংশ মনে করেন, দলে সংস্কার আনার বিষয়ে অনাগ্রহ বন্ধুপ্রতিম দেশ ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা কিছুটা অখুশি। বর্তমানে যে বিশ্বব্যবস্থা তাতে কোনো বিদেশি শক্তি আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বে—এমনটা মনে করছেন না তাঁরা। অন্তর্বর্তী সরকারের মতো ক্ষমতাসীন বিএনপি হয়তো আওয়ামী লীগের ওপর এতটা কঠোর হবে না। কিন্তু তারা কখনোই শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন পুরোনো আওয়ামী লীগকে ফিরতে দেবে না। সুতরাং আরেকটি গণ-অভ্যুত্থানের জন্য অপেক্ষা করতে হবে; যা একেবারেই অবাস্তব। আরেকটি পথ হচ্ছে ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপির মধ্যে চরম বিভেদের জন্য অপেক্ষা করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত এই ধারণারও খুব একটা ভিত্তি নেই। ফলে আওয়ামী লীগের এখনকার রাজনীতি অনেকটাই লক্ষ্যহীন।
এ অবস্থায় স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরে নির্বাচনের সময় এলাকায় টিকে থাকার জন্য আওয়ামী লীগের অনেকেই অন্য দলে চলে যেতে পারেন বলে আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করেন।
নানা মাধ্যমে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর শেখ হাসিনা দলের নেতা-কর্মীদের প্রায়ই বলতেন, যাঁরা রাজনীতি করতে চান, তাঁরা দেশে ফিরে যান। অর্থাৎ দেশে গিয়ে কারাবরণ, মামলা মোকাবিলা করুন। এখন পর্যন্ত কেউ এই নির্দেশনায় সাড়া দেননি। আবার, দেশে এসে কারাগারে গেলে জামিন মিলবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। সরকার আওয়ামী লীগকে ছাড় দেবে এমন কোনো সমঝোতা কিংবা উদ্যোগও নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্র একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশে ব্যবসা আছে এমন সাবেক সংসদ সদস্য, বিদেশে পরিবার থাকে এমন নেতা কিংবা বয়সে জ্যেষ্ঠ অনেকে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হওয়ার কথাও বলছেন ঘনিষ্ঠদের। দেশে ফিরলে জামিন মিলবে-এমন আশ্বাস পেলে ফেরার কথা ভাবছেন ব্যবসায় যুক্ত সাবেক সংসদ সদস্য বা নেতারা।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে জায়গা দিতে সরকারের ওপর আন্তর্জাতিক কোনো মহল থেকে কোনো চাপ আছে বলেও মনে করেন না দলটির নেতারা। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে থাকা নেতারা দেশে ফেরার চিন্তা করছেন না। বরং কেউ কেউ দেশে ফেরার তাগিদ এড়াতে দীর্ঘদিন ভারতে থাকার পর অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। এর মধ্যে দুজন প্রভাবশালী সাবেক সংসদ সদস্যের একজন মালয়েশিয়ায়, অন্যজন সাইপ্রাসে চলে গেছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের ধারণা, ভারতের সঙ্গে বিএনপি সরকারের সম্পর্ক ভালো হলে সে দেশটি তাঁদের জন্য নিরাপদ না–ও হতে পারে।
টানা সাড়ে ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। ২০২৪ সালের ছাত্র–গণঅভ্যুত্থানে তাদের পতন হয়েছে। দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাসহ অধিকাংশ নেতা-কর্মী বিদেশে আত্মগোপনে। দেশে থাকা নেতা–কর্মীদের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ কারাগারে। দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার সে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়নি। ফলে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি, হারিয়েছে সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক অবস্থান ও মাঠের নিয়ন্ত্রণ।
বিকল্প পথ ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’
এমন সংকটময় বাস্তবতায় ‘রিফাইন্ড’ বা পরিশুদ্ধ আওয়ামী লীগের ধারণা সামনে আসে। এটি হচ্ছে মূলত দলটি পুনর্গঠনের একটি প্রস্তাব, যেখানে বিতর্কিত বা অভিযুক্ত নেতৃত্বের বাইরে অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য, কম বিতর্কিত ও ‘পরিষ্কার ভাবমূর্তির’ নেতাদের দিয়ে দলকে নতুনভাবে দাঁড় করানো।
‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগের আলোচনা হলেও দলের কট্টরপন্থী নেতারা মনে করেন, শেখ হাসিনার বিকল্প আওয়ামী লীগে নেই। আর যদি বিকল্প আনতে হয়, তবে তাঁর পরিবার থেকেই হতে হবে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রস্তুত কেউ নেই; তা ছাড়া বর্তমান সময়টাও এই ধরনের উদ্যোগের জন্য অনুকূল নয়।
এই ধারণার পেছনে যুক্তি হচ্ছে—বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, বিতর্ক এবং রাজনৈতিক দায় তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে সরাসরি রাজনীতিতে ফিরে আসা কঠিন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মহল এবং দেশের একটি বড় অংশের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেতে হলে পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান বার্তা প্রয়োজন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি শেখ হাসিনার বয়স ৮০ পেরিয়েছে। তিনি চার দশকের বেশি ধরে দলের নেতৃত্বে। তাঁর রাজনীতিতে ফিরে আসা কঠিন মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। ফলে ভবিষ্যতের জন্য দলটিকে সংগঠিত করার একটা বিকল্প হচ্ছে নেতৃত্বে পরিবর্তন।
রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ধারণাটি প্রথম সামনে আসে গত বছর মার্চে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়। জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) এবং বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ নিজের ফেসবুক পেজে একটি পোস্ট দেন। তাতে সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা উল্লেখ করে তিনি লেখেন, ‘রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ’ নামে নতুন একটি ষড়যন্ত্র নিয়ে আসার পরিকল্পনা চলছে। এই পরিকল্পনা পুরোপুরি ভারতের; সাবের হোসেন চৌধুরী, শিরীন শারমিন চৌধুরী ও ফজলে নূর তাপসকে সামনে রেখে এই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।
এরপর কিছুদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। আবার বিষয়টি সামনে আসে বিএনপি সরকার গঠনের পর। তবে এবার বেশি আলোচনা হয় ভারতভিত্তিক কিছু অনলাইন গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এর মূল বার্তা হচ্ছে—রিফাইন্ড আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার সায় নেই বা এ ধরনের কোনো চেষ্টা সফল হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনীতি একধরনের ‘অপেক্ষার রাজনীতিতে’ রূপ নিয়েছে। কিন্তু সেই অপেক্ষার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। দলটির নেতাদের মধ্যে রাজনীতিতে ফেরার আলোচনা আছে। তবে তা কীভাবে সম্ভব, এর কোনো স্পষ্ট পথ জানা নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশে ও বিদেশে থাকা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা বলেন, দলের কট্টরপন্থী নেতারা মনে করেন, শেখ হাসিনার বিকল্প আওয়ামী লীগে নেই। আর যদি বিকল্প আনতে হয়, তবে তাঁর পরিবার থেকেই হতে হবে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো প্রস্তুত কেউ নেই; তা ছাড়া বর্তমান সময়টাও এই ধরনের উদ্যোগের জন্য অনুকূল নয়। কট্টরপন্থীদের মত হচ্ছে—আগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম শুরুর অনুমতি পাক। এরপর দলে সংস্কার আনা হবে। তবে সংস্কার হতে হবে শেখ হাসিনাকে রেখে এবং অন্য বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে নতুনদের আনতে হবে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই হতাশ
দেশে থাকা নেতা, কর্মী কিংবা সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায়ই বিদেশে থাকা নেতাদের ফোনে কথা হয়। কেমন আছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে বেশির ভাগ নেতার মুখ থেকে আসে দীর্ঘশ্বাস, ভালো থাকার সুযোগ কোথায়? দিল্লি, কলকাতা, লন্ডন, নিউইয়র্ক, ব্রাসেলস, দুবাই, সিঙ্গাপুর, কুয়ালালামপুর—যেখানেই থাকুক না কেন কমবেশি সবার জবাব কাছাকাছি।
ভারত ও ইউরোপে থাকা দুজন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে সম্প্রতি এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তাঁরা বলছিলেন, রাজনীতি থেকে দূরে থাকলে অঢেল টাকা বা আয়েশি জীবন—কোনোটাই সুখের হয় না। পরিস্থিতি এমন যে ঘরের বাইরে যেতেও নানা সংশয়, মন টানে না। আবার বিদেশে থাকা সবাই আর্থিকভাবে খুব ভালো আছেন, তা–ও নয়। বিশেষ করে কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন শহরে থাকা অনেকে আর্থিকভাবে কষ্টে আছেন বলেও কোনো কোনো নেতা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশে ব্যবসা আছে এমন সাবেক সংসদ সদস্য, বিদেশে পরিবার থাকে এমন নেতা কিংবা বয়সে জ্যেষ্ঠ অনেকে রাজনীতি থেকে নিষ্ক্রিয় হওয়ার কথাও বলছেন ঘনিষ্ঠদের। দেশে ফিরলে জামিন মিলবে—এমন আশ্বাস পেলে ফেরার কথা ভাবছেন ব্যবসায় যুক্ত সাবেক সংসদ সদস্য বা নেতারা।
দেশে-বিদেশে প্রথমে আলোচনা ছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে দিয়ে ‘রিফাইন্ড’ আওয়ামী লীগের কার্যক্রম চালু হতে পারে। বিএনপি সরকারের গঠনের পর গত ৭ এপ্রিল সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তিনি পাঁচ দিনের মাথায় ১২ এপ্রিল জামিনে মুক্তি পান। তাঁকে নিয়েও আওয়ামী লীগের পুনর্গঠনের গুঞ্জন ছড়ায়।
সব মিলিয়ে নেতাদের কেউ কেউ এতে কিছুটা আশাও দেখছিলেন; এর মাধ্যমে যদি রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ হয়। তবে দলের ভেতরে একটা শক্তিশালী মত হচ্ছে—শেখ হাসিনার অনুমোদন ছাড়া নতুন কোনো সাংগঠনিক কাঠামো টেকসই হবে না। কারণ, মাঠপর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বড় অংশ এখনো তাঁর নেতৃত্বকেই চূড়ান্ত হিসেবে মানে। শেখ হাসিনার দিক থেকে এ ধরনের উদ্যোগে সায় নেই জানার পর অনেকেই এখন আর আশা দেখছেন না।
বিএনপির সরকার গঠন: আশা ও হতাশা
বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে—এমনটা আশা করছিলেন অনেকেই। এমনকি গ্রেপ্তারকৃত নেতারা জামিন পাবেন, এরপর আত্মগোপনে থাকা নেতারা দেশে ফিরবেন—এমনও প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু বিএনপির তিন মাসের মেয়াদে এমন আশা অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ নেতাদের।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা অংশ নেবেন এবং ভালো ফলাফলের মাধ্যমে কর্মীদের মনোবল বাড়াতে চেষ্টা চালাবেন বলেও দলের একটি অংশ আশা করছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। ভবিষ্যতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা সুযোগ পাবেন বলে মনে করছেন না দলটির অনেক নেতা। ফলে বিএনপি সরকার গঠনের পর আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে ফিরতে পারবে বলে দলটির একটা অংশের ভেতর যে আশা ছিল, তা কিছুটা হতাশায় রূপ নিয়েছে।
এই মিছিল চট্টগ্রামে গত এপ্রিলে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা নানা স্থানে মাঝে–মধ্যে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করে, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়
এই মিছিল চট্টগ্রামে গত এপ্রিলে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকার মধ্যে আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা নানা স্থানে মাঝে–মধ্যে ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করে, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারও হয়ফাইল ছবি
আওয়ামী লীগের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন, বাস্তবতা হচ্ছে আওয়ামী লীগকে ছাড় দেওয়ার মতো রাজনৈতিক ঝুঁকি বিএনপির পক্ষে এখন নেওয়া কঠিন। ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী শক্তি জামায়াত-এনসিপির মধ্যে নানা বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে তাদের অবস্থান প্রায় একই। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি সরকার বড় ধরনের চাপে পড়ে কি না, সে জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আওয়ামী লীগের জন্য খুব একটা বিকল্প নেই। এর মধ্যে দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করতে হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য বিভিন্ন মহলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ চেষ্টা চালালেও সফল হয়নি। ফলে নির্বাচনটি বিএনপি জোট ও জামায়াত জোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তখন আওয়ামী লীগের ভেতরে একটি কৌশলগত ভাবনা কাজ করেছিল—জামায়াতকে ক্ষমতায় আসতে দেওয়া যাবে না।
দলীয় সূত্র অনুযায়ী, এই লক্ষ্য থেকে বিএনপি জোটের প্রতি একধরনের নীরব সমর্থনের কৌশল নেওয়া হয়েছিল। আওয়ামী লীগের কেউ কেউ মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভালো। জামায়াত ক্ষমতায় এলে পরিস্থিতি আরও কঠোর হতে পারত।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনীতি একধরনের ‘অপেক্ষার রাজনীতিতে’ রূপ নিয়েছে। কিন্তু সেই অপেক্ষার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। দলটির নেতাদের মধ্যে রাজনীতিতে ফেরার আলোচনা আছে। তবে তা কীভাবে সম্ভব, এর কোনো স্পষ্ট পথ জানা নেই।
গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, রাজনীতিতে ফিরতে হলে আওয়ামী লীগকে তাদের সাড়ে ১৫ বছরের শাসন ও রাজনীতি নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি ও ভুল স্বীকার করতে হবে। ছাত্র–জনতার গণ–অভ্যুত্থানে ফৌজদারি অপরাধের বিষয়টি তাদের মেনে নিয়ে এর মুখোমুখি হতে হবে। কোনো সরকারই ফৌজদারি অপরাধের ক্ষমা করতে পারবে না। কিন্তু মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ এর কোনোটার জন্যই প্রস্তুত নয়।
আলতাফ পারভেজ প্রথম আলোকে বলেন, মনে হচ্ছে আওয়ামী লীগ যদি গায়ের জোরে ফিরে আসার চিন্তা করে, সে ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি যৌথভাবে আওয়ামী লীগকে মোকাবিলা করবে। এ ধরনের চিন্তা আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষতিকর, দেশের জন্য ভয়াবহ হবে, সংঘাতপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসবে।
নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করাটা অন্তর্বর্তী সরকারের সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করেন না আলতাফ পারভেজ। তাঁর মতে, বিএনপিও একই ভুল করল। বরং আওয়ামী লীগকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারত। যেমন নেপালে গণ–অভ্যুত্থানের পর কোনো দল নিষিদ্ধ করা হয়নি। পূর্বতন ক্ষমতাসীন দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিয়েছে এবং জনগণ তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার ফলে আওয়ামী লীগ এই প্রচার করতে পারছে যে তারা ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্ত।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে নতুন করে চার নেতাকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শনিবার (১৫ আগস্ট) দলটির পক্ষ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিএনপির সাংগঠনিক গতিশীলতা বাড়ানো এবং দলীয় সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় এই চার নেতাকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়। স্থায়ী কমিটির নতুন চার সদস্য হলেন—অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ, মো. আমান উল্লাহ আমান, ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। রুহুল কবির রিজভী এতোদিন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। এর আগে যুগ্ম মহাসচিব পদে ছিলেন। সাবেক রাকসু ভিপি রিজভী ছাত্রজীবন শেষে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। আমান উল্লাহ আমান এতোদিন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পদে ছিলেন। ৯০ স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে তার উত্থান। তিনি ডাকসু ভিপি পদে জয়ী হয়েছিলেন। পরবর্তীতে বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক এবং যুগ্ম মহাসচিব পদে ছিলেন। ডা. ফরহাদ হোসেন ডোনার বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পদে ছিলেন। তিনি পেশাজীবীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশের অন্যতম চিকিৎসা গবেষণা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেডিকেল স্টাডিজ অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (বিএমএসআরআই) চেয়ারম্যান। ডা. ডোনার ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব) এর প্রধান উপদেষ্টা, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক। আর ইসমাইল জবিউল্লাহ বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পদে এতোদিন দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তিনি সরকারের জনপ্রশাসন উপদেষ্টা পদে রয়েছেন। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দলের আশা, নতুন অন্তর্ভুক্ত নেতারা তাদের মেধা, অভিজ্ঞতা ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে সুচিন্তিত পরামর্শ দেবেন। একই সঙ্গে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে দল ও জনগণের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখবেন। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অভিজ্ঞ নেতাদের সম্পৃক্ততা বাড়ানোর অংশ হিসেবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, সম্প্রতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির রাষ্ট্রপতি প্রার্থী মনোনীত হয়েছে। তাই তিনি মহাসচিব ও দলের স্থায়ী কমিটি থেকে পদত্যাগ করেন। এছাড়া সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন মারা যাওয়ায় স্থায়ী কমিটির আরেকটি পদ শূন্য হয়। অসুস্থ থাকায় ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যেতে পারেন না। আর মাহবুবুর রহমান রাজনীতি থেকে নিস্ক্রিয়। এমতাবস্থায় বিএনপির স্থায়ী কমিটিতে নতুন চারজনকে যুক্ত করা হলো।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে ‘বিদায়ী’ সাক্ষাৎ করেছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকসহ শীর্ষ পাঁচ নেতা। এর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘রাকিব-নাছির’ কমিটির বিদায় হয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে যেকোনো সময় নতুন নেতৃত্ব পেতে যাচ্ছে বিএনপির প্রধানতম সহযোগী সংগঠন ছাত্রদল। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) রাতে রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ ‘বিদায়ী’ সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের নতুন কমিটিকে সবাই সাদরে গ্রহণ করার প্রত্যাশা জানিয়ে বিদায়ী সাক্ষাতের পর রাতে সংগঠনটির সভাপতি মো. রাকিবুল ইসলাম রাকিব নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ! মহান রাব্বুল আলামিনের নিকট লাখো কোটি শোকরিয়া, অনেক বেশি সম্মান ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটতে চলেছে।’ তিনি আরও লেখেন, ‘একটা নতুন জীবন শুরু করতে চাই। নিজেকে আরও বেশি পরিশুদ্ধ, মানবিক ও সৎ মানুষ হিসেবে গড়তে চাই। ভুল ত্রুটির ঊর্ধ্বে কেউ না, সেহেতু দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে আমারও ভুল ত্রুটি রয়েছে, কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ রইল। ছাত্রদলের আসন্ন নতুন কমিটিকে সবাই সাদরে গ্রহণ করবেন, সেই প্রত্যাশা রইল।’ এদিকে শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বেলা সাড়ে ৩টায় রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি চেয়ারম্যান কিংবা দলের পক্ষ থেকে ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে কোনো নির্দেশনা আছে কিনা জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের বলেন, আজকে আমার কাছে এ ধরনের কোনো নির্দেশনা আসেনি। যদি সেরকম (নতুন কমিটি) কোনো সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে তাহলে অবশ্যই আসবে। ‘রাকিব-নাছির’ কমিটির বিদায় প্রসঙ্গে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘এটা নিঃসন্দেহে দলের হাইকমান্ড তাদের সঙ্গে কথা বলছেন। তাদের সঙ্গে কী কথা হয়েছে, তাতে কী নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এটা আমি এই মুহূর্তে বলতে পারব না। আর যদি চূড়ান্ত পর্যায়ের কিছু হয়, নতুন কিছু হয়— তো সেটা তো নিঃসন্দেহে আমরা প্রেস রিলিজ আকারে আপনাদেরকে বলে দেব। এখন পর্যন্ত আমার কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি।’ বিএনপি ও তার সহযোগী-অঙ্গসংগঠনের যেকোনো কমিটি প্রকাশ হয়ে থাকে রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরে ও দলীয় প্যাডে। সে কারণে ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়ে তার কাছে জানতে চান সাংবাদিকরা। চলতি মাসেই নতুন কমিটি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন নেতৃত্ব ঘোষণার প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় ও ছাত্রদলের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি আগস্টেই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হতে পারে। তবে গত ৩ আগস্ট ছাত্রদলের জাতীয় ছাত্র সমাবেশ স্থগিত হওয়ার পর নতুন কমিটি নিয়ে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। দলীয় সূত্র বলছে, আগস্টের মধ্যেই কমিটি হতে পারে, আবার কেউ মনে করছেন ঘোষণার সময় আরও পিছিয়ে যেতে পারে। বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতা জানান, নতুন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং ক্লিন ইমেজকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এদিকে শীর্ষ পদপ্রত্যাশীরা শেষ মুহূর্তের সাংগঠনিক তৎপরতা, সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন। কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদপ্রত্যাশী নেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে পদযাত্রা, মিছিলসহ নানা কার্যক্রম পরিচালনা করে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন। সভাপতি পদে আলোচনায় যারা কেন্দ্রীয় সভাপতি পদে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষ থেকে বর্তমান কমিটির সহ-সভাপতি রিয়াদ রহমান, এইচ এম আবু জাফর, এজাজুল কবির রুয়েল, খোরশেদ আলম সোহেল এবং মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ আলোচনায় রয়েছেন। ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষ থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানুল্লাহ আমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. হাসানুর রহমান, শরিফ প্রধান শুভ, ফারুক হোসেনের নামও আলোচনায় রয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক পদে ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষ থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম তারিক ও সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিকের নাম আলোচনায় রয়েছে। ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষ থেকে সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, গাজী সাদ্দাম হোসেন, ইব্রাহিম খলিল, মাসুদুর রহমান মাসুদ, তারেক হাসান মামুন, নাছির উদ্দীন শাওন এবং জাহিদ হাসান শাকিল সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। পদপ্রত্যাশী ছাত্রদল নেতারা বলছেন, বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ায় আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত নেতাদের দিয়েই নতুন কমিটি গঠন করা হলে সংগঠন আরও শক্তিশালী হবে। তাদের মতে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের সাংগঠনিক অভিভাবক বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি যাকে যে দায়িত্ব দেবেন, সেটিই সবাই মেনে নেবেন। যা বলছেন পদপ্রত্যাশীরা শীর্ষ পদপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক রিয়াদ রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের আগে ছাত্রলীগের দখলদারিত্ব, সিট বাণিজ্য ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের কারণে ছাত্ররাজনীতির মূলধারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তার দাবি, সাধারণ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও শোষণই গণঅভ্যুত্থানে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণের অন্যতম কারণ ছিল এবং এর ধারাবাহিকতায় ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে।’ তিনি বলেন, ‘ছাত্ররাজনীতি বন্ধ কোনো সমাধান নয়। ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের আন্দোলন—সব ক্ষেত্রেই ছাত্রসমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ভবিষ্যতের নেতৃত্ব হতে হবে নৈতিক, শিক্ষার্থীবান্ধব ও গ্রহণযোগ্য। ছাত্রনেতাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, শিক্ষার্থীদের অধিকার, নিরাপত্তা, শিক্ষা, কল্যাণ এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা থাকতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্যান্টিনে পর্দা টাঙানোর মতো প্রতীকী উদ্যোগ নয়, বরং সারা দেশের শিক্ষার্থীদের বাস্তব সমস্যা সমাধানই ছাত্রসংগঠনের প্রধান দায়িত্ব। নেতৃত্ব এমন ব্যক্তির হাতে যেতে হবে, যিনি সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাজ করতে পারবেন, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা রাখবেন, নিজের সংগঠনের ভুলের সমালোচনা করার সাহস রাখবেন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিবন্ধকতামুক্ত পরিবেশ তৈরিতে কাজ করবেন।’ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান বলেন, ‘সংগঠনের নেতাকর্মীরা নতুন কমিটির জন্য, নতুন জুলাইয়ে, নতুন সরকারের কাছে মুখিয়ে রয়েছেন। নতুন কমিটির নেতৃত্বে দেশ গড়ায় অংশ নেবে ছাত্রদল।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংগঠনের তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত আমার একটি নিবিড় যোগাযোগ ও সম্পর্ক রয়েছে। আমার সেই সহযোদ্ধা-সহকর্মীরা আমাকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চান। আমি সংগঠনের তৃণমূলে যারা রয়েছে এবং দলের সর্বোচ্চ সাংগঠনিক অভিভাবক, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের ওপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস রাখি। তিনি যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেই আলোকে কাজ করতে আমি সদা প্রস্তুত।’ কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রাজু আহমেদ বলেন, ‘নতুন নেতৃত্ব ও নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাওয়ার জন্য সারা দেশের ছাত্রদল অপেক্ষা করছে। তারা আশা করছেন, সাংগঠনিক অভিভাবক প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিগগিরই নতুন কেন্দ্রীয় কমিটি উপহার দেবেন।’ ঢাবি ছাত্রদলের নতুন কমিটিও দোরগোড়ায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখার নতুন কমিটিও যেকোনো সময় ঘোষণা হতে পারে। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার কমিটি সাধারণত একসঙ্গে বা কাছাকাছি সময়ে ঘোষণা করা হয়। সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে ঢাবি শাখাকেও নতুনভাবে সাজানো হয়। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে পরিবর্তনের প্রস্তুতি প্রায় চূড়ান্ত হওয়ায় দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হিসেবে বিবেচিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার নতুন নেতৃত্ব নিয়েও জোর আলোচনা চলছে। দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, চলতি সপ্তাহেই কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে ঢাবি শাখার নতুন কমিটিও ঘোষণা হতে পারে। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের কমিটি ২০২৪ সালের মার্চে গণেশ চন্দ্র রায় সাহসকে সভাপতি এবং নাহিদুজ্জামান শিপনকে সাধারণ সম্পাদক করে এক বছরের জন্য ঘোষণা করা হয়েছিল। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার অনেক আগেই নতুন কমিটি গঠনের আলোচনা শুরু হলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কারণে তা পিছিয়ে যায়। ঢাবি ছাত্রদলের শীর্ষ পদে যাদের নাম দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পদে একাধিক নেতা আলোচনায় রয়েছেন। ২০১৩-১৪ সেশন থেকে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জসিম খান ও গাজী মোহাম্মদ আল-আমিন, সহ-সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুল হাসানকে সম্ভাব্য শীর্ষ নেতৃত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ ছাড়া ২০১৪-১৫ সেশন থেকে বিজয় একাত্তর হলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক বি এম কাওসার, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাইফ খান এবং আলমগীর হোসেন আলম আলোচনায় রয়েছেন। ২০১৫-১৬ সেশন থেকে যুগ্ম সম্পাদক বজলুর রহমান বিজয়, আবিদুল ইসলাম খান এবং ২০১৬-১৭ সেশন থেকে সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক আবু হায়াত মো. জুলফিকার জেসান, প্রচার সম্পাদক তানভীর হাসান এবং শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক মাহমুদুল হাসানের নামও সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় রয়েছে। ২০১৭-১৮ সেশন থেকে আপ্যায়ন সম্পাদক আরিফুল ইসলাম, আন্তর্জাতিক সম্পাদক মেহেদী হাসান, মুক্তিযুদ্ধ ও গবেষণা সম্পাদক সৈয়দ ইমাম হাসান অনিক ও ক্রীড়া সম্পাদক সাইফুল্লাহ সাইফ আলোচনায় রয়েছেন। আন্দোলনে ভূমিকা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় গুরুত্ব ছাত্রদলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, এবারের নেতৃত্ব নির্বাচনে বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং বিতর্কমুক্ত নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কঠোর অবস্থানে রয়েছে। পদপ্রত্যাশী ও বর্তমান যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জসিম খান বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমাদের নেতা জনাব তারেক রহমানের মূল লক্ষ্য হলো— মেধা, ত্যাগ ও পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির সমন্বয়। নেতার লক্ষ্য বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে পারবে এবং একই সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে একাধারে অনুকরণীয় ও নির্ভরযোগ্য নেতৃত্বই আমাদের প্রত্যাশা।’ সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক আবু হায়াত মো. জুলফিকার জেসান বলেন, ‘দীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনামলে দেশের গণতন্ত্র ও শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রামে যারা সাহসিকতার সঙ্গে রাজপথে থেকেছেন, জেল-জুলুম, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, তাদের অবদান মূল্যায়নের সময় এসেছে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যাদের নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে এবং যারা ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে সংগঠনের প্রতি সর্বোচ্চ নিষ্ঠা, ত্যাগ ও কমিটমেন্টের পরিচয় দিয়েছেন, তারাই নেতৃত্বের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। আমি বিশ্বাস করি সংগঠন ত্যাগ, যোগ্যতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার সমন্বয়ে এমন নেতৃত্বই বেছে নেবে, যারা আগামী দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলকে আরও শক্তিশালী ও শিক্ষার্থীবান্ধব সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে।’ আরেক পদপ্রত্যাশী ঢাবি ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক গাজী মো. আল আমিন বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রদলের সম্পর্ক প্রত্যাশিতভাবে গভীর হতে পারেনি। তাই শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট দাবি আদায়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম এবং বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সর্বোচ্চ অবদান রাখা নেতৃত্বই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের জন্য প্রয়োজন। পাশাপাশি, যারা ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে সংগঠনের স্বার্থকে প্রাধান্য দেন, তাদের নেতৃত্বে ছাত্রদল সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে আরও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়বে।’ বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, জুলাই গণঅভ্যুত্থানসহ বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা রাখা ত্যাগী নেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। তারা চান, নতুন কমিটি গঠনে কোনো ধরনের সিন্ডিকেট বা ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রভাব যেন না থাকে। নেতৃত্ব নির্বাচনে যেসব বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে ছাত্রদলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, এবারের নেতৃত্ব নির্বাচনে আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা, সাংগঠনিক দক্ষতা, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, ত্যাগ, দলের প্রতি আনুগত্য এবং শিক্ষার্থীদের কাছে গ্রহণযোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বিতর্কমুক্ত, নিয়মিত শিক্ষার্থী এবং শিক্ষার্থীবান্ধব নেতৃত্বকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ফলে এবারের কমিটিতে বিগত সময়ের মতো গ্রুপভিত্তিক কমিটি হচ্ছে না বলেই দলীয় সূত্রে জানা গেছে। তাই কে পাচ্ছেন নতুন নেতৃত্ব তা এখনো ধোঁয়াশা। তাই নতুন নেতৃত্বকে ঘিরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
বর্তমানে খাবার, পানি এবং বাতাস— প্রায় সব জায়গাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। ৫ মিলিমিটার বা তার চেয়ে ছোট প্লাস্টিকের কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এর চেয়েও সূক্ষ্ম ন্যানোপ্লাস্টিক যা খালি চোখে দেখা যায় না, তবে গবেষকদের উদ্বেগের বড় কারণ হয়ে উঠেছে এই অতি ক্ষুদ্র কণা বান্যানোপ্লাস্টিক । ভারতীয় সংবাদমাধ্যম আনন্দবাজার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভিন্ন গবেষণায় মানুষের মস্তিষ্ক, হার্ট, যকৃত, কিডনি, ধমনী, চোখ এবং গর্ভের প্লাসেন্টায়ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসক সঞ্জীব বাগাইয়ের মতে, আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিই, যে খাবার খাই এবং ত্বকের সংস্পর্শের মাধ্যমেও মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করতে পারে। একবার শরীরে ঢুকে পড়লে এগুলো রক্তের মাধ্যমে বিভিন্ন অঙ্গে ছড়িয়ে যায়। গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এসব ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, প্রদাহ এবং কোষের ক্ষতির মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তবে চিকিৎসক দর্শনা রানের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি ক্যানসারের কারণ— এমন সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। তবুও সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঝুঁকি কমাতে যা করবেন — ১. প্লাস্টিকের বদলে কাচের পাত্র ব্যবহার করুন খাবার সংরক্ষণ এবং গরম করার জন্য প্লাস্টিকের পরিবর্তে কাচ বা সেরামিকের পাত্র ব্যবহার করুন। বিশেষ করে মাইক্রোওয়েভে প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার গরম না করাই ভালো। ২. প্লাস্টিকের বোতলের বদলে স্টিল বা কাচের বোতল ব্যবহার করুন একই প্লাস্টিকের বোতল দীর্ঘদিন ব্যবহার করলে তা ক্ষয়ে গিয়ে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা ছাড়তে পারে। তাই স্টেইনলেস স্টিল বা কাচের বোতল নিরাপদ বিকল্প। ৩. রান্নার প্লাস্টিকের সরঞ্জাম বদলে ফেলুন পুরোনো বা আঁচড় পড়া প্লাস্টিকের হাতা, খুন্তি বা স্প্যাচুলার বদলে স্টেইনলেস স্টিল, কাঠ বা ফুড-গ্রেড সিলিকনের তৈরি সরঞ্জাম ব্যবহার করুন। ৪. কৃত্রিম স্পঞ্জের বদলে প্রাকৃতিক বিকল্প বেছে নিন কিচেন স্পঞ্জ ক্ষয়ে গিয়ে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক তন্তু ছড়াতে পারে। এর পরিবর্তে প্রাকৃতিক লুফা, সেলুলোজ স্পঞ্জ বা ধুঁধুলের ছোবড়ার মতো পরিবেশবান্ধব বিকল্প ব্যবহার করতে পারেন। ৫. প্যাকেটজাত খাবারের পরিবর্তে তাজা খাবার খান যতটা সম্ভব তাজা ফল, সবজি ও খোলা পণ্য কিনুন। পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করুন এবং অতিরিক্ত প্লাস্টিক মোড়ক এড়িয়ে চলুন। প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসই ভবিষ্যতের বড় সুরক্ষা গড়ে তুলতে পারে। প্লাস্টিক পুরোপুরি এড়িয়ে চলা হয়তো সম্ভব নয়, তবে সচেতন কিছু পরিবর্তন আপনার এবং পরিবারের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রবেশ অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। সুস্থ থাকার লড়াই শুরু হতে পারে আজ থেকেই।