শুধু ঋণ বিতরণ নয়, উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করে তাদের ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য দেশের প্রতিটি উপজেলায় ব্যাংকগুলোকে স্থানীয় উদ্যোক্তা শনাক্ত, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হচ্ছে।
ব্যবসার ধারণা থাকলেও অর্থের অভাবে যারা উদ্যোগ নিতে পারছেন না, তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির মাধ্যমে ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত তরুণদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে অর্থায়ন করা হবে। কর্মসূচির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের পাশাপাশি সমপরিমাণ অনুদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন দেওয়া যাবে।
এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। তবে অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ হবে ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন ও ব্যয় পরিকল্পনা যাচাই করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অনেক তরুণের ব্যবসার আগ্রহ ও ধারণা থাকলেও ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় জামানত, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি। আবার উপজেলা পর্যায়ে অনেক সম্ভাবনাময় ব্যবসা থাকলেও সেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের আওতায় আসে না।
নতুন কর্মসূচিতে এসব বাধা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই উদ্যোক্তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই কর্মসূচিতে কারা আবেদন করতে পারবেন
এই কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা তরুণেরা আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীর নিজের ব্যবসায়িক উদ্যোগ অথবা বাস্তবসম্মত ব্যবসার পরিকল্পনা থাকতে হবে। আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়া ব্যক্তি, ঋণখেলাপি এবং সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন না।
উপজেলায় ব্যাংকগুলোর নতুন ভূমিকা
উদ্যোগ কর্মসূচিতে ব্যাংকের ভূমিকা শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট উপজেলার সব তফসিলি ব্যাংকের শাখাকে স্থানীয়ভাবে প্রচার চালিয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা নির্বাচনের প্রক্রিয়াতেও ব্যাংকগুলো যুক্ত থাকবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি উপজেলায় একটি তফসিলি ব্যাংককে লিড ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব দেবে। জেলা পর্যায়ের আবেদন ও কার্যক্রমও এই লিড ব্যাংকের মাধ্যমে সমন্বয় করা হবে। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে শুধু অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে।
আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন করার সুযোগ থাকবে। যে ব্যাংকে আবেদন করা হবে, সেখানে আগে থেকে হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, ছবি, নির্ধারিত আবেদন ফরম এবং স্থায়ী বাসিন্দার প্রমাণপত্র দিতে হবে।
জামানত ছাড়াই অর্থায়ন
তরুণদের ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো জামানত। নতুন কর্মসূচিতে এই বাধা কমাতে সহায়ক জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো সম্পদ জামানত দেওয়ার মতো সক্ষমতা না থাকলেও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকলে তরুণেরা অর্থায়নের সুযোগ পাবেন।
তবে জামানত না থাকলেও ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি শিথিল নয়। উদ্যোক্তা নির্বাচন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতি ও প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে ঋণ অনুমোদন করবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত উদ্যোক্তার ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে।
কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে তার কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে তা জানাতে হবে। এর ফলে উদ্যোক্তা বাছাই ও ঋণ অনুমোদনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ঋণের সঙ্গে ব্যবসা শেখানোর ব্যবস্থা
কর্মসূচিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ। শুধু টাকা দিলেই নতুন ব্যবসা টেকসই হবে না—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আর্থিক সাক্ষরতা, প্রশিক্ষণ, মেন্টরের পরামর্শ এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
নতুন উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ তৈরি করার উদ্যোগ থাকবে। অর্থাৎ ব্যবসা শুরু করার জন্য অর্থের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বাজার পাওয়ার বিষয়টিকেও কর্মসূচির অংশ করা হয়েছে।
কৃষি থেকে প্রযুক্তি পর্যন্ত সুযোগ
উদ্যোগ কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট কোনো একটি খাতকে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য, পশুপালন, হস্তশিল্প, পর্যটন, সেবা, হালকা প্রকৌশল, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এর আওতায় আসতে পারে।
ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্স, ফিনটেক, এডটেক, এগ্রিটেক ও হেলথটেকের মতো নতুন খাতেও তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সম্পদ ও চাহিদার ভিত্তিতে ব্যবসা তৈরির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগও থাকছে।
বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে ব্যবসার সম্ভাবনা
উদ্যোক্তা নির্বাচনে শুধু বয়স বা আবেদন করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে না। ব্যবসার ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত, পণ্য বা সেবার বাজার কতটা সম্ভাবনাময়, উদ্যোক্তার সক্ষমতা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের বদলে ব্যবসার সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তার সক্ষমতার ভিত্তিতে বাছাই করার সুযোগ তৈরি হবে।
টাকা দেওয়ার পরও নজরদারি
উদ্যোক্তার হাতে অর্থ দেওয়ার পরও ব্যাংককে ব্যবসার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিক্রি, নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধ এবং কর্মসংস্থান তৈরির অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত নজরদারির আওতায় থাকবে।
বিশেষ করে অনুদানের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বা অনুদানের অর্থ অনুমোদিত কাজে ব্যবহার না করলে অনুদানের সমপরিমাণ অর্থও ঋণে পরিণত হবে। ফলে অনুদান পাওয়ার পর অর্থ অন্য কাজে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল পরিবর্তন হলো, উপজেলা পর্যায়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা। অর্থের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং, ব্যবসা নিবন্ধন ও বাজারসংযোগের ব্যবস্থা থাকায় কর্মসূচিটি শুধু ঋণ বিতরণের প্রকল্প না হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ব্যবসা তৈরির একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে প্রকৃত উদ্যোক্তা বাছাই, অর্থ ছাড়ে গতি এবং অর্থের ব্যবহার তদারকিই শেষ পর্যন্ত কর্মসূচিটির সফলতা নির্ধারণ করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
শুধু ঋণ বিতরণ নয়, উপজেলা পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় তরুণদের খুঁজে বের করে তাদের ব্যবসায়ী হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ জন্য দেশের প্রতিটি উপজেলায় ব্যাংকগুলোকে স্থানীয় উদ্যোক্তা শনাক্ত, প্রশিক্ষণ ও অর্থায়নের প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হচ্ছে। ব্যবসার ধারণা থাকলেও অর্থের অভাবে যারা উদ্যোগ নিতে পারছেন না, তাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন ‘উদ্যোগ’ কর্মসূচির মাধ্যমে ২৮ বছর বয়স পর্যন্ত তরুণদের ব্যবসা শুরু ও সম্প্রসারণে অর্থায়ন করা হবে। কর্মসূচির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক প্রয়োজন অনুযায়ী ঋণের পাশাপাশি সমপরিমাণ অনুদানের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ একজন উদ্যোক্তাকে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন দেওয়া যাবে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা ব্যাংকঋণ এবং সমপরিমাণ অর্থ অনুদান হিসেবে দেওয়া হবে। তবে অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণ হবে ব্যবসার প্রকৃত প্রয়োজন ও ব্যয় পরিকল্পনা যাচাই করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের অনেক তরুণের ব্যবসার আগ্রহ ও ধারণা থাকলেও ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়ায় জামানত, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ঘাটতি। আবার উপজেলা পর্যায়ে অনেক সম্ভাবনাময় ব্যবসা থাকলেও সেগুলো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের আওতায় আসে না। নতুন কর্মসূচিতে এসব বাধা কমিয়ে স্থানীয় পর্যায়েই উদ্যোক্তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এই কর্মসূচিতে কারা আবেদন করতে পারবেন এই কর্মসূচিতে সংশ্লিষ্ট উপজেলার স্থায়ী বাসিন্দা তরুণেরা আবেদন করতে পারবেন। আবেদনকারীর নিজের ব্যবসায়িক উদ্যোগ অথবা বাস্তবসম্মত ব্যবসার পরিকল্পনা থাকতে হবে। আগে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ব্যবসার জন্য ঋণ নেওয়া ব্যক্তি, ঋণখেলাপি এবং সরকারি, আধা সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তিরা এই সুবিধার আওতায় আসবেন না। উপজেলায় ব্যাংকগুলোর নতুন ভূমিকা উদ্যোগ কর্মসূচিতে ব্যাংকের ভূমিকা শুধু ঋণ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। সংশ্লিষ্ট উপজেলার সব তফসিলি ব্যাংকের শাখাকে স্থানীয়ভাবে প্রচার চালিয়ে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। আবেদন গ্রহণ থেকে শুরু করে উদ্যোক্তা নির্বাচনের প্রক্রিয়াতেও ব্যাংকগুলো যুক্ত থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিটি উপজেলায় একটি তফসিলি ব্যাংককে লিড ব্যাংক হিসেবে দায়িত্ব দেবে। জেলা পর্যায়ের আবেদন ও কার্যক্রমও এই লিড ব্যাংকের মাধ্যমে সমন্বয় করা হবে। ফলে কেন্দ্রীয়ভাবে শুধু অর্থ বরাদ্দ না দিয়ে স্থানীয় ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে উদ্যোক্তা তৈরির কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে। আবেদনকারীদের সংশ্লিষ্ট উপজেলার যেকোনো তফসিলি ব্যাংকের শাখায় আবেদন করার সুযোগ থাকবে। যে ব্যাংকে আবেদন করা হবে, সেখানে আগে থেকে হিসাব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। জাতীয় পরিচয়পত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, ছবি, নির্ধারিত আবেদন ফরম এবং স্থায়ী বাসিন্দার প্রমাণপত্র দিতে হবে। জামানত ছাড়াই অর্থায়ন তরুণদের ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হলো জামানত। নতুন কর্মসূচিতে এই বাধা কমাতে সহায়ক জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে জমি, বাড়ি বা অন্য কোনো সম্পদ জামানত দেওয়ার মতো সক্ষমতা না থাকলেও সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক পরিকল্পনা থাকলে তরুণেরা অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। তবে জামানত না থাকলেও ঋণ পাওয়ার প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি শিথিল নয়। উদ্যোক্তা নির্বাচন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংক নিজস্ব ঋণনীতি ও প্রচলিত নিয়ম অনুসরণ করে ঋণ অনুমোদন করবে। চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত উদ্যোক্তার ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়া ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা রয়েছে। কোনো আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হলে তার কারণ লিখিতভাবে সংরক্ষণ করতে হবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে তা জানাতে হবে। এর ফলে উদ্যোক্তা বাছাই ও ঋণ অনুমোদনে জবাবদিহি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ঋণের সঙ্গে ব্যবসা শেখানোর ব্যবস্থা কর্মসূচিটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অর্থায়নের পাশাপাশি উদ্যোক্তাদের প্রস্তুত করার উদ্যোগ। শুধু টাকা দিলেই নতুন ব্যবসা টেকসই হবে না—এ বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আর্থিক সাক্ষরতা, প্রশিক্ষণ, মেন্টরের পরামর্শ এবং ব্যবসায়িক পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএনসহ প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক নিবন্ধনের ক্ষেত্রেও সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি বাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের যোগাযোগ তৈরি করার উদ্যোগ থাকবে। অর্থাৎ ব্যবসা শুরু করার জন্য অর্থের পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও বাজার পাওয়ার বিষয়টিকেও কর্মসূচির অংশ করা হয়েছে। কৃষি থেকে প্রযুক্তি পর্যন্ত সুযোগ উদ্যোগ কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট কোনো একটি খাতকে সীমাবদ্ধ করা হয়নি। কৃষি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য, পশুপালন, হস্তশিল্প, পর্যটন, সেবা, হালকা প্রকৌশল, সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসা এর আওতায় আসতে পারে। ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্স, ফিনটেক, এডটেক, এগ্রিটেক ও হেলথটেকের মতো নতুন খাতেও তরুণ উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ বিবেচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সম্পদ ও চাহিদার ভিত্তিতে ব্যবসা তৈরির পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগ গড়ে তোলার সুযোগও থাকছে। বাছাইয়ে গুরুত্ব পাবে ব্যবসার সম্ভাবনা উদ্যোক্তা নির্বাচনে শুধু বয়স বা আবেদন করার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে না। ব্যবসার ধারণা কতটা বাস্তবসম্মত, পণ্য বা সেবার বাজার কতটা সম্ভাবনাময়, উদ্যোক্তার সক্ষমতা, আর্থিক পরিকল্পনা এবং কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, সফল উদ্যোক্তা, ব্যাংকার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সম্পৃক্ত করার কথা বলা হয়েছে। এতে স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের বদলে ব্যবসার সম্ভাবনা ও উদ্যোক্তার সক্ষমতার ভিত্তিতে বাছাই করার সুযোগ তৈরি হবে। টাকা দেওয়ার পরও নজরদারি উদ্যোক্তার হাতে অর্থ দেওয়ার পরও ব্যাংককে ব্যবসার অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। বিক্রি, নগদ প্রবাহ, ঋণ পরিশোধ এবং কর্মসংস্থান তৈরির অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত নজরদারির আওতায় থাকবে। বিশেষ করে অনুদানের অর্থ নির্ধারিত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বা অনুদানের অর্থ অনুমোদিত কাজে ব্যবহার না করলে অনুদানের সমপরিমাণ অর্থও ঋণে পরিণত হবে। ফলে অনুদান পাওয়ার পর অর্থ অন্য কাজে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগের মূল পরিবর্তন হলো, উপজেলা পর্যায়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে উদ্যোক্তা তৈরির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত করা। অর্থের পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, মেন্টরিং, ব্যবসা নিবন্ধন ও বাজারসংযোগের ব্যবস্থা থাকায় কর্মসূচিটি শুধু ঋণ বিতরণের প্রকল্প না হয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নতুন ব্যবসা তৈরির একটি কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে প্রকৃত উদ্যোক্তা বাছাই, অর্থ ছাড়ে গতি এবং অর্থের ব্যবহার তদারকিই শেষ পর্যন্ত কর্মসূচিটির সফলতা নির্ধারণ করবে।
সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের অভ্যন্তরীণ পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণের এই পরিসংখ্যান সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার রেকর্ড সীমা অতিক্রম করল। এক বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ ছিল ১০ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত অর্থবছরে ব্যাংক ব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ করেছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ করেছে ১ লাখ ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা। এ সময়ে সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু সরকার এ সময় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা বেশি ঋণ নেয়। ফলে অর্থবছর শেষে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায়।
কর ফাঁকি রোধ এবং রাজস্ব আদায় বাড়াতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও উপাত্তনির্ভর প্রযুক্তির সাহায্যে করদাতাদের ঘোষিত আয়ের সঙ্গে বাস্তব ব্যয়ের সামঞ্জস্য যাচাইয়ের লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ নিচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন এই ব্যবস্থায় প্রতিটি করদাতার একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্রোফাইল তৈরি করা হবে। সেখানে রিটার্নে প্রদর্শিত আয়ের পাশাপাশি ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ, বিদেশ ভ্রমণ, ব্যাংক লেনদেন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ব্যয়ের তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্ত হবে। কোনো করদাতার আয় ও ব্যয়ের মধ্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি বা গরমিল দেখা দিলে প্রযুক্তি তা নিজে থেকেই ধরে ফেলবে। এতে ফাঁকিবাজদের সহজে চিহ্নিত করে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় রাখা সম্ভব হবে। কর ফাঁকি রোধ ও করজাল সম্প্রসারণে করদাতার আর্থিক কর্মকান্ডের বিভিন্ন উৎসের তথ্য এক জায়গায় এনে বিশ্লেষণের উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআরের কর বিভাগ। আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে ইনকাম ট্যাক্স ডেটা ওয়্যারহাউস স্থাপনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, দেশের কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে এ মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে কর-জিডিপির অনুপাত ৬.৮ শতাংশ। ২০৩৫ সালের মধ্যে এটি ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। নতুন ব্যবস্থায় করদাতার ব্যাংক হিসাব, জমি ও গাড়ি কেনাবেচা এবং শেয়ারবাজারের বিনিয়োগের তথ্য অটোমেটেড সিস্টেমে চলে আসবে। উদাহরণ হিসেবে এনবিআর জানায়, কোনো করদাতা বছরে ১০ লাখ টাকা আয় দেখালে এবং একই সময়ে ব্যাংকে কোটি টাকা জমা বা দামি গাড়ি ক্রয় করলে এআই তা সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করবে। ট্যাক্স আইডেনটিফিকেশন নম্বর (টিআইএন) না থাকলেও করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা হবে। একইভাবে টিআইএন থাকার পরও যারা রিটার্ন দাখিল করেন না, তাদেরও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। এ জন্য টিআইএন ডেটাবেস পরিশোধন করে করদাতাদের কার্যক্রম অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে ভাগ করার পরিকল্পনা রয়েছে। নিয়মিত রিটার্ন দাখিল ও কর প্রদানকারীদের ‘অ্যাকটিভ ট্যাক্সপেয়ার’, রিটার্ন দাখিল করলেও করযোগ্য আয় না থাকা ব্যক্তিদের ‘রিটার্ন ফাইলার বাট নো ট্যাক্স’, টিআইএন থাকার পরও রিটার্ন না দেওয়া ব্যক্তিদের ‘নন-ফাইলার’ এবং দীর্ঘদিন কোনো কার্যক্রম নেই এমন টিআইএনকে ‘ডরম্যান্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। অন্যদিকে টিআইএন না থাকলেও করযোগ্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ড রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ‘পটেনশিয়াল ট্যাক্সপেয়ার’ হিসেবে শনাক্ত করা হবে। প্রতিটি করদাতার জন্য একটি সমন্বিত করদাতা প্রোফাইল তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে ঘোষিত আয়, পরিশোধ করা কর, ব্যাংক লেনদেন, স্থাবর সম্পত্তি, গাড়ি, কোম্পানিতে মালিকানা, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ, আমদানি-রপ্তানি, উৎসে কর, বিদেশ ভ্রমণ এবং অন্যান্য বড় ব্যয় ও সম্পদের তথ্য একত্রে রাখা হবে। এর ফলে একজন করদাতার আয়, ব্যয় ও সম্পদ অর্জনের মধ্যে সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা সহজেই যাচাই করা যাবে। এ ছাড়া করপোরেট কর ফাঁকি বন্ধে কোম্পানিগুলোর জন্য বিশেষ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরির কাজ চলছে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. মো. আইনুল ইসলাম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, রাজস্ব খাতের ডিজিটালাইজেশন এ প্রস্তাবটি দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন মহল থেকে আলোচিত হচ্ছে, তবে মাঠপর্যায়ে এর কার্যকর কোনো বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হয়নি। তবে এনবিআরের এ বাস্তবসম্মত সুপারিশগুলো যদি দ্রুত ও সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে দেশের ভঙ্গুর রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এক বৈপ্লবিক, ইতিবাচক ও টেকসই পরিবর্তন আসবে।