বাংলাদেশে বিএনপির নতুন সরকার এ মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়া বা ওই পদে পরিবর্তনের চিন্তা করছে না। রাষ্ট্রপ্রধানের পদে পরিবর্তনের প্রশ্নে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি বলেই সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানাচ্ছে।
তবে ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বড় বিজয় নিয়ে বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকেই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন প্রশ্নে নানা আলোচনা চলছে রাজনীতিতে।
এমনকি বিএনপির কারা রাষ্ট্রপতি হতে পারেন, অনেক নাম দিয়েও খবর হচ্ছে সংবাদমাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যমেও রয়েছে অনেক নাম নিয়ে আলোচনা। দলটির নেতা-কর্মীদেরও অনেকে ধারণা করছেন, রাষ্ট্রপতি পদে পরিবর্তন আসতে পারে।
যদিও বিএনপির নীনিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদের এখনো অনেকটা সময় বাকি আছে। ফলে সংবিধান অনুযায়ী এখনই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিষয় নেই।
তারা এই প্রশ্নও করছেন যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রশ্ন কেন তোলা হচ্ছে?
প্রসঙ্গত, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল পাঁচ বছর মেয়াদে রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্বে আসেন মো. সাহাবুদ্দিন। ফলে তার মেয়াদ রয়েছে ২০২৮ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু মেয়াদ রয়েছে, সেখানে মো. সাহাবুদ্দিন যদি পদত্যাগ না করেন অথবা তাকে অভিশংসন বা অপসারণ না করা পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আইনগত সুযোগ নেই।
কিন্তু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন মো. সাহাবুদ্দিন।
ফলে আলোচনায় আসছে, সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া বিএনপি সরকার চাইলেই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে, সেটা তারা করবে কি না।
রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের প্রশ্নে বিএনপির শীর্ষ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনো তাদের শীর্ষ পর্যায়ের অন্য নেতাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা করেননি বলে জানা গেছে।
দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, বিষয়টি নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আরেকজন নেতার বক্তব্য হচ্ছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর সেই আন্দোলনের নেতৃত্বের একটা আংশ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি তুলেছিল। বিএনপি নেতাদের অনেকের ধারণা, সদ্য বিদায় নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের একটা অংশও ওই দাবির পেছনে ছিল।
সে সময় সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা উল্লেখ করে বিএনপি প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিল রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবির বিপক্ষে।
তখন তাদের যুক্তি ছিল, রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়া হলে দেশে সংবিধান ও আইন বহির্ভূত একটা অরাজকতা বা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। কোনো কোনো মহল সে ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে চেয়েছিল।
সেই উদাহরণ টেনে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতা জানান, বিএনপি এবং তাদের সরকার এখন পর্যন্ত সংবিধান সমুন্নত রাখার পুরোনো অবস্থানেই আছে।
বিএনপি নেতৃত্ব নতুন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ গঠনসহ সামনে চলার ক্ষেত্রে সংবিধান সমুন্নত রাখার কথা বলছেন।
সে অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসতে যাচ্ছে আগামী ১২ই মার্চ।
সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিনেই স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন করা হবে।
নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে ভাষণ দেওয়ার কথা রয়েছে।
জুলাই আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি এখন জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের এই ভাষণেরও বিরোধিতা করছে। তারা রাষ্ট্রপতিকে সংসদে অভিশংসন বা অপসারণের দাবিও তুলেছে।
তাদের যুক্তি, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সংসদ গঠিত হচ্ছে। সেই সংসদে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের আমলের রাষ্ট্রপতি ভাষণ দিতে পারেন না।
এনসিপির এই অবস্থানের প্রতি সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীরও সমর্থন রয়েছে বলে দলটির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে।
আইনজ্ঞরা বলছেন, এনসিপি ও জামায়াতের এমন অবস্থান পুরোনো ও রাজনৈতিক। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের শুরু থেকেই তাদের এই অবস্থান ছিল রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে।
বিএনপি অবশ্য এনসিপিসহ বিভিন্ন দলের ওই অবস্থানকে আমলে নিচ্ছে না। সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
এর মানে বিএনপি সরকার এখনই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের পথে যাচ্ছে না এবং পরিবর্তন করতে চাইলে সেজন্য সময় নেবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
সরকারের ভেতরেও এ নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা নেই বলেও সংশ্লিষ্টরা বলছেন।
আর বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান যেহেতু দলের বা সরকারের অন্য নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে এখনো কোনো আলোচনা করেননি।
ফলে তারা সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে বহাল রাখার পুরোনো অবস্থানেই থাকার কথা বলছেন।
কিন্তু ভিন্নমতও আছে বিএনপির সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে। তাদের কেউ কেউ বলছেন, জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি। সেখানে ভিন্ন রাজনীতির কাউকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বহাল রেখে সংবিধান সমুন্নত রাখার বিষয়টি তাদের কাছে যৌক্তিক নয়।
তাদের বক্তব্য হচ্ছে, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকারই সংবিধান সমুন্নত রাখবে এবং বিএনপি চাইলেই রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন করতে পারে।
তবে যারা আপাতত রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন চান না, তারা চান সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যেন তাদের নির্বাচিত রাষ্ট্রপতির মেয়াদ থাকে। আপাতত রাষ্ট্রপতি পরিবর্তন না করার চিন্তার পেছনে এটি অন্যতম যুক্তি হিসেবে আসছে।
যদিও রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সংসদে ভাষণ দেওয়ার বিরোধীতা করছে এনসিপিসহ বিভিন্ন দল।
কিন্তু বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদের জন্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ তৈরি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ নিয়ে আলোচনাও করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংসদের জন্য রাষ্ট্রপতির ভাষণ এখন প্রস্তুত।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণে কি থাকবে, তা সরকারের পক্ষ থেকে ঠিক করে মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করতে হয়।
অর্থ্যাৎ যখন যে রাজনৈতিক সরকার থাকে, সংসদের প্রথম অধিবেশনে বা বছরের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণে সেই সরকারের বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
এর আগে রাষ্ট্রপতিরা সেভাবেই ভাষণ দিয়েছেন সংসদে। শুধু ব্যতিক্রম করেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে তাদের প্রথম সরকারে এসে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে।
তিনি পাঁচ বছর রাষ্ট্রপতি থাকার সময় সংসদে বছরের প্রথম অধিবেশনে তৎকালীন সরকার অনুমোদিত ভাষণ পড়তেন।
তিনি ভাষণের শেষে গিয়ে দুএকটি বাক্য নিজ থেকে বলতেন এবং সেটাই শিরোনাম হতো সংবাদ মাধ্যমে।
আওয়ামী লীগের সেই সরকারের একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল, এর পেছনে বিভিন্ন কারণের মধ্যে সংসদে বিচারপতি আহমদের স্বাধীনভাবে দুএকটি বাক্য বলার বিষয়টিও অন্যতম কারণ ছিল। যা নিয়ে সে সময় অনেক আলোচনাও হয়েছে।
এখন বিএনপি সরকার সংসদে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ দেওয়ার ব্যাপারে যে ব্যবস্থা নিচ্ছে, তাতেই নতুন সরকার সংবিধানের বিরোধীতাকারীদের জন্য একটা বার্তা দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করেন।
তারা বলছেন, আগের রাষ্ট্রপতিকে বহাল রেখে বিএনপি সরকার তাদের যাত্রার প্রথম পর্যায়ে সংসদ গঠন করাসহ সাংবিধানিক কাজগুলো সেরে নিতে চাইছে। একইসঙ্গে সংবিধান সমুন্নত রাখার যে কথা দলটি বলে আসছে, সেই অবস্থানে থাকার ব্যাপারেও একটা বার্তা দেওয়া হচ্ছে বিরোধীদের প্রতি।
কিন্তু এমন অবস্থান নিয়ে বিএনপির ভেতরেও প্রশ্ন আছে।
প্রথমত রাষ্ট্রপতির পদে থাকা ব্যক্তি নিজে থেকে পদত্যাগ করলে ওই পদ শূন্য হবে। তখন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে কোনো বাধা থাকে না।
সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যেতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে সংবিধান লঙ্ঘন ও গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগ থাকতে হবে।
এই অভিশংসন প্রশ্নে সংবিধানে যা বলা আছে, সাধু ভাষায় ওই অংশ হুবহু তুলে ধরা হলো––
৫২। ১. এই সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসিত করা যাইতে পারিবে; ইহার জন্য সংসদের মোট সদস্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের স্বাক্ষরে অনুরূপ অভিযোগের বিবরণ লিপিবদ্ধ করিয়া একটি প্রস্তাবের নোটিশ স্পীকারের নিকট প্রদান করিতে হইবে; স্পীকারের নিকট অনুরূপ নোটিশ প্রদানের দিন হইতে চৌদ্দ দিনের পূর্বে বা ত্রিশ দিনের পর এই প্রস্তাব আলোচিত হইতে পারিবে না; এবং সংসদ অধিবেশনরত না থাকিলে স্পিকার অবিলম্বে সংসদ আহ্বান করিবেন।
২. এই অনুচ্ছেদের অধীন কোনো অভিযোগ তদন্তের জন্য সংসদ কর্তৃক নিযুক্ত বা আখ্যায়িত কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট সংসদ রাষ্ট্রপতির আচরণ গোচর করিতে পারিবেন।
৩. অভিযোগ-বিবেচনাকালে রাষ্ট্রপতির উপস্থিত থাকিবার এবং প্রতিনিধি-প্রেরণের অধিকার থাকিবে।
এছাড়া সংবিধানে বলা হয়েছে, শারীরিক ও মানসিক অসামর্থের কারণে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোটে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা যায়।
তখন সংসদে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের সুযোগ তৈরি হয়।
অভিশংসন বা অপসারণ-এই উপায়গুলো অনুসরণ করলে রাষ্ট্রপতিকে সরানোর দায় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের ওপর বর্তায় বলে উল্লেখ করেন সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শাহদীন মালিক।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বলছেন, এ মুহূর্তে এই দুই পথের কোনো পথই অনুসরণ করতে চান না তারা।
সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিন নিজ থেকে পদত্যাগ করলে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন।
প্রসঙ্গত, ভোটের আগে গত ডিসেম্বর মাসে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে হোয়াটসঅ্যাপে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছিলেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর তিনি সরে যেতে চান। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি "অপমানিত বোধ করছেন"।
রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করতে হয় জাতীয় সংসদের স্পিকারের কাছে। সংবিধান অনুযায়ী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে অভিশংসনের প্রয়োজন হয় না।
১২ই মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই নতুন স্পিকার নির্বাচিত হবেন।
তবে, মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের প্রশ্নে তার সেই আগের অবস্থান থেকে কিছুটা ভিন্ন বক্তব্য এসেছে এখন।
সম্প্রতি কালের কণ্ঠ পত্রিকায় তার একটি সাক্ষাৎকারে প্রশ্ন করা হয়েছিল, বিএনপি যদি মনে করে, তারা নিজেদের মতো রাষ্ট্রপতি চায়, সে ক্ষেত্রে আপনি কী করবেন?
জবাবে তিনি বলেছেন, "যদি তারা মনে করে আমি থাকি, তাহলে আমি থাকব। আর যদি বলে যে, সরে যাওয়া ভালো; তাহলে আমি নিজেই সম্মানজনকভাবে সরে যাব"।
এদিকে, যদিও বিএনপি সরকারের উচ্চপর্যায়ের কেউ কেউ বলছেন, অভিশংসন বা অপসারণের পথে যেতে চান না তারা।
কিন্তু সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে বিএনপি রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের জন্য সংবিধানে থাকা যে কোনো উপায়ই ব্যবহার করতে পারে। সেখানে কোনো বিতর্ক কিংবা দায় এড়াতে অভিশংসন বা অপসারণের সেই পথে না গিয়েও বিএনপি চাইলে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগের জন্য বলতে পারে। তাতে জটিলতা দেখেন না বিএনপি নেতাদেরই অনেকে।
সরকারের কোনো দায়িত্বে নেই, বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের এমন একজন নেতা জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি পদে মো. সাহাবুদ্দিনের মেয়াদ ২০২৮ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আরও দুই বছর রয়েছে। এত লম্বা সময় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের রাষ্ট্রপতিকে রাখা হবে, এটাও মনে করেন না তাদের অনেকে।
অন্যদিকে, সরকার ও বিএনপির নেতাদের যারা সংবিধান সমুন্নত রাখতে মো. সাহাবুদ্দিনকেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপাতত বহাল রাখার কথা বলছেন, তাদের অবশ্য ভিন্ন একটা হিসাব-নিকাশ আছে।
সেটি যদি এভাবে বলা যায় যে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা সংস্কারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচন পরিচালনার জন্য সংবিধান সংশোধন করে তিন মাস মেয়াদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফেরত আনতে হবে।
সেই পরিস্থিতি বিবেচনায় রাখছেন বিএনপির ওই নেতারা। কারণ, বিএনপি সরকার এখন নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করলে, তার মেয়াদও পাঁচ বছর পর এই সরকারের মেয়াদের সঙ্গে শেষ হবে।
ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হলে তখন বিএনপির রাষ্ট্রপতি থাকবে না। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেহেতু নির্বাচিত হবে না, সে সময় রাষ্ট্র প্রধানের পদে নির্বাচিত ব্যক্তি না থাকলে সাংবিধানিক, রাজনৈতিক সংকট হতে পারে।
সেজন্য বিএনপি সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও যাতে একটা যথাযথ সময়ের জন্য রাষ্ট্রপতির মেয়াদ থাকে, সেটি চান সরকার ও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের অনেকে।
এমন প্রেক্ষাপটে মো. সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে বহাল রেখে তার মেয়াদ শেষে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বা তার আগেও তাকে পরিবর্তনের সাংবিধানিক উপায় বিএনপির হাতে আছে।
ফলে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা এখনই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রশ্নে চিন্তিত নন বলে মনে হয়েছে।
তবে বিএনপির সাধারণ নেতা-কর্মীরা মনে করছেন,, রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের প্রশ্নে তাদের শীর্ষ নেতা যেহেতু তার চিন্তা বা মনোভাব এখনো প্রকাশ করেন নি।
ফলে নতুন জাতীয় সংসদ যাত্রা শুরুর পর বিষয়টিতে দল ও সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হতে পারে যে, মো. সাহাবুদ্দিনই রাষ্ট্রপতি হিসেবে আপাতত বহাল থাকছেন নাকি পরিবর্তন আসবে।
উল্লেখ্য, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন অল্প সময়ের ব্যবধানে তিনটি সরকারের শপথ পড়িয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সাত মাস আগে ২০২৪ সালের ৭ই জানুয়ারি একতরফা ও বিতর্কিত নির্বাচনের পর ওই সরকারের প্রধানমন্তী-মন্ত্রীদের শপথ পড়িয়েছিলেন তিনি।
আওয়ামী লীগের শাসনের পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ পড়ান বর্তমান রাষ্ট্রপতি।
সর্বশেষ ১২ই ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের পর তিনি শপথ পড়ান তারেক রহামানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারকে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাকে ঘিরে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। তবে বাস্তবে বড় ধরনের জ্বালানি ঘাটতি না থাকলেও আতঙ্কে কিংবা বেশি দামে বিক্রির আশায় অনেকেই অবৈধভাবে অকটেন ও ডিজেল মজুত করছেন। উদ্বেগজনকভাবে, এই প্রবণতা এখন বাসাবাড়িতেও ছড়িয়ে পড়েছে—যেন প্রতিটি ঘরই ছোট একটি পেট্রোলপাম্পে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেকেই বাসায় ২ থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত জ্বালানি তেল জমা করে রেখেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও খোলামেলা অকটেন বিক্রির পোস্ট দেখা যাচ্ছে, যেখানে প্রতি লিটার ২৫০ টাকা পর্যন্ত দাম চাওয়া হচ্ছে—যা স্বাভাবিক দামের প্রায় দ্বিগুণ। প্রশাসনের তথ্যমতে, গত ৩০ মার্চ পর্যন্ত দেশজুড়ে অভিযান চালিয়ে প্রায় ২৮ হাজার ৯৩৮ লিটার অকটেন উদ্ধার করা হয়। এরপরও প্রতিদিন কোথাও না কোথাও অবৈধভাবে মজুত বা বিক্রির ঘটনা সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসাবাড়িতে এমন দাহ্য পদার্থ সংরক্ষণ অত্যন্ত বিপজ্জনক। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহমুদুল হাসান জানান, পেট্রোল-অকটেন অত্যন্ত দাহ্য ও উদ্বায়ী হওয়ায় সামান্য আগুনের উৎস পেলেই বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে। এর ফ্ল্যাশ পয়েন্ট খুবই কম হওয়ায় কক্ষ তাপমাত্রাতেই ঝুঁকি তৈরি হয়। সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করলে বিস্ফোরণের আশঙ্কাও থাকে। এ ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি। বিশেষজ্ঞদের মতে, মার্চ থেকে মে মাসে দেশে বজ্রপাতের প্রবণতা বেশি থাকে। এ সময় বাসায় দাহ্য পদার্থ মজুত থাকলে বজ্রপাতের ঘটনায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড বা বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, যা আশপাশের ভবনেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩৩ লাখের বেশি বজ্রপাত হয় এবং এতে প্রতি বছর প্রায় ৩৫০ জন প্রাণ হারান। সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, জ্বালানি মজুত শুধু অগ্নিঝুঁকিই নয়, স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি করে। বদ্ধ জায়গায় জ্বালানির বাষ্প জমে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ায় এবং দীর্ঘ সময় শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট ও ত্বকে জ্বালাপোড়া হতে পারে। শিশু ও প্রবীণদের জন্য এ ঝুঁকি আরও বেশি। এছাড়া জ্বালানি লিক হয়ে পরিবেশ দূষণেরও আশঙ্কা থাকে। আইন অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া জ্বালানি তেল মজুত বা খোলাবাজারে বিক্রি দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রমাণ পাওয়া গেলে জরিমানা বা শাস্তির মুখোমুখি হতে হয়। তবুও আতঙ্কের কারণে অনেকেই বাসায় জ্বালানি মজুত করছেন। রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোলপাম্পে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অনেককে জ্বালানি সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। অনেকেই জানিয়েছেন, ভবিষ্যৎ সংকটের আশঙ্কায় তারা বাসায় তেল জমা করছেন। এতে কৃত্রিম সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ জানিয়েছে, দেশে বর্তমানে ১ লাখ ৬৯ হাজার ৫২৪ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল মজুত রয়েছে, যা দিয়ে আগামী দুই মাসে কোনো সংকট হওয়ার আশঙ্কা নেই। বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্ক থেকে জ্বালানি মজুত কোনো সমাধান নয়; বরং এটি ব্যক্তি ও জননিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সরকারি দল বিএনপি সবকিছু শেষ করে দেওয়ার অপকৌশল নিয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, আমরা আজ মুখের ওপরই বলেছি, আপনারা (সরকারি দল) ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন। আপনাদের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই। উনারা সবকিছু শেষ করে দেওয়ার অপকৌশল নিয়েছেন। সেই অপকৌশলের ফাঁদে আমরা পা দিতে চাইনি বলেই তো ওয়াকআউট করেছি। শুক্রবার (১০ এপ্রিল) রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশন শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এই সংসদ গত ১২ মার্চ থেকে কাজ শুরু করেছে। বিধি মোতাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ উত্থাপিত হয়েছে; এটাই নিয়ম। উত্থাপনের ৩০ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে এগুলো নিষ্পত্তি করতে হবে। ওই দিনই সংসদ থেকে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। সরকারি দলের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটিতে সরকারি ও বিরোধী উভয় দলের সদস্যরা ছিলেন। আলাপ-আলোচনা ও বিভিন্ন সেশন হয়েছে। কিন্তু পরে হঠাৎ দেখা গেল একটি রিপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে। আমরা বিরোধী দলের সদস্যদের জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা কি সবাই মিলে এই রিপোর্টটি চূড়ান্ত করেছেন? তারা জানালেন, এ ধরনের কোনো চূড়ান্তকরণ বৈঠকই হয়নি। পরে যোগাযোগ করে দেখা গেল, শুধু সরকারি দলের সদস্যরা মিলেই রিপোর্টটি চূড়ান্ত করে ফেলেছেন। অথচ উচিত ছিল সবাই মিলে এটি সম্পন্ন করা অথবা এমন একটি ছোট দলকে দায়িত্ব দেওয়া যেখানে সরকারি ও বিরোধী উভয় পক্ষের প্রতিনিধি থাকবে। তার কিছুই করা হয়নি। পরবর্তীতে আমাদের আপত্তির মুখে কিছু বিষয় সংযোজন করা হলেও এটি কোনো সঠিক বা সুস্থ ধারা ছিল না। মূলত সেখান থেকেই সমস্যার শুরু। তিনি বলেন, আমরা দেখলাম যে বিলের রিপোর্টের একটি জায়গায় ক, খ, গ ইত্যাদি ভাগ করা হয়েছে। এটি দেখে পরবর্তী কার্যউপদেষ্টা কমিটির মিটিংয়ে আমরা বললাম যে, সংসদে ১৩৩টি অধ্যাদেশই উত্থাপন করা হয়েছে। বিশেষ কমিটির কাজ হলো এগুলোর ওপর কাজ করে তা পুনরায় সংসদে উত্থাপন করা। তাদের এখান থেকে কোনো কিছু বাদ দেওয়া বা রাখার অধিকার নেই; এটি সংসদের সম্পত্তি। আমাদের দাবি ছিল ১৩৩টি অধ্যাদেশের সব কটি নিয়েই আলোচনা হতে হবে। কার্যউপদেষ্টা কমিটির দীর্ঘ বৈঠকে এ নিয়ে আইনি দিক ও নানা সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে মন্ত্রীরা কথা বলেছেন। শেষ পর্যন্ত আমাদের যুক্তির সাথে একমত হয়ে স্পিকার বলেছিলেন, প্রতিটি অধ্যাদেশই আলোচনার জন্য আসবে। এর জন্য শুক্রবার ছুটির দিনে সংসদ বসা এবং রাত ১২টা পর্যন্ত আলোচনা করে নিষ্পত্তি করার বিষয়েও আমরা রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু আজকে কী হলো? আমরা দেখলাম জাতির নিরাপত্তা ও প্রত্যেকটি নাগরিকের জীবনের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করে সেগুলোকে ল্যাপস (তামাদি) হওয়ার তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। তারা আজকে এগুলো উত্থাপনই করবে না। সর্বশেষ বিলের আগে ছিল ‘জুলাই জাদুঘর বিল’। এই বিলে সবার ঐকমত্য ছিল যে, অন্তর্বর্তী সরকার যেভাবে অধ্যাদেশ জারি করেছে, সেটিকে অপরিবর্তিত রেখেই পাস করা হবে এবং সংসদে সেভাবেই উত্থাপনও করা হলো। কিন্তু হঠাৎ দেখা গেল সরকারি দলের একজন সদস্য হাত তুললেন। সাধারণত বিল উত্থাপনের সময় সরকারি দল একমত থাকে এবং আপত্তি থাকলে বিরোধী দল হাত তোলে। কিন্তু এখানে সরকারি দলের একজন সদস্য হাত তোলার পর স্পিকার তাকে কথা বলার সুযোগ দিলেন এবং তিনি তিনটি সংশোধনী নিয়ে আসলেন। এই তিনটি সংশোধনীর ব্যাপারে আমাদের নীতিগত আপত্তি আছে। তবে তার চেয়ে বড় আপত্তির জায়গা হলো, আমরা জানলামই না যে তিনি কী সংশোধনী এনেছেন; তা জানার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি। তারা হয়তো বলবেন মেমোতে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, হঠাৎ করে এটিকে একটি দলীয় রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। বলা হলো, মন্ত্রণালয় যেহেতু এটি তদারকি করবে, তাই মন্ত্রী না থাকলে এটি চলবে কীভাবে? পরে তারা খোলামেলাভাবেই বলে ফেললেন যে, এখানে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এটি পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এমনকি আমাদের বোঝানোর জন্য এটাও বলা হলো যে, আজকে আপনারা বিরোধী দলে আছেন, আগামীতে সরকারি দলে আসলে আপনারাও এই সুবিধা পাবেন। আমরা বললাম, লজ্জা (শেইম)। আমরা এখানে কোনো সুবিধা নেওয়ার জন্য আসিনি; এসেছি জনগণের অধিকার রক্ষা করতে। সেরকম সুবিধা আমরা চাইও না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্পিকার আমাদের কোনো আপত্তিই শুনলেন না। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী আমাদের কমপক্ষে একদিন আগে সমস্ত নথিপত্র (ডকুমেন্ট) সরবরাহ করার কথা, কিন্তু তা দেওয়া হয়নি। আমরা অধিবেশনে বসার মাত্র এক ঘণ্টা আগে এক বস্তা কাগজ আমাদের সামনে আনা হলো। এখন আমরা যা দেখলাম না, শুনলাম না কিংবা যা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পেলাম না, সে বিষয়ে রায় দেব কীভাবে? তারপরও যেহেতু সরকারি ও বিরোধী দল মিলে বিশেষ কমিটি হয়েছিল এবং তারা যেসব বিষয়ে একমত হয়েছিলেন, আমরা তাদের ওপর আস্থা রেখেছিলাম। কিন্তু শেষ মুহূর্তে এসে সরকারি দল সেই আস্থাও ভঙ্গ করেছে। তারা যুক্তি দেখালেন যে, মন্ত্রী ছাড়া বাকি সকল সদস্যই বেসরকারি। কিন্তু যদি তারা বেসরকারিই হয়ে থাকেন, তবে সংস্কৃতিমন্ত্রী হিসেবে আপনি এটি গ্রহণ করলেন কেন? আপনি গ্রহণ করার মাধ্যমে তো এটি আর বেসরকারি থাকল না। আপনার ‘মেমো’ হিসেবে আসার পর এটিকে আর বেসরকারি বলার সুযোগ নেই। আমরা যখন তাকে এ বিষয়ে ধরলাম, তিনি বক্তব্যে দাঁড়িয়ে বললেন যে, তিনি নিজেও এটি জানতেন না। জামায়াত আমির বলেন, এই পার্লামেন্টে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীও যদি না জানেন যে কী হচ্ছে, তবে কলকাঠি কোথা থেকে নাড়ানো হচ্ছে? এভাবে একটি গণতান্ত্রিক সংসদ চলতে পারে না। আমরা স্পিকারের কাছে এ বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে জানতে চেয়ে আপত্তি জানালে তিনি আমাদের কেবল সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন। বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্পিকার সংসদের সর্বোচ্চ ব্যক্তি। তার কাছে আমরা স্পষ্ট জানতে চাই, দুদক বিল, পুলিশ সংস্কার কমিশন বিল, গুম কমিশন বিল ও পিএসসি বিল আসবে কি না? এগুলোর সাথে প্রতিটি নাগরিকের ভাগ্য জড়িত। এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করেই অতীতে ফ্যাসিজম কায়েম করা হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গণভোট অধ্যাদেশও আছে। সরকার এগুলো আনবে না; তারা আনবে শুধু সেগুলোই, যেগুলোতে ফ্যাসিজম বহাল থাকবে এবং যা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য প্রয়োজন। স্থানীয় সরকার বিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারাই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এবং ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে বলেছিলেন যে, কোনো স্তরেই তাঁরা অনির্বাচিত কোনো প্রতিনিধি দেখতে চান না। কিন্তু তাঁরা নিজেদের কথা নিজেরা রাখেননি, জাতির সাথে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও রক্ষা করেননি। এই আচরণ সম্পূর্ণ স্ববিরোধী। সরকার সংসদে আস্থাহীনতার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে এর নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এই পার্লামেন্ট আমরা মেনে নিয়েছি, তবে এই সংসদ ও নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা আছে। সেই নির্বাচনের পক্ষে অন্তত দুজন ‘রাজসাক্ষী’ পাওয়া গেছে। নির্বাচন প্রকৌশল (ইঞ্জিনিয়ারিং) নিয়ে সাবেক উপদেষ্টা পরিষদের একজন সদস্য এবং বর্তমান সরকারি দলের একজন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী কথা বলেছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, আন্দোলন ছাত্ররা করেছে, আমরাও ছিলাম; তবে ‘ক্যাপ্টেন’-এর হাতে ট্রফি প্রফেসর ড. ইউনুস লন্ডনে গিয়ে তুলে দিয়ে এসেছেন। লজ্জা (শেইম)! জামায়াত আমির প্রশ্ন তোলেন, ট্রফি যদি ওখানেই দেওয়া হয়ে থাকে, তবে কিসের নির্বাচন? তার মানে নির্বাচনের ভাগ্য আগে থেকেই পর্দার আড়ালে ঠিক করে জাতিকে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছে, যার প্রমাণ আপনারা গতকাল দেখেছেন। দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, কথা দিচ্ছি, জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আমরা কোনোভাবেই চুল পরিমাণ ছাড় দেব না। আমাদের অবস্থান অক্ষুণ্ণ থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই লড়াই জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই। জনগণের গণরায় ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলেই সব সমস্যার সমাধানের পথ খুলে যাবে বলে আমরা মনে করি। সংসদে আমরা সুবিচার পাইনি; ইনশাআল্লাহ, জনগণকে সাথে নিয়েই আমরা সেই দাবি আদায় করে ছাড়ব। তিনি বলেন, অতীতেও এই ধরনের সংসদে কিছু কিছু বিলকে গুরুত্বই দেওয়া হয়নি। পরে তারা নিজেরাই সেগুলো গ্রহণে বাধ্য হয়েছেন। গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করার মানে হচ্ছে গণতন্ত্র ও জনগণকে অপমান করা। সব দাবি আদায় হবে এবং সেই দাবি আদায় করতে গিয়ে যত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, আমরা প্রস্তুত। দেশের জন্য, জনগণের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই অব্যাহত থাকবে। সরকারি দলের হুইপ বলেছেন যে ১৬টি অধ্যাদেশ উত্থাপন করা হয়নি, সেগুলো পরবর্তী অধিবেশনে বিল আকারে আনা হবে, আপনারা এটি বিশ্বাস করেন কি না? জানতে চাইলে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, আমরা সেখানে মুখের ওপরই বলেছি যে আপনারা ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন, তাই আপনাদের ওপর আমাদের কোনো আস্থা নেই। আপনারা এখন আনেননি, পরবর্তী পর্যায়ে আনবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি না। আরেক প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোটকে তাঁরা অস্বীকার করছেন। গণভোটকে অস্বীকার না করলে অধ্যাদেশ ল্যাপস (তামাদি) হয় কীভাবে? গণভোটের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্যই তো সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা ছিল। তাঁরা প্রথম দিনই তো সেটি লঙ্ঘন করেছেন। প্রথম দিনই জাতিকে অপমান করেছেন, অগ্রাহ্য করেছেন। এখন তারা কীভাবে এসব কথা বলেন? সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ জামায়াত ও বিরোধী জোটের শীর্ষস্থানীয় সংসদ সদস্যরা।
জাতীয় সংসদের কার্যক্রম সরাসরি দেখার জন্য শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত দর্শনার্থী গ্যালারিতে আরও ১০০টি আসন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের এক আধা-সরকারি পত্রের (ডিও) প্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদের স্পিকার মন্ত্রীর এ আবেদন মঞ্জুর করেন। আজ শুক্রবার শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে স্পিকারের কাছে পাঠানো ওই আধা-সরকারি পত্রে শিক্ষামন্ত্রী উল্লেখ করেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জাতীয় সংসদ জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান। নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মাঝে সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা এবং রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণী কার্যক্রম সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। পাঠ্যপুস্তকের তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি সংসদের কার্যক্রম প্রত্যক্ষভাবে অবলোকন তাদের দেশপ্রেম এবং নাগরিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। পত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, বর্তমানে সংসদের দর্শনার্থী গ্যালারিতে ৪৪৮টি আসনের মধ্যে মাত্র ৫০টি আসন অনূর্ধ্ব ১২ বছর বয়সীদের জন্য নির্ধারিত। শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ১০০টি আসন স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত রাখা হলে সারা দেশের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফরের মাধ্যমে আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান লাভ করতে পারবে। স্পিকার এ প্রস্তাবটি বিবেচনা করেন এবং এখন থেকে মোট ১৫০ জন শিক্ষার্থী সংসদের অধিবেশন সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পাবেন। এ উদ্যোগের বিষয়ে ড. মিলন বলেন, ‘শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে নৌবিহারে যেতেন; যাতে তারা রাষ্ট্রের সম্পদ ও সম্ভাবনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করতে পারে। শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমিও চাই বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা (জেন-জি) রাষ্ট্র সম্পর্কে জানুক এবং রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠুক।’ জাতীয় সংসদের সচিব মো. গোলাম সারওয়ার ভূঁইয়া এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, শিক্ষার্থীরা সংসদে এলে অধিবেশন শুরুর আগে তাদের সংসদীয় কার্যক্রম ও ঐতিহ্য নিয়ে বিস্তারিত অবহিত করা হবে। এতে তারা সংসদের স্থাপত্য শৈলী ও ইতিহাস সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাবে।