বাৎসরিক ছুটির টাকার দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আহসান কম্পোজিট কারখানায় কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় পুলিশ, শ্রমিক ও কারখানার কর্মকর্তাসহ প্রায় অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকালে উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ দীঘির পাড় এলাকায় অবস্থিত কারখানাটিতে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কারখানা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকালে শ্রমিকদের মধ্যে বাৎসরিক ছুটির টাকার স্লিপ বিতরণ করা হয়। তবে শ্রমিকরা শতভাগ ছুটির টাকা পরিশোধের দাবি জানিয়ে সকাল ৮টার দিকে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। পরে তারা বিক্ষোভে নামেন।
একপর্যায়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানার অফিসকক্ষে ভাঙচুর চালান। অফিসের দরজা-জানালা, টেবিল, কম্পিউটার ও ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়।
এ সময় অফিসকক্ষে থাকা প্রোডাকশন ম্যানেজার মাজহারুল ইসলাম, সহকারী প্রোডাকশন ম্যানেজার নুরন নবী, আলতাফ হোসেনসহ ৯ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন।
খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে শ্রমিকরা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে নারী শ্রমিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে অতিরিক্ত শিল্প পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহত কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
কারখানার অ্যাডমিন কর্মকর্তা জামাল হোসেন বলেন, শ্রমিকদের বুঝিয়ে কাজে ফেরানোর চেষ্টা করা হলে তারা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং অফিসকক্ষে হামলা চালান। বাধা দিতে গেলে কর্মকর্তাদের ওপর রড দিয়ে হামলা করা হয়।
অন্যদিকে শ্রমিক রাব্বি হাসান অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে পাওনা টাকা না দিয়ে মালিকপক্ষ সময়ক্ষেপণ করছে। পাওনা টাকার দাবিতে আন্দোলন চলাকালে মালিকপক্ষই তাদের ওপর হামলা চালায়।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিল্প পুলিশের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
শিল্প পুলিশের ওসি মোরশেদ জামান বলেন, কয়েক দফা আলোচনার চেষ্টা করা হলেও শ্রমিকরা উত্তেজিত ছিলেন। পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। বর্তমানে কারখানা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে।
দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন।
সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান।
পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে।
পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে।
রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন।
এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।
পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন।
এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন।
গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন।
অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে।
এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন।
অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন।
এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।
অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে।
তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে।
গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না।
এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত।
সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী।
গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান।
হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা।
তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে।
সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ।
এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই।
মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন।
কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন।
ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বাৎসরিক ছুটির টাকার দাবিতে গাজীপুরের কালিয়াকৈরে আহসান কম্পোজিট কারখানায় কর্মবিরতি, বিক্ষোভ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় শ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ায় পুলিশ, শ্রমিক ও কারখানার কর্মকর্তাসহ প্রায় অর্ধশত মানুষ আহত হয়েছেন।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকালে উপজেলার পল্লী বিদ্যুৎ দীঘির পাড় এলাকায় অবস্থিত কারখানাটিতে এ ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে উপজেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
কারখানা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকালে শ্রমিকদের মধ্যে বাৎসরিক ছুটির টাকার স্লিপ বিতরণ করা হয়। তবে শ্রমিকরা শতভাগ ছুটির টাকা পরিশোধের দাবি জানিয়ে সকাল ৮টার দিকে কর্মবিরতি পালন শুরু করেন। পরে তারা বিক্ষোভে নামেন।
একপর্যায়ে কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের সঙ্গে আলোচনা করতে গেলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ক্ষুব্ধ শ্রমিকরা কারখানার অফিসকক্ষে ভাঙচুর চালান। অফিসের দরজা-জানালা, টেবিল, কম্পিউটার ও ল্যাপটপসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ভাঙচুর করা হয়।
এ সময় অফিসকক্ষে থাকা প্রোডাকশন ম্যানেজার মাজহারুল ইসলাম, সহকারী প্রোডাকশন ম্যানেজার নুরন নবী, আলতাফ হোসেনসহ ৯ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হন।
খবর পেয়ে শিল্প পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে শ্রমিকরা তাদের লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। পরে শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে নারী শ্রমিকসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে অতিরিক্ত শিল্প পুলিশ ও র্যাব সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আহত কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
কারখানার অ্যাডমিন কর্মকর্তা জামাল হোসেন বলেন, শ্রমিকদের বুঝিয়ে কাজে ফেরানোর চেষ্টা করা হলে তারা আরও উত্তেজিত হয়ে ওঠেন এবং অফিসকক্ষে হামলা চালান। বাধা দিতে গেলে কর্মকর্তাদের ওপর রড দিয়ে হামলা করা হয়।
অন্যদিকে শ্রমিক রাব্বি হাসান অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে পাওনা টাকা না দিয়ে মালিকপক্ষ সময়ক্ষেপণ করছে। পাওনা টাকার দাবিতে আন্দোলন চলাকালে মালিকপক্ষই তাদের ওপর হামলা চালায়।
কালিয়াকৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম জানান, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে শিল্প পুলিশের সহায়তায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
শিল্প পুলিশের ওসি মোরশেদ জামান বলেন, কয়েক দফা আলোচনার চেষ্টা করা হলেও শ্রমিকরা উত্তেজিত ছিলেন। পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় কয়েকজন সদস্য আহত হয়েছেন। বর্তমানে কারখানা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে।
এখন বোরো মৌসুম, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আংশিকভাবে ধান কাটা শুরু হয়েছে; এরপর আউশ আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করতে হবে। কিন্তু সেচ, সার ও কৃষিযন্ত্রের সংকট কৃষকের উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে।
দেশের মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশই মেলে বোরো মৌসুমে। প্রতিটি ফসল আবাদের ক্ষেত্রেই এখন আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে।
কৃষকরা বলছেন, সেচের জন্য শ্যালো মেশিন, মাড়াইয়ের কাজে হারভেস্টার, জমি চাষ দিতে পাওয়ার টিলার, এমনকি ওষুধ ছিটাতেও যন্ত্রচালিত স্প্রে মেশিন ব্যবহার করা হচ্ছে। বেশিরভাগ যন্ত্র চালাতে প্রয়োজন ডিজেল।
কিন্তু তেলের সংকটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও ডিজেল মিলছে না। এর মধ্যে আবার প্রতি লিটারে ১৫ টাকা বাড়িয়ে ডিজেলের দাম ঠিক হয়েছে ১১৫ টাকা।
অথচ বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বলেছে, গ্রীষ্মের এই সময়ে তাপপ্রবাহের মধ্যে জমিতে যেন কোনোভাবেই পানির ঘাটতি না হয়। তা না হলে ধানে চিটা হতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে খাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে কৃষিতে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার কথা বলছেন কৃষি অর্থনীতিবিদরা। সেইসঙ্গে খাদ্য উৎপাদন ঠিক রাখতে কৃষিতে ভর্তুকি বাড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ তাদের।
কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার তিনতেলী গ্রামের কৃষক এরশাদুল হক এবার চার বিঘা (৬২ শতাংশে এক বিঘা) জমিতে ধান ও পাঁচ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করেছেন।
সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এক কামলা কাজ বাদ দিয়া লাইনে দৌড়াতে হয় ভোর ৪টায়। সার তুলতে দুপুর ২টা বাজে। তারপরে সংকট, এক বস্তা সার দেয়। টাকা দিয়েও সেটা আবার সময়মত পাচ্ছি না।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তেল সংকট। তেলের জন্য বাজারে গিয়েছিল সকাল ৬টায়। তেল নিয়ে আসতে আসতে রাত ১০টা। সারাদিন কাজ বাদ দিয়ে কৃষকের ভোগান্তি। এখন আরেকটা সংকট তৈরি হয়েছে; সময়মত কামলা পাচ্ছি না। আবার পাইলেও প্রতিজন ৭০০/৮০০ টাকা মজুরি চায়।
এ সব কিছুই ফসলের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে জানিয়ে এরশাদ বলেন, প্রতিমণ ধানে উৎপাদন খরচ মিনিমাম ১১০০/১১৫০ টাকা টাকা পড়েছে। বাজারে দাম ১০৫০ টাকা। প্রতি মণে ৫০ /১০০ টাকা লস (ক্ষতি) হচ্ছে আমাদের।
তেল সংকটে ভোগান্তিতে রয়েছেন পাহাড়ি এলাকার কৃষকও। রাঙামাটির জেলার কাপ্তাই উপজেলার ধংনালা গ্রামের কৃষক ক্যাপরু মারমা তিন কানি বা ৪০ শতাংশ জামিতে চাষবাদ করেন।
তিনি বলেন, “আমাদের এখানে উঁচু ও নিচু দুই ধরনের জমি আছে। নিচু জমিতে প্রাকৃতিক পানির উৎস অর্থাৎ নলকূপ রয়েছে। কিন্তু সংকট তীব্র হয়েছে উঁচু জমির চাষাবাদে।
আমার এলাকার মানুষদের তেল প্রাপ্তির উৎস হল রাইখালী বাজার। বাজারে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। পেলেও দুই লিটার, এক লিটার দেয়। তাও বিকেল ৪টা থেকে ৫টার মধ্যে যেতে হয়। কেউ পায়, কেউ পায় না। এখন তেলের দাম বাড়ায়, ধান কাটার খরচও বেড়ে যাবে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) হিসাব অনুযায়ী, ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত ছয় মাসের সেচ মৌসুমে দেশে কৃষি খাতে ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা দাঁড়ায় প্রায় সাড়ে ১২ লাখ টন। শুধু সেচযন্ত্রেই প্রয়োজন প্রায় সাত লাখ ৬০ হাজার টন জ্বালানি।
গড় হিসাবে প্রতি মাসে কৃষিতে ডিজেলের সম্ভাব্য চাহিদা প্রায় দুই লাখ ৯ হাজার টন, দৈনিক চাহিদা প্রায় সাত হাজার টন, যা বৃষ্টির ওপর কিছুটা নির্ভর করে।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪৫ লাখ টন। বর্তমানে মজুদ আছে এক লাখ ১৩৮৫ টন। দৈনিক চাহিদা ১২ হাজার টন হলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টন।
অর্থাৎ চাহিদার চেয়ে সরবরাহ কম। এই ঘাটতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে কৃষি খাতে।
শনিবার দুপুরে কেরানীগজ্ঞের কোনাখোলার ‘আলহাজ নূর ফিলিং স্টেশনে’ তেলের জন্য অপেক্ষায় দীর্ঘসময় লাইনে ছিলেন ট্রাক্টর চালক জহির ইসলাম। সকাল সাড়ে ৯টায় পাম্পে আসা জহির বলেন, “এখন ২টা বাজে। তেল থাকলে পাব ১০ লিটার। যদি ক্ষেতে নামি, এই ১০ লিটার তেলে জমি দুই পাক চাষ দিতেই শেষ।
কৃষকরা ঘিরে ধরে; তারা জমি আবাদ করতে পারছে না। তেলের লাইনে সারাদিন চলে যাচ্ছে। ভোগান্তির মধ্যেই আছি।
তেলের অভাবে উপার্জন কমে যাওয়ার তথ্য দিয়ে জহির বলেন, আগে তেল পাইতাম, সারা দিনে ১০-১২ টাকা আসত। এখন দিনে ওঠে হাজার দুই।
সার কম পাওয়ার কথা বলছে কৃষক, কর্মকর্তারা মানছেন না
চৈত্র-বৈশাখ (মধ্য-মার্চ থেকে মধ্য-মে) মাসে পাট বীজ বপন করা হয়। অর্থাৎ পাট চাষের মৌসুম চলছে। রৌমারী উপজেলার এরশাদের ভাষ্য, এখন ভালো পাটের দাম মেলে প্রতি মণে ৫ হাজার টাকা। ফলে চাষও বেড়েছে। লম্বা আঁশের জন্য ইউরিয়া টিএসপি এমওপি (পটাশ), জিপসাম সার দিতে হয়।
পাট চাষে সার বেশি লাগে। ৩ শতাংশ জমিতে মিনিয়াম ২০ কেজি সার লাগে। এত সার তো পাই না।
গাইবান্ধার তিস্তা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের চরাঞ্চল জুড়ে আবাদ হয়েছে ভুট্টা, মরিচসহ বিভিন্ন শস্য। লাভজনক হওয়ায় বর্তমানে ভুট্টা চাষে বেশি আগ্রহ এই অঞ্চলের কৃষকদের।
এখানকার দুই কৃষকও অভিযোগ করলেন, ভুট্টা চাষের জন্য পর্যাপ্ত সার পাচ্ছেন না। সার সংকটে ভুট্টা উৎপাদন কমে যাওয়ার অশঙ্কার কথাও বললেন চরাঞ্চলের কৃষকরা।
ওই এলাকার সুন্দরগঞ্জের ভাটি কাপাসিয়া গ্রামের কৃষক মনিরুল মিয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, “চারায় কলা (তোড়) আসছে। ভালো ভুট্টার জন্য এই সময়ে ইউরিয়াসহ বিভিন্ন ধরনের সার লাগে। কিন্তু এবার আগের চেয়ে ফলন অনেক কম হইছে। পর্যাপ্ত সার দিতে পারি নাই। সার দিচ্ছে না। বেশি দামে বাইর থেকে সার কিনতে হয়।
ধান ও ভুট্টা দুটোই চাষ করেছেন ফুলছড়ি উপজেলার কৃষক মনোয়ার হোসেন। তার অভিযোগ, টাকা দিয়েও সার পাওয়া যায় না। সরকার কাছ থেকে যে পরিমাণ সার মেলে, তা ‘খুবই অল্প’।
তবে গাইবান্ধার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলছেন ওই অঞ্চলের সারের কোনো সংকট নেই।
যদি কেউ অভিযোগ করে সার দিচ্ছে না, বা বেশি মূল্যে সার বিক্রি করার চেষ্টা করছে, তাহলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার কৃষকদেরও অভিযোগ, বোরো মৌসুম শুরু থেকে ডিলার তাদের চাহিদা মত সার দিচ্ছে না। ফলে বাড়তি দামে খোলা বাজার থেকে তাদের সার কিনতে হচ্ছে।
কাহারোল উপজেলার কৃষক আব্দুল লতিফ বলেন, তার যেখানে দুই বস্তা সার প্রয়োজন, সেখানে ডিলার দিচ্ছেন এক বস্তা। বাড়তি সার তাকে বাইরে থেকে বাড়তি দাম কিনতে হচ্ছে।
একই অভিযোগ দিনাজপুরের সদর উপজেলার উলিপুর গ্রামের রেজাউল ইসলামের। তিনি বলেন, তার এক একর জমির বোরো চাষের জন্য দুই বস্তা ইউরিয়া সার প্রয়োজন। ডিলার তাকে দিয়েছে এক বস্তা সার। ফলে তাকে সাড়ে ১৩ শ টাকার সার বাইরে থেকে সাড়ে ১৪ শ টাকায় কিনতে হয়েছে।
দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কার্যালয়ের উপ-পরিচালক আফজাল হোসেনও দাবি করলেন, সারের কোনো ‘সংকট নেই’।
জেলায় বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রার ৯৮ শতাংশ জমিতে চারা রোপণ সম্পন্ন হয়ে গেছে। এক একর জমিতে বোরো রোপণ থেকে কাটা পর্যন্ত সর্বোচ্চ একশ কেজি সার প্রয়োজন। কিন্তু কৃষক এক বারেই দুই বস্তা সার নিতে চায়। এটা না পেয়ে তাদের অভিযোগ চাহিদার সার তারা পাচ্ছে না
‘বেড়ে যাচ্ছে’ উৎপাদন ব্যয়
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২১ লাখ ৩১ হাজার ৩০৯টি ডিজেলচালিত কৃষিযন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে গভীর ও অগভীর নলকূপ, এলএলপি পাম্প, পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টার, মাড়াই-ঝাড়াই যন্ত্রসহ অন্যান্য কৃষিযন্ত্র। কম্বাইন হারভেস্টারের সংখ্যা ১০ হাজার ৭২৬টি। মাড়াই-ঝাড়াই ও অন্যান্য যন্ত্র রয়েছে চার লাখ ৯৬ হাজার ৮০৫টি।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ভর্তুকি না পাওয়ায় দুই বছর ধরে কম্বাইন হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র নতুন করে বাজারে আসেনি। এদিকে পুরোনো যন্ত্রের একটি বড় অংশ এখন মেরামতের অভাবে অচল হয়ে পড়েছে।
কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে ধান কাটা শুরু হবে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য কৃষি মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলো সমন্বয় সভা করেছে। তবে এ বছর অনেক এলাকায় যন্ত্রের পাশাপাশি শ্রমিক দিয়েও ধান কাটতে হবে।
তার ভাষ্য, অচল হয়ে পড়া ফসল তোলার যন্ত্রেগুলো দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এদিকে কৃষিতে জ্বালানি ও সেচ সংকটে উৎপাদন খরচ ও খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ সাইফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, সার তেলসহ বিভিন্ন কৃষি উপকরণের ব্যয় বৃদ্ধি চাষাবাদের খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগের থেকেই উৎপাদন খরচ তুলতে কৃষকরা হিমশিম খাচ্ছে। এখন তেলের সংকট উৎপাদনেও প্রভাব ফেলবে। শস্য উৎপাদনও কমবে।
দ্রুত সংকট সমাধান ও কৃষির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবাগুলোতে ভতুর্কি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, “ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কৃষিকাজে এই জ্বালানিটা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য জ্বালানির তেলের দাম বাড়িয়ে ডিজেলের ক্ষেত্রে ভর্তিুর্কি বাড়াতে পারত সরকার।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যা বলছে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইং এর পরিচালক কৃষিবিদ ওবায়দুর রহমান মণ্ডলের ভাষ্য, এখন ধান ও ভুট্টা কর্তনের সময়। তাই সেচ ও সার নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই।
ধান ঘরে তুলতে কৃষিযন্ত্রের তেল সংকট সমাধানের বিষয়ে তিনি বলেন, “জ্বালানি সংগ্রহ প্রক্রিয়া সহজ করতে ‘ফুয়েল কার্ড’ দেওয়া হচ্ছে কৃষকদের। এই কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমে ভোগান্তি ছাড়াই সদর উপজেলার পাম্প ও অনুমোদিত জ্বালানি তেল বিক্রয় কেন্দ্র থেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন।
আগে কৃষকদের ডিজেল, পেট্রোল, অকটেনের জন্য প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে। যার মাধ্যমে কৃষকেরা বোরো ধান, সবজির জমিতে সেচ দিতে পেরেছে। এখন ফসলের জমিতে পানি দিতে ফুয়েল কার্ডও দেওয়া হয়েছে। জ্বালানি তেলের জন্য কৃষকদের লাইনে কোনো সংকট নেই।
তবে ভিন্ন কথা বলছেন একই অধিদপ্তরের আরেক কর্মর্কর্তা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন উইংয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উপকরণ) মো. মাহফুজুর রহমান বলেন, এখন ধান ও পাট, দুই আবাদের জন্যই সেচের প্রয়োজন আছে।
নাটোরের সিংড়ায় দুটি পুকুরে বিষ দিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকার মাছ নিধনের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার (১৯ এপ্রিল) ভোররাতে উপজেলার ডাহিয়া ইউনিয়নের লালুয়া পাঁচপাখিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
ক্ষতিগ্রস্ত মাছ চাষি জাহাঙ্গীর আলম জানান, তার এক একর আয়তনের দুটি পুকুরে পাবদা ও গুলশা মাছ চাষ করা হয়েছিল। দু-এক দিনের মধ্যেই মাছ বাজারে বিক্রির কথা ছিল।
কিন্তু সকালে গিয়ে দেখা যায় সব মাছ মরে ভেসে আছে। পরিকল্পিতভাবে বিষ দিয়ে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
এই ঘটনায় ভুক্তভোগীর দুলাভাই ডাহিয়া ইউনিয়নের বিয়াশ গ্রামের বাসিন্দা সাইফ মাহমুদ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘ভুক্তভোগী জাহাঙ্গীর আলম আমার আপন শ্যালক। তার এই বিশাল ক্ষতি দেখে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার মতো কোনো ভাষা আমার জানা নেই।
অনেক কষ্ট আর স্বপ্ন নিয়ে সে এই মাছ চাষ করেছিল। আমরা পৈশাচিক ঘটনার বিচার চাই।’
এ বিষয়ে থানায় অভিযোগের প্রস্তুতি চলছে।
এ বিষয়ে সিংড়া থানার ওসি রফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে।
লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
We use cookies to improve your experience, deliver personalized content and ads, and analyze our traffic. By continuing to browse our site, you agree to our use of cookies.