ব্রিকসের একটি সদস্য দেশ হামলার শিকার হওয়ার পর শেষমেশ নিজেই জোটের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে।
শনিবার এসব দেশের নেতারা একই কক্ষে বসতে যাচ্ছেন।
এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো তারা এমন একটি যুদ্ধ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন, যে যুদ্ধ চলতি বছর আন্তর্জাতিক রাজনীতির মনোযোগ কেড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত ক করে তুলেছে।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যকার বিভেদ সামনে আনলেও সম্মেলনের আয়োজক ভারত এ জোটের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টায় আছে।
কারণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, তেহরান ও আবুধাবি এই যুদ্ধে বিপরীত অবস্থানে রয়েছে।
ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর ছয় মাসের বেশি সময় পর এ সম্মেলন হতে যাচ্ছে।
২০২৪ সালে ব্রিকসের সদস্য হয় ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এদের বাইরে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, মিশর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।
উদীয়মান দেশগুলোর এই জোট গড়ে ওঠে মূলত পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর লক্ষ্যে।
তবে বছর বিশেক হলো যাত্রা শুরু করা এ জোট নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, বিশ্বকে বহুমুখী করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের ভূমিকা থাকলেও পশ্চিমা বিশ্বের বিকল্প হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তারা বেশ হিমশিম খাচ্ছে।
পশ্চিমাদের নেতৃত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে ব্রিকস একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা দক্ষিণের দেশগুলোকে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে আরও ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক বিকল্প এনে দিয়েছে।
তবে কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ডলারের আধিপত্য এখনও আগের মতোই রয়ে গেছে। আর পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সদস্যদের মধ্যকার বিভেদ।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, পশ্চিমাদের বিকল্প হতে পারছে কিনা, সেটা ব্রিকসের সাফল্যের মাপকাঠি নয়; দেখতে হবে, পশ্চিমা আধিপত্যকে তারা কঠিন করে তুলতে পারছে কিনা।
ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিকস স্টাডিজ গ্রুপের গবেষক অক্টাভিও অলিভেইরা ও এনজো গোদিনহো আল জাজিরাকে বলেন, “আমরা ব্রিকস নেতৃত্বাধীন সব উদ্যোগকে খাটো করে দেখি, কারণ এটি আমাদের প্রত্যাশার বিপ্লব নয়।”
আল জাজিরার প্রশ্নের জবাবে লিখিতে উত্তরে এই দুই গবেষক বলেন, “এটা ঠিক যে, নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ইস্যু মোকাবিলায় জাতিসংঘের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা সক্ষমতা ব্রিকসের নেই। কিন্তু এই জোটের অস্তিত্বই দক্ষিণের দেশগুলোর নিজেদের মতামতের জানান দেয়। এছাড়া সহযোগিতার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বকে পাশ কাটানোর জন্য এই জোট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।”
পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্যেই জন্ম
কোনো কোনো বিশ্লেষকের যুক্তি, পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ব্রিকসের জন্ম হয়নি; তাদের মূল লক্ষ্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন ক্ষমতার বলয়কে চ্যালেঞ্জ জানানো।
২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয় এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) দোহা সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার কারণেই মূলত ব্রিকসের উত্থান ঘটে।
দোহা সংলাপ ছিল এমন এক বাণিজ্য আলোচনা, যার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা সংস্কার করা।
অলিভেইরা ও গোদিনহো বলেন, “যেসব দেশকে পরবর্তী ‘উন্নত রাষ্ট্র’ ভাবা হচ্ছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল, একটি প্ল্যাটফর্মে আসতে পারলেই তাদের কণ্ঠ সবচেয়ে ভালোভাবে শোনা যাবে।”
ব্রাজিলের এই দুই গবেষকের মতে, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান এসব শক্তি আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল।
সেই লক্ষ্যের জায়গা থেকে দেখলে, এই জোটের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ থাকাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কানাডার কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক শন বার্গেস।
তার মতে, ব্রিকসের দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে অগ্রাধিকার রয়েছে। একটি হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন। আরেকটি হলো, অধিকার ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যর্থতা কোথায়, সে বিষয়ে ‘পশ্চিমাদের নীতিকথা’ শোনানোর অবসান ঘটানো।
বেশির ভাগ বিশ্লেষক একমত যে, ভেঙে পড়তে থাকা উদার বিশ্বব্যবস্থাকে উৎখাত করার চেয়ে সংস্কার ও আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন অর্জনই ব্রিকসের জন্য অনেক বড় উদ্বেগের বিষয়।
বার্গেস প্রশ্ন করেন, “ব্রিকস কেন জি- সেভেনের সদস্য দেশগুলোর বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিতে যাবে?”
তার ব্যাখ্যায়, ব্রিকস তাদের সদস্য দেশগুলোকে এমন বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিকল্প পথ তৈরি করে দিয়েছে, যা তাদের স্বার্থ, বিশেষ করে জাতীয় উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে।
বার্গেস বলেন, “শর্তহীন উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রে চীনের গুরুত্ব দেওয়া এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে মুদ্রা বিনিময় নিয়ে ব্রাজিলের আলোচনা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট দুটি উদাহরণ।”
এর ফলে শুধু ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যেই নয়, সামগ্রিকভাবে দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিক লেনদেন বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
ভূরাজনৈতিক ও নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক গাই বার্টন বলেন, একবিংশ শতকের শুরুর দিকে ব্রিকসের ধারণা ও আনুষ্ঠানিক যাত্রার সময় ‘পশ্চিম’ বলতে যা বোঝানো হত, সেই ধারণাও নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। তখনকার তুলনায় এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ব্রিকস কাজ করছে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “পশ্চিমের ধারণাটিই এখন ভেঙে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। ফলে ব্রিকস আসলে কাকে বা কোন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করছে, আমেরিকা নাকি ইউরোপ, সেটাই তো এখন স্পষ্ট নয়।”
এর ফলে শুধু ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যেই নয়, সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিক লেনদেন বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
বড় অর্থনৈতিক শক্তি, সীমিত সম্মিলিত ক্ষমতা
বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, ব্রিকসের অর্থনৈতিক শক্তি যতটা বিশাল, সেটাকে সম্মিলিতভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা ততটা নয়।
ভূকৌশল বিশ্লেষক ও ফরেন পলিসি ইন ফোকাসের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইমরান খালিদ বলেন, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশ, বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর দখলে।
আইএমএফের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বছর ১১ সদস্যের এ জোটের অর্থনীতি প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়ছে, যেখানে জি-সেভেনের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ।
খালিদ বলেন, ব্রিকসের আকার যতটা, সেই তুলনায় তাদের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা দুর্বল।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমা অর্থনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সক্ষমতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সম্ভবত মার্কিন ডলারের ওপর তাদের কাঠামোগত নির্ভরতা।
ব্রাজিলের দুই গবেষক বলেন, “ডলার নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও ব্রিকসের অধিকাংশ বাণিজ্য এখনও ডলারেই হয়। আবার অধিকাংশ ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্র রিজার্ভ হিসেবে ডলারই ব্যবহার করেন।”
খালিদ বলেন, “সামগ্রিকভাবে ব্রিকস ডলার থেকে সরে যাচ্ছে না। তবে সদস্য দেশগুলো একেকটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে ডলার নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছে।”
আকাঙ্ক্ষায় ঐক্য, স্বার্থে বিভক্তি
বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করার সক্ষমতাই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এটিই আবার জোটটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হতে পারে। কারণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্বার্থগত নানা বিভেদ রয়েছে।
মে মাসে ভারতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়। সেখানেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি জোটের সদস্যরা।
খালিদ বলেন, “মে মাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক কোনো বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়। কারণ ইরান চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কথা বিবৃতিতে তুলে ধরা হোক। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত এতে রাজি হয়নি।”
তবে বর্তমান যুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরতির সব উদ্যোগই দক্ষিণের দেশগুলো থেকে এসেছে বলে তুলে ধরেন খালিদ।
তার ভাষ্য, “ওয়াশিংটন থেকে কোনো উদ্যোগ আসেনি।”
বিভেদের উদারহণ টানতে গিয়ে বার্টন বলেন, “ব্রিকসের সদস্যপদ তেহরানকে একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, জোটের সদস্যরা ইরানের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান এক করে ফেলেছে।”
বার্টন বলেন, “একজনের জন্য সবাই, সবার জন্য একজন— এমন কোনো নীতি ব্রিকসে নেই। সদস্য দেশগুলো ইচ্ছা করেই স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা ধরে রেখেছে, যা একটি সমন্বিত জোটের ঠিক বিপরীত।”
বার্টনের মতো করে বার্গেসও বলেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ে আরও বড় পরিসরে কথা বলার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ব্রিকসের থাকলেও সেখানে মতভেদ রয়েছে।
“সব সদস্যই আরও বেশি কথা বলার সুযোগ চায়, কিন্তু তারা যে বার্তা দেবে, তাতে মোটেও ঐক্যের বার্তা নেই।”
তাহলে কি ব্রিকস সত্যিই পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করছে?
সামগ্রিকভাবে ব্রিকস পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম বলে মনে করেন খালিদ।
তার মতে, অভিন্ন মুদ্রা নেই, অভিন্ন শুল্ক নেই, প্রতিরক্ষা সহযোগিতারও কোনো অঙ্গীকার নেই—তাই এটিকে প্রচলিত অর্থে কোনো ভূরাজনৈতিক জোট বলা কঠিন।
তবে ব্রিকস পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং বাণিজ্য সহজ করেছে বলে তার কাছে মনে হয়েছে।
তার ভাষায়, এই জোট একই সঙ্গে দক্ষিণের দেশগুলোকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
ব্রিকসের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ তুলে ধরতে গিয়ে খালিদ বলেন, “কোনো একটি দেশের ওপর পশ্চিমা দেশগুলো কতটা কম খরচে চাপ তৈরি করতে পারে— সেটার চ্যালেঞ্জ হিসেবে এই জোটের আবিভাবকে দেখা যেতে পারে।”
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
সৌদি আরবের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্ট-ওয়েস্ট তেল পাইপলাইন একাধিক হামলার পর এগুলো সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়। নিরাপত্তার স্বার্থে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে শুক্রবার পাইপলাইনটি বন্ধ করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুতিদের হামলার কারণে সৌদি কর্তৃপক্ষ এই পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার সকালে রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে পাইপলাইনটিতে একাধিক হামলার ঘটনা ঘটে। এতে কয়েকজন আহত হন। আহতদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। হামলার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পাইপলাইনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ শুরু করে জরুরি ও বিশেষায়িত কারিগরি দল। পরিস্থিতির পরবর্তী অগ্রগতি যথাসময়ে জানানো হবে বলে জানিয়েছে সৌদির জ্বালানি মন্ত্রণালয়। হরমুজ প্রণালির বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ রুট ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধের ঘটনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ এবং এর ফলে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির অন্যতম প্রধান বিকল্প রুটে পরিণত হয়েছে এই পাইপলাইন। পাইপলাইনটির মাধ্যমে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে উৎপাদিত অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে সরাসরি লোহিত সাগরের রপ্তানি টার্মিনালে পৌঁছানো হয়। প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল এই পাইপলাইনের মাধ্যমে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছে সৌদি আরব। বৈশ্বিক তেল সরবরাহে উদ্বেগ বাড়ছে হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ। এই পথের ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন দীর্ঘদিন ধরেই কৌশলগত বিকল্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক হামলার পর পাইপলাইনটির নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এটি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে সৌদি আরবের তেল পরিবহন ও রপ্তানি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হতে পারে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এখন পাইপলাইনটির নিরাপত্তা ও কার্যক্ষমতা যাচাই করছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি পুরোপুরি নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত পাইপলাইনটি পুনরায় চালু করা হবে কিনা সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি সৌদির জ্বালানি মন্ত্রণালয়। সূত্র : সৌদি গ্যাজেট
ব্রিকসের একটি সদস্য দেশ হামলার শিকার হওয়ার পর শেষমেশ নিজেই জোটের অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে হামলা শুরু করে। শনিবার এসব দেশের নেতারা একই কক্ষে বসতে যাচ্ছেন। এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো তারা এমন একটি যুদ্ধ নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন, যে যুদ্ধ চলতি বছর আন্তর্জাতিক রাজনীতির মনোযোগ কেড়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত ক করে তুলেছে। আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যকার বিভেদ সামনে আনলেও সম্মেলনের আয়োজক ভারত এ জোটের গুরুত্ব বাড়ানোর চেষ্টায় আছে। কারণ হিসেবে সংবাদমাধ্যমটি লিখেছে, তেহরান ও আবুধাবি এই যুদ্ধে বিপরীত অবস্থানে রয়েছে। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা শুরুর ছয় মাসের বেশি সময় পর এ সম্মেলন হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালে ব্রিকসের সদস্য হয় ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এদের বাইরে রয়েছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, সৌদি আরব, মিশর, ইথিওপিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। উদীয়মান দেশগুলোর এই জোট গড়ে ওঠে মূলত পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানানোর লক্ষ্যে। তবে বছর বিশেক হলো যাত্রা শুরু করা এ জোট নিয়ে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন হলো, বিশ্বকে বহুমুখী করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের ভূমিকা থাকলেও পশ্চিমা বিশ্বের বিকল্প হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তারা বেশ হিমশিম খাচ্ছে। পশ্চিমাদের নেতৃত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে ব্রিকস একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যা দক্ষিণের দেশগুলোকে দর-কষাকষির ক্ষেত্রে আরও ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক বিকল্প এনে দিয়েছে। তবে কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, ডলারের আধিপত্য এখনও আগের মতোই রয়ে গেছে। আর পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সম্মিলিত পদক্ষেপ নেওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সদস্যদের মধ্যকার বিভেদ। কিছু বিশ্লেষকের মতে, পশ্চিমাদের বিকল্প হতে পারছে কিনা, সেটা ব্রিকসের সাফল্যের মাপকাঠি নয়; দেখতে হবে, পশ্চিমা আধিপত্যকে তারা কঠিন করে তুলতে পারছে কিনা। ব্রাজিলের সাও পাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্রিকস স্টাডিজ গ্রুপের গবেষক অক্টাভিও অলিভেইরা ও এনজো গোদিনহো আল জাজিরাকে বলেন, “আমরা ব্রিকস নেতৃত্বাধীন সব উদ্যোগকে খাটো করে দেখি, কারণ এটি আমাদের প্রত্যাশার বিপ্লব নয়।” আল জাজিরার প্রশ্নের জবাবে লিখিতে উত্তরে এই দুই গবেষক বলেন, “এটা ঠিক যে, নির্দিষ্ট ভূরাজনৈতিক ইস্যু মোকাবিলায় জাতিসংঘের মতো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বা সক্ষমতা ব্রিকসের নেই। কিন্তু এই জোটের অস্তিত্বই দক্ষিণের দেশগুলোর নিজেদের মতামতের জানান দেয়। এছাড়া সহযোগিতার ক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বকে পাশ কাটানোর জন্য এই জোট অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।” পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করার লক্ষ্যেই জন্ম কোনো কোনো বিশ্লেষকের যুক্তি, পশ্চিমা বিশ্বব্যবস্থার বিকল্প হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ব্রিকসের জন্ম হয়নি; তাদের মূল লক্ষ্য মার্কিন নেতৃত্বাধীন ক্ষমতার বলয়কে চ্যালেঞ্জ জানানো। ২০০৮ সালের আর্থিক বিপর্যয় এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) দোহা সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার কারণেই মূলত ব্রিকসের উত্থান ঘটে। দোহা সংলাপ ছিল এমন এক বাণিজ্য আলোচনা, যার লক্ষ্য ছিল দক্ষিণের দেশগুলোর স্বার্থে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যব্যবস্থা সংস্কার করা। অলিভেইরা ও গোদিনহো বলেন, “যেসব দেশকে পরবর্তী ‘উন্নত রাষ্ট্র’ ভাবা হচ্ছিল, তারা বুঝতে পেরেছিল, একটি প্ল্যাটফর্মে আসতে পারলেই তাদের কণ্ঠ সবচেয়ে ভালোভাবে শোনা যাবে।” ব্রাজিলের এই দুই গবেষকের মতে, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদীয়মান এসব শক্তি আরও বেশি প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছিল। সেই লক্ষ্যের জায়গা থেকে দেখলে, এই জোটের সদস্যদের ঐক্যবদ্ধ থাকাটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কানাডার কার্লেটন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সহযোগী অধ্যাপক শন বার্গেস। তার মতে, ব্রিকসের দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ থাকার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়ে অগ্রাধিকার রয়েছে। একটি হলো, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রচুর অর্থ উপার্জন। আরেকটি হলো, অধিকার ও গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে নিজেদের ব্যর্থতা কোথায়, সে বিষয়ে ‘পশ্চিমাদের নীতিকথা’ শোনানোর অবসান ঘটানো। বেশির ভাগ বিশ্লেষক একমত যে, ভেঙে পড়তে থাকা উদার বিশ্বব্যবস্থাকে উৎখাত করার চেয়ে সংস্কার ও আরও বেশি স্বায়ত্তশাসন অর্জনই ব্রিকসের জন্য অনেক বড় উদ্বেগের বিষয়। বার্গেস প্রশ্ন করেন, “ব্রিকস কেন জি- সেভেনের সদস্য দেশগুলোর বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে নিতে যাবে?” তার ব্যাখ্যায়, ব্রিকস তাদের সদস্য দেশগুলোকে এমন বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বিকল্প পথ তৈরি করে দিয়েছে, যা তাদের স্বার্থ, বিশেষ করে জাতীয় উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে ভূমিকা রাখে। বার্গেস বলেন, “শর্তহীন উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রে চীনের গুরুত্ব দেওয়া এবং সরাসরি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে মুদ্রা বিনিময় নিয়ে ব্রাজিলের আলোচনা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে স্পষ্ট দুটি উদাহরণ।” এর ফলে শুধু ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যেই নয়, সামগ্রিকভাবে দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিক লেনদেন বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। ভূরাজনৈতিক ও নীতিবিষয়ক বিশ্লেষক গাই বার্টন বলেন, একবিংশ শতকের শুরুর দিকে ব্রিকসের ধারণা ও আনুষ্ঠানিক যাত্রার সময় ‘পশ্চিম’ বলতে যা বোঝানো হত, সেই ধারণাও নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। তখনকার তুলনায় এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ব্রিকস কাজ করছে। আল জাজিরাকে তিনি বলেন, “পশ্চিমের ধারণাটিই এখন ভেঙে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যকার সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। ফলে ব্রিকস আসলে কাকে বা কোন বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করছে, আমেরিকা নাকি ইউরোপ, সেটাই তো এখন স্পষ্ট নয়।” এর ফলে শুধু ব্রিকসের সদস্যদের মধ্যেই নয়, সামগ্রিকভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যেও অর্থনৈতিক লেনদেন বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি। বড় অর্থনৈতিক শক্তি, সীমিত সম্মিলিত ক্ষমতা বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, ব্রিকসের অর্থনৈতিক শক্তি যতটা বিশাল, সেটাকে সম্মিলিতভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা ততটা নয়। ভূকৌশল বিশ্লেষক ও ফরেন পলিসি ইন ফোকাসের জ্যেষ্ঠ ফেলো ইমরান খালিদ বলেন, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, ক্রয়ক্ষমতার সমতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক উৎপাদনের ৪০ শতাংশ, বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের ৪৪ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর দখলে। আইএমএফের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, এ বছর ১১ সদস্যের এ জোটের অর্থনীতি প্রায় ৩ দশমিক ৭ শতাংশ হারে বাড়ছে, যেখানে জি-সেভেনের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ। খালিদ বলেন, ব্রিকসের আকার যতটা, সেই তুলনায় তাদের প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা দুর্বল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, পশ্চিমা অর্থনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে ব্রিকসের সক্ষমতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সম্ভবত মার্কিন ডলারের ওপর তাদের কাঠামোগত নির্ভরতা। ব্রাজিলের দুই গবেষক বলেন, “ডলার নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হলেও ব্রিকসের অধিকাংশ বাণিজ্য এখনও ডলারেই হয়। আবার অধিকাংশ ব্রিকস সদস্য রাষ্ট্র রিজার্ভ হিসেবে ডলারই ব্যবহার করেন।” খালিদ বলেন, “সামগ্রিকভাবে ব্রিকস ডলার থেকে সরে যাচ্ছে না। তবে সদস্য দেশগুলো একেকটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে ডলার নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমিয়ে আনছে।” আকাঙ্ক্ষায় ঐক্য, স্বার্থে বিভক্তি বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষকে প্রতিনিধিত্ব করার সক্ষমতাই ব্রিকসের সবচেয়ে বড় শক্তি। কিন্তু এটিই আবার জোটটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাও হতে পারে। কারণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে স্বার্থগত নানা বিভেদ রয়েছে। মে মাসে ভারতে ব্রিকসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক হয়। সেখানেও ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ নিয়ে কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি জোটের সদস্যরা। খালিদ বলেন, “মে মাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক কোনো বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়। কারণ ইরান চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের কথা বিবৃতিতে তুলে ধরা হোক। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত এতে রাজি হয়নি।” তবে বর্তমান যুদ্ধের সময় যুদ্ধবিরতির সব উদ্যোগই দক্ষিণের দেশগুলো থেকে এসেছে বলে তুলে ধরেন খালিদ। তার ভাষ্য, “ওয়াশিংটন থেকে কোনো উদ্যোগ আসেনি।” বিভেদের উদারহণ টানতে গিয়ে বার্টন বলেন, “ব্রিকসের সদস্যপদ তেহরানকে একটি প্ল্যাটফর্ম দিয়েছে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, জোটের সদস্যরা ইরানের সঙ্গে নিজেদের অবস্থান এক করে ফেলেছে।” বার্টন বলেন, “একজনের জন্য সবাই, সবার জন্য একজন— এমন কোনো নীতি ব্রিকসে নেই। সদস্য দেশগুলো ইচ্ছা করেই স্বাধীনভাবে কাজ করার স্বাধীনতা ধরে রেখেছে, যা একটি সমন্বিত জোটের ঠিক বিপরীত।” বার্টনের মতো করে বার্গেসও বলেন, আন্তর্জাতিক বিষয়ে আরও বড় পরিসরে কথা বলার অভিন্ন আকাঙ্ক্ষা ব্রিকসের থাকলেও সেখানে মতভেদ রয়েছে। “সব সদস্যই আরও বেশি কথা বলার সুযোগ চায়, কিন্তু তারা যে বার্তা দেবে, তাতে মোটেও ঐক্যের বার্তা নেই।” তাহলে কি ব্রিকস সত্যিই পশ্চিমকে চ্যালেঞ্জ করছে? সামগ্রিকভাবে ব্রিকস পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং স্বায়ত্তশাসনের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম বলে মনে করেন খালিদ। তার মতে, অভিন্ন মুদ্রা নেই, অভিন্ন শুল্ক নেই, প্রতিরক্ষা সহযোগিতারও কোনো অঙ্গীকার নেই—তাই এটিকে প্রচলিত অর্থে কোনো ভূরাজনৈতিক জোট বলা কঠিন। তবে ব্রিকস পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে উন্নয়ন অর্থায়নের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করেছে এবং বাণিজ্য সহজ করেছে বলে তার কাছে মনে হয়েছে। তার ভাষায়, এই জোট একই সঙ্গে দক্ষিণের দেশগুলোকে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। ব্রিকসের ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়’ তুলে ধরতে গিয়ে খালিদ বলেন, “কোনো একটি দেশের ওপর পশ্চিমা দেশগুলো কতটা কম খরচে চাপ তৈরি করতে পারে— সেটার চ্যালেঞ্জ হিসেবে এই জোটের আবিভাবকে দেখা যেতে পারে।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে নন। তবে তিনি মনে করেন, দেশকে আরও শক্তিশালী হতে হবে যাতে ভবিষ্যতে শত্রু বা অন্য দেশের সামনে দুর্বল হয়ে আলোচনায় বসতে না হয়। খবর মিডলইস্ট আই-এর। দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও প্রধানদের সঙ্গে এক সভায় এসব কথা বলেন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি, দেশ পরিচালনা এবং সংস্কৃতি রক্ষায় গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকারের পাশে দাঁড়াতে হবে। শিক্ষার্থীদের ভূমিকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে পেজেশকিয়ান জানান, শিক্ষার্থীরা কেবল রাস্তায় নেমে আন্দোলন না করে বরং দেশের নানা সমস্যা কীভাবে মেটানো যায়, সেই পথে হাঁটুক। রাজনৈতিক ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে এক হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে ইরানি প্রেসিডেন্ট বলেন, যার রাজনৈতিক মতাদর্শ যাই হোক না কেন, দেশের সমস্যা সমাধানে যিনি সাহায্য করবেন, তাকেই তিনি স্বাগত জানাবেন। সেই সঙ্গে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।