মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত পরিস্থিতির মধ্যে লেবানন-এ আরও দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এতে ওই অঞ্চলে অবস্থানরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও প্রবাসী কমিউনিটির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন এলাকায় গোলাগুলি ও হামলার ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় নতুন করে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুর খবর আসে। নিহতদের পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট দূতাবাস প্রবাসীদের নিরাপদ স্থানে থাকার এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
প্রবাসী সংগঠনগুলো বলছে, চলমান উত্তেজনার কারণে সেখানে থাকা বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিহতদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু করার দাবিও উঠেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে লেবাননে কর্মরত প্রবাসীদের মধ্যে আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, অনেকে ২০২৪ সালের আন্দোলনকে শুধু কয়েকজন ব্যক্তির নামে চালাতে চান। তবে দেশের মানুষ মনে করে ২০২৪ সালে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলনের ফল। তারই ধারাবাহিকতায় ছাত্র-গণআন্দোলন সফল হয়েছে এবং শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছেন। সোমবার (২৪ আগস্ট) বিকালে রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বিএনপির সাবেক মহাসচিব ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের ২৭তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ড. মোশাররফ বলেন, “বিএনপি দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আরও অনেক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আন্দোলন করেছে। এ সময় বহু নেতাকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মিথ্যা মামলায় আসামি হয়ে শাস্তি ভোগ করেছেন এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সাজাপ্রাপ্ত হয়ে লন্ডন থেকে দেশে ফিরতে পারেননি।” ড. মোশাররফ বিএনপির প্রয়াত সাবেক মহাসচিব ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারের এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকার স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, “এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির মহাসচিব হিসেবে সালাম তালুকদার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।” আন্দোলনের সমন্বয়ের জন্য গঠিত লিয়াজোঁ কমিটির আহ্বায়কও ছিলেন তিনি। নিজের সঙ্গে সালাম তালুকদারের স্মৃতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় জামালপুরে একটি জনসভায় যাওয়ার কর্মসূচি ছিল। এর আগের দিন এরশাদ একটি নির্বাচনের ঘোষণা দেন এবং ওই নির্বাচনের বিষয়ে বক্তব্য দিলে গ্রেফতারের হুমকি দেওয়া হয়। তখন অনেক নেতা মনে করেছিলেন, জামালপুরের ওই জনসভায় গেলে তাদের গ্রেফতার হতে হবে। ওই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়া টেলিফোনে সালাম তালুকদারের সঙ্গে কথা বলেন। তখন সালাম তালুকদার জানিয়েছিলেন, তিনি এবং তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীরা গ্রেফতার হতে প্রস্তুত। কিন্তু জনসভায় না গেলে তাদের ইজ্জত থাকবে না। শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নেতারা জামালপুরের জনসভায় যোগ দেন।” তিনি বলেন, “জনসভা শেষে ঢাকায় ফেরার সময় তাদের গ্রেফতার হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তবু খালেদা জিয়া ও সালাম তালুকদার সিদ্ধান্ত নেন, তারা কোথাও আত্মগোপন করবেন না; বরং যার যার বাসায় ফিরে যাবেন। ঢাকায় ফেরার পথে টঙ্গীর কাছে সালাম তালুকদার, ব্যারিস্টার টি এইচ খান, তিনি নিজেসহ অনেক নেতাকে গ্রেফতার করা হয়।” খন্দকার মোশাররফ বলেন, “ওই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া ও ব্যারিস্টার সালাম তালুকদারের গণতন্ত্র ও রাজনীতির প্রতি দৃঢ়তার প্রমাণ পাওয়া যায়। পরবর্তীতে এরশাদবিরোধী আন্দোলন গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এরশাদকে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য করা হয়।” তিনি বলেন, “এরশাদের পতনের পর দেশের জনগণ খালেদা জিয়াকে ‘দেশনেত্রী’ উপাধি দেয় এবং নির্বাচনের মাধ্যমে তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। আন্দোলন সফল করা এবং পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপিকে ক্ষমতায় নেওয়ার সময় দলের মহাসচিব ছিলেন ব্যারিস্টার সালাম তালুকদার।” অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, “বর্তমানে যারা মন্ত্রী হয়েছেন বা প্রধানমন্ত্রী যাদের নিয়ে কাজ করছেন, তারা কাজ করে যাচ্ছেন। কিন্তু রাগ, গোসা বা অভিমান থেকে বিএনপির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হলে এবং দল তা মোকাবিলায় সজাগ না থাকলে পরিস্থিতি কঠিন হতে পারে। বিএনপির নেতাকর্মীরা রাজপথে সক্রিয় না থাকলে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদেরও ঝুঁকিতে পড়তে হবে।”
দক্ষ বিদেশি কর্মীদের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় এইচ-১বি ভিসার আবেদন ফি বাড়িয়ে ১ লাখ ৩ হাজার ২৬৫ ডলার করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সরকার। দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ এই সংক্রান্ত একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। নতুন এই প্রস্তাব কার্যকর হলে প্রযুক্তি, শিক্ষা ও গবেষণা খাতে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি নির্দেশের মাধ্যমে এই উচ্চ ফি সাময়িকভাবে চালু করা হয়েছিল। তবে আদালত তা স্থগিত করার পর, এখন আইনের মাধ্যমেই নীতিটিকে স্থায়ী করার চেষ্টা চলছে। সরকারের দাবি, অভিবাসন ব্যবস্থার খরচ তোলা এবং আমেরিকানদের চাকরির সুযোগ নিশ্চিত করতেই এই বাড়তি ফি নির্ধারণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগে যেখানে একটি এইচ-১বি ভিসার সাধারণ ফি ছিল মাত্র দুই থেকে পাঁচ হাজার ডলারের মধ্যে, সেখানে এখন ১ লাখ ডলারের বেশি ফি দিতে হলে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বড় আর্থিক চাপ তৈরি হবে। প্রস্তাবটি চূড়ান্ত করার আগে ৩০ দিন সাধারণ মানুষের মতামতের জন্য রাখা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, দেশটিতে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি মেটাতে ও নতুন উদ্ভাবন ধরে রাখতে বিদেশি মেধা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, এই ভিসার প্রায় ৭০ শতাংশই ব্যবহার করেন ভারতীয় পেশাজীবীরা। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের এই নিয়ম স্থায়ী হলে তা আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানে বড় প্রভাব ফেলবে। সূত্র: রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তীব্র সংঘাতে লিপ্ত থাকার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরে একটি পরিচিত লড়াইয়ের মুখোমুখি হচ্ছে ইরান। সেটি হচ্ছে ক্রমবর্ধমান হারে দেশটির নারীরা প্রকাশ্যে হিজাব পরতে অস্বীকৃতি জানালেও সরকার এই বিষয়ে তেমন কঠোর কোনও অবস্থানে যাচ্ছে না। যুদ্ধের ভয়াবহ সময়েও সরকারপন্থি জনসভা এবং রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে হিজাবহীন নারীদের দেখা গেছে। একটি ভিডিওতে জাতীয় পতাকা হাতে এক হিজাবহীন নারীকে বলতে শোনা যায়, তার স্বামী সেনাবাহিনীতে কর্মরত এবং স্বামীকে নিয়ে গর্বিত তিনি। যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট এবং মোজতবা খামেনির অধীনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার পুনর্গঠন নিয়ে ব্যস্ত থাকা কর্তৃপক্ষের অগ্রাধিকারের তালিকা থেকে নারীদের পোশাক সংক্রান্ত নিয়ম কঠোরভাবে চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি যেন কিছুটা থমকে গেছে। বর্তমানে ইরানের কট্টরপন্থিরা বিষয়টিকে আবারও অগ্রাধিকারের তালিকার শীর্ষের কাছাকাছি ফিরিয়ে আনতে চান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রক্ষণশীল ধর্মীয় নেতা এবং রাজনীতিকরা ‘‘প্রকাশ্য নগ্নতার’’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে পোশাকের নিয়ম মানতে ব্যর্থ হওয়ায় ক্যাফে ও অন্যান্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সরকার এক বিস্ফোরক হিসেব-নিকেশের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে: ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ওপর কঠোর হওয়া এক বিষয়, আর বিপুল সংখ্যক নারীর মুখোমুখি হতে নীতি পুলিশকে আবারও রাস্তায় নামানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। মাহসা আমিনির মৃত্যু দেশটিতে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনভাবে চলার’ অভ্যুত্থানের দাবানল জ্বালিয়ে দেওয়ার চার বছর পর অনেক ইরানি নারী প্রকাশ্যে বাধ্যতামূলক হিজাব আইন অমান্য করছেন। আর তেহরান নতুন সংঘাতময় পরিস্থিতি এড়াতে চাইছে। • হিজাব থেকে মাহসা আমিনি: যেভাবে আজকের ইরান • ১৯৭৯ : বিপ্লবের পথ পরিবর্তন ইসলামি বিপ্লবে শাহর পতনের পর আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি নারীদের ইসলামি পোশাক মেনে চলার আহ্বান জানান। নারীরা বাধ্যতামূলকভাবে পর্দা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদ করেন। • ১৯৮০-এর দশকের শুরু : বাধ্যতামূলক হিজাব ইরানে পর্যায়ক্রমে কর্মক্ষেত্র ও সরকারি স্থানগুলোতে বাধ্যতামূলক ইসলামি পোশাক চালু করে। নির্ধারিত ইসলামি হিজাব ছাড়া জনসমক্ষে আসা নারীরা ইরানি আইনের আওতায় শাস্তির যোগ্য হন। • ২০০০-এর দশক : নীতি পুলিশের ব্যাপক উপস্থিতি নীতি পুলিশ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত ইরানের ‘গাইডেন্স পেট্রোল’ নারীদের পোশাক সংক্রান্ত নিয়ম প্রয়োগের প্রধান হাতিয়ারে পরিণত হয়। অনুচিতভাবে হিজাব পরা নারীদের তারা থামাত এবং আটক করত। • ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ : মাহসা আমিনিকে আটক নীতি পুলিশ অনুপযুক্ত হিজাব পরার অভিযোগে ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি নারী মাহসা আমিনিকে তেহরান থেকে আটক করে। • ১৬ সেপ্টেম্বর : আমিনির মৃত্যু পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় মারা যান ইরানি এই তরুণী। দেশটির কর্তৃপক্ষ জানায়, তার মৃত্যু স্বাভাবিক কারণে হয়েছে। তবে জাতিসংঘের একটি তদন্ত দল বেআইনি বল প্রয়োগে আমিনি মারা গেছেন বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। রাষ্ট্রীয় হেফাজতে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়ে মারা যান তিনি। • ২০২২-২৩ : ‘নারী, জীবন, স্বাধীনভাবে চলা’ আন্দোলনের বিস্ফোরণ তার মৃত্যু দেশজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দেয়। বিক্ষোভ যত ছড়িয়ে পড়তে থাকে, নারীরা তত তাদের মাথার স্কার্ফ খুলে আগুন ধরিয়ে দিতে থাকেন এবং এটি ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে এক ব্যাপক চ্যালেঞ্জে রূপ নেয়। • ৫৫০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী নিহত জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটির এক প্রতিবেদনে বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর অপ্রয়োজনীয় ও প্রাণঘাতী বল প্রয়োগে অন্তত ৬৮ শিশুসহ ৫৫০ জনেরও বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এই অস্থিরতার সময়ে হাজার হাজার মানুষকে আটক করা হয়। • ২০২৪ : কঠোর আইন স্থগিত ইরান হিজাব লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি এবং নজরদারির বিধান রেখে একটি আইন অনুমোদন করে। কিন্তু সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে এর বাস্তবায়ন স্থগিত করা হয়। • ২০২৬ : যুদ্ধ বদলে দিয়েছে হিসাব-নিকাশ যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক চাপে জর্জরিত থাকায় ইরানে হিজাবহীন নারীদের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। কট্টরপন্থিরা নতুন করে আইন প্রয়োগের দাবি জানাচ্ছেন। তবে কর্তৃপক্ষ মাহসা আমিনির মতো আরেকটি সংঘাতের জন্ম দিতে অনিচ্ছুক বলে ধারণা করা হচ্ছে। • নারীদের মুখোমুখি না হয়ে দমন-পীড়ন মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ বলেছে, বাধ্যতামূলক হিজাব আইন না মানায় ১৯ জুলাই তেহরানে অন্তত সাতটি ক্যাফে ও রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সামাজিক আদর্শ ও বাধ্যতামূলক হিজাব বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে দক্ষিণ খোরসান প্রদেশেও ১০টি ক্যাফে বন্ধ করে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। কট্টরপন্থিরা দেশটির কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কট্টরপন্থি কায়হান পত্রিকার সম্পাদক হোসেইন শরীয়তমাদারি যুক্তি দিয়েছেন, হিজাব বিধি প্রয়োগ করা আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ধর্মীয় দায়িত্ব। ইসফাহানের এক সমাবেশে এক প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, নেতানিয়াহু: হিজাবহীন নারীরা আমাদের জন্য বিনামূল্যের সৈনিক। • পিছু হটছেন না নারীরা তবুও ইরানের রাস্তার পরিস্থিতি একদম উল্টো। সামাজিক যোগাযোাগ মাধ্যমের ভিডিওতে দেখা যায়, তরুণীরা হেলমেট পরে থাকলেও মাথায় স্কার্ফ ছাড়া স্কুটার চালিয়ে তেহরান ও অন্যান্য শহর পাড়ি দিচ্ছেন। তেহরানের ষাটোর্ধ্ব এক নারী সিএনএনকে বলেন, কর্তৃপক্ষ এখনও নারীদের সরাসরি মুখোমুখি হতে দ্বিধাগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে। তারা এখনও রাস্তার মানুষকে কিছু বলার সাহস পায় না। তেহরানের মেয়েরা ক্রপ টপ, শর্টস এবং সব ধরনের পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে, আর মাথার স্কার্ফ কার্যত অতীত হয়ে গেছে। ‘‘আমি মনে করি না তারা এই মেয়েদের দিয়ে আবার মাথায় স্কার্ফ পরাতে পারবে। তবে আবার ভেবে দেখলে, বিপ্লবের সময়ও আমরা ঠিক এটাই ভেবেছিলাম। আমরা কখনোই ভাবিনি আমাদের এটি পরতে বাধ্য করতে পারবে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পেরেছিল।’’ • পেজেশকিয়ানের বাধা বাধ্যতামূলক কঠোরতার মাধ্যমে আচরণের পরিবর্তন আনা সম্ভব কি না, সেই বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও। নিজের মেয়ের সঙ্গে মতভেদের কথা উল্লেখ করে তিনি প্রশ্ন করেন, এর অর্থ কি আমার তাকে জোর করা উচিত? ‘‘আচরণের পরিবর্তন একটি সাংস্কৃতিক বিষয়; এটি বিশ্বাসের বিষয়। শক্তি প্রয়োগ করে আপনি মানুষের মনে বিশ্বাস তৈরি করতে পারেন না।’’ দেশটির সাবেক সংসদ সদস্য গোলামআলী জাফরজাদেহ ইমানাবাদী বলেন, কর্মকর্তাদের বরং মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার দিকে নজর দেওয়া উচিত। যুদ্ধের সময়ে এই যুক্তির গুরুত্ব অনেক বেশি। ইরান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতের অর্থনৈতিক পরিণতি সামলাচ্ছে। অন্যদিকে এই যুদ্ধকে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হিসেবে উপস্থাপন করছে। নিজ দেশে নারীদের বিরুদ্ধে নতুন আরেকটি ফ্রন্ট খুলে বসার স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। • যে লড়াইয়ের কথা মনে রেখেছে তেহরান শাসকগোষ্ঠীর সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ২২ বছর বয়সী কুর্দি-ইরানি তরুণী মাহসা আমিনিকে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে হিজাব না পরার অভিযোগে তেহরান থেকে আটক করে ইরানের নীতি পুলিশ। তিন দিন পর তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যু ‘‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’’ স্লোগানে ইরানজুড়ে বিক্ষোভের জন্ম দেয়; যা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটিতে পরিণত হয়। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে নারীরা মাথার স্কার্ফ খুলে পুড়িয়ে দেন এবং চুল কেটে ফেলেন। আন্দোলন নির্মমভাবে দমন করা হলেও হিজাব আইনের প্রতি ব্যাপক অমান্য করার প্রবণতা স্থায়ী রূপ নেয়। ইরানের ইসলামিক প্যানাল কোডের ৬৩৮ অনুচ্ছেদে ইসলামি হিজাব ছাড়া নারীদের জনসমক্ষে আসাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ২০২৪ সালে অনুমোদিত এক কঠোর আইনে জরিমানা ও নজরদারি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপে এর বাস্তবায়ন স্থগিত হয়ে যায়। সেই পিছু হটা কট্টরপন্থিদের ক্ষুব্ধ করেছে। সংসদ সদস্য মোহাম্মদ-তাকি নকদালি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইসরায়েল ও আমেরিকা আমাদের ধ্বংস করতে পারবে না। কিন্তু যে ক্ষয় আমাদের ধর্মীয় সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরেছে এবং সমাজে যেভাবে বিপর্যয়কর ও ব্যাপকভাবে নগ্নতা ছড়িয়ে দিচ্ছে, তা আমাদের ধ্বংস করে দেবে। ইরানের কট্টরপন্থিদের কাছে হিজাবের লড়াইও এক অস্তিত্বের লড়াই। কিন্তু ইতোমধ্যে বিদেশে যুদ্ধ, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং নতুন করে অস্থিরতার ঝুঁকির মুখোমুখি হওয়া একটি সরকারের কাছে, এই নিয়ম কার্যকর করতে এমন মূল্য চোকাতে হতে পারে যা তারা এখনও দিতে প্রস্তুত নয়। আপাতত তেহরান যেন পরখ করে দেখছে; ইরানের নারীদের আবারও রাজপথে না নামিয়ে কতদূর পর্যন্ত বলপ্রয়োগ করা যায়। সূত্র: সিএনএন, এএফপি।