চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) নিয়ে চুক্তির সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এবার ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতির ডাক দিয়েছে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) তৃতীয় দিন ৮ ঘণ্টা কর্মবিরতি চলাকালে নতুন কর্মসূচির ডাক দেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। তারা বলছেন, সরকার চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক স্থাপনা বিদেশিদের (ডিপি ওয়ার্ল্ডের) হাতে তুলে দিয়ে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিচ্ছে। দেশের স্বার্থ রক্ষায় যখন বন্দরের শ্রমিক-কর্মচারীরা আন্দোলনে নেমেছে তখন তাদের সঙ্গে আলোচনার পরিবর্তে কর্মচারীদের বদলিসহ নানা হয়রানিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার।
প্রতিহিংসামূলক ও স্বৈরাচারী এই আচরণে শ্রমিকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও দানা বাঁধছে। শনি ও রোববার দুই দফায় চট্টগ্রাম বন্দরের ১৬ জন কর্মচারীকে পানগাঁও ও কমলাপুর আইসিডিতে বদলি করা হয়েছিল। সোমবার মন্ত্রণালয়ের নতুন এক আদেশে তাদের মধ্যে ১৫ জনকে বদলি করে মোংলা ও পায়রা বন্দরে সংযুক্ত করা হয়েছে।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, মোংলা ও পায়রা বন্দর আলাদা প্রতিষ্ঠান। সাধারণত চট্টগ্রাম বন্দরের কর্মচারীদের এই দুই বন্দরে পাঠানোর সুযোগ নেই। তবে যেখানেই বদলি করা হোক, এ পর্যন্ত কোনো কর্মচারী নতুন কর্মস্থলে যোগ দেননি। নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার সংকল্প করেছেন তারা।
তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকার ও আদালতের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে শ্রমিক-কর্মচারীদের এ ধরনের আন্দোলনে যাওয়া ঠিক হয়নি। এতে ‘মহলবিশেষের ইন্ধন’ রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।
এদিকে টানা তিন দিনের কর্মবিরতি তথা ধর্মঘটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করেছে। কোনো ধরনের কনটেইনার হ্যান্ডলিং না হওয়ায় বিভিন্ন ইয়ার্ডে সৃষ্টি হয়েছে কনটেইনারের জট। কেবল রোজার পণ্যসহ জরুরি পণ্য নিয়ে বন্দরের বহির্নোঙ্গরে ভাসছে ৩৫টি মাদার ভেসেল। লাইটার থেকেও পণ্য খালাস করা যাচ্ছে না।
একইভাবে চট্টগ্রাম বন্দরের আওতাধীন যেসব বেসরকারি ডিপো বা অফডক রয়েছে, সেসব অফডকেও অপারেশনাল কার্যক্রমে মারাত্মক ধীরগতি সৃষ্টি হয়েছে। কর্মচারীদের নতুন করে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি কর্মসূচি ঘোষণার কারণে আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। তারা বলছেন, আমদানি-রপ্তানির বেশির ভাগ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। দেশের অর্থনীতির প্রাণ চট্টগ্রাম বন্দর যে কোনো মূল্যে সচল রাখতে হবে। সেটা আলোচনার ভিত্তিতে হোক কিংবা অন্য যেকোনো উপায়ে হোক। টানা তিন দিনের কর্মবিরতির কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে তা টাকার অঙ্কে হিসাব করা কঠিন।
সোমবার সকালে দাবি আদায়ে কালোপতাকা মিছিল করেছে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদ (স্কপ)। বন্দরের দেয়ালে দেয়ালে সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে কালো হরফে লেখা ‘কর্মবিরতি চলছে’ স্টিকার। স্কপের সমাবেশ থেকে বন্দর চেয়ারম্যান ও বিডা চেয়ারম্যানের অপসারণ দাবি করা হয়। কর্মচারীদের কর্মবিরতি বা ধর্মঘটের প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টিও।
সকালে শ্রমিক-কর্মচারী ঐক্য পরিষদের ব্যানারে আগ্রাবাদ চৌমুহনি থেকে কালোপতাকা মিছিল বের হয়। ‘এনসিটি ইজারা দেওয়ার দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তির প্রক্রিয়া বন্ধ করো’ শীর্ষক কালোপতাকা ও ব্যানার নিয়ে মিছিলটি বারিক বিল্ডিং মোড়ে গেলে আটকে দেয় পুলিশ। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ বন্দর ভবন চত্বরে দুপুর ১টার দিকে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে আজ (মঙ্গলবার) সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতির নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করে। পাশপাশি সড়ক অবরোধ কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
কর্মবিরতি চলাকালে দেখা গেছে, সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত বন্দরের কোনো ইয়ার্ডে অপারেশনাল বা প্রশাসনিক কোনো কার্যক্রম হয়নি। শ্রমিক-কর্মচারীরা অফিসে উপস্থিত হলেও কাজ করা থেকে বিরত থাকেন। বন্দরের ভেতরে-বাইরে ছিল না ট্রাক-লরির চলাচল।
চট্টগ্রাম বন্দর জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক ও বন্দরের নৌ বিভাগের ইঞ্জিন ড্রাইভার (১ম শ্রেণী) মো. ইব্রাহিম খোকন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এনসিটি বিদেশিদের না দেওয়ার জন্য এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দাবি জানিয়ে আসছিলেন শ্রমিক-কর্মচারীরা। কিন্তু সরকার তাদের দাবির প্রতি কোনো তোয়াক্কা না করে চুক্তির প্রক্রিয়া অস্বাভাবিক গতিতে এগিয়ে নিচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ আছে আর মাত্র ৯ দিন। এরপরও এনসিটি দিয়ে দেওয়ার নেপথ্যে তাদের কী স্বার্থ লুকিয়ে আছে তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে। শ্রমিক-কর্মচারীরা এতে অত্যক্ষ ক্ষুব্ধ। এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসাবেই সবাই স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে আন্দোলনে নেমেছেন। তিনি বলেন, বন্দর তথা সরকার শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনার পরিবর্তে অন্যায়ভাবে ক্ষমতা দেখাচ্ছে। কিন্তু শ্রমিকরা এতে ভীত নয়। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা কর্মসূচি চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) মো. ওমর ফারুক বলেন, মঙ্গলবার চট্টগ্রাম বন্দরে ৩৭ হাজার কনটেইনার জমেছিল। রোববার কনটেইনার ডেলিভারি হয়েছিল এক হাজার ৬৮৪ টিইইইউএস কনটেইনার। সোমবার এক হাজার ৫৮৭ টিইইইউএস কনটেইনার ডেলিভারি হওয়ার কথা ছিল। ৮ ঘণ্টা কর্মবিরতির পর যে সময়টা ছিল, সেই সময়ে এই ডেলিভারি হয়েছে। তবে স্বাভাবিক সময়ে এর দ্বিগুণ বা তারও বেশি ডেলিভারি হয়।
অফডক নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোটস অ্যাসোসিয়েশন (বিকডা) সচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, বন্দরে কর্মবিরতির ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অফডকেও। অফডকে কনটেইনারের জট লেগে যাচ্ছে। রপ্তানি কনটেইনার পাঠাতে না পারায় পোশাক শিল্পের বড় ধরনের ক্ষতির শঙ্কা তৈরি হয়েছে। সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের উচিত যে কোনো মূল্যে বন্দর সচল করা। না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে। অর্থনীতির যে ক্ষতি হয়ে যাচ্ছে তা সামাল দেওয়া আমদানিকারক, ব্যবসায়ী ও সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
কুড়িগ্রামের সব কটি নদ-নদীর পানি আবারও বাড়ায় বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত দুই দিন ধরে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার সন্ধ্যা ৬টায় স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় রাজারহাটে তিস্তা নদীর কাউনিয়া পয়েন্টে পানি আরো ৩৪ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ১৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে ও দুধকুমার নদের পানি ৩২ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৩৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ধরলা নদীর শিমুলবাড়ি ও সেতু পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের হাতিয়া, চিলমারী ও নুনখাওয়া পয়েন্টে পানি বেড়ে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ফলে এসব নদনদী অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে পানি উঠতে শুরু করেছে। নতুন করে বন্যা পরিস্থিতিতে সদরসহ বিভিন্ন উপজেলার কৃষকেরা পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। এদিকে, বুধবার প্রবল বর্ষণে জেলার জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পিটিআই পরীক্ষণ বিদ্যালয় মাঠ, জেলা ফায়ার সার্ভিস স্টেশন এবং মজিদা আদর্শ ডিগ্রি কলেজ মাঠসহ বিভিন্ন অফিস আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে এসব এলাকার মানুষজন পড়েছেন ভোগান্তিতে। দিনভর এসব স্থান থেকে পানি ঝরে না যাওয়ায় অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, এর আগে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমরা ৯ উপজেলায় ২৭৫ মেট্রিক টন চাল, নগদ ১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ও ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করেছি।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্যসচিব পদ থেকে সাময়িক অব্যাহতি পাওয়া এক নেতাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে দায়ের হওয়া সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলায় বুধবার (৫ আগস্ট) সকালে ঢাকার পূর্ব মনিপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহীম আলী গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মামলার এজাহার গ্রহণের পর প্রাথমিক তদন্ত ও তথ্যের ভিত্তিতে যৌথ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাকে বগুড়ায় নিয়ে এসে আদালতে সোপর্দ করার আইনি প্রক্রিয়া চলছে। পুলিশ সূত্র জানায়, গত ২৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। পরে পোস্টটি মুছে ফেলা হলেও এ ঘটনায় সাইবার নিরাপত্তাসংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয়। এদিকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদ জানিয়েছেন এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট নেতা পোস্টটি মুছে ফেলার পাশাপাশি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন এবং দলও তাকে শোকজ করে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছিল। এরপরও তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। সারজিস আলম আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি বর্তমানে ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে সিলেটে ছাত্রদলের হামলায় আহত ছাত্রশক্তির এক কর্মীর ঘটনায় জড়িতদের এখনো গ্রেপ্তার না হওয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে এনসিপি ওই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে সাময়িকভাবে সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। দলের কেন্দ্রীয় শৃঙ্খলা কমিটির কাছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্পে নতুন গতি এসেছে। প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে ৩২টি বাস রুটের বিন্যাস (এলাইনমেন্ট) নির্ধারণ করা হয়েছে, যা এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব রুটকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকার জন্য সমন্বিত বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার বাস মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) বৈঠকে এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে। বৈঠকে প্রথম ধাপে কোনো দুই বা তিনটি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনা শুরু হবে, সে বিষয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ডিটিসিএর জারি করা ‘সভার নোটিশ’ অনুযায়ী, আজ দুপুর ১২টায় ডিটিসিএ ভবনে ‘ঢাকা মহানগরীর মাল্টিমোডাল ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান’ বিষয়ক এ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, পরিবহন মালিক-শ্রমিক প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারাও অংশ নেবেন। রুট রেশনালাইজেশন বিষয়ে জানা গেছে, নতুন রুটগুলো এমনভাবে পরিকল্পনা করা হয়েছে যাতে একই করিডোরে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতা কমে আসে এবং যাত্রীরা নির্ধারিত রুটভিত্তিক সেবা পান। এর মাধ্যমে যানজট, বিশৃঙ্খলা ও যাত্রী ভোগান্তি কমানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা হবে। প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ৩২টি রুটের মধ্যে রয়েছে নন্দন পার্ক–ডেমরা, নন্দন পার্ক–কাঁচপুর, দিয়াবাড়ী–সদরঘাট, শ্রীপুর–ঢাকেশ্বরী মন্দির, কোনাবাড়ী–কেরানীগঞ্জ, গাবতলী–শিমুলতলী, ঘাটারচর–সালনা, নবীনগর–বাবুবাজার, সাভার–কাঁচপুর, গাবতলী–ডেমরা, গাবতলী–কুড়াতলী, কাঁচপুর–গাজীপুর, সাভার–আড়াইহাজার ইত্যাদি। এসব রুটের মাধ্যমে বিমানবন্দর, গাবতলী, মহাখালী, কুড়িল, গুলিস্তান, মতিঝিল, সায়েদাবাদ, কাঁচপুর, সদরঘাট, সাভার, টঙ্গী, গাজীপুর, কেরানীগঞ্জসহ রাজধানীর প্রধান পরিবহন কেন্দ্রগুলোকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এ বিষয়ে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে ৩২টি রুট নির্ধারণ করেছি এবং এটি নিয়ে মঙ্গলবার বাস মালিক ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার প্রাথমিক রূপরেখা নিয়ে আলোচনা হবে। প্রথম পর্যায়ে দুই বা তিনটি রুটে এ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোনো রুট কর্তৃপক্ষ থেকে চাপিয়ে দেওয়া হবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘মালিক ও শ্রমিকরা যে রুটগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক ও বাস্তবায়নযোগ্য মনে করবেন, সেগুলোই অগ্রাধিকার পাবে। বৈঠকেই প্রথম ধাপের রুট চূড়ান্ত করার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হতে পারে।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম কালবেলাকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত ৩২টি বাস রুট এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এগুলো খসড়া বা প্রস্তাবিত পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর প্রজ্ঞাপন জারি হবে। এরপর ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতি, কোন ধরনের বাস চলবে এবং কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হবে; সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘রুট চূড়ান্ত করার আগে প্রতিটি করিডোরে যাত্রীর চাপ, সড়কের প্রশস্ততা ও পরিচালনার সক্ষমতা বিবেচনায় সমীক্ষা করা হবে। সেই সমীক্ষার ভিত্তিতে কোন রুটে কী ধরনের বাস প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা হবে।’ তার মতে, ঢাকা-গাজীপুর বা ঢাকা-সাভারের মতো ব্যস্ত করিডোরে পরীক্ষামূলকভাবে আধুনিক বাস পরিচালনা শুরু করা যেতে পারে। সাইফুল আলম বলেন, ‘বাস রুট রেশনালাইজেশনের উদ্দেশ্য শুধু নতুন রুট নির্ধারণ নয়; বরং পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাকে আধুনিক ও শৃঙ্খলাবদ্ধ করা। এজন্য ডিজিটাল ভাড়া আদায়, নির্দিষ্ট স্টপেজে যাত্রী ওঠানামা, প্রতিটি স্টপেজে বাসের আগমনের সময় জানাতে ডিজিটাল ডিসপ্লে বোর্ড এবং যাত্রী ও চালকদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যমান মালিক ও শ্রমিকদের সম্পৃক্ত রেখেই ধাপে ধাপে নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘প্রয়োজনীয় নীতিগত ও অবকাঠামোগত সহায়তা পেলে বেসরকারি মালিকরা নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার জন্য চার্জিং অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।’ বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির একটি সূত্র জানায়, বাস রুট রেশনালাইজেশন নিয়ে সরকারের সঙ্গে মালিকদের কোনো মতপার্থক্য নেই। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে তারাও আগ্রহী। প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষামূলকভাবে দুটি রুটে কোম্পানিভিত্তিক বাস পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। এ জন্য একটি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০০টি বাস সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। আংশিক ডাউন পেমেন্টের ভিত্তিতে বাসগুলো সরবরাহের পাশাপাশি বৈদ্যুতিক বাসের জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামোও নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছে তারা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বলেন, ‘ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শৃঙ্খলার আওতায় আনতে বাস রুট রেশনালাইজেশন অনেক আগেই বাস্তবায়ন হওয়া উচিত ছিল। স্মার্ট সিগন্যাল বা ইলেকট্রিক বাসের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো সুশৃঙ্খল বাস ব্যবস্থা, যা বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজি পদ্ধতির মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমানে একই করিডোরে একাধিক বাসের প্রতিযোগিতার কারণে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। কোম্পানিভিত্তিক পরিচালনা চালু হলে বাসের নেটওয়ার্ক আরও কার্যকর হবে, মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির পরিবর্তে গণপরিবহন ব্যবহার করবে, যানজট কমবে এবং মেট্রোরেলের ওপর চাপও ভারসাম্যপূর্ণ হবে।’ ড. শামসুল হক বলেন, ‘এই সংস্কারের জন্য সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য। সরকার সফল হলে রাজধানীর গণপরিবহনে দীর্ঘদিনের অরাজকতা দূর করে একটি আধুনিক, যাত্রীবান্ধব ও টেকসই বাস ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। তবে বর্তমানে যেসব মালিক বাস খাতে বিনিয়োগ করেছেন, তাদের বাদ দিয়ে নতুন ব্যবস্থা চালু করা উচিত হবে না। বরং কোম্পানিভিত্তিক ব্যবস্থায় তাদের ইক্যুইটি বা অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন।