জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরাসরি প্রচারে নেমেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়সহ সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সিল দেওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে সরকার সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রচারণার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়েছে। গণভোট ঘিরে সরকারের এ অবস্থান নিয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারও গণভোটের একটি পক্ষ। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, তাই সরকারের প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বরাত দিয়ে তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, সরকার নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে এবং এতে কোনো আইনগত বাধা নেই। রোববার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন,
“সরকার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করবে এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করবে। এ বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়েছে। তারা লিখিতভাবে জানিয়েছেন, সরকার চাইলে এ ধরনের প্রচার চালাতে পারে—এতে কোনো আইনগত বাধা নেই।”
গতকাল প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১১ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আটটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হবে। এসব ফটোকার্ডে লেখা রয়েছে—
‘আমাদের সবার স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবে গড়ার জন্য হ্যাঁ-তে সিল দিন।’
এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আব্দুল আলীম কালবেলাকে বলেন,
“অন্তর্বর্তী সরকার মূলত একটি সংস্কার সরকার। এ সরকারের প্রধান এজেন্ডাই ছিল সংস্কার। এজন্য একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে, ঐকমত্য কমিশন হয়েছে এবং জুলাই জাতীয় সনদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুলাই সনদের অন্তত ৩০টি ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। সরকার নিজেও এই প্রক্রিয়ার একটি অংশ।”
তিনি আরও বলেন,
“এর আগের গণভোটগুলোর ক্ষেত্রেও সরকার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। সারা বিশ্বেই সাধারণত সরকার গণভোটের পক্ষে কথা বলে। ফলে এ ক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগও নেই।”
এদিকে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, সত্যিকারের সংস্কার চাইলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে। গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন,
“১২ ফেব্রুয়ারি যে দ্বিতীয় ভোটটি দেওয়া হবে, সেটিই হচ্ছে গণভোট। এটি দেশের ক্ষমতার ভার শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে জনগণের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। যারা প্রকৃত সংস্কার চান, তাদের অবশ্যই হ্যাঁ বলতে হবে।”
অন্যদিকে, উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন,
“যদি আমরা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও আয়নাঘরের অন্ধকার দিনে ফিরে যেতে না চাই, তাহলে আমাদের গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে এবং হ্যাঁ ভোট দিতে হবে।”
এছাড়া বরিশালে এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে ইমামদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন,
“গণভোট সাধারণ ভোটের মতো নয়। এটি নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে—তারই রূপরেখা।”
উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটের ব্যালট পেপারে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব থাকবে। প্রতিটি প্রস্তাবের বিপরীতে ভোটাররা শুধু ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’—এই দুই বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নেবেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে সরাসরি প্রচারে নেমেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এরই মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়সহ সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও দপ্তরের মাধ্যমে প্রচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। পাশাপাশি দেশজুড়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচি। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটে সিল দেওয়ার জন্য উৎসাহ দিতে সরকার সোশ্যাল মিডিয়াকে প্রচারণার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে ফটোকার্ড প্রকাশ করা হয়েছে। গণভোট ঘিরে সরকারের এ অবস্থান নিয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারও গণভোটের একটি পক্ষ। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, তাই সরকারের প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বরাত দিয়ে তার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, সরকার নিজেই ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে এবং এতে কোনো আইনগত বাধা নেই। রোববার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “সরকার হ্যাঁ ভোটের পক্ষে ক্যাম্পেইন করবে এবং জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করবে। এ বিষয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইন বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে মতামত নেওয়া হয়েছে। তারা লিখিতভাবে জানিয়েছেন, সরকার চাইলে এ ধরনের প্রচার চালাতে পারে—এতে কোনো আইনগত বাধা নেই।” গতকাল প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ১১ জানুয়ারি থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আটটি ফটোকার্ড প্রকাশ করা হবে। এসব ফটোকার্ডে লেখা রয়েছে— ‘আমাদের সবার স্বপ্নের বাংলাদেশ বাস্তবে গড়ার জন্য হ্যাঁ-তে সিল দিন।’ এ বিষয়ে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আব্দুল আলীম কালবেলাকে বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার মূলত একটি সংস্কার সরকার। এ সরকারের প্রধান এজেন্ডাই ছিল সংস্কার। এজন্য একাধিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে, ঐকমত্য কমিশন হয়েছে এবং জুলাই জাতীয় সনদের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জুলাই সনদের অন্তত ৩০টি ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। সরকার নিজেও এই প্রক্রিয়ার একটি অংশ।” তিনি আরও বলেন, “এর আগের গণভোটগুলোর ক্ষেত্রেও সরকার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছিল। সারা বিশ্বেই সাধারণত সরকার গণভোটের পক্ষে কথা বলে। ফলে এ ক্ষেত্রে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগও নেই।” এদিকে, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছেন, সত্যিকারের সংস্কার চাইলে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলতে হবে। গতকাল ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি যে দ্বিতীয় ভোটটি দেওয়া হবে, সেটিই হচ্ছে গণভোট। এটি দেশের ক্ষমতার ভার শাসকগোষ্ঠীর কাছ থেকে জনগণের দিকে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। যারা প্রকৃত সংস্কার চান, তাদের অবশ্যই হ্যাঁ বলতে হবে।” অন্যদিকে, উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, “যদি আমরা গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্যাতন ও আয়নাঘরের অন্ধকার দিনে ফিরে যেতে না চাই, তাহলে আমাদের গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে এবং হ্যাঁ ভোট দিতে হবে।” এছাড়া বরিশালে এক অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ গণভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে ইমামদের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “গণভোট সাধারণ ভোটের মতো নয়। এটি নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে—তারই রূপরেখা।” উল্লেখ্য, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। গণভোটের ব্যালট পেপারে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের চারটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব থাকবে। প্রতিটি প্রস্তাবের বিপরীতে ভোটাররা শুধু ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’—এই দুই বিকল্পের মধ্যে একটি বেছে নেবেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সাহেদ আলীসহ ১০ জনকে হত্যাচেষ্টা মামলায় ‘আহতদের হদিস না পেয়ে’ ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে অব্যাহতির সুপারিশ করেছে পিবিআই। ‘তথ্যগত ভুল’ থাকার কথা উল্লেখ করে গত ৫ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ঠিক রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই আবুল বাশার। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সাবেক মন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মোহাম্মদ এ আরাফাত, জুনাইদ আহমেদ পলক, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব উল আলম হানিফ, শামীম ওসমান, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। পটপরিবর্তনের পর ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ধানমন্ডি থানায় মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্যে সীমান্ত স্কয়ার থেকে কাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে ৪ অগাস্ট ধানমন্ডি ২৭-এর মীনা বাজারের সামনে আহত হন সাহেদ আলী। সেসময় ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীসহ মোট ৯জন আহত হন। এ ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে আসামি করে মামলা করেন সাহেদের কথিত ভাই শরীফ। থানা পুলিশ মামলার তদন্তকালে চারজনকে গ্রেপ্তার করে। এরপর মামলার তদন্তভার পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তদন্তকালে আহতদের খুঁজে পাননি তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক শাহজাহান ভূঞাঁ। জানতে চাইলে পিবিআই কর্মকর্তা শাহজাহান ভূঞাঁ বলেন, “জুলাই আন্দোলনে আহতদের নিয়ে গেজেট হয়েছে। এ মামলায় যে সমস্ত আহতদের কথা বলা হয়েছে, গেজেটে তাদের নাম পাইনি। “তথ্যগত ভুলের কারণে আপাতত আসামিদের অব্যাহতি চেয়ে প্রতিবেদন দিয়েছি। যদি পরবর্তীতে আহতদের তথ্য পাওয়া যায়, পরে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হবে।” বাদী শরীফ এজাহারে উল্লেখ করেন, তার ভাই ছাড়াও ঢাকা কলেজ ও সিটি কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়। তবে পর্যাপ্ত তথ্য, পূর্ণাঙ্গ নাম-ঠিকানা, ক্লাস রোল না থাকায় কলেজে খুঁজেও তাদের তথ্য পাননি তদন্ত কর্মকর্তা। তদন্ত কর্মকর্তা আশপাশের হাসপাতালেও খবর নেন। তবে মামলায় যেসব আহতের নাম বলা হয়েছে, তারা হাসপাতালে ভর্তি হননি বা চিকিৎসা নেননি। মামলার বাদী শরীফ বলেন, “ওই ঘটনার সময় আমিও সেখানে ছিলাম। আমাকে মারধর করা হয়। অনেকে আহত হয়। জুলাই-অগাস্টের মামলায় পুলিশ সত্যতা পায়নি, বিষয়টা কেমন যেন! “আহতরা বিভিন্ন ফার্মেসি, বিভিন্ন জায়গা থেকে ট্রিটমেন্ট নিয়েছে। আর ওই সময় তো চিকিৎসা নেওয়াটা কেমন ছিল–আমরা সবাই জানি।” মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজাহারে উল্লেখিত আহত সাহেদ আলী, রাশেদ, জুয়েল, মাহমুদ, নাহিদ, রাসেল, মিরাজ, জান্নাতুল ফেরদৌস নাঈমা, আইশ আক্তার, সাম্মি আক্তারের সন্ধান পাননি তদন্ত কর্মকর্তা। তাদের চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো তথ্য–কোন হাসপাতালে বা ক্লিনিকে বা অন্য কোনো স্থানে চিকিৎসা নিয়েছে কি না তা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। আহতদের কোনো তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় শেখ হাসিনাসহ ১১৩ জনকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহান ভূঞাঁ মামলার বাদী শরীফের ভাই সাহেদ আলীসহ অন্যান্য আহতদের সন্ধান করার জন্য সীমান্ত স্কয়ার মার্কেট, ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ এবং ঘটনাস্থলের আশেপাশের হাসপাতালে চিঠি দিয়ে প্রতিবেদন সংগ্রহ করেন। বাদীকে নোটিস দিয়ে অনুরোধ করেন তার ভাইকে থানায় হাজির করতে। তবে তাতে সাড়া মেলেনি। তদন্ত কর্মকর্তা শাহজাহানের ভাষ্য, মামলা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য বাদীর হাজারীবাগের ভাড়া বাসায় নোটিস পাঠানো হয়। তবে বাড়িওয়ালা জানান, শরীফ নামের কাউকে চেনেন না এবং সেখানে থাকে না। পরে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করে বের করেন, বাদীর নাম শরিফুল ইসলাম। লক্ষ¥ীপুর সদরের মান্দারী এলাকার সিরাজুল ইসলামের ছেলে। সেখানে খবর নিলে তাকে কেউ চিনতে পারেননি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাদীর মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকে। তবে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর কখনো খোলা থাকে, আবার কখনো বন্ধ থাকে। হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করেন তদন্ত কর্মকর্তা। বেশ কয়েকদিন অপেক্ষার পর শরীফ ধানমন্ডি লেকের পাশে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেন। তদন্ত কর্মকর্তা ভুক্তভোগীকে হাজির করতে এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র সরবরাহের অনুরোধ জানান। তবে দীর্ঘদিন পার হলেও তিনি ভুক্তভোগীকে হাজির বা চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র সরবরাহ করেননি। চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনো তথ্য এজাহারেও উল্লেখ করেননি বাদী। তবে মামলার বাদী শরীফ বলেন, “আমি তদন্ত সংস্থার সাথে সাক্ষাৎ করেছি। মামলাটা নিয়ে থ্রেটও এসেছে। আসামিরা থ্রেট দিয়েছে। বিচার চাওয়াটা কি অপরাধ?” এ মামলায় থানা পুলিশ চার আসামিকে গ্রেপ্তার করেছিল। তারা হলেন¬–শাকিল হোসেন ইমরান, কামরুল হাসান ওরফে কামু, মারুফ হোসেন ও মাসুদ রানা বেপারী। কামরুল হাসান ওরফে কামুর আইনজীবী পীযূষ কান্তি বলেন, “আমার আসামি হয়রানির শিকার হল। আদালতকে আমরা বিষয়টা বলেছি। বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আদালতও পরিস্থিতির শিকার।”
দিনাজপুর দীর্ঘ ৩ দশক পর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৬ আসনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্ষীয়ান নেতা ডা. এ. জেড. এম জাহিদ হোসেনকে একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি। বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট উপজেলা নিয়ে গঠিত দেশের সর্ববৃহৎ সংসদীয় নির্বাচনী এলাকা দিনাজপুর-৬ এলাকায় দীর্ঘদিন পর বিএনপি’র একক প্রার্থী ডা. জাহিদ হোসেনকে পেয়ে তার গণসংযোগে নেতাকর্মী ও ভোটার সমর্থকরা বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায় গ্রহণ করেছেন। তার নির্বাচনী এলাকা ঘোড়াঘাট উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি এস এম শামীম হোসেন চৌধুরী বলেন, গণসংযোগকালে তিনি ওই এলাকার সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে মিশে গিয়েছেন। উপস্থিত কোনো অসুস্থ রোগী পেলে তিনি তাকে তাৎক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দিচ্ছেন। নির্বাচনী এলাকায় সব ধরনের লোকের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও পরিচিতি পর্ব চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ ৩ দশক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে দিনাজপুর-৬ আসনে বিএনপি একক প্রার্থী ঘোষণা করেছে। ধানের শীষের প্রার্থী হিসাবে ডা. জাহিদ হোসেনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা হওয়ার পর থেকে ওই এলাকার সর্বস্তরের মানুষ ও বিএনপি’র নেতাকর্মীরা তাকে নিয়ে সকল ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে মতবিনিময় করছেন। আজ রোববার সন্ধ্যায় এ বিষয়ে ডা. এ. জেড. এম জাহিদ হোসেন বলেন, তাকে এই আসনে বিএনপি’র প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘদিন পর নিজ দলের একক প্রার্থী পাওয়ায় আশাবাদী হয়ে উঠেছেন বিএনপি’র নেতাকর্মী-সমর্থক ও সাধারণ ভোটাররা। নেতাকর্মীরা মনে করছেন, ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে এবার এই আসনে বিএনপি’র প্রতীক ধানের শীষের বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব হবে। নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের প্রত্যাশা অনুযায়ী তিনি নির্বাচিত হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিসহ এলাকার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। তিনি আরও বলেন, দিনাজপুর-৬ আসনের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, স্বাধীনতার পর এ আসন থেকে ন্যাপ, স্বতন্ত্র প্রার্থী, জামায়াতে ইসলামী ও আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। জোট রাজনীতির কারণে বিগত কয়েকটি নির্বাচনে বিএনপি এখানে একক প্রার্থী দিতে পারেনি। ফলে দীর্ঘ প্রায় ৪০ বছর পর এবারই প্রথম দলটি নিজেদের একক প্রার্থী নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে যাচ্ছে।