দেশের রাজস্বখাতের বিভিন্ন ক্যাটাগরির উপবৃত্তির সংখ্যা ও মাসিক টাকার হার কয়েকগুণ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
দীর্ঘ এক দশক পর দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, উপজাতি ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের (৬ষ্ঠ-স্নাতক স্তর) উপবৃত্তির সংখ্যা বাড়তি ২০ শতাংশ এবং মাসিক টাকার পরিমাণ আগের তুলনায় অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
এর বাইরে বিভিন্ন শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজসহ পেশামূলক উপবৃত্তির সংখ্যা এবং মাসিক টাকার হার একই হারে বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিদ্ধান্তের আলোকে রাজস্বখাতের উপবৃত্তি বাড়ানোর প্রস্তাব করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। এ সংক্রান্ত প্রস্তাবের খসড়া গত ৭ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
মাউশির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) প্রফেসর বি. এম. আব্দুল হান্নান বাসসকে জানান, ২০১৫ সালের পর মাউশির আওতাধীন রাজস্বখাতের বিভিন্ন উপবৃত্তির সংখ্যা ও টাকার পরিমাণ বাড়ানো হয়নি। বর্তমান বাজারমূল্য বিবেচনায় এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এসব স্তরের উপবৃত্তির হার ও টাকার পরিমাণ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা থেকেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মহাপরিচালক বলেন, মন্ত্রণালয়ের অনুরোধে পাঠানো প্রস্তাবটি অর্থ বিভাগের অনুমোদন পাওয়া গেলে আমরা সেটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করব।
মন্ত্রণালয়ে পাঠানো খসড়া প্রস্তাবে মাউশি বলছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে রাজস্বখাতের সকল স্তরের উপবৃত্তির হার অপরিবর্তিত রয়েছে। বর্তমান বাজারদর এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে টাকার হার ও সংখ্যা বৃদ্ধি করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভার কার্যবিবরণীর সিদ্ধান্তের আলোকে মাউশির রাজস্বখাতভুক্ত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, উপজাতি ও বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের (৬ষ্ঠ থেকে স্নাতক স্তর) উপবৃত্তির বর্ধিত সংখ্যা ও টাকার হার অনুযায়ী সম্ভাব্য ব্যয়ের একটি সার-সংক্ষেপ প্রস্তুত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের উপসচিব সাবিনা ইয়াসমিন বাসসকে বলেন, সম্প্রতি মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত এক সভার সিদ্ধান্তের আলোকে মাউশি কাছ থেকে রাজস্ব খাতের সকল উপবৃত্তি বাড়ানোর প্রস্তাব পাওয়া গেছে। মন্ত্রণালয়ের বাজেট শাখা থেকে প্রস্তাবের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য অর্থ বিভাগে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।
তিন ক্যাটাগরির উপবৃত্তি বাড়ছে :
মাউশির প্রস্তাবনা অনুযায়ী, দেশের সংখ্যালঘু ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ক্যাটাগরিতে খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ, তফশিলি হিন্দু, সশস্ত্র বাহিনী এবং উপজাতীয় শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির সংখ্যা ৮ হাজার ৭৬০ থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫১২ জনে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বার্ষিক সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ২ লক্ষ ৪৩ হাজার ৬০০ টাকা। বর্তমানে এ খাতে সরকারের ব্যয় হচ্ছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা।
প্রস্তাবনা মতে, অন্যদিকে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিক্ষার্থী ‘গ’ ক্যাটাগরিতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিক্ষার্থীদের (৬ষ্ঠ-স্নাতক) জন্য উপবৃত্তির সংখ্যা ১ হাজার ৭৩৫ জন থেকে বাড়িয়ে ২ হাজার ৮২ জন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মাসিক টাকার হারের পাশাপাশি তাদের বার্ষিক এককালীন ভাতার পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। এই খাতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২ কোটি ১৩ লক্ষ ১৭ হাজার ৪০০ টাকা। বর্তমানে ব্যয় হচ্ছে কোটি ৪১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা।
মাউশির প্রস্তাবনা আরও বলা হয়, এছাড়া পেশামূলক উপবৃত্তি হিসেবে দেশের শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ (বিএড), চারুকলা (বিএফএ ও এমএফএ) এবং গার্হস্থ্য অর্থনীতির শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির সংখ্যা ৭ হাজার ২৩০ জন থেকে বাড়িয়ে ৮ হাজার ৬৭৬ জন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ কোটি ৪২ লক্ষ ৭৭ হাজার টাকা। বর্তমানে এখাতে ব্যয় হচ্ছে ৪ কোটি ৯৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা।
আর্থিক পরিবর্তনের চিত্র :
প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আগে যেখানে ৬ষ্ঠ-১০ম শ্রেণির উপবৃত্তি টাকা ছিল মাসিক ১৫০ টাকা, তা বাড়িয়ে ২০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একইভাবে মাস্টার্স পর্যায়ের উপবৃত্তি ৪০০-৪৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের মাস্টার্স পর্যায়ের হার ১ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৭৫ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
মাউশি জানিয়েছে, মাসিক হারের পাশাপাশি বাৎসরিক এককালীন অনুদানের পরিমাণও কয়েকগুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব খসড়াতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখার সহকারী পরিচালক কামরুন নাহার বাসসকে বলেন, ‘প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে দেশের হাজার হাজার সুবিধাবঞ্চিত ও মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণে আরও বেশি উৎসাহী হবে। একই সঙ্গে তাদের পড়াশোনার আর্থিক ব্যয়ভার লাঘব হবে।’
তিনি জানান, নতুন এই প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে প্রায় সকল পর্যায়ের শিক্ষার্থীরাই বর্তমান হারের চেয়ে অন্তত ২৫ শতাংশ বেশি উপবৃত্তির অর্থ সহায়তা পাবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশের সাধারণ পাসপোর্টে আবারও পুনর্বহাল করা হচ্ছে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ (ইসরায়েল ব্যতীত) শব্দবন্ধ। একই সঙ্গে পাসপোর্টের ভেতরের পাতার জলছাপ (ওয়াটারমার্ক) পরিবর্তন করে সেখানে যুক্ত করা হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আবু সাঈদের ছবি ও দেশের বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও নিদর্শন। ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। সূত্রগুলো জানিয়েছে, এ পরিবর্তনের অংশ হিসেবে পাসপোর্টের ভেতরের পাতার প্রায় এক ডজন ওয়াটারমার্ক নতুনভাবে ডিজাইন করা হবে। ইসরায়েলের সঙ্গে বাংলাদেশের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই এবং অতীতেও কখনো ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশি পাসপোর্টে লেখা থাকত, ‘দিস পাসপোর্ট ইস ভ্যালিড ফর অল কান্ট্রিস অব দ্য ওয়ার্ল্ড এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ (এই পাসপোর্টটি ইসরায়েল ব্যতীত বিশ্বের সব দেশের জন্য বৈধ)। তবে ২০২০ সালের শেষ দিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই পাসপোর্ট থেকে ‘এক্সেপ্ট ইসরায়েল’ শব্দবন্ধটি বাদ দেওয়া হয়। এখন সেটি পুনর্বহালের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য পাসপোর্ট অধিদপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে এতে সম্মতি দিয়েছে এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রস্তাবটি সরকারপ্রধানের কাছে পাঠানো হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। যোগাযোগ করা হলে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক নূরুল আনোয়ার বলেন, এ উদ্যোগ তাদের অধিদপ্তর থেকে শুরু হয়নি। তিনি বলেন, এটি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত। কূটনৈতিক পাসপোর্টে বিষয়টি ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানিয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ই এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। গত বছরের ৭ এপ্রিল এ-সংক্রান্ত একটি আদেশও জারি করা হয়। তবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় এখন নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এদিকে পাসপোর্টের পাতার ওয়াটারমার্কেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হচ্ছে। নতুন ডিজাইনে যুক্ত হচ্ছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক হিসেবে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকা শহীদ আবু সাঈদের ছবি। এছাড়া বঙ্গভবন, জিআই পণ্য জামদানি শাড়ি, জাতীয় ফল কাঁঠাল, জাতীয় মাছ ইলিশ, আমবাগান, সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওর, বান্দরবানের নীলগিরি এবং নারায়ণগঞ্জের পানাম নগরীর ছবিও রাখা হচ্ছে। বর্তমানে থাকা কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের নৌকাসহ একটি ছবিও পরিবর্তন করা হবে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে বাদ পড়ছে টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিসৌধ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ, মডেল মসজিদ, দিনাজপুরের কান্তজিউ মন্দির, বঙ্গবন্ধু সেতু (যমুনা সেতু), পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং মেহেরপুরের মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের ছবি।
সাফল্যের একটি বড় অংশজুড়ে থাকে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা ও স্বনির্ভরতা। আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে মুনাফার জন্য অনৈতিক পথ অবলম্বন করাকে অনেকে ‘স্মার্টনেস’ মনে করেন। কিন্তু নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন সততা ও বিশ্বস্ততাই হলো ব্যবসার আসল মূলধন। একজন সফল উদ্যোক্তা বা কর্মজীবী হওয়ার জন্য তাঁর জীবন থেকে ১০টি বৈপ্লবিক সূত্র তুলে ধরা হলো: ১. সততাই শ্রেষ্ঠ মূলধন ব্যবসার সাফল্যের জন্য মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া সাময়িক লাভ দিলেও দীর্ঘমেয়াদে তা ধ্বংস ডেকে আনে। নবীজি (সা.) সত্যবাদী ব্যবসায়ীদের পরকালে উচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “সত্যবাদী ও আমানতদার (বিশ্বস্ত) ব্যবসায়ী কেয়ামতের দিন নবীগণ, সত্যবাদীগণ এবং শহীদদের সঙ্গী হবেন।” (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯) ২. ভেজাল ও প্রতারণা বর্জন পণ্যের ত্রুটি গোপন করা বা ওজনে কম দেওয়া শুধু নৈতিক অপরাধ নয়, বরং এটি ব্যবসায়িক বরকত নষ্ট করে দেয়। একবার রাসুল (সা.) এক খাদ্য বিক্রেতার শস্যের স্তূপে হাত ঢুকিয়ে দেখলেন ভেতরে ভেজা। তিনি বললেন, “যে প্রতারণা করে, সে আমার দলভুক্ত নয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০২) ৩. সহজলভ্যতা ও সহমর্মিতা বেচাকেনার ক্ষেত্রে কঠোর হওয়া বা গ্রাহককে ঠকানো নয়, বরং উদার ও নমনীয় হওয়া বরকতের চাবিকাঠি। রাসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ সেই ব্যক্তির ওপর রহম করুন, যে ক্রয়-বিক্রয়ের সময় এবং পাওনা দাবির সময় নমনীয় থাকে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০৭৬) ৪. শ্রমিকের অধিকার ও মজুরি একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য নির্ভর করে তার কর্মীদের সন্তুষ্টির ওপর। নবীজি (সা.) শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “শ্রমিকের মজুরি পরিশোধ করো তার গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৪৩) ৫. অতিরিক্ত শপথ না করা পণ্যের গুণাগুণ বর্ণনা করতে গিয়ে কসম বা শপথ করা ব্যবসার সুনাম নষ্ট করে এবং গ্রাহকের আস্থা কমিয়ে দেয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, “বেচাকেনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কসম করা থেকে বিরত থাকো; এটি পণ্য বিক্রি বাড়ালেও বরকত মিটিয়ে দেয়।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০৭) ৬. মজুদদারি ও কৃত্রিম সংকট তৈরি মুনাফার লোভে পণ্য জমা রেখে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করাকে নবীজি (সা.) কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, “পণ্য মজুদকারী ব্যক্তি অত্যন্ত অপরাধী।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৬০৫) ৭. ঋণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা পেশাদার জীবনে লেনদেনের স্বচ্ছতা অপরিহার্য। ঋণ পরিশোধের সদিচ্ছা এবং সময়মতো তা ফেরত দেওয়া সফল ব্যক্তিত্বের পরিচয়। রাসুল (সা.) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই শ্রেষ্ঠ, যে পাওনা পরিশোধের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৩০৫) ৮. সুদের ভয়াবহতা থেকে দূরে থাকা আর্থিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক ভারসাম্যের জন্য সুদবিহীন অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছেন নবীজি (সা.)। তিনি সুদ গ্রহণকারী, প্রদানকারী, এর লেখক এবং এর সাক্ষী—সকলের ওপর অভিশাপ দিয়েছেন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৫৯৮) ৯. অলসতা ত্যাগ ও স্বাবলম্বিতা কারো ওপর বোঝা না হয়ে নিজ হাতে উপার্জন করাকে নবীজি (সা.) ইবাদত হিসেবে গণ্য করেছেন। তিনি বলেছেন, “নিজ হাতের উপার্জিত খাদ্যের চেয়ে শ্রেষ্ঠ খাদ্য আর কেউ কখনো খায়নি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯৬১) ১০. ব্যয়ের ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ উপার্জনের পাশাপাশি ব্যয়ের ক্ষেত্রে মিতব্যয়িতা আর্থিক সমৃদ্ধির অন্যতম সূত্র। অপচয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে, “আর তোমরা অপচয় করো না; নিশ্চয়ই অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই।” (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৭) রাসুল (সা.)-এর এই অর্থনৈতিক দর্শন শুধু ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি নয়, বরং একটি সুষম ও ইনসাফপূর্ণ অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ দেখায়। সততা, কঠোর পরিশ্রম এবং অন্যের অধিকারের প্রতি সচেতনতাই হলো প্রকৃত ও স্থায়ী সাফল্যের ভিত্তি।
বিদেশ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক সম্প্রসারণের জন্য। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে এই প্রকল্পে যুক্ত করা হয় গবেষণাগার উন্নয়নের নামে ভবন নির্মাণসহ নানা বিলাসী উপকরণ। যেমন মাল্টিপারপাস হল, সেমিনার হল, কনফারেন্স হল, লাউঞ্জ, দেড় শতাধিক পাঁচ তারকা হোটেলের সমমানের থাকার কক্ষ। আরও যোগ হয়েছে সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম, ইনডোর গেমস সরঞ্জাম বিলিয়ার্ড, স্নুকার, কার্ড রুম ইত্যাদি। সবই করা হচ্ছে বড় বড় গাছ কেটে, পুকুর ভরাট করে। বর্তমান সরকার সারা দেশে বৃক্ষরোপণে জোর দিয়েছে। অথচ সরকারেরই একটি সংস্থা গাছ কেটে বিলাসী ভবন তৈরি করছে। প্রকল্পটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের। প্রকল্পটির নাম সাসেক সড়ক সংযোগ প্রকল্প-২। আর বিলাসী ভবনগুলোর নির্মাণকাজ চলছে মিরপুরের পাইকপাড়ায় সড়ক গবেষণাগার এলাকায়। জায়গাটি মূল সড়ক থেকে ভেতরে, গাছগাছালিতে ঘেরা। এখানে নতুন ভবন নির্মাণ করতে ভাঙা হয়েছে পুরোনো স্থাপত্যশৈলীর ভবন। এগুলোর নকশা করেছিলেন স্থপতি মাজহারুল ইসলাম। প্রকল্পে বিলাসী উপকরণ যোগ হওয়ার সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। শুরুতে এসব ভবন ও কিছু যন্ত্রপাতি কেনার জন্য ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই) নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। শুরুতে তারা কাজটি পেয়েছিল ২৩২ কোটি টাকায়। তিন দফা ব্যয় বাড়িয়ে এখন ৩৩৫ কোটি টাকায় ঠেকেছে। সওজের দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ঠিকাদার সওজের প্রাক্কলনের চেয়ে সাড়ে ১৩ শতাংশ ছাড়ে (লেস) মূল্য প্রস্তাব করে কাজটি পান। অনেক উপকরণের (আইটেম) মূল্য কম দেখিয়ে কাজটি বাগিয়ে নেন। কিন্তু পরে যেসব আইটেমের মূল্য কম দেখানো হয়েছিল, এর বেশির ভাগই বাদ দেওয়া হয়। আর নতুন নতুন পণ্য ও কাজ যোগ করা হয়, যেগুলোর মূল্য বেশি। মূলত বাড়তি লাভের জন্যই এই কারসাজি করেছেন ঠিকাদার। কর্তৃপক্ষও তা অনুমোদন করেছে। সব মিলিয়ে ঠিকাদার কাজ নেওয়ার পর কৌশল করে প্রায় ৪৫ শতাংশ ব্যয় বাড়িয়েছেন, যা খুবই অস্বাভাবিক। ঢাকার তেজগাঁওয়ে হাতিরঝিলের পাশেই ২০২৩ সালের শেষের দিকে সওজের নতুন প্রধান কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়। আধুনিক নকশা এবং দৃষ্টিনন্দন এই ভবন যে কারও নজর কাড়বে। এর পাশেই আরেকটি গোলাকার দৃষ্টিনন্দন ভবন তৈরি করা হয় একই সময়। এটির একাংশ ব্যবহার করে সওজ, অন্য অংশ ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। দুটি ভবনই ১৩ তলাবিশিষ্ট। এই প্রধান কার্যালয়ে ৭০০ আসনবিশিষ্ট মিলনায়তনসহ বিভিন্ন আকারের সম্মেলনকক্ষ, বড় মসজিদ, পাবলিক প্লাজা, পাঠাগার, ক্যাফেটেরিয়া, ডে কেয়ার সেন্টার, ২০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা আছে। সব মিলিয়ে দুটি ভবন নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩৩৫ কোটি টাকা। দুটি ভবনে এক হাজারের মতো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কক্ষ ও বসার জায়গা রয়েছে। অন্যদিকে সওজের গবেষণাগারে সাকল্যে লোকবল আছে ৫০ জনের মতো। তারপরও খরচ করা হচ্ছে দুই ভবনের সমান টাকা। দৃষ্টিনন্দন ভবন থাকা সত্ত্বেও নতুন করে বিলাসী ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, সড়ক ভবনে সেমিনার হলসহ অন্যান্য সুবিধা থাকার পরও নতুন করে একই ধরনের বিলাসী স্থাপনা করার যৌক্তিকতা নেই। প্রকল্পের ব্যয় বাড়ানোর এটা একটা কৌশল। সওজ সূত্র জানায়, সাসেক-২ প্রকল্পে মোট ব্যয় শুরুতে ছিল ১১ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা। তিন দফা বাড়িয়ে তা ১৯ হাজার ৫৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রকল্পে প্রতি কিলোমিটার চার লেন সড়ক নির্মাণে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২০০ কোটি টাকার বেশি। প্রকল্পের অধীন ভবন নির্মাণ, যানবাহন ক্রয়সহ বিভিন্ন প্যাকেজে একাধিকবার কাজ পরিবর্তন ও ব্যয় বাড়ানোর অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে কম দামের আইটেম বাদ দিয়ে বেশি দামের আইটেম যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সওজ সূত্র ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বারবার ভেরিয়েশন ও ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত, না হলে ঋণের টাকায় প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়তেই থাকবে।