বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মহানগর চট্টগ্রাম। পাহাড়, নদী ও বঙ্গোপসাগরের মিলিত ভূপ্রকৃতির কারণে এটি দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর, শিল্পকারখানা, আমদানি-রপ্তানি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রবেশদ্বার এই নগরী। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ভারী বর্ষণ হলেই নগরীর বহু এলাকা কোমর কিংবা বুক সমান পানিতে তলিয়ে যায়।
কোথাও ফ্ল্যাশ ফ্লাড, কোথাও জলাবদ্ধতা, আবার কোথাও জোয়ারের পানিতে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়ে। বৃষ্টি হলেই কেন ডুবে যায় চট্টগ্রাম? পাহাড়, নদী, সাগর ও নগর ব্যবস্থাপনার জটিল বাস্তবতা।
একইভাবে টানা বর্ষণে কক্সবাজারের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু সমান পানি জমে যায়, পাহাড়ি ঢলে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সমুদ্রের এত কাছে থাকা চট্টগ্রাম কেন পানিতে ডুবে?
বৃষ্টির পানি সাগরে যেতে বাধা কোথায়? আর এই সংকট থেকে মুক্তির উপায় কী? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের প্রকৃতি, ভূপ্রকৃতি, জলবায়ু এবং নগর ব্যবস্থাপনাকে একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত ব্যতিক্রমী। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে কর্ণফুলী নদী এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। স্বাভাবিকভাবে পাহাড়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিচের সমতলে নেমে আসে। একই সময়ে নগরীর নিজস্ব বৃষ্টির পানি, পাহাড়ি ঢল এবং জোয়ারের প্রভাব একত্রে কাজ করলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই বিপুল পরিমাণ পানি জমে যায়।
অনেকে মনে করেন, সমুদ্রের পাশে শহর হওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত সাগরে চলে যাওয়ার কথা। বাস্তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। বৃষ্টির পানি সাগরে যেতে হলে খাল, নালা, ড্রেন ও নদীপথের মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত থাকতে হয়। কিন্তু নগরীর বহু প্রাকৃতিক খাল দখল, ভরাট এবং সংকুচিত হয়ে গেছে। কোথাও অপরিকল্পিত সড়ক, কোথাও আবাসন, কোথাও বাজার কিংবা শিল্প স্থাপনা পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত করেছে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো জোয়ার। যখন বঙ্গোপসাগরে উচ্চ জোয়ার থাকে, তখন কর্ণফুলী নদীর পানির স্তর বেড়ে যায়। ফলে শহরের ড্রেন ও খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি নদীতে নামতে পারে না। অনেক ক্ষেত্রে নদীর পানি উল্টো শহরের দিকে চাপ সৃষ্টি করে।
অর্থাৎ বৃষ্টির পানি বের হতে না পেরে শহরের ভেতরেই আটকে যায়। এ অবস্থাকে প্রকৌশল ভাষায় ‘ব্যাকওয়াটার ইফেক্ট’ বলা হয়। অর্থাৎ নদী বা সাগরের পানির উচ্চতা এত বেশি থাকে যে শহরের পানি বের হওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। বর্তমানে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি আগের তুলনায় অনেক বেশি হচ্ছে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কয়েকশ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে শতবর্ষ আগের নকশায় নির্মিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা সেই পানি বহন করতে পারে না।
চট্টগ্রামে যে সমস্যা তৈরি হয়েছে তা হলো, ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩৩১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা এই মৌসুমে সর্বোচ্চ রেকর্ড। এর ফলে পানির নিচে রেললাইন চলে গিয়েছে, আটকা পড়েছে কক্সবাজারগামী ‘পর্যটক এক্সপ্রেস’। ভারী বৃষ্টিতে চট্টগ্রামের আউটার রিং রোডের একাংশ ধসে পড়েছে।
টানা বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম নগরজুড়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের প্রবেশপথে ও পার্কি জোনে পানি জমে গেছে।
অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে জোয়ারের উচ্চতাও বাড়ছে। ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চট্টগ্রামের আরেকটি বড় সমস্যা হলো পাহাড় কাটা। প্রাকৃতিক পাহাড় বৃষ্টির পানি কিছুটা ধরে রাখে এবং ধীরে ধীরে নিচে নামতে দেয়। কিন্তু পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণের ফলে পানি দ্রুত নিচে নেমে আসে। একই সঙ্গে ভূমিধসের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
নগরায়ণের ফলে মাটির প্রাকৃতিক পানি শোষণ ক্ষমতাও কমে গেছে। আগে খোলা মাঠ, জলাভূমি ও কৃষিজমি বৃষ্টির পানি শোষণ করত। এখন সেগুলোর জায়গায় কংক্রিটের ভবন, রাস্তা ও পার্কিং এলাকা তৈরি হয়েছে। ফলে অধিকাংশ পানি সরাসরি ড্রেনে চলে আসে এবং অল্প সময়েই ড্রেনের ধারণক্ষমতা অতিক্রম করে।
খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির সমস্যার প্রকৃতি কিছুটা ভিন্ন। সেখানে পাহাড়ি ঢল খুব দ্রুত নিচু এলাকায় নেমে আসে। ছোট নদী ও ছড়াগুলো অল্প সময়ে পূর্ণ হয়ে যায়। কোথাও সেতু, কালভার্ট বা ড্রেন সংকীর্ণ হওয়ায় পানি আটকে গিয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। একই সঙ্গে পাহাড় ধসের ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
কক্সবাজারেও একই ধরনের বহুমাত্রিক সমস্যা কাজ করে। অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল, নিম্নভূমি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, জলাভূমি ভরাট এবং জোয়ারের সম্মিলিত প্রভাবে নিম্নাঞ্চল দ্রুত প্লাবিত হয়। পর্যটনকেন্দ্র হওয়ায় দ্রুত নগর সম্প্রসারণ অনেক প্রাকৃতিক পানি ধারণ এলাকা নষ্ট করেছে।
তাহলে মুক্তির পথ কী?
প্রথমত, প্রাকৃতিক খাল, জলাধার ও জলাভূমি পুনরুদ্ধার করতে হবে। এগুলো শহরের কিডনির মতো কাজ করে। পানি জমা রাখে এবং ধীরে ধীরে নদীতে পাঠায়।
দ্বিতীয়ত, পুরো ড্রেনেজ ব্যবস্থা আধুনিক হাইড্রোলজিক্যাল মডেলের ভিত্তিতে পুনঃনকশা করতে হবে। আগামী ৫০ থেকে ১০০ বছরের বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বিবেচনায় রেখে অবকাঠামো নির্মাণ করা জরুরি।
তৃতীয়ত, কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত সব খালকে কার্যকর রাখতে হবে। যেখানে প্রয়োজন সেখানে জোয়ার নিয়ন্ত্রণকারী স্বয়ংক্রিয় স্লুইসগেট ও শক্তিশালী পাম্পিং স্টেশন স্থাপন করতে হবে, যাতে উচ্চ জোয়ারের সময়ও শহরের পানি বাইরে পাঠানো যায়।
চতুর্থত, খাল, নালা ও ড্রেনে বর্জ্য ফেলা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য ড্রেনের ধারণক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়।
পঞ্চমত, নগর পরিকল্পনায় ‘স্পঞ্জ সিটি’ ধারণা গ্রহণ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে পার্ক, উন্মুক্ত সবুজ এলাকা, রেইন গার্ডেন, পারমিয়েবল পেভমেন্ট এবং কৃত্রিম জলাধারের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি সাময়িকভাবে ধরে রাখা হয়, যাতে তা একসঙ্গে ড্রেনে চাপ সৃষ্টি না করে।
ষষ্ঠত, পাহাড় কাটা কঠোরভাবে বন্ধ করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ে দ্রুত বনায়ন করতে হবে। এতে পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রিত হবে এবং ভূমিধসের ঝুঁকিও কমবে।
সপ্তমত, আবহাওয়া পূর্বাভাস, ডপলার রাডার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রিয়েল-টাইম বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণ এবং স্বয়ংক্রিয় বন্যা সতর্কীকরণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে। আগাম সতর্কতা মানুষের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
অষ্টমত, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিকে পৃথক জলাধারা বা ক্যাচমেন্টভিত্তিক সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। কারণ প্রতিটি এলাকার ভূপ্রকৃতি ভিন্ন; তাই এক এলাকার সমাধান অন্য এলাকায় কার্যকর নাও হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি শুধু প্রকৃতির সমস্যা নয়, এটি পরিকল্পনারও সমস্যা। অতিবৃষ্টি বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু সেই বৃষ্টির পানি কীভাবে নিরাপদে নদী ও সাগরে পৌঁছাবে, সেই ব্যবস্থা আমরা অবশ্যই করতে পারি। চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে হলে খণ্ডিত নয়, সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নগর পরিকল্পনাবিদ, প্রকৌশলী, জলবিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, স্থানীয় সরকার, বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং সাধারণ নাগরিক—সবার একই লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে নগর ব্যবস্থাপনার পুরোনো ধারণা আর কার্যকর নয়। ভবিষ্যতের চট্টগ্রামকে নিরাপদ রাখতে হলে আজই বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা, প্রাকৃতিক জলপথ সংরক্ষণ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের পথে এগোতে হবে। অন্যথায় প্রতিটি বর্ষাই আমাদের মনে করিয়ে দেবে, প্রকৃতিকে উপেক্ষা করে কোনো নগরকে টেকসই রাখা যায় না।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
নোয়াখালীর বিভিন্ন থানায় কিশোর গ্যাংবিরোধী অভিযান চালিয়ে ১৬৩ জনকে আটক করেছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে দুজনকে আগের মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এছাড়া ৯ জনকে ৩৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে বাকি ১৫২ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আহমেদ পেয়ার আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এর আগে, মঙ্গলবার দিনব্যাপী অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করা হয়। পুলিশ জানায়, জেলা পুলিশ সুপার এন এম নাসিরুদ্দিনের সার্বিক দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা প্রতিরোধ, কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া রোধ, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলার বিভিন্ন থানায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এসব অভিযান চালিয়ে ১৬৩ জনকে আটক করা হয়। থানাভিত্তিক অভিযানের মধ্যে সুধারাম মডেল থানায় ২৮ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে চারজনকে ৩৪ ধারায় গ্রেফতার দেখিয়ে বাকি ২৪ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। কোম্পানীগঞ্জ থানায় তিনজন, বেগমগঞ্জ মডেল থানায় ৩৭ জন, সেনবাগ থানায় ৯ জন, চরজব্বর থানায় ৭ জন, সোনাইমুড়ী থানায় ৫ জন এবং কবিরহাট থানায় ৫ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হাতিয়া থানায় ৬৯ জনকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনকে পূর্বের মামলায় গ্রেফতার পাঁচজনকে ৩৪ ধারায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। বাকি ৬২ জনকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের জিম্মায় দেওয়া হয়েছে। নোয়াখালীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) আহমেদ পেয়ার বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের অপতৎপরতা ও অপরাধপ্রবণতা প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে। পাশাপাশি কিশোরদের সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি ও সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে সম্পৃক্ত করে জনসচেতনতামূলক ও সামাজিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
রাজধানীর ৩০০ ফিট সড়কে (পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে) উল্টো পথে আসা মোটরসাইকেল থামাতে গিয়ে দুই আরোহীর অসদাচরণের শিকার হয়েছেন কর্তব্যরত এক ট্রাফিক সার্জেন্ট। এ ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত তাদের প্রত্যেককে সাত দিনের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছেন। ওই দুই মোটরসাইকেল আরোহী হলেন- মোসা. স্বপ্না (২৭), যিনি সামাজিক যোগামাধ্যমে লেডি বাইকার নামে পরিচিত। সাজাপ্রাপ্ত অপরজন তার স্বামী মাহফুজুর রহমান। ট্রাফিক বাড্ডা জোন সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সাড়ে ৪টার দিকে পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ের একটি পয়েন্ট দিয়ে ট্রাফিক আইন অমান্য করে উল্টো পথে মোটরসাইকেল চালিয়ে আসছিলেন ওই দুই আরোহী। এ সময় সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য দুর্ঘটনা এড়াতে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক সার্জেন্ট তাদের মোটরসাইকেল থামানোর সংকেত দেন। মোটরসাইকেলটি থামানোর পর সার্জেন্ট উল্টো পথে চলাচলের কারণ জানতে চান এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেন। এ সময় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী কর্তব্যরত সার্জেন্টের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাদের সার্জেন্টের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে মোটরসাইকেলের নারী আরোহী সার্জেন্টের সঙ্গে উত্তেজিতভাবে কথা বলেন এবং তাকে লক্ষ্য করে তেড়ে যাওয়ার মতো আচরণ করেন। এতে দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক সার্জেন্টকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। সরকারি কাজে বাধা প্রদান এবং দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক সার্জেন্টের সঙ্গে প্রকাশ্য সড়কে অসদাচরণ ও তাকে হেনস্তা করার অভিযোগে পরবর্তী সময়ে ওই দুইজনকে আটক করা হয়। পরে তাদের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হলে আদালত তাদের প্রত্যেককে সাত দিনের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন এবং কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। ঘটনাটি নিশ্চিত করে পুলিশ সদরদপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, সড়কে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দায়িত্ব পালনরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে শালীন আচরণ নিশ্চিত করতে ডিএমপি নিয়মিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ট্রাফিক আইন অমান্য করা, সরকারি কাজে বাধা প্রদান কিংবা দায়িত্ব পালনরত পুলিশ সদস্যের সঙ্গে অসদাচরণের মতো ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত থাকবে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহুল আলোচিত ‘মিজানের ভাতের হোটেল’ আবারও উচ্ছেদ করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। মঙ্গলবার দুপুরে ফুটপাতে চুলা জ্বালিয়ে রান্নার প্রস্তুতি চলার সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিযান চলাকালে রান্না করা খাবারসহ মালামাল সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি ফুটপাতে স্তূপ করে রাখা কাঠের আসবাবপত্র ভেঙে জায়গাটি পরিষ্কার করা হয়। মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) দুপুর আনুমানিক ১২টার দিকে আগারগাঁও এলাকায় এই অভিযান পরিচালনা করা হয়। ডিএনসিসির অঞ্চল-৪-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জালাল উদ্দিনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই কার্যক্রমে উপস্থিত ছিলেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলী। আগারগাঁও থেকে শুরু হয়ে শেওড়াপাড়া ও কাজীপাড়া হয়ে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর পর্যন্ত সড়কের দুই পাশের ফুটপাতে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকান ও অস্থায়ী স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়ে উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। সিটি করপোরেশনের সূত্রে জানা যায়, আগের উচ্ছেদের পর এবার মিজানের কোনো স্থায়ী বা অস্থায়ী কাঠামো তৈরি করা ছিল না। গ্রাহকদের বসার জন্য চেয়ার-টেবিলও আগে থেকেই সরানো ছিল। তবে পথচারীদের চলাচলের ফুটপাতে উন্মুক্ত চুলা বসিয়ে রান্নাবান্না চলছিল এবং রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পুরোনো আসবাবপত্র জড়ো করে রাখা হয়েছিল। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্দেশে খাবার ও তৈজসপত্র সরিয়ে নেওয়া হলে অবশিষ্ট কাঠ ও অন্যান্য জঞ্জাল অপসারণ করে পথচারীদের জন্য ফুটপাত উন্মুক্ত করা হয়। অভিযানের বিষয়ে জানতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মারুফা বেগম নেলীর সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া মেলেনি; খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাদের তরফ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এর আগে গত ১৬ আগস্ট আগারগাঁওয়ের তালতলা এলাকায় প্রথম দফায় মিজানের দোকানসহ সড়কের দুই পাশের সব অবৈধ স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল ডিএনসিসি। তারও আগে, ১০ আগস্ট অবৈধ বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীদের ওপর চড়াও হওয়া ও সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগে মিজানকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। প্রায় দুই সপ্তাহ কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও ফুটপাতে দোকান চালু করার ঘোষণা দেন এবং জোর দিয়ে বলেন, ‘তালতলার ফুটপাতে যদি কোনো একটি দোকানও থাকে, তবে তা তারই থাকবে।’ উল্লেখ্য, প্রায় এক বছর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাত্র ১০০ টাকায় গরুর মাংস ও ভাত বিক্রির ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে আলোচনায় আসেন তিনি, পান ‘ভাইরাল মিজান’ খেতাব। সকালবেলা ফুটপাতেই মাংস ও ভাত রান্না করে স্বল্প মূল্যে পরিবেশন করায় দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের বহু মানুষের ভিড় জমত তাঁর এই ভ্রাম্যমাণ ভাতের হোটেলে।