নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় নিখোঁজ ৫৫ মালয়েশিয়ান নাগরিকের মধ্যে একজনকে ৩৭ দিন পর জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গেছে। হিমালয়ের লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট বন্যায় নিখোঁজ হওয়া ওই মালয়েশিয়ান পর্যটক নিরাপদে দেশে ফিরে গেছেন বলে জানা গেছে। খবর দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) ‘মালয়েশিয়া সলিডারিটি: ফ্যামিলিজ ইন হোপ’ (মাসফি)-এর মুখপাত্র মনিভান্নান রেথিনাম এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেন।
বিবৃতিতে তিনি জানান, নেপাল ভ্রমণে যাওয়া ওই নাগরিক কাঠমান্ডুতে অবস্থিত মালয়েশিয়ার দূতাবাসে উপস্থিত হয়ে নিজের সুরক্ষার কথা নিশ্চিত করেন। ভয়াবহ সেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দীর্ঘ ৩৭ দিন পর তাকে জীবিত খুঁজে পাওয়ায় নিখোঁজ অন্য পরিবারগুলোর মনে কিছুটা স্বস্তি ও আশা ফিরে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপসংস্থার (ইউএসজিএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লাংটাং লিরুং পর্বতে হিমবাহ ও বরফ ধসের ফলে সৃষ্ট কম্পনের পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য। এই ধ্বংসাত্মক ঘটনায় নেপাল ও সংলগ্ন তিব্বত অঞ্চলে এক হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এখনো পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে।
এর আগে গত ২৭ আগস্ট মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, নেপাল বন্যার পর কাঠমান্ডু দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া ৫৫ মালয়েশিয়ান নাগরিকের কোনো খোঁজ মিলছিল না।
মনিভান্নান রেথিনাম জানান, গত ২৫ আগস্ট বিকাল ৩টা ২৬ মিনিটে (বন্যার ঠিক এক দিন আগে) ওই পর্যটক নাগথালি ভিউপয়েন্টে ছিলেন বলে আমাদের জানানো হয়েছিল। স্থানীয় রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ ও খাবার পানির তীব্র সংকটের কারণে তিনি ওই দুর্গম এলাকায় সাময়িকভাবে আটকা পড়েছিলেন।
নেপালে সাম্প্রতিক ওই দুর্যোগের পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার তৎপরতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বরের নেপালের পর্যটন দপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ ৩০টিরও বেশি দেশের নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এদের মধ্যে ১৮০ জনের বেশি ভারতীয়, ৬৫ জন আমেরিকান, ৫৪ জন ইউক্রেনীয়, ৫৪ জন মালয়েশিয়ান এবং ৩৭ জন চীনা নাগরিক রয়েছেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনায় নিখোঁজ ৫৫ মালয়েশিয়ান নাগরিকের মধ্যে একজনকে ৩৭ দিন পর জীবিত অবস্থায় খুঁজে পাওয়া গেছে। হিমালয়ের লাংটাং লিরুং পর্বতের কাছে হিমবাহ ধসের পর সৃষ্ট বন্যায় নিখোঁজ হওয়া ওই মালয়েশিয়ান পর্যটক নিরাপদে দেশে ফিরে গেছেন বলে জানা গেছে। খবর দ্য ইন্ডিপেনডেন্টের। শুক্রবার (২ অক্টোবর) ‘মালয়েশিয়া সলিডারিটি: ফ্যামিলিজ ইন হোপ’ (মাসফি)-এর মুখপাত্র মনিভান্নান রেথিনাম এক বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। বিবৃতিতে তিনি জানান, নেপাল ভ্রমণে যাওয়া ওই নাগরিক কাঠমান্ডুতে অবস্থিত মালয়েশিয়ার দূতাবাসে উপস্থিত হয়ে নিজের সুরক্ষার কথা নিশ্চিত করেন। ভয়াবহ সেই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের দীর্ঘ ৩৭ দিন পর তাকে জীবিত খুঁজে পাওয়ায় নিখোঁজ অন্য পরিবারগুলোর মনে কিছুটা স্বস্তি ও আশা ফিরে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপসংস্থার (ইউএসজিএস) বিশ্লেষণ অনুযায়ী, লাংটাং লিরুং পর্বতে হিমবাহ ও বরফ ধসের ফলে সৃষ্ট কম্পনের পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমতুল্য। এই ধ্বংসাত্মক ঘটনায় নেপাল ও সংলগ্ন তিব্বত অঞ্চলে এক হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে এবং এখনো পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। এর আগে গত ২৭ আগস্ট মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছিল, নেপাল বন্যার পর কাঠমান্ডু দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া ৫৫ মালয়েশিয়ান নাগরিকের কোনো খোঁজ মিলছিল না। মনিভান্নান রেথিনাম জানান, গত ২৫ আগস্ট বিকাল ৩টা ২৬ মিনিটে (বন্যার ঠিক এক দিন আগে) ওই পর্যটক নাগথালি ভিউপয়েন্টে ছিলেন বলে আমাদের জানানো হয়েছিল। স্থানীয় রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় এবং বিদ্যুৎ ও খাবার পানির তীব্র সংকটের কারণে তিনি ওই দুর্গম এলাকায় সাময়িকভাবে আটকা পড়েছিলেন। নেপালে সাম্প্রতিক ওই দুর্যোগের পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় উদ্ধার তৎপরতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। গত ১৭ সেপ্টেম্বরের নেপালের পর্যটন দপ্তরের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যসহ ৩০টিরও বেশি দেশের নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এদের মধ্যে ১৮০ জনের বেশি ভারতীয়, ৬৫ জন আমেরিকান, ৫৪ জন ইউক্রেনীয়, ৫৪ জন মালয়েশিয়ান এবং ৩৭ জন চীনা নাগরিক রয়েছেন।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধকে এখন আর কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের সরাসরি সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। যুদ্ধের সামরিক ময়দানের বাইরে অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রযুক্তি, বাণিজ্য ও কূটনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লড়াই চলছে। আর সেই লড়াইয়ের কেন্দ্রে উঠে এসেছে চীন। বেইজিং সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেনি। তবে ইরানের সঙ্গে চীনের গভীর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক, বিশেষ করে ইরানি তেল কেনা এবং চীনা পণ্যের বিনিময়ে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া, ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা কৌশলকে জটিল করে তুলছে। ফলে ইরানকে অর্থনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার মার্কিন প্রচেষ্টার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এ কারণেই বড় প্রশ্নটি এখন সামনে এসেছে—ইরান যুদ্ধ কি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার আরেকটি পরোক্ষ মঞ্চ হয়ে উঠছে? ইরানের অর্থনীতির বড় ভরসা চীন ইরানের অর্থনীতিতে চীনের গুরুত্ব নতুন নয়। তবে যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার সময়ে এই সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বেড়েছে। মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চীন ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ কিনে থাকে। এসব তেলের বড় অংশ যায় চীনের ছোট ও স্বাধীন ‘টিপট’ শোধনাগারগুলোতে। এসব শোধনাগারের আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ততা তুলনামূলক কম। ফলে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানি তেল কেনাবেচার ক্ষেত্রে এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরান ও চীনের মধ্যে তেল ও পণ্য বিনিময়ের একটি গোপন বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে ইরান চীনা পণ্য, যোগাযোগ সরঞ্জাম, যানবাহন ও অন্যান্য পণ্য সংগ্রহ করছে এবং বিনিময়ে তেল সরবরাহ করছে। এই ব্যবস্থায় প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ব্যবহারও এড়িয়ে চলা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের জন্য এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ। ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা যত কঠোরই হোক, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি যদি তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যায়, তাহলে নিষেধাজ্ঞার চাপ পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন। চীনা প্রতিষ্ঠানও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার নিশানায় ইরানের সঙ্গে চীনের এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও বসে নেই। ইরানের তেল বাণিজ্য, অস্ত্র ও প্রযুক্তি সংগ্রহের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিক চীনা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ওয়াশিংটন। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অস্ত্র সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট উপাদান সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত ১৩ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তালিকায় চীন, হংকং, রাশিয়া ও পাকিস্তানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানও ছিল। এর আগে মার্কিন প্রশাসন ইরানি তেল আমদানির সঙ্গে যুক্ত চীনা ‘টিপট’ শোধনাগারগুলোর ব্যাপারেও সতর্কতা জারি করে। একই সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য চীনা সরবরাহ নেটওয়ার্কের ভূমিকা নিয়েও ওয়াশিংটনের নজরদারি বেড়েছে। তবে চীনের বড় ব্যাংক বা আর্থিক ব্যবস্থাকে সরাসরি নিশানা করা ওয়াশিংটনের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ ইরানকে চাপ দিতে গিয়ে চীনের সঙ্গে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে। তেল থেকে প্রযুক্তি, বদলে যাচ্ছে লড়াইয়ের ধরন ইরান-চীন সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তি ও পণ্য সরবরাহ। আধুনিক যুদ্ধে একটি দেশকে সরাসরি অস্ত্র বা সেনা পাঠানোই একমাত্র সহায়তার পথ নয়। যোগাযোগব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক উপাদান, নেভিগেশন প্রযুক্তি, উৎপাদন সরঞ্জাম ও দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তিও সামরিক সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই ইরানের সরবরাহব্যবস্থায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নজরদারি বাড়ছে। তবে কোনো নির্দিষ্ট বাণিজ্যিক সরবরাহ সরাসরি সামরিক ব্যবহারে গেছে কি না, সে বিষয়ে সব অভিযোগেরই একই মাত্রার প্রমাণ নেই। ফলে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সরাসরি সামরিক সহায়তার মধ্যে পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ। হরমুজে একই সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত ও মিল ইরান যুদ্ধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথটির ওপর ইরানের ভৌগোলিক প্রভাব রয়েছে। আর চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিপুল পরিমাণ তেল আমদানির কারণে হরমুজে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা বেইজিংয়ের জন্য বড় অর্থনৈতিক ঝুঁকি। যুক্তরাষ্ট্রও চায় এই নৌপথে জ্বালানি ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক থাকুক। ফলে এখানে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের স্বার্থের একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে। চীন একদিকে ইরানের পতন বা সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বিপর্যয় চায় না। অন্যদিকে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধও বেইজিংয়ের স্বার্থে নয়। কারণ যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, ততই জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়বে। চীনের এই দ্বৈত অবস্থানই বেইজিংয়ের কৌশলকে জটিল করে তুলেছে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের জ্বালানি স্বার্থ রক্ষা করতে হবে, আবার এমন কোনো অবস্থানও নেওয়া যাবে না যাতে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মধ্যস্থতাকারী হওয়ার সুযোগও দেখছে বেইজিং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত চীনের জন্য শুধু ঝুঁকি নয়, কূটনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান ও চীনের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে এবং বেইজিং সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রাখার আগ্রহ দেখিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও চীনের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। ফলে তেহরানের প্রতি প্রকাশ্য ও সীমাহীন সমর্থনের বদলে বেইজিংকে ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে হচ্ছে। অর্থাৎ চীনের লক্ষ্য শুধু ইরানকে টিকিয়ে রাখা নয়। একই সঙ্গে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক স্বার্থ ও মধ্যপ্রাচ্যে কূটনৈতিক প্রভাবও ধরে রাখা। দ্বৈরথের ভেতর আরেক দ্বৈরথ ইরান যুদ্ধ তাই ধীরে ধীরে আরেকটি বড় প্রতিযোগিতার চিত্র সামনে আনছে। ওয়াশিংটন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সামরিক চাপ ও আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার প্রভাব কাজে লাগিয়ে তেহরানকে দুর্বল করতে চাইছে। বিপরীতে বেইজিং বাণিজ্য, জ্বালানি ক্রয়, কূটনীতি ও বিকল্প সরবরাহব্যবস্থার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে। তবে এটিকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র-চীন ‘অঘোষিত যুদ্ধ’ বলা এখনই অতিরঞ্জিত হবে। দুই দেশ ইরানের মাটিতে সরাসরি পরস্পরের বিরুদ্ধে সামরিক সংঘাতে জড়ায়নি। বরং ইরানকে ঘিরে তাদের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের সংঘাত ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় পরীক্ষাগুলোর একটি হলো—যুক্তরাষ্ট্র কতটা কার্যকরভাবে ইরানকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে এবং চীন কতটা পর্যন্ত সেই চাপ উপেক্ষা করে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যেতে পারে। ফলে ইরান যুদ্ধের আসল ‘চীন সমীকরণ’ হয়তো চীনের সরাসরি যুদ্ধে নামার প্রশ্নে নয়। বরং প্রশ্নটি হলো, বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাব কি ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের কার্যকারিতাকে সীমিত করতে পারবে? আর সেই পরীক্ষার ফল শুধু ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎই নয়, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরবর্তী অধ্যায়ের গতিপথও নির্ধারণ করতে পারে। এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি বিশেষজ্ঞ আলতাফ মোতির কলাম
গত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে ৯৪টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে হুতিরা। শুক্রবার হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াহিয়া সারি এ দাবি করেন। সারি বলেন, এসব হামলায় বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে এবং এতে বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। সানা, সাদা, তাইজ, হাজ্জাহ, আমরান ও ইব প্রদেশের বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালানো হয়েছে বলে জানান তিনি। তার দাবি, এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে এসব হামলা চালানো হয়। খামিস মুশাইত ও তাইফের বিমানঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমানগুলো উড্ডয়ন করে। এছাড়া নজরান ও জিজান থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে। সারি আরও দাবি করেন, উত্তেজনা শুরুর পর থেকে ইয়েমেনে সৌদি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংখ্যা ১ হাজার ৩৫০টিতে পৌঁছেছে। অন্যদিকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুরকি আল-মালকি বলেন, খামিস মুশাইতের দিকে হুতিদের ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করে ধ্বংস করা হয়েছে। এর আগে সৌদি আরব জানিয়েছিল, খামিস মুশাইত ও জিজানের আকাশে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং খামিস মুশাইতের আকাশে চারটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। সৌদি সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার পর এর ধ্বংসাবশেষ আসির অঞ্চলের খামিস মুশাইতে পড়ে। এতে সীমিত পরিমাণে বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সূত্র: শাফাক নিউজ