পরনে শিফন শাড়ি, আঁকা ভ্রু, চোখে বড় সানগ্লাস- নিজের ব্যক্তিত্বের সাথে মিলিয়ে জনপরিসরে এভাবেই দেখা যেত প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে। তার এই সাজপোশাক একদিকে যেমন অনেক নারীর জন্য অনুকরণীয় হয়ে উঠেছিল, তেমনি কটাক্ষেরও শিকার হতে হয়েছে প্রতিপক্ষ রাজনীতিকদের। আবার নারী নেতৃত্বের বিষয়ে ভিন্নমত থাকা রাজনৈতিক দলও জোট করেছিলেন খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতির মাঠে নারীদের সাজপোশাকের ধারণাই বদলে দিয়েছিলেন ৪০ বছরেরও বেশি সময় বিএনপির শীর্ষ পদে থাকা এই নেতা।
একইসাথে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে পশ্চিমা ছকে বাঁধা ভাবনারও জবাব দিয়েছেন তিনি।
১৯৯৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সহনশীল ইসলামী ধারার ও কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সাথে নারীদের উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরেছিলেন। ফলে রাজনীতি আর ব্যক্তি জীবনে নেওয়া তার সিদ্ধান্তগুলো কারও কারও কাছে বিপরীতমুখী মনে হলেও, নিজ চিন্তায় তাতে সামঞ্জস্য আছে বলেও মনে করেন অনেকে।
সাদা সুতি শাড়ি থেকে শিফন, জর্জেট
সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা স্বামী জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে এসেছিলেন প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া।
পরনে সাদা রঙের সুতি বা তাঁতের শাড়ি, মাথায় আধোঘোমটা টেনে এক সময়ের গৃহবধূ হাল ধরেন দলের, নেতৃত্ব দেন স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের।
যদিও তার আগে স্বামীর সাথে তোলা ছবি বা ঘরোয়া পরিবেশে তাকে ঘোমটা দিতে দেখা যায়নি। নির্বাচনে জয়ী হয়ে শপথ নেন বাংলাদেশের প্রথম ও মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। সময়ের সাথে তার সাজপোশাকেও আসে কিছুটা পরিবর্তন।
আন্দোলনের মাঠে যেখানে তাকে বেশিরভাগ সময় দেশিয় শাড়িতেই বেশি দেখা গেছে, ক্ষমতায় যাওয়ার পর বৈঠক বা সরকারি সফরে তাকে দেখা যেত একরঙা সিল্ক, জর্জেট বা শিফন শাড়িতে। সাথে থাকতো শাড়ির সাথে মিলিয়ে নেয়া শাল, সামনের দিকে খানিকটা ফুলিয়ে বাধা চুল, সীমিত অলঙ্কার, কখনও বা হাতঘড়ি, আর মর্জি হলে গোলাপি লিপস্টিকে। তার এই অবয়বকে আইকনিকও মনে করেন কেউ কেউ।
এনিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নাহরিন আই খান বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ওনার যে পোশাকটা, যে এপেয়ারেন্সে উনি (খালেদা জিয়া) আমাদের সামনে এসেছেন, সেটা আসলে আমাদের রক্ষণশীল জায়গার বিধবার রূপকে ভেঙে দেয়ার একটা জায়গা ছিল। পোশাক যেমন তার আইকন ছিল, তার ডাকটাও কিন্তু তার একটা আইকন ছিল এবং যেটা ক্রমাগত এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে তার শক্ত অবস্থানকে প্রমাণ করেছে।
প্রয়াত বিএনপি চেয়ারপার্সনকে নিয়ে ‘খালেদা’ নামে একটি বই লিখেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। সেখানে তার বাবা-মায়ের বরাত দিয়ে তিনি লিখেছেন ছোটবেলা থেকেই খালেদা জিয়া গুছিয়ে চলাফেরা করতেন, ছিলেন মৃদুভাষী।
মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায় রাজনীতিতে আসার পর তিনি কিছুটা গুটিয়ে গেলেও ‘পোশাকপরিচ্ছদের ব্যাপারে সবসময় পরিপাটি ছিলেন। তার সাজপোশাকে কোনো উগ্রতা ছিল না। এক ধরনের সম্ভ্রম জাগতো। এককথায় বলা যায় এলিগেন্ট’।
বদলে দিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতার সাজপোশাকের ধারণা
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পভাষী, গাম্ভীর্য আর সংযত আচরণ তথা খালেদা জিয়ার ব্যক্তিত্বই তাকে রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা এনে দেয়। পোশাক আর সাজে তার আধুনিক মার্জিত রুচি আর পরিমিতিবোধ সেসময় যেমন নানা বয়সী নারীদের আকৃষ্ট করেছিল, তেমনি প্রভাব ফেলেছিল তাদের সাজসজ্জাতেও। খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এনিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্টও করেন তারকাসহ অনেকে।
সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টে সংগীতশিল্পী সাজিয়া সুলতানা পুতুল লিখেছেন, ‘জীবনে প্রথম তাকে দেখেছিলাম শৈশবে… ধূসর চুল আর শুভ্র শাড়িতে মনে হয়েছিল রাষ্ট্রপ্রধান হতে হলে বোধ হয় এতটাই আভিজাত্য নিজের ভেতর ধারণ করতে হয়।’
আইরিন সুলতানা নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘খালেদা জিয়ার জীবনাবসানের পর তার রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়েই বস্তুত কথা হবে। যদিও রাজনীতিক খালেদা জিয়া ঘরের বধূ থেকে দলের নেতা হয়ে ওঠার পুরোটা সময়েই ফ্যাশন ও স্টাইলে কেতাদুরস্ত একজন নারী ছিলেন।’
বরং পর্যবেক্ষকদের ভাষায় পশ্চাৎপদ পুরুষতান্ত্রিক যে সমাজে তাকে রাজনীতিতে আসতে হয়েছে, সেখানে তার দল বা নেতৃত্বের বিপরীতে এসব বিষয় ঘিরে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকারই হতে হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
সভা-সমাবেশতো বটেই, এমনকি সংসদে দাঁড়িয়েও তার সাজপোশাক নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কটাক্ষ করার নজির রয়েছে, যা প্রকাশিত হয়েছে নানা সংবাদমাধ্যমে। আর তাতে কোনো অংশে পিছিয়ে ছিলেন না নারী নেতৃত্বও। খোদ ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমের সামনে তার ভ্রু আঁকা কিংবা সাজগোজ নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন।
এধরনের কর্মকান্ডকে ‘ব্যক্তিগত রোষানল’ আর মোটাদাগে ছকে আঁকা নারী রাজনৈতিক নেতার চেয়ে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের ফলে ‘হজম’ করতে না পারাকেই কারণ হিসেবে দেখেন পর্যবেক্ষকদের অনেকে।
অধ্যাপক নাহরিন আই খান বলেছিলেন, ‘উনিতো সত্যিকার অর্থেই ট্র্যাডিশনাল সুন্দরী ছিলেন, একারণে ওনাকে অনেকের ব্যক্তিগত রোষানলে পড়তে হয়েছে।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগে মুসলিম লীগ ও পরবর্তী সময়ে নারী রাজনৈতিক নেতাদের যে ইমেজ ছিল তাদের তুলনায় খালেদা জিয়াকে ‘একটু ডিস্টিংক্ট (স্বতন্ত্র) মনে হতো’ বলে মন্তব্য করেন তিনি। ‘এই পার্থক্যটা অনেকে হজম করতে পারতেন না। এটাই হলো সমস্যা’ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
নারী নেতৃত্ব মেনে নিয়ে একই মঞ্চে ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এসব আক্রমণ-সমালোচনায় কখনো জবাব দেননি খালেদা জিয়া, দমেও যাননি। বরং বজায় রেখেছেন নিজের পছন্দের সাজপোশাক, জনপ্রিয়তা দিয়ে দাপিয়ে বেরিয়েছেন রাজনীতির মাঠ। এমনকি ধর্মভিত্তিক যেসব রাজনৈতিক দলের নেতারা নারী নেতৃত্বকে সমর্থন করে না, তারাও খালেদা জিয়াকে সামনে রেখে করেছেন রাজনৈতিক জোট, একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে করেছেন সভা-সমাবেশ আর আন্দোলন।
মহিউদ্দিন আহমদ বলছিলেন, ‘পশ্চাৎপদ এই সমাজে এমনিতেই নারীদের প্রতি একটি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। এমনকি এবারও ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে নারীদের মনোনয়ন দিতে দেখা যায়নি। কিন্তু এরকম একটা সমাজে একজন নারীকে রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে গ্রহণ করতে তাদের দ্বিধান্বিত দেখিনি। বা হতে পারে তারা বাধ্য হয়েছেন, তাদের এটা গিলতে হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘কিন্তু খালেদা জিয়ার যে জনপ্রিয়তা এবং যে বিপুল পরিমাণ আগ্রহ তাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের – জীবনে কোনো নির্বাচনে হারেন নাই। এরকম একজন ব্যক্তিকে মেনে নেয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না- এভাবেও বলা যায়।’
এমনকি নির্বাচনের জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে নিজের বেশভূষায়ও কখনও বদল আনেননি খালেদা জিয়া।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, ‘যতদিন তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, তিনি কট্টরবাদী লেবাসে যান নাই।’
মৃত্যুর আগে পরিবারের সাথে তোলা ছবিতেও খালেদা জিয়াকে দেখা গেছে একই ধরনের শাড়ি আর সাজে।
অধ্যাপক নাহরিন আই খান বলছিলেন ‘ওনাকে কিন্তু ইলেকশনের আগে কখনও হিজাব পরে আসতে হয়নি বা তসবিহ নিয়ে আসতে হয়নি। উনি যে পোশাকে ছিলেন, ওনার মৃত্যুর আগ পর্যন্ত একই ধারায় চলেছেন এবং শক্ত হাতে উনি ইসলামিক দলকে কন্ট্রোল করেছেন, উনি জাতীয়তাবাদকে ধারণ করেছেন এবং ওনার দলওকে ৪৪ বছর ধরে ম্যানেজ করে চলেছেন।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
রাজবাড়ী শহরের সজ্জনকান্দায় মসজিদের সামনে গুলিতে নিহত ডিশ ব্যবসায়ী পিয়ারুল ইসলাম (৩৫) হত্যার ঘটনায় মামলা হয়েছে। নিহতের স্ত্রী ফারজানা হক বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে রাজবাড়ী সদর থানায় মামলাটি দায়ের করেছেন। রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন রাজবাড়ী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার ঘোষ। এর আগে শনিবার রাতে দায়ের করা মামলাটির নম্বর ২০। এতে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। নিহত পিয়ারুল ইসলাম রাজবাড়ী সদর উপজেলার রামকান্তপুর ইউনিয়নের বড় মুরারীপুর গ্রামের হারুন সরদারের ছেলে। তিনি কয়েক বছর ধরে রাজবাড়ী পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সজ্জনকান্দা পূর্বপাড়া এলাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতেন। ওই এলাকায় ডিশ লাইনের ব্যবসা করতেন তিনি। পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পিয়ারুলের বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, ডাকাতি ও মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে একাধিক থানায় ১৪টি মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়ভাবে তিনি সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মসজিদের সামনে গুলি মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ১৬ অক্টোবর সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৩৫ মিনিটে সজ্জনকান্দা পূর্বপাড়া জামে মসজিদে নামাজ শেষে উত্তর পাশের কলাপসিবল গেটের সামনে পাকা রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিলেন পিয়ারুল। এ সময় দুটি মোটরসাইকেলে করে চারজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি সেখানে এসে থামেন। তাদের মধ্যে একজন আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে পিয়ারুলকে লক্ষ্য করে পরপর দুই রাউন্ড গুলি ছোড়েন। এতে একটি গুলি তার বুকের বাঁ পাশে লাগে। গুরুতর আহত অবস্থায় তিনি রাস্তায় পড়ে যান। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থলে ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করেন। পরে রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে অবস্থার অবনতি হওয়ায় কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। তবে অ্যাম্বুলেন্সে করে ফরিদপুরে নেওয়ার পথে রাত আনুমানিক ৮টা ৫ মিনিটে গোয়ালন্দ মোড় এলাকায় পৌঁছালে পিয়ারুলের মৃত্যু হয়। ময়নাতদন্ত শেষে দাফন পরে পিয়ারুলের মরদেহ রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ফিরিয়ে আনা হয়। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের ব্যবস্থা করে। ১৭ অক্টোবর ময়নাতদন্ত শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হয়। ওই দিন আসরের নামাজের পর সজ্জনকান্দা ভোকেশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। পূর্ববিরোধের জেরে হত্যার সন্দেহ মামলার এজাহারে নিহতের স্ত্রী উল্লেখ করেছেন, পূর্ববিরোধের জেরে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা পরস্পর যোগসাজশে পূর্বপরিকল্পিতভাবে প্রকাশ্যে গুলি করে তার স্বামীকে হত্যা করেছেন বলে তিনি ধারণা করছেন। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। রাজবাড়ী সদর থানার ওসি উত্তম কুমার ঘোষ বলেন, পিয়ারুলের স্ত্রী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেছেন। পুলিশ মামলাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছে। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা এবং এর পেছনের কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে।
আয়ের তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক বেড়েছে। শহরের তুলনায় গ্রামের পরিবারগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দেশের ৪৭ দশমিক ৪২ শতাংশ পরিবার ঋণগ্রস্ত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) করা এক বিশেষ জরিপে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিবিএসের ‘দারিদ্র্য ও জীবিকা পরিসংখ্যান সেল’ পরিচালিত ‘লিভিং স্ট্যান্ডার্ড সার্ভে ২০২৫’ অনুযায়ী, গত এক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে গিয়ে গ্রামের ৫১ দশমিক ৯১ শতাংশ, শহরাঞ্চলের ৪০ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং সিটি করপোরেশন এলাকার ৩২ দশমিক ১১ শতাংশ পরিবার ঋণ করতে বাধ্য হয়েছে। গত বছরের ১৪ থেকে ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই জরিপটি পরিচালনা করা হয়। এতে গ্রামীণ, শহরাঞ্চল ও সিটি করপোরেশন এলাকার মোট তিন হাজার পরিবারের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। ১৫০টি নমুনা এলাকা (স্যাম্পলিং ইউনিট) থেকে ট্যাবলেট ডিভাইস ও ডিজিটাল কম্পিউটার অ্যাসিস্টেড পার্সোনাল ইন্টারভিউয়িং পদ্ধতিতে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়। জরিপে থেকে জানা যায়, জাতীয় পর্যায়ে পরিবারপ্রতি গড় মাসিক আয় ৩৩ হাজার ৫১৩ টাকা, যেখানে গড় মাসিক ব্যয় ৩৫ হাজার ৩১১ টাকা। পরিবারপ্রতি সবচেয়ে বেশি মাসিক গড় ব্যয় সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে ৪৬ হাজার ৭৭৮ টাকা। এরপরে রয়েছে শহরাঞ্চলে গড়ে ৩৭ হাজার ৩৪৪ টাকা ও গ্রামীণ এলাকায় ৩২ হাজার ৫৩২ টাকা। জাতীয় পর্যায়ে মাসিক খরচের অর্ধেক খাদ্যে এবং বাকি অর্ধেক খাদ্যবহির্ভূত খাতে ব্যয় হয়, তবে অঞ্চলভেদে এর ভিন্নতা রয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় খাদ্যের পেছনে খরচ বেশি হয়, অন্যদিকে শহরাঞ্চলে খাদ্যবহির্ভূত খাতে খরচ বেশি। সিটি করপোরেশন এলাকাগুলোতে মাসিক খরচের ৫৬ দশমিক ৭ শতাংশই ব্যয় হয় খাদ্যবহির্ভূত খাতে। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মহামারির পর থেকে বাংলাদেশ যে দুর্বল সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এই জরিপের ফলাফল যেন তারই এক প্রতিচ্ছবি। সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা ৫৬ মাস ধরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে মূল্যস্ফীতির হার বেশি ছিল। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘মজুরি হার সূচক’ অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে মজুরি বৃদ্ধির হার কমে ৭ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়ায়, যা আগের মাসে ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ। এই সূচকের মাধ্যমে কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ৬৩টি পেশার স্বল্প আয়ের দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মাসিক মজুরির হিসাব রাখা হয়। গত ৬ অক্টোবর প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের সবশেষ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট আপডেটের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক মন্দা মানুষের জীবনযাত্রার মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এর পেছনে মূল কারণ হলো শ্রমের চাহিদায় ঘাটতি এবং টানা উচ্চ মূল্যস্ফীতি। এর প্রভাবে দেশে জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে আনুমানিক ২২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
২২ অক্টোবর ও ৫ নভেম্বর খুলনা সফর করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। সম্ভাব্য এ সফর ঘিরে প্রস্তুতি শুরু করেছে প্রশাসন। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এটিই হবে তারেক রহমানের প্রথম খুলনা সফর। সম্ভাব্য সফরসূচি অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান হয়ে আকরাম পয়েন্টে যাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে এলএনজি আমদানি ও পুনর্গ্যাসীকরণের অবকাঠামো স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই করা হবে। ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে জাহাজে আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সংরক্ষণ করা হয়। পরে তা গ্যাসীয় অবস্থায় রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এ ধরনের টার্মিনাল স্থাপনের মাধ্যমে এলএনজি গ্রহণ ও গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে আকরাম পয়েন্টে প্রকল্পটির চূড়ান্ত অনুমোদন, বিনিয়োগ, নির্মাণকাজ শুরুর সময় এবং গ্যাস সরবরাহের সময়সূচি এখনো নিশ্চিত হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য পরিদর্শন প্রকল্পটির উপযোগিতা যাচাইয়ের অংশ। প্রধানমন্ত্রীর এ সফর সামনে রেখে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) দাকোপের নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠ পরিদর্শন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও খুলনা-৩ আসনের সংসদ সদস্য রকিবুল ইসলাম বকুল। এ সময় খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান, খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পীসহ স্থানীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বোরহান উদ্দিন মিঠু জানান, সূচি অনুযায়ী, ২২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী হেলিকপ্টারে নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণ করবেন। সেখান থেকে কোস্টগার্ডের স্পিডবোটে আকরাম পয়েন্টে যাবেন। তবে দাকোপে তার কোনো প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নেই। খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরটি সরকারি। স্থানীয়ভাবে কোনো কর্মসূচি না থাকলেও তার আগমন ঘিরে প্রশাসন ও স্থানীয় নেতারা প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এলাকার মানুষ প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন। এদিকে, আগামী ৫ নভেম্বর বিকাল ৪টায় খুলনা জেলা স্টেডিয়ামে নতুন কুঁড়ি স্পোর্টসের দ্বিতীয় আসরের উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এ উপলক্ষে গত ১২ অক্টোবর খুলনা জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে একটি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধানমন্ত্রীর সফর সামনে রেখে সরকারি দপ্তরগুলোর প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি কর্মকর্তাদের নিয়মিত অফিসে উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং অপ্রয়োজনে নৈমিত্তিক ছুটি নেওয়ার প্রবণতা কমানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়।