বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, আগামী অর্থবছরে মোট উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে এবং পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক কমিয়ে আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এবারের বাজেটে প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ মোট প্রস্তাবিত বাজেটের দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি আসবে রাজস্ব আদায় থেকে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণভাবে ঢেলে সাজিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এর অংশ হিসেবে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, কর ব্যবস্থাপনাকে সম্পূর্ণ অটোমেশনের আওতায় আনার মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি রোধ করা হবে এবং কর ব্যবস্থায় জনগণের হয়রানি নিরসন করে আস্থা ফিরিয়ে আনা হবে।
রাজস্ব ফাঁকি রোধে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও, করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়েছে সরকার। এর বাইরেও কর, রাজস্ব আদায় ও শুল্ক আরোপের ক্ষেত্রে কী কী প্রস্তাব আনা নেওয়া হয়েছে, সেটি তুলে ধরা হচ্ছে এই প্রতিবেদনে।
করমুক্ত আয়সীমা বাড়ছে
বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, বাজেটের আকার ও জিডিপির প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় নিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়, যার সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় ৮৬ শতাংশ আহরণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
বৃহস্পতিবার ঘোষিত বাজেট ব্যক্তিশ্রেণির করদাতার করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এই করমুক্ত আয়সীমা বাড়িয়ে পৌনে ৪ লাখ টাকা করা হয়েছে। বর্তমানে এই সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা।
করমুক্ত আয়সীমা পৌনে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত শুধু ২০২৬-২৭ অর্থ বছরেই থাকবে না। সেটি অব্যাহত রাখা হবে পরের অর্থবছর অর্থাৎ ২০২৭-২৮ সাল পর্যন্ত।
শুধু এই দুই অর্থ বছর নয়, আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত করমুক্ত আয়সীমার হার কেমন হবে, সেটির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এই বাজেটে।
সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ২০২৮-২৯ এবং ২০২৯-৩০ অর্থবছরে ব্যক্তি শ্রেণি পর্যায়ে করমুক্ত আয়সীমা হবে ৪ লাখ টাকা। পরের অর্থ বছর অর্থাৎ ২০৩০-৩১ অর্থ বছরে করমুক্ত আয়সীমা হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তবে আগামী অর্থ বছর ও তার পরের অর্থ বছরে নারী করদাতা এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সী নাগরিকদের জন্য বাৎসরিক করমুক্ত আয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৪ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
তৃতীয় লিঙ্গ ও প্রতিবন্ধী করদাতাদের ক্ষেত্রে আগামী দুই অর্থবছরে করমুক্ত আয়ের পরিমাণ হবে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত। অন্যদিকে, গেজেটভুক্ত যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও গেজেটভুক্ত জুলাই আন্দোলনকারীদের করমুক্ত আয়ের পরিমাণ হচ্ছে ৫ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
করে ছাড় প্রদান
মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও কৃষিপণ্যে কর ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে।
বৃহস্পতিবার বাজেট ঘোষণাকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সরকার দেশের প্রতিটি ব্যক্তি ও পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নতির লক্ষ্যে, নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর হ্রাসের একটি বড় জনমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
তিনি জানান, মৌলিক কৃষি ও ভোগ্যপণ্য, যেমন-ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর উৎসে করের হার হ্রাস করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া স্বাস্থ্য খাতে কর ছাড়ের অংশ হিসেবে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ অগ্রিম কর সম্পূর্ণ মওকুফেরও ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের ওপর উৎসে কর ও ভ্যাট কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে কর ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। জুয়েলারি সেবার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ ভ্যাটের পরিবর্তে প্রতি ভরি হিসাবে ২ হাজার ৫০০ টাকা সুনির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, দেশীয় শিল্পের বিকাশ ও গতিশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে মোবাইল ফোন, কম্পিউটারসহ স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত বিভিন্ন পণ্যের ক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা বর্ধিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একইভাবে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রেও শর্তসাপেক্ষে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ৩০শে জুন ২০৩০ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
একইভাবে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, প্রিন্টার, টোনারসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিনির্ভর পণ্যের স্থানীয় উৎপাদনের ক্ষেত্রেও শর্তসাপেক্ষে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বর্ধিত করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অপরিবর্তিত থাকছে কর্পোরেট কর
২০২৬-২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘ মেয়াদে আরো শক্তিশালী, প্রতিযোগিতাসক্ষম এবং প্রযুক্তিনির্ভর করতে কর ও শুল্ক কাঠামোয় বড় ধরনের রূপান্তরের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়িক পরিবেশ সহজ করতে এবং করদাতাদের হয়রানি কমাতে নীতিগত কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছ।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যমেয়াদী নিশ্চয়তা দিতে এবং পলিসি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে বিদ্যমান কর্পোরেট করের হার আগামী অর্থবছরে অপরিবর্তিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে করের আওতা বাড়িয়ে করের হার ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
এত দিন করযোগ্য আয় না থাকলেও উৎসে কর্তিত করকে বাধ্যতামূলক 'ন্যূনতম কর' ধরা হতো, যা ব্যবসার সচল মূলধন আটকে দিত।
নতুন প্রস্তাবে এই সনাতন পদ্ধতি বাতিল করে উৎসে করকে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী 'অগ্রিম কর' হিসেবে গণ্য করার প্রস্তাব করা হয়েছে। অতিরিক্ত পরিশোধিত কর সরাসরি রিফান্ড (ফেরত) করা হবে।
অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, সরকারের লক্ষ্য ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করা। এই লক্ষ্য অর্জনে করের হার বাড়ানোর পরিবর্তে করের পরিধি সম্প্রসারণ এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল অটোমেশনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
কনটেন্ট তৈরি ও ফ্রিল্যান্সারদের ভ্যাট
কনটেন্ট তৈরিতে কর মওকুফের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতির প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দেশের লাখ লাখ তরুণ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সৃজনশীল কনটেন্ট তৈরি করে আয় করছেন, তারা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তরুণ প্রজন্মের উদ্যম ও সৃজনশীলতাকে উৎসাহ প্রদান এবং উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে স্টার্ট-আপ প্রতিষ্ঠান, কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের সম্পূর্ণ ভ্যাট অব্যাহতি প্রদানের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সারদের ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণরূপে অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করেন।
তিনি বলেন, মানুষের কাছে মোবাইল সেবা আরো সহজলভ্য করার লক্ষ্যে প্রতিটি মোবাইল সিমের ওপর আরোপিত ৩০০ টাকা হারে কর সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহারের প্রস্তাব করছি। ফলশ্রুতিতে আগামী অর্থবছরে মোট ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হ্রাস হবে।
রিটার্ন জমা দেওয়া যাবে সারা বছর
আয়কর ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হিসেবে সারা বছর রিটার্ন দাখিলের সুযোগ চালু করা হচ্ছে। তবে নির্ধারিত সময়ের আগে রিটার্ন জমা দিলে করদাতারা বিশেষ প্রণোদনা পাবেন।
বাজেট প্রস্তাব অনুসারে, অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের পাঁচ শতাংশ বা ২৫ হাজার টাকা, যা কম তাই ছাড় পাবেন। দ্বিতীয় প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) রিটার্ন যা কর তা দিলেই হবে। কোনো প্রণোদনা পাওয়া যাবে না।
আর জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের দুই শতাংশ বা তিন হাজার টাকা, যেটি বেশি সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে। এছাড়া এপ্রিল-জুন মাসে রিটার্ন দিলে পরিশোধযোগ্য করের পাঁচ শতাংশ বা পাঁচ হাজার টাকা, যেটি বেশি সেই পরিমাণ টাকা দিতে হবে।
নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে শুল্ক হ্রাস
বিএনপি সরকারের অধীনে প্রথম বাজেটে বিভিন্ন পণ্য ও সেবার ওপর শুল্ককর ছাড় দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে এসব পণ্যের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এবারের বাজেটে নিত্যপ্রয়োজনীয় ৬০টি পণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল, বীজসহ ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে করের হার কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে জনজীবনে যে নাভিশ্বাস উঠেছিল, তার বিপরীতে গণতান্ত্রিক সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পদক্ষেপ জনজীবনে স্বস্তি আনবে।
এছাড়া জিরা, দারুচিনি, এলাচি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, ধনিয়া ইত্যাদি মসলায় পাঁচ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।খেজুর আমদানিতে পাঁচ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে দাম কমতে পারে খেজুরের।
এছাড়া আমদানি করা শিশুখাদ্য প্রস্তুতিমূলক সামগ্রীর ওপর আমদানি শুল্ক ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। এর ফলে বাজারে শিশুখাদ্যের দাম কমবে।
ওষুধ শিল্প ও জনস্বাস্থ্য খাত
দেশের ওষুধ শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি ওষুধের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বিশাল কর ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধের নতুন উপকরণ এবং ওষুধ তৈরির মূল উপাদান এপিআইসহ মোট ৭৭টি নতুন মৌলিক কাঁচামাল আমদানিতে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট তুলে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পকে স্থানীয়ভাবে আন্তর্জাতিক মানের ও সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনে সক্ষম ও স্বাবলম্বী করে তুলতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার প্রজ্ঞাপনে কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে নতুন করে আরো ৯টি উপকরণ যুক্ত করে আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট শূন্য শতাংশ করার প্রস্তাব করছি।’
ওষুধ শিল্পের অধিকতর প্রসারকল্পে স্থানীয়ভাবে অ্যাক্টিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট বা এপিআই উৎপাদনের লক্ষ্যে নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী।
এছাড়াও বিশ্ববাজারে দেশি ওষুধের রপ্তানি বাজার ধরে রাখতে আরো ১৭টি মৌলিক কাঁচামালকে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।
ইলেকট্রিক গাড়ি ও বাইক শুল্ক ছাড়
দেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন শিল্পে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে ইলেকট্রিক গাড়ি বা ইভি, বাস, ট্রাক ও ই-বাইক খাতে শুল্ক-কর ছাড়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী পরিবহনে ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে বিদ্যমান সব ধরনের শুল্ক-কর অব্যাহতি এবং অন্যান্য ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাকের ক্ষেত্রে ভ্যাট ছাড়া বাকি সব শুল্ক-কর ছাড়ের সুবিধা ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত বহাল রাখা হবে।
এ ছাড়া ইলেকট্রিক গাড়ি আমদানিতে করভার কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। দেশে ইলেকট্রিক গাড়ি উৎপাদনে উৎসাহিত করতে স্থানীয়ভাবে উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য যন্ত্রাংশ ও উপকরণ আমদানিতে তিন শতাংশ আমদানি শুল্ক ছাড়া বাকি সব শুল্ক-কর মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে তুলনামূলক কম মূল্য সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক রেখে অন্যান্য শুল্ক-কর অব্যাহতি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া দেশীয় ই-বাইক উৎপাদন ও সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে যন্ত্রাংশ উৎপাদনকারী ভেন্ডর প্রতিষ্ঠানগুলোকেও উপকরণ আমদানিতে রেয়াতি সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
একই সাথে ইলেকট্রিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে বিআরটিএতে নিবন্ধন ও নবায়নের ক্ষেত্রে বিদ্যমান দুই লাখ টাকার অগ্রিম আয়কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
চলতি অর্থবছরের জন্য কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এবার একটি ব্যাংকের মোট ঋণের অন্তত চার শতাংশ কৃষিতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা দিয়ে এই লক্ষ্যমাত্রা দেওয়া হয়েছে। এত দিন মোট ঋণের অন্তত আড়াই শতাংশ কৃষিতে বিতরণের বাধ্যবাধকতা ছিল। সে হিসাবে, গত অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকে এক সংবাদ সম্মেলনে ডেপুটি গভর্নর ড. মো. হাবিবুর রহমান নতুন নীতিমালা ঘোষণা করেন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকসমূহ ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকের জন্য ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, কৃষি খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করাই এই নীতিমালার প্রধান উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে তিনি কৃষি ঋণ কর্মসূচির তদারকি জোরদার করতে একটি বিশেষ ‘ওয়েব বেসড এগ্রি-ক্রেডিট এমআইএস সফটওয়্যার’ করা হয়েছে। নতুন নীতিমালার উল্লেখযোগ্য ও নতুন বিষয় এবারের নীতিমালায় বেশকিছু নতুন বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণের জন্য প্রচলিত স্থাবর সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যক্তিগত, সামাজিক বা দলবদ্ধ জামানত ব্যবহার করা যাবে। বিশেষ করে, নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য এই অর্থায়ন সহজ করা হয়েছে। শস্য, ফসল এবং মৎস্য খাতের পাশাপাশি গ্রামীণ অঞ্চলের বিভিন্ন আয়-উৎসারি কর্মকাণ্ডে দলবদ্ধভাবে ঋণ দেওয়া যাবে এবং দলের সদস্য সংখ্যার সীমা শিথিল করা হয়েছে। নীতিমালায় নতুন খাত হিসেবে হ্যাচারিতে মাছ ও হাঁস-মুরগির বাচ্চা উৎপাদন এবং উট পালনের মতো বিষয়গুলো যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ব্লুবেরি ফল, শিমুল মূল, অর্শ্বগন্ধা ও ডিমের খোসা দিয়ে জৈব সার উৎপাদনের মতো নতুন নতুন খাতকে ঋণের আওতায় আনা হয়েছে। প্রকৃত কৃষক যাচাইয়ের জন্য স্থানীয় কৃষি, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার প্রত্যয়ন অথবা সরকারি ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবহার করা হবে। ঋণ পাওয়ার জন্য পাসবই থাকার বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় ব্যাংক ও গ্রাহকের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে কৃষকদের বিমা সুবিধার আওতায় আনার নতুন নিয়ম যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আশা করে, এই সময়োপযোগী নীতিমালা দেশের দারিদ্র্য বিমোচন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
একীভূতকরণ প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নিযুক্ত কর্মকর্তারা। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) হিসেবে মো. আবেদুর রহমান সিকদার দায়িত্ব নেওয়ার পর পর্যায়ক্রমে প্রশাসকদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। তাঁরা এখন নিজেদের মূল কর্মস্থল বাংলাদেশ ব্যাংকে ফিরে গেছেন। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বর্তমান সরকারও এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। একীভূতকরণ কার্যক্রম শুরুর পর প্রথমে স্বতন্ত্র পরিচালক এবং পরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এসব ব্যাংকের প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। গত ১৬ জুলাই সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের এমডি হিসেবে আবেদুর রহমান সিকদার দায়িত্ব নেওয়ার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে বর্তমানে শুধু এক্সিম ব্যাংকে একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) রয়েছেন। অন্য চার ব্যাংকে এ পর্যায়ের শীর্ষ নির্বাহী নেই। নতুন এমডি এক্সিম ব্যাংকের কার্যালয়কে কেন্দ্র করে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি অন্য ব্যাংকগুলোর বিষয়ও দেখভাল করছেন। তবে পাঁচ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় রাজধানীর মতিঝিল, গুলশান ও মহাখালীর বিভিন্ন এলাকায় হওয়ায় একজন এমডির পক্ষে সবগুলো কার্যালয়ের কার্যক্রম একসঙ্গে সরাসরি তদারক করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ বিষয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান কাজী শাইরুল হাসান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক এখন আর পাঁচ ব্যাংকের সরাসরি ব্যবসায়িক পরিচালনায় থাকবে না। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে ব্যাংকগুলোর ওপর পূর্ণ তদারকি বজায় রাখবে। দ্রুত জ্যেষ্ঠ পর্যায়ে চার থেকে পাঁচজন কর্মকর্তা নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। তিনি জানান, আপাতত এমডি নিজেই পাঁচ ব্যাংকের কার্যক্রম তদারক করছেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন কার্যালয়ে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে পুরোনো কর্মকর্তাদের সক্রিয় করে কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে। একীভূতকরণের সময়সীমা প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান বলেন, প্রক্রিয়াটি ইতোমধ্যে পুরোদমে শুরু হয়েছে। আগামী ১ ডিসেম্বরের মধ্যে পাঁচটি ব্যাংককে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি একক ও শক্তিশালী ব্যাংকে রূপান্তর করার লক্ষ্য রয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারের দেওয়া মূলধন ২০ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার আমানতকারীদের মধ্যে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাঁচ ব্যাংকে আমানতকারীদের মোট জমার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপরীতে ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চে পাঁচ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৭৭৯ কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের ৮৪ দশমিক ২২ শতাংশ। একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ ব্যাংকের দেশজুড়ে মোট ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ রয়েছে। ফলে নতুন ব্যাংকটির কার্যক্রমের পরিধি ও গ্রাহকসংখ্যা বড় হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, একীভূতকরণ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোতে কঠোর ও নিবিড় নজরদারি প্রয়োজন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই বড় ধরনের পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের প্রশাসনিক দুর্বলতা বা অনিয়ম দেখা দিলে পুরো উদ্যোগটি বাধাগ্রস্ত হতে পারে এবং ব্যাংক খাতে নতুন করে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, একীভূতকরণ যেহেতু শুরু হয়েছে, তাই এটি সফলভাবে শেষ করা জরুরি। নতুন চেয়ারম্যান ও এমডির নেতৃত্বে দ্রুত যোগ্য জনবল নিয়োগ করে রূপান্তর প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে হবে, যাতে কোনো পক্ষ বিশৃঙ্খলা তৈরির সুযোগ না পায়।
কয়েক দিনের তীব্র গ্যাসসংকট কাটিয়ে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলের উৎপাদন কার্যক্রম। শনিবার (১৫ আগস্ট) সকাল থেকে জেলার ৮১টি শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ পুনরায় চালু হওয়ায় বন্ধ ও সীমিত উৎপাদনে থাকা কারখানাগুলো আবার সচল হতে শুরু করেছে। এতে কাজে ফিরেছেন হাজারো শ্রমিক, আর উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের (জেজিটিডিএসএল) শাহজীবাজার কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক মো. খালেদ গণি জানান, শনিবার সকাল থেকে হবিগঞ্জের ছোট-বড় সব মিলিয়ে ৮১টি শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। বর্তমানে গ্যাসের চাপ সন্তোষজনক থাকায় শিল্পকারখানাগুলো ধাপে ধাপে পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে ফিরছে। উৎপাদনে ফিরছে কারখানাগুলো তেলিয়াপাড়ার ফার ইস্ট স্পিনিং মিলের জেনারেল ম্যানেজার সুমন আহমেদ বলেন, সকাল থেকেই পূর্ণমাত্রায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে উৎপাদন স্বাভাবিক গতিতে শুরু হয়েছে এবং যন্ত্রপাতি আগের মতো সচল রয়েছে। একইভাবে যমুনা শিল্পকারখানার জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী আবুল হোসেন জানান, গ্যাসের চাপ বাড়ায় উৎপাদন কার্যক্রম দ্রুত স্বাভাবিক হচ্ছে এবং শ্রমিকেরা নিয়মিতভাবে কাজে যোগ দিয়েছেন। কয়েক দিনের সংকটে বিপাকে ছিল শিল্পাঞ্চল গত বুধবার বিকেল থেকে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় মাধবপুরের ২৪টি ভারী শিল্পকারখানাসহ জেলার মোট ৮১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়ে। এতে প্রায় দেড় লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানাগুলো বিদেশি ক্রেতাদের নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারার আশঙ্কায় বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। এলএনজি সরবরাহে বিঘ্নেই তৈরি হয়েছিল সংকট সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রামের ভাসমান এলএনজি (LNG) টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে সংকট তৈরি হয়েছিল। ওই পরিস্থিতিতে সিলেট অঞ্চলের গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরিয়ে নেওয়ায় হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। তবে সামিট এলএনজি টার্মিনাল থেকে পুনরায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমেছে। এর ফলে হবিগঞ্জের শিল্পকারখানাগুলো আবার পর্যাপ্ত গ্যাস পেতে শুরু করেছে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সময় লাগবে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় উৎপাদন আবার শুরু হলেও উদ্যোক্তারা বলছেন, কয়েক দিনের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ক্ষতি দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সহজ হবে না। তাদের মতে, বিশেষ করে রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্ডার সরবরাহ নিশ্চিত করতে এখন অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হতে পারে। তাই উৎপাদন স্বাভাবিক হলেও সাম্প্রতিক সংকটের প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে আরও কিছু সময় লাগবে।