কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নাশকতার আশঙ্কায় দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সতর্ক অবস্থান।
আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দলটি গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দলটি আজ ক্ষমতার বাইরে, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে। শীর্ষ নেতাদের অনেকেই কারাগারে, আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে।
টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা দলটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ কি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে?
দেশের অন্যতম পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে দলটি। সবচেয়ে বেশি সময় দেশের ক্ষমতায় থাকার স্বাদ নিয়েছে। দলের প্রধান শেখ হাসিনা সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এত এত সাফল্যের গল্প সবই ঢাকা পড়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে।
এ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি; দেড় দশকের অপশাসন, তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা—সব সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে টিকে থাকা, অন্যদিকে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া। ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির অতীতের গৌরবের চেয়ে তাই বেশি আলোচিত হচ্ছে এর ভবিষ্যৎ। পুরোনো ও প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক দল কীভাবে এ সংকট অতিক্রম করবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম বড় প্রশ্ন।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি; দেড় দশকের অপশাসন, তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা—সব সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে টিকে থাকা, অন্যদিকে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া।
বর্তমান কৌশল কতটা কার্যকর
ক্ষমতা হারানোর পর ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগও নিষিদ্ধ। ফলে দলটির কার্যক্রম পুরোপুরিই ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল, হরতালের ডাকও এসেছে। তবে সেটা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতো কিছু নয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই রয়েছে।
এবার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ঝটিকা মিছিল করছিল আওয়ামী লীগ। আজ মঙ্গলবার তা সারা দেশেই করার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতারা।
এ পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর বাইরে সেনা মোতায়েনের জন্য চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঘিরে সরকার যে প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটাই তাদের সাফল্য। কারণ, ঝটিকা মিছিল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেওয়া যাবে না। কিন্তু দেশে এবং দেশের বাইরে এ নিয়ে যে আলোচনা হোক—এটাই চাইছে আওয়ামী লীগ।
তবে আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের এসব কর্মসূচি তেমন ফল বয়ে আনবে না; বরং দেশে থাকা যেসব নেতা-কর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন, তাঁরা পুনরায় গ্রেপ্তার হতে পারেন।
ওই নেতা আরও বলেন, ছয় মাসের একটি সরকারের ওপর এভাবে চাপ দিতে গেলে হিতে বিপরীত হবে; বরং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ওঠানো এবং মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত; পাশাপাশি দলের ভেতর সংস্কার দরকার।
আওয়ামী লীগের অনেক নেতা মনে করেন, ঝটিকা মিছিলের মতো কর্মসূচি তেমন ফল বয়ে আনবে না। বরং দেশে থাকা যেসব নেতা-কর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন, তাঁরা পুনরায় গ্রেপ্তার হতে পারেন। এখন বরং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিষেধাজ্ঞা উঠানো এবং মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত; পাশাপাশি দলের ভেতর সংস্কার দরকার।
ইতিহাসের শক্তি, বর্তমানের দুর্বলতা
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে যাত্রা শুরু, পরে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রসার ঘটে।
আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময়ই ছিল ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে দলটির ভূমিকা। পাকিস্তানি শাসনামলে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি বড় রাজনৈতিক বাঁকে আওয়ামী লীগ ছিল কেন্দ্রীয় শক্তি।
১৯৬৬ সালে ছয় দফাভিত্তিক বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিণত হয় দলটি। ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এসব অর্জন আওয়ামী লীগকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৬০টি আসন লাভ ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও দলটি বিপুল বিজয় অর্জন করে; যদিও ওই নির্বাচন নিয়ে উঠেছিল প্রশ্ন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর পাল্টে যায় দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। দীর্ঘ ২১ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে পরাজয় এবং ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারির পর আরেক দফা বিপর্যয় কাটিয়ে দলটি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী হয়। এরপর ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে পতনের আগপর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ।
ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সম্পদ নয় বা পক্ষে থাকবে না—এটা হয়তো ভুলেই গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ইতিহাস আওয়ামী লীগকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু গত এক দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামল দলটির জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল। এই সময়ে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকেও অগ্রগতির দাবি করেছে দলটি। কিন্তু দীর্ঘ ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়ন আওয়ামী লীগকে আগ্রাসী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। দেশে–বিদেশে জোটে কর্তৃত্ববাদী শাসনের তকমা। দীর্ঘ সময় গুম-খুনের পর গণ-অভ্যুত্থানে নির্বিচার গুলি করে হত্যা—অপশাসনের চরম সীমায় নিয়ে যায় আওয়ামী লীগকে।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বৈধতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং দেশে–বিদেশ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের কারণে ভোটারদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে আসে। একসময় যে দল গণভিত্তিক আন্দোলনে সুনাম অর্জন করেছিল, তারাই অগণতান্ত্রিক পথে দেশ চালাতে থাকে।
শেখ হাসিনাতে পুনরুত্থান, শেখ হাসিনাতেই পতন
স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পাঁচ মেয়াদে ২০ বছরের বেশি দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চার যুগের কাছাকাছি সময় ধরে শেখ হাসিনা সভাপতি পদে আছেন।
ফলে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক ইতিহাস মূলত শেখ হাসিনার ইতিহাস। ১৯৮১ সালে বিদেশে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান শেখ হাসিনা। এরপর এই পদে তাঁর আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই তৈরি হয়নি দলে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে যখন দলের দায়িত্ব নেন, তখন আওয়ামী লীগ ছিল বিভক্ত ও নেতৃত্বসংকটে আক্রান্ত একটি দল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলটি বহু উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থায় শেখ হাসিনা দলকে পুনর্গঠিত করেন এবং ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠেন।
১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় এবং পরবর্তী প্রায় দেড় দশক ক্ষমতা ধরে রাখা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই। ফলে দলটির ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ কার্যত থেমে যায়।
এখানেই আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটের অন্যতম উৎস। দীর্ঘ সময় ধরে দলটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠনের চেয়ে নেতাকেন্দ্রিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নীতিনির্ধারণ, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের সক্ষমতা দৃশ্যমানভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৯৯০ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের পতন হয়। তিনি কারাগারে যান। আমৃত্যু তিনি দেশে ছিলেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। একমাত্র শেখ হাসিনাই বাংলাদেশে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও নেতা যিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। বেশির ভাগ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলের শীর্ষ নেতা, এমনকি সহযোগী সংগঠনের নেতারাও দেশ ছাড়েন, যা বাংলাদেশে বিরল।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ দৃশ্যমান ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের এই করুণ পরিণতির মূল দায়ভার শেখ হাসিনারই বলে মনে করেন দলটির অনেক নেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষী।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। এখনো সেখানেই আছেন তিনি
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা, ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়ে পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে।
সাংগঠনিক শক্তি কোথায় হারাল
আওয়ামী লীগ সব সময় দাবি করে এসেছে যে তাদের কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে দলীয় সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যায়। ক্ষমতা হারানোর পর দেখা যায়, সাংগঠনিক শক্তির বড় অংশও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।
আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মতে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের এতটা দুরবস্থা হয়নি। জেল হত্যাকাণ্ড, অনেক নেতাকে কারাগারে প্রেরণের পরও দেশে অনেক নেতা ছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, সহযোগী সংগঠনের সব শীর্ষ নেতা বিদেশে আত্মগোপনে চলে গেছেন। অন্যরা কারাগারে চলে গেছেন। ফলে দেশে দলটি অনেকটাই নেতৃত্বশূন্য। বিদেশে থাকা নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগই মূল ভরসা, যা রাজপথ কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়।
বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে মূলত চারটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে বলে মনে করেন।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে দেওয়া এক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংশোধন করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রথম বিজ্ঞপ্তিতে অতিরিক্ত বিল নিয়ে ‘মিথ্যা তথ্য’ বা ‘অপপ্রচার’ ছড়ালে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল। পরে সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে সেই অংশ বাদ দেওয়া হয়। সোমবার (৩ আগস্ট) বিদ্যুৎ বিভাগ সংশোধিত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিষয়টি স্পষ্ট করে। বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ বা গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনও কি ‘অপপ্রচার’ হিসেবে বিবেচিত হবে? অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে এমন ভাষা ব্যবহারেরও সমালোচনা করেন অনেকে। সমালোচনার পর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই ওই বিজ্ঞপ্তি সংশোধন করে মন্ত্রণালয়। ফেসবুকের এডিট হিস্টোরিতে দেখা যায়, অধিকাংশ বক্তব্য অপরিবর্তিত রাখা হলেও আইনানুগ ব্যবস্থার হুঁশিয়ারিসংবলিত অংশটি বাদ দেয়া হয়েছে। সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, অতিরিক্ত বিল সংক্রান্ত এ পর্যন্ত পাওয়া সব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, কোনো গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি মনে হলে তিনি প্রয়োজনীয় নথিসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন। প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা হবে এবং কোনো অনিয়মের প্রমাণ মিললে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার না করে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। এর আগে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে অতিরিক্ত বিল নিয়ে ‘মিথ্যা তথ্য’ বা ‘অপপ্রচার’ ছড়ানোর অভিযোগে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল। তবে কয়েক ঘণ্টা পর প্রকাশিত সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে ওই সতর্কবার্তার অংশটি আর রাখা হয়নি। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং বিভিন্ন স্থানে কয়েকজন গ্রাহকের অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের অভিযোগ সামনে আসার পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যুৎ বিভাগের এ ব্যাখ্যা এসেছে। বিদ্যুৎ খাত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এর আগে জানিয়েছেন, মিটার রিডিং সময়মতো সংগ্রহ না হওয়া, আনুমানিক রিডিংয়ের ভিত্তিতে বিল প্রস্তুত, তথ্য হালনাগাদে বিলম্ব, বিলিং চক্রের সমন্বয় এবং গ্রীষ্মকালে বিদ্যুতের ব্যবহার বেড়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিল বেশি আসতে পারে। বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে, প্রকৃত অভিযোগ থাকলে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তা জানাতে হবে। অভিযোগের যথাযথ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশে অপুষ্টি এখন আর কেবল খাদ্যঘাটতির তালিকায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে। বর্তমানে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চারটি শিশুর একটি খর্বকায় (বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম)। পাশাপাশি ১৩ শতাংশ শিশু কৃশকায় এবং ৫৩ শতাংশ গর্ভবতী নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন। অন্যদিকে, প্রজননক্ষম বয়সী ৫৬ শতাংশ নারী অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টির এই ‘ত্রিমুখী সংকট’-এর কারণে দেশে প্রতিবছর জাতীয় অর্থনীতির (জিডিপি) ৮ শতাংশের বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু খাদ্য নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; মাতৃপুষ্টি, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তা না হলে খর্বতা ও অপুষ্টির এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে। সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীতে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পুষ্টি কার্যক্রম সংযুক্তিকরণ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য ও মতামত তুলে ধরা হয়। যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ। অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের প্রধান সায়কা সিরাজ বলেন, ‘দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের খাদ্য এখনো শর্করা বা চালনির্ভর। বিশেষ করে চর, হাওর, বস্তিসহ প্রান্তিক এলাকায় পুষ্টিসেবা এখনো দুর্বল। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে, পোশাকশ্রমিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রবীণদের পুষ্টির বিষয়টি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না।’ আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘শিশুর খর্বতা শুধু খাদ্যের অভাবের ফল নয়। গর্ভকালীন অপুষ্টি, বিশুদ্ধ পানির অভাব, দুর্বল স্যানিটেশন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের এতে বড় ভূমিকা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খর্বতার সূচনা হয় শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই। তিনি বলেন, ‘দেশে বর্তমানে প্রায় চার লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, যাদের অধিকাংশকেই কমিউনিটিভিত্তিক সেবার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৩ থেকে ৫ শতাংশ বিনিয়োগ করা সম্ভব হলে খর্বতার হার ২৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি মত দেন।’ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ এখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে। অপুষ্টির কারণে দেশে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে মোট রোগব্যাধির প্রায় ৭০ শতাংশই অসংক্রামক।’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের ওয়ার্ডে ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর আওতায় মাঠপর্যায়ে বর্তমানে কর্মরত ৪৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি আরও এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।’ এ ছাড়া প্রতিটি নাগরিককে ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড প্রদান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
২০২৬ সালের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল করেছে সরকার। জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ ছাড়াই নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল বলে মন্ত্রিসভা এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন দিয়েছে। সোমবার (৩ আগস্ট) সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নিরাপদ, কার্যকর, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদের মতামত নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও ২০২৬ সালের তালিকা প্রণয়নের ক্ষেত্রে সেই বিধান অনুসরণ করা হয়নি। এ কারণে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতির বৈধতা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়। বিষয়টি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে বলেও জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। এদিকে গত ২৯ জুন ঔষধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী জাতীয় ঔষধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিষদে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। সরকার জানিয়েছে, ২০২৬ সালের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি বাতিল হলেও ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা এবং সেসব ওষুধের সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা আগের মতোই কার্যকর থাকবে। এ ছাড়া অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা নতুন করে হালনাগাদ করা হবে। একই সঙ্গে ওষুধের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে, যাতে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ না পড়ে এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় থাকে।