রাজনৈতিক প্রভাব এবং লুটপাট করে ব্যাংকিং খাতকে প্রায় শূন্য করে দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, বাংলাদেশের শুধু ব্যাংকিং খাত থেকে লুট হয়েছে ১৭ বিলিয়ন ডলার। এটা আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৬৬ শতাংশ। আমরা জানি, প্রতিবছরই কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় যখনই এডিপির বাজেট দেওয়া হয়, সেটা বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে হয়। ওই পরিমাণ অর্থ শুধু ব্যাংকিং খাত থেকে লুটপাট হয়েছে। এস আলম গ্রুপ সম্পর্কে আপনারা সবাই জানেন, আশা করি পৃথিবীর সবাই জানে। আজকে হয়তো আবার এস আলম গ্রুপ থেকে ফোন পেতে পারি। এস আলম গ্রুপ লুট করেছে ১ লাখ ৯০০ হাজার কোটি টাকা। এই ১ লাখ ৯০০ হাজার কোটি টাকা মোট এডিপিতে সরকার আগামী বাজেটে যে পরিমাণ খরচ করতে চায়, ঠিক সেই পরিমাণটা।
সম্প্রতি এক উচ্চ পর্যায়ের সেমিনারে তিনি এই বিস্ফোরক তথ্য জানান। সেমিনারে তিনি বাংলাদেশের খাদে পড়া অর্থনীতি, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এস আলমের দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেছেন। সেমিনারটিতে বাংলাদেশের রাজস্ব খাত সংস্কার এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কারের সঙ্গে বাজেটের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করেন।
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়ার শিক্ষক ড. খান জহিরুল ইসলাম বলেন, এবার চিন্তা করে দেখুন আমাদের টাকা কোথায় যাচ্ছে? কেন আমরা বাজেট বাস্তবায়ন করতে হিমশিম খাই। দুঃখজনক বিষয়। আবারও বলছি, এর আগের দিনও বলেছিলাম বর্তমান সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ করে আবার এই ব্যাংক লুটেরাদের ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং পৃথিবীর যেকোনো দেশের জন্য একটা বিশাল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেকোনো অর্থনীতির জন্য। কিন্তু আপনারা জানেন ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়ে যায় ৮১ মিলিয়ন ডলার। যেটা সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তৈরি করেছিল। আমরা আশা করেছিলাম বর্তমান সরকার বাংলাদেশ ব্যাংককে আবার সচল করবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগের সমালোচনা করে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের প্রধানমন্ত্রী আমার ধারণা শুধু বাংলাদেশে না, সারা পৃথিবীতে রেকর্ড করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন এমএ পাস একাউন্ট্যান্টকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দিয়ে। যেটা শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্ব রেকর্ড। তাঁর কেন্দ্রীয় ব্যাংকিংয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এটা কেন করা হলো? প্রশ্ন হলো কেন এই নিয়োগ দেওয়া হলো? সব প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে একইভাবে এই নিয়োগও হয়েছে।
সুদানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর সালাম হাসান যুক্তরাষ্ট্রের একটা বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেছেন। পৃথিবীর দরিদ্রতম দেশের গভর্নর। অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পিএইচডি করা। সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক গভর্নরের একাউন্ট্যান্ট হিসেবেও কোনো কাজ নেই।
খান জহিরুল ইসলাম বলেন, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপি, যেটা আমরা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বলি, সেটার আকার ধরা হয়েছে আনুমানিক ৩ লাখ কোটি টাকা। এই ৩ লাখ কোটি টাকার মধ্যে সরকার অর্থায়ন করার পরিকল্পনা করছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বাকি ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সরকার ঋণ করে অর্থায়নের পরিকল্পনা করছে।
অর্থ পাচারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, আপনারা সবাই জানেন ২০০৯ থেকে ২০২৩ এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার। আর বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ১২.৪ বিলিয়ন ডলার। যেটা একটা বাজেটের বিশাল অংশ।
ব্যাংকিং খাত নিয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, শুধু বাংলাদেশ না, পৃথিবীর যেকোনো দেশের ব্যাংকিং খাত অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। কারণ ব্যাংকিং খাতের ওপর নির্ভর করে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, মুদ্রাস্ফীতি, আর্থিক নীতি— সবকিছুই ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত। আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাতের প্রধান সমস্যাগুলো সবারই হয়তো জানা।
ভয়াবহ ঋণ খেলাপি নিয়ে কানাডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, আমাদের আগামী বছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার সচিব মহোদয় বলেছেন, ৯ লাখ ৩ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। একটা বাজেটের প্রায় ৭৫ শতাংশ আমাদের খেলাপি ঋণ আছে। আমি যেটা বোঝানোর চেষ্টা করছি, এই খেলাপি ঋণ যদি না থাকত তাহলে আমাদের বাজেট বাস্তবায়নে কী প্রভাব ফেলতে পারতো এবং এটাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া যেত।
সিপিডির গবেষক বলেছেন যে, আসলে বাস্তবায়ন করা যায় না। কারণ আমাদের তো সেই পরিমাণ টাকা নেই। টাকা নেই কেন? কারণ আমাদের টাকা পাচার হচ্ছে, চুরি হচ্ছে, খেলাপি হচ্ছে। এগুলোই কার্যকর জায়গা। বাজেটের ৭৫ শতাংশ যদি খেলাপি ঋণ থাকে, আমি আশা করি সেই জায়গায় কাজ করার সুযোগ আছে। এনসিপির সংসদ সদস্যরা এই জায়গায় কথা বলবেন। এই টাকাগুলো তো ছিল, সেটা নাই হয়ে গেছে আমাদের অর্থনীতি থেকে পাচার এবং দুর্নীতির জন্য।
এরপর রাজনৈতিক প্রভাব এবং লুটপাট করে ব্যাংকিং খাতকে প্রায় শূন্য করে দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে ১৭ বিলিয়ন ডলার শুধু ব্যাংকিং খাত থেকে লুট হয়েছে। যেটা আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ৬৬ শতাংশ। আমরা জানি প্রতিবছরই কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক বিবেচনায় যখনই এডিপির বাজেট দেওয়া হয়, সেটা বাস্তবায়নে হিমশিম খেতে হয়। অথচ ৬৬ শতাংশ অফ দ্য এডিপি প্রোগ্রাম— এটা শুধু ব্যাংকিং খাত। ওই পরিমাণ অর্থ শুধু ব্যাংকিং খাত থেকে লুটপাট হয়েছে।
এস আলমের দুর্নীতি নিয়ে জহিরুল ইসলাম বলেন, এস আলম গ্রুপ লুট করেছে ১ লাখ ৯০০ হাজার কোটি টাকা। এই ১ লাখ ৯০০ হাজার কোটি টাকা মোট এডিপিতে সরকার আগামী বাজেটে যে পরিমাণ খরচ করতে চায়, ঠিক সেই পরিমাণটা।
আমাদের টাকা কোথায় যাচ্ছে, কেন আমরা বাজেট বাস্তবায়ন করতে হিমশিম খাই। আবারও বলছি, বর্তমান সরকার ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬ করে আবার এই ব্যাংক লুটেরাদের ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তাই সংসদ সদস্যদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, আপনারা যদি সংস্কার নিয়ে সংসদে কথা বলেন, বাজেট আলোচনায় ব্যাংকিং খাতের লুটপাট এবং বর্তমান সরকার আবারও এই লুটেরা এস আলমকে নিয়ে আসার জন্য সুযোগ করে দিচ্ছেন এটা নিয়ে কথা বলবেন। আপনারা যেটা বলে গেলেন যে ভোটে হয়তো এটা পাশ হয়ে যাবে। তারপরও আমরা দেখতে চাই আপনারা এটা নিয়ে জোরালো অবস্থান নিচ্ছেন। ব্যাংকিং খাতের দ্বিতীয় দুর্বলতা হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং। কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং পৃথিবীর যেকোনো দেশের অর্থনীতির জন্য একটা বিশাল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু আপনারা জানেন ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি হয়ে যায় ৮১ মিলিয়ন ডলার, যেটা সারা পৃথিবীতে আলোড়ন তৈরি করেছিল। ৮১ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে চুরি হয়ে গেছে এবং আমরা জানি এর সঙ্গে রথি-মহারথি সবাই জড়িত ছিল।
তাহলে আমাদের ব্যাংকিং খাতে করণীয় কি? আমাদের আসলে আলফা জেনারেশন, জেডের পরে যে আলফা জেনারেশন, করণীয় আমরা সবাই জানি। আমার ধারণা বাংলাদেশের এরা এত সচেতন, তারা জানে করণীয় কি। সমস্যা হচ্ছে দুর্নীতি। এই দুর্নীতি কীভাবে কমানো যাবে সেই বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা আমরা দেখতে চাই এনসিপির সংসদ সদস্যসহ সব নেতাদের কাছ থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংককে পুরোপুরি স্বাধীন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। যেটা জুলাই সনদে স্পষ্টভাবে ছিল।
তো সেই সংস্কার তো প্রত্যাখ্যান করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ যেটা, সেখানে ঢেলে সাজাতে হবে। এটা হচ্ছে ব্যাংকিং খাতে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হাজার হাজার আমানতকারীর কাছে আতঙ্কের নাম হয়ে আছে দেশের কয়েকটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই)। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও টাকা ফেরত না পাওয়া, প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে বিক্ষোভ, আদালত ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্বারে দ্বারে ঘোরাঘুরি; সব মিলিয়ে বহু পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটিয়েছে। অবশেষে সেই সংকট নিরসনে বড় পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কার্যত দেউলিয়া হয়ে পড়া পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ করে ধাপে ধাপে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হবে। প্রথম পর্যায়ে ব্যক্তি আমানতকারীদের সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এই অর্থের জোগান আসবে সরকারি তহবিল থেকে, অর্থাৎ জনগণের করের অর্থ ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের স্বস্তি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, প্রশাসক নিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করে অবসায়ন বা লিকুইডেশনের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। একই সঙ্গে ছোট আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার কাজও শুরু হবে। এর জন্য সরকারের নীতিগত সম্মতি ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেও প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কোন পাঁচ প্রতিষ্ঠান বন্ধের পথে যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অবসায়নের আওতায় আনার প্রস্তুতি চলছে, সেগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানে প্রায় ২৭ হাজার ব্যক্তি আমানতকারীর মোট জমা রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বছরের পর বছর ধরে এসব আমানতকারীর বড় অংশই নিজেদের অর্থ ফেরত পাননি। প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক অবস্থার চিত্র আরও ভয়াবহ। গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ ঋণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় পুরো ঋণপোর্টফোলিওই অকার্যকর হয়ে গেছে। কীভাবে ফেরত দেওয়া হবে আমানতের টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রশাসক নিয়োগের পর প্রথম ধাপে ব্যক্তি আমানতকারীদের মধ্যে যাদের জমার পরিমাণ ১০ লাখ টাকা বা তার কম, তাদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। এতে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন ক্ষুদ্র ও মধ্যম আয়ের আমানতকারীরা, যাদের অনেকেই সঞ্চয়ের পুরো অর্থ এসব প্রতিষ্ঠানে রেখেছিলেন। তবে ১০ লাখ টাকার বেশি জমা রাখা ব্যক্তিরা অর্থাৎ বড় ব্যক্তি আমানতকারী ইচ্ছে করলে ক্ষুদ্র ও মধ্যম আমানতকারীদের সঙ্গে প্রথমে ১০ লাখ টাকা নিতে পারবেন। ধারণা করা হচ্ছে সবাইকে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার কিছু দিন পরে বাকী টাকা কিভাবে দেওয়া হবে সেটা নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা মনে করছেন, সীমিত সম্পদ ও বিপুল দায়ের মধ্যে প্রথমে ছোট আমানতকারীদের সুরক্ষা দেওয়া সবচেয়ে জরুরি। কারণ বড় অঙ্কের আমানতকারীদের তুলনায় সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, যাদের জমা ১০ লাখ টাকার বেশি, তাদের কী হবে? বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, প্রথম ধাপের অর্থ পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ, উদ্ধারযোগ্য ঋণ, বিক্রয়যোগ্য সম্পত্তি এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অর্থাৎ বড় আমানতকারী, প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারী এবং অন্যান্য পাওনাদারদের অর্থ কীভাবে ও কোন ক্রমে পরিশোধ করা হবে, তা প্রশাসক নিয়োগের পর বিস্তারিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবসায়ন প্রক্রিয়ায় সাধারণত প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রি, উদ্ধারযোগ্য ঋণ আদায় এবং দায়-দেনার তালিকা প্রস্তুতের মাধ্যমে পাওনাদারদের অর্থ পরিশোধ করা হয়। ফলে ১০ লাখ টাকার বেশি আমানতধারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়টি সময়সাপেক্ষ হতে পারে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সরাসরি তদারকি থাকায় আগের তুলনায় একটি সুসংগঠিত কাঠামোর মাধ্যমে অর্থ ফেরতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমানতকারীদের সংগঠন ‘অ্যালায়েন্স অব ৬ এনবিএফআইস ডিপোজিটরস ফর রিকভারি’-এর আহ্বায়ক জাফর খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ক্ষুদ্র আমানতকারীদের সুরক্ষার লক্ষ্যে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত আমানত সম্পূর্ণ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগকে তারা ইতিবাচকভাবে দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তিতে থাকা ছোট আমানতকারীদের স্বস্তি দিতে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন। তিনি বলেন, তবে সংকটাপন্ন পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সব আমানতকারী একই ধরনের অনিয়ম ও দুর্যোগের শিকার হয়েছেন। ফলে সমস্যার সমাধানও হতে হবে ন্যায়সঙ্গত, সমতাভিত্তিক ও বৈষম্যহীন। শুধু ক্ষুদ্র আমানতকারীদের জন্য নয়, ছোট-বড় সব ধরনের আমানতকারীর জন্য একটি সময়বদ্ধ, স্বচ্ছ ও বাস্তবসম্মত অর্থ ফেরত নীতিমালা (রিপেমেন্ট রোডম্যাপ) ঘোষণা করা প্রয়োজন। জাফর খানের মতে, এমন একটি পরিকল্পনা থাকা উচিত, যেখানে সব আমানতকারী তাদের জমাকৃত অর্থ ধাপে ধাপে হলেও সমানুপাতিক ভিত্তিতে ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা পাবেন। অন্যথায় একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আমানতকারীর স্বার্থ রক্ষা হলেও বাকি আমানতকারীরা দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে থেকে যাবেন, যা আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। এসব প্রতিষ্ঠানে আমানত রাখা অর্থ কেবল সংখ্যা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জীবনভর সঞ্চয়, প্রবাসী পরিবারের কষ্টার্জিত উপার্জন, বিধবা নারীর নিরাপত্তা, মধ্যবিত্তের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং ব্যবসায়ীদের মূলধন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষ্য, তাই বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি তাদের আহ্বান, এমন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিমালা গ্রহণ করা হোক, যা সকল আমানতকারীর প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে, আর্থিক খাতে আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবে এবং ভবিষ্যতের সঞ্চয়কারীদের জন্য নিরাপত্তার বার্তা দেবে। কেন এই অবস্থায় পৌঁছাল প্রতিষ্ঠানগুলো এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের পতনের পেছনে রয়েছে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্বল তদারকি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর ঋণ কেলেঙ্কারি। আভিভা ফাইন্যান্সের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন চট্টগ্রামের আলোচিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম (এস আলম)। অন্যদিকে এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের নিয়ন্ত্রণ ছিল বহুল আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারির নায়ক প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের হাতে। তাদের সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়, যার বড় অংশই পরে খেলাপিতে পরিণত হয়। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে নামে-বেনামে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ফলে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার মতো সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রশাসক নিয়োগের পর কী হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথমে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হবে। এরপর প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে সব ধরনের আর্থিক কার্যক্রম, সম্পদ ও দায়-দেনা কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যালোচনা করা হবে। প্রশাসকরা প্রতিষ্ঠানের সম্পদের প্রকৃত অবস্থা, উদ্ধারযোগ্য ঋণ, আদালতে থাকা মামলার অগ্রগতি এবং সম্ভাব্য নগদ প্রবাহ মূল্যায়ন করবেন। একই সঙ্গে আমানতকারীদের তথ্য যাচাই করে অর্থ ফেরতের তালিকাও প্রস্তুত করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানান, লোকসানি ও অকার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো সচল রাখার জন্য বছরের পর বছর ব্যয় করার পরিবর্তে দ্রুত অবসায়নের মাধ্যমে আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা করাই এখন প্রধান লক্ষ্য। অবসায়নের তালিকা কেন ছোট হলো গত বছর উচ্চ খেলাপি ঋণ ও আমানত ফেরতে ব্যর্থ হওয়ায় ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। পরবর্তীতে তাদের মধ্যে কয়েকটির পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা মূল্যায়ন করে ছয়টি প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরবর্তীতে জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসি তালিকা থেকে বাদ পড়ে। সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিজিংকেও আপাতত অবসায়নের তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। ফলে এখন পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করেই চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আস্থা ফেরানোর বড় পরীক্ষা ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের জন্য নয়, পুরো আর্থিক খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অর্থ ফেরত দেওয়া গেলে আর্থিক খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কিছুটা হলেও পুনরুদ্ধার হবে। তবে একই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, শুধুমাত্র সরকারি অর্থ দিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যারা অনিয়ম ও লুটপাটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে, তাদের সম্পদ জব্দ ও অর্থ পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়াও সমান গুরুত্বের সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে। অন্যথায় জনগণের করের অর্থ দিয়ে ক্ষতি পূরণ করা হলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সম্প্রতি বলেছেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আমানত ফেরত নিয়ে দীর্ঘ ১২ বছর ধরে সমস্যা চলছে। আগামী এক থেকে দুই সপ্তাহের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের জন্য দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা হাজারো আমানতকারীর অর্থ ফেরতের পথ খুলবে। তবে ১০ লাখ টাকার বেশি আমানতধারীরা কবে, কীভাবে এবং কতটুকু অর্থ ফেরত পাবেন—সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও ভবিষ্যতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে না পারা দেশের ব্যাংকবহির্ভূত পাঁচটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে (এনবিএফআই) আটকে থাকা টাকা আমানতকারীদের ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। জনগণের করের টাকা থেকে সরকার এই অর্থ জোগান দেবে। তার আগে পাঁচ প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়ন করা হবে। এ জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় প্রশাসক বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এই প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, প্রশাসক নিয়োগের পর প্রতিষ্ঠানগুলোর ছোট ছোট আমানতকারীর টাকা ফেরত দেওয়া উদ্যোগ নেওয়া হবে। টাকা ফেরত দেওয়ার বিষয়ে এরই মধ্যে সরকারের সম্মতি পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারপরও প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, অবসায়ন বা বন্ধের তালিকায় যে পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেগুলো হলো এফএএস ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানে ২৭ হাজার আমানতকারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রশাসক নিয়োগের পর শুরুতে ব্যক্তি আমানতকারীরা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮ দশমিক ৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ, অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় শতভাগ ঋণই খেলাপি। প্রতিষ্ঠান পাঁচটির মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ছিলেন চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম (এস আলম)। অন্য চারটির নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেলেঙ্কারির দায়ে বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদার। তাঁদের মেয়াদে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে টাকা তুলে নেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না। সদ্য বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব প্রতিষ্ঠান সচল বা অবসায়ন করে আমানতকারীদের দুর্ভোগ লাঘবের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত কাজটি তারা শেষ করে যেতে পারেনি। এ অবস্থায় বর্তমান সরকারও অন্তর্বর্তী সরকারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। এ জন্য ২০২৬–২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে এই খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, প্রশাসক নিয়োগের পর প্রথমে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যক্তি আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়া হবে। পরে অন্যদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে। এসব প্রতিষ্ঠান বাঁচিয়ে রেখে শুধু শুধু খরচ বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই। এ জন্য যত দ্রুত সম্ভব, অবসায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, প্রথমে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদ বিলুপ্ত করা হবে। এরপর এসব প্রতিষ্ঠান একীভূত করে ব্যাংকগুলোর মতো প্রশাসক নিয়োগ করা হবে। বর্তমানে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কেন ২০টি এনবিএফআই বন্ধ করা হবে না মর্মে গত বছরের মে মাসে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ৯টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার বা ঘুরে দাঁড়ানোর কর্মপরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় সেগুলো বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেখান থেকে তিনটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিয়ে ছয়টি বন্ধ বা অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তখন জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স ও বিআইএফসিকে বাদ দেওয়া হয়। সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে প্রিমিয়ার লিজিংকে বাদ দিয়ে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা অবসায়নের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়। সরকারি দলের একজন নেতা প্রিমিয়ার লিজিং সচল করার উদ্যোগ নেবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানিয়েছেন। এ জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে আপাতত অবসায়নের তালিকার বাইরে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ১২ জুন বাজেট–পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর টাকা ফেরত দেওয়া নিয়ে ১২ বছর ধরে সমস্যা হচ্ছে। আগামী এক–দুই সপ্তাহের মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাবেন।
সাম্প্রতিক সময়ে পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত থেকে পক্ষে রায় পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। এর ফলে ক্লোজড-এন্ড (মেয়াদি) মিউচুয়াল ফান্ডকে ওপেন-এন্ড (বেমেয়াদি) ফান্ডে রূপান্তর বা অবসায়ন এবং বেস্ট হোল্ডিংস-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বাধা কেটেছে। এতে করে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা পরিপালনে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কঠোর অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। ইতোমধ্যে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডের সব ট্রাস্টিকে ক্লোজড-এন্ড স্কিমগুলোর অবসায়ন অথবা ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তর সংক্রান্ত সদ্য প্রণীত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছে। বিএসইসির কঠোর অবস্থান এবং আদালতের রায়ের ফলে স্বস্তি মিলেছে সংশ্লিষ্ট খাতের বিনিয়োগকারীদের। জানা গেছে, আপিল বিভাগের চেম্বার কোর্টের পৃথক দুটি রিটে হাইকোর্টের দেওয়া স্থিতাবস্থা স্থগিত এবং স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেছেন। এতে করে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা হয়েছে বলে মনে করে কমিশন। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আবুল কালাম বাংলানিউজকে বলেন, আপিল বিভাগের সর্বশেষ আদেশের ফলে ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ড রূপান্তর বা অবসায়ন এবং বেস্ট হোল্ডিংস-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে আর বাধা নেই। তিনি বলেন, ক্লোজড-এন্ড মিউচুয়াল ফান্ডকে ওপেন-এন্ড ফান্ডে রূপান্তর বা অবসায়ন সংক্রান্ত মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা বিধি ৬২(২) এবং ৭ মে জারি করা আদেশের বিরুদ্ধে সম্প্রতি পাঁচজন ইউনিটধারী রিট আবেদন করেন। ওই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৪ মে হাইকোর্ট থেকে একটি স্থিতাবস্থা আদেশ জারি হয়েছিল। তবে সেই আদেশ স্থগিত করা হয়। এর আগে মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা বাস্তবায়নে বিএসইসি গত ৯ ও ১১ জুন ট্রাস্টিদের পৃথক চিঠি পাঠায়। বেস্ট হোল্ডিংস-সংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর থাকা স্থগিতাদেশও প্রত্যাহার করা হয়েছে। আমাদের ল ডিভিশন রায়ের বিষয়টি কনফার্ম করেছে। তারা যে রিট করেছিল সেটা ভ্যাকেট হয়ে গেছে তাহলে তো আর কোনো বাধা থাকে না। বেস্ট হোল্ডিং এর তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে তো বাধা থাকার কথা না। কমিশনের মূল কাজটা হলো ইনভেস্টর প্রটেকশন। আর বর্তমান কমিশন সেই কাজটা করে যাচ্ছে। ইনভেস্টর সুরক্ষায় আমাদের যারা আইনজীবী আছে তারা তাদের মত করে লড়তে থাকেন। আর যে রায় আসছে এটা ইনভেস্টরের পক্ষেই যাচ্ছে, কমিশন বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় সঠিক দায়িত্ব পালন করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।