চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে সরকারের তিন লাখ শতক (৩১শ একর) খাসজমির মধ্যে প্রায় দুই লাখ শতকই ভূমি অফিসের রেকর্ডপত্র থেকে গায়েব হয়ে গেছে। শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিনের সঙ্গে ভূমি ও সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব জমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি ও নামজারি করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের আমলে এই জমি যে যেভাবে পেরেছে লুট করেছে। দখলদারদের তালিকায় আছে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ এবং তার পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। কয়েক হাজার কোটি টাকার এই বিশাল খাসজমি লুটের মহোৎসবে যোগ দিয়েছেন রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরাও।
ভূমিদস্যুরা প্রথমে পাহাড়ের গাছ কেটেছেন। এরপর পাহাড় কেটে মাটি ও বালু সরিয়ে প্লট আকারে বিক্রি করেছেন। তাদের এই ধ্বংসযজ্ঞে ৭০ ভাগ পাহাড়-টিলা উজাড় হয়ে গেছে। এতে ৪-৫ কিলোমিটার এলাকা এখন খালে পরিণত হয়েছে। এমনকি পাহাড় কাটার মাটি ও বালু সরাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ওপর দিয়েই নির্মাণ করেছেন ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা। এতে যে কোনো সময় গ্যাসলাইনে ভয়াবহ বিস্ফোরণের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যুগান্তরের মাসব্যাপী অনুসন্ধানে জঙ্গল সলিমপুরের এই চাঞ্চল্যকর জমি লুটের তথ্য উঠে এসেছে। বিপুল পরিমাণ জমি বেহাত হয়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এএসএম সালেহ আহমদ সোমবার যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের জমির প্রকৃত চিত্র জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন আকারে চাওয়া হবে। যেসব প্রভাবশালী আলোচনায় আসছেন, তারা কে কীভাবে সেখানে অবস্থান নিয়েছেন, তাও জানতে হবে। বিষয়টি আমি দেখছি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের রেকর্ডপত্রে জঙ্গল সলিমপুরে ৩ লাখ ১০ হাজার শতক খাসজমির হিসাব আছে। এই জমির বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ৪০ হাজার কোটি টাকা। তবে সীতাকুণ্ড সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে সংরক্ষিত রেকর্ডপত্রে অর্ধেকেরও বেশি জমির রেকর্ড নেই। সেখানে আছে মাত্র ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৮১ শতকের জমির তথ্য। অবশিষ্ট ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৯১ শতক জমি চলে গেছে পাহাড়খেকোদের পেটে। সীতাকুণ্ড রেজিস্ট্রি অফিসেই সরকারি খাসজমি জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রি ও নামজারি করা হয়েছে। ভয়াবহ এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সীতাকুণ্ড সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একজন দলিল লেখক।
সংশ্লিষ্ট সাবরেজিস্ট্রি অফিসে সরেজমিন কথা হয় ওই দলিল লেখকের সঙ্গে। এ সময় নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ইয়াসিনকে মালিক সাজিয়ে সলিমপুরের বহু জমি বিক্রি করা হয়েছে। এমনকি বিক্রির পর সেগুলো নামজারিও হয়েছে এসি ল্যান্ড অফিসে। নামজারি ও রেজিস্ট্রি করার সুবিধা পেতে রেকর্ডপত্র থেকেই খাসজমির তালিকা গোপন করা হয়। এই দুটি অফিসের অনেক কর্মচারী ইয়াসিনের সহযোগী। তারা সবাই এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। তদন্ত করা হলে সব বেরিয়ে আসবে। রেজিস্ট্রির পর নামজারির তথ্য-উপাত্ত গোপন করার কোনো সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, জঙ্গল সলিমপুরে সন্ত্রাসী হামলায় র্যাব সদস্য নিহত হওয়ার পর রেজিস্ট্রি ও এসি ল্যান্ড অফিসে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। সেখান থেকে কোনো তথ্য সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। গোপন করা হয়েছে সব রেকর্ডপত্রও। এমনকি জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জঙ্গল সলিমপুরের সব রেজিস্ট্রি মৌখিকভাবে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রেকর্ডপত্রে নেই খাসজমি : তথ্যানুসন্ধানে পাওয়া রেকর্ডপত্রে দেখা যায়, বিএস (বাংলাদেশ সার্ভে) রেকর্ড অনুযায়ী জঙ্গল সলিমপুরে খাসজমির ১৪০টি দাগ আছে। এর মধ্যে পাহাড় শ্রেণিতে ১ লাখ ১৭ হাজার ২২৮, নাল ১ হাজার ৩০১, খাল ৩১৯, ছড়া ২ হাজার ২১৩, গোপাট ৭৭, ছনখোলা ১ হাজার ৩১৭, টিলা ১ হাজার ৫৭, জঙ্গল ৪৭৪, কবরস্থান ৫৪৯, বাড়ি ৭৬, রাস্তা ২৯, মিল ৯০১ এবং খিলা শ্রেণিতে ৩৪ শতক জমি রয়েছে। খাসজমির এই তালিকা সংগ্রহ করতেও অনেক কৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে প্রতিবেদককে।
তালিকায় দেখা গেছে, উল্লিখিত শ্রেণিবদ্ধ জঙ্গল সলিমপুরে ১ লাখ ২৫ হাজার ৭৮১ শতক জমি আছে। কিন্তু জেলা প্রশাসনের হিসাবে তিন হাজার ১০০ একর (৩ লাখ ১০ হাজার শতক) জমির তথ্য প্রকাশ করা হয়। অর্থাৎ ১ লাখ ৮৪ হাজার ২৯১ শতক জমির হদিস নেই। প্রকৃত তথ্য গোপন করে রেজিস্ট্রির পাশাপাশি নামজারিও করা হয়েছে এসব জমি।
খাসজমি উদ্ধারের চেষ্টা ব্যর্থ : আলোচ্য খাসজমি উদ্ধারে ২০২২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে মাস্টারপ্ল্যান সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সরকারের সচিব, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধিসহ সিনিয়র কর্মকর্তারা। সভায় খাসজমি প্রভাবশালীরা কীভাবে দখল করেছে তার অংশবিশেষ তুলে ধরা হয়। বলা হয়, ভূমিদস্যু, সন্ত্রাসীরা প্রথমে পাহাড়ের গাছ কেটে ফেলে। এরপর পাহাড় কেটে মাটি ও বালু বিক্রি করে। পরে সেখানে প্লট বানিয়ে বিক্রি করে দেয়। প্রায় ৭০ ভাগ পাহাড়-টিলা উজাড় করা হয়েছে। এর ফলে একসময় যেখানে ৪-৫ কিলোমিটার বিস্তৃত পাহাড় ও টিলার সারি ছিল, তা এখন দীর্ঘ খালে পরিণত হয়েছে। এমনকি তারা গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (টিসিএল) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম গ্যাস সঞ্চালন লাইনের ওপর দিয়ে মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণভাবে কয়েক কিলোমিটার লম্বা রাস্তা তৈরি করেছে। সেই রাস্তা দিয়ে পাহাড় কাটার কাজে ব্যবহৃত এক্সকেভেটর, ড্রাম্প ট্রাক এবং বালু ও মাটিবাহী বড় বড় ট্রাক যাতায়াত করে। ফলে ওই গ্যাসলাইনে যে কোনো সময় বড় ধরনের বিস্ফোরণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সভায় আরও বলা হয়, ২০১৭ সালে এখানে প্রথম উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে খাসজমি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের দখলেও সেখানে শত শত একর খাস জায়গা থাকায় সেই অভিযান ব্যর্থ হয়েছে।
প্রভাবশালীদের সাইনবোর্ডে সয়লাব : সরেজমিন দেখা যায়, চট্টগ্রামের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে সয়লাব হয়ে গেছে জঙ্গল সলিমপুরের খাসজমি। জমি দখলের তালিকায় আছেন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদও। তার বাবা আখতারুজ্জমান বাবুর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ‘চৌধুরী অ্যাগ্রো’র নামেও জমি দখল করতে দেখা গেছে। এছাড়াও দখলের তালিকায় আছে চট্টগ্রাম ব্রিকস অ্যান্ড ক্লে ওয়ার্কস লিমিটেড, পোর্টলিংক লজিস্টিকস কনটেইনার লিমিটেড, খান অ্যাগ্রো, সলিমপুর সিডিএ আবাসিক এলাকা, মুক্তিযোদ্ধা বসতিনগর, জলিল টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, সীমা অটোমেটিক স্টিল রি-রোলিং মিলস। এমনকি ফৌজদার হাট ক্যাডেট কলেজের সীমানার ভেতরেও আছে এই জমি।
জমি চায় অর্ধশত প্রতিষ্ঠান : দখল উচ্ছেদ করে মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন ঘোষণার পর ২০২২ সালের পর চট্টগ্রামের অন্তত অর্ধশত প্রতিষ্ঠান জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমি বরাদ্দের আবেদন করেছে। এর মধ্যে অধিকাংশই সরকারি প্রতিষ্ঠান। বরাদ্দের আবেদনে যে পরিমাণ জমির চাহিদা দেওয়া হয়েছে, তার অর্ধেকও সেখানে নেই।
জানা যায়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) চেয়েছে ৩৫০ একর। পুলিশের ৫টি ইউনিট থেকে পৃথক আবেদন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির কার্যালয়ের জন্য ২৫, মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কার্যালয়ের জন্য ১৪৫, বাংলাদেশ পুলিশ (আরআরএফ) ২৫, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ ১৫ এবং চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ এক একর জমি চেয়েছে। জমি বরাদ্দের আবেদন করেছে চট্টগ্রাম সেনানিবাসও। তারা চেয়েছে এক হাজার একর এবং বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি ২৩৮ দশমিক ১৩ একর। র্যাব-৭ দশ, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ১২০, গোয়েন্দা সংস্থা এনএসআই ১০, চট্টগ্রাম ওয়াসা ১০০, বাংলাদেশ বেতার ২৫ এবং বিজিএমইএ ২০০ একর জমি চেয়েছে। আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স স্থাপন করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে চাওয়া হয়েছে ৩৬ দশমিক ৫ একর। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় বিসিএস প্রশাসন একাডেমি আঞ্চলিক প্রশিক্ষণকেন্দ্রের জন্য ৫০, সরকারি যানবাহন মেরামত কারখানার জন্য ২০, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের জন্য শূন্য দশমিক ৫০ এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ চেয়েছে ৫০০ একর। এছাড়া কারা ডিআইজির কার্যালয় ৭৫ এবং জেলা ক্রীড়া সংস্থা চেয়েছে ৪০ একর জমি। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ১২, প্যাসিফিক জিন্স গ্রুপ ২৫, আল মানাছিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ হাসপাতাল নির্মাণের জন্য ৫০, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন ৩০, ইউনিভার্সিটি অব গ্র্যান্ড ৫, বাংলাদেশ জেলা ও বিভাগীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ১০, খাদ্য বিভাগ ৫০, ফায়ার সার্ভিস ১০, কর্মচারী কল্যাণ বোর্ড ২৫, মেট্রোপলিটন শুটিং ক্লাব ২০, অটিস্টিক বিদ্যালয় ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ৬, বাংলাদেশ স্কাউটস চট্টগ্রাম অঞ্চল ৫, বুড্ডিস্ট রিসার্চ অ্যান্ড পাবলিকেশন সেন্টার ১০, বোধিজ্ঞান ভাবনা কেন্দ্র ৬৬, জাতীয় পরিকল্পনা ও উন্নয়ন একাডেমির প্রশিক্ষণকেন্দ্র ১০ এবং জেএম শিপব্রেকিং রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রি পরিবেশ কারখানা তৈরির জন্য ২৫ একর জমি চেয়েছে।
এদিকে বারবার চেষ্টা করেও চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞার সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলা সম্ভব হয়নি। সরকারি নম্বরে খুদে বার্তা পাঠিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি সাড়া দেননি। পরে যোগাযোগ করা হয় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকতের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে আরও ভয়াবহ তথ্য দিয়েছেন। সাখাওয়াত জামিল বলেন, ‘সীতাকুণ্ডের সহকারী কমিশনার (ভূমি) এ বিষয়ে আমাকে জানিয়েছেন তার অফিসের রেকর্ডপত্রে আছে ৯১০ একর। এই জমি এখন কীভাবে আবেদনকারীদের দেওয়া হবে, সেটি ভূমি মন্ত্রণালয় দেখবে।’
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) ১২ ফুট লম্বা একটি বার্মিজ অজগর উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) রাত ১২টার দিকে সাপ ও সাপের দংশন বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে কাজ করা সংগঠন সোসাইটি ফর স্নেক অ্যান্ড স্নেকবাইট অ্যাওয়ারনেস (3SA) এর উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা সাপটি উদ্ধার করেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গভীর বনাঞ্চলে অজগরটি অবমুক্ত করা হয়। সংগঠন সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ ক্যাম্পাসের মসজিদের পাশের ভাই ভাই স্টোরসংলগ্ন একটি বিল্ডিং থেকে অজগরটি উদ্ধার করা হয়। জিরো পয়েন্টের ইমাম মো. ইয়াকুবের হেল্পলাইনে ফোন পেয়ে 3SA-এর উদ্ধারকারী দলের সদস্য মো. ইমরান, মো. জাহিদ ও মো. জিহাদ ঘটনাস্থলে গিয়ে অজগরটি উদ্ধার করেন। উদ্ধার হওয়া অজগরটি বার্মিজ প্রজাতির এবং এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ ফুট ও ওজন প্রায় ২০ কেজি। 3SA-এর রেসকিউ টিমের সদস্য মোহাম্মদ ইমরান বলেন, ‘এটি বার্মিজ জাতের। প্রায় ১২ ফুট লম্বা এবং ওজন ২০ কেজি। উদ্ধার করার পর আমরা এটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গভীর বনাঞ্চলে অবমুক্ত করেছি। খাবারের অভাব, পাহাড় কেটে ফেলা ও আবাসস্থল ধ্বংসসহ নানা কারণে এ ধরনের সাপ লোকালয়ে চলে আসে’।
ফেনীর সোনাগাজীর বহুল আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড, ১০ আসামিকে খালাস ও চার আসামিকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন হাইকোর্ট। সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুরে বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার হাইকোর্ট বেঞ্চ আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করেন। যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন- নূর উদ্দিন, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ও জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন। খালাস প্রাপ্তরা হলেন- সোনাগাজীর সাবেক পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির তৎকালীন সহ-সভাপতি রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল। আদালতে আসামিদের পক্ষে অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার মাসুদ হোসেন দোলন, অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির। আলোচিত এ মামলায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় ঘোষণা করেছিলেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। রায়ে মাদ্রাসার বরখাস্ত অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় থানায় অভিযোগ করলে তা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ এপ্রিল নুসরাতের মৃত্যু হয়।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুম-খুনের শিকার ব্যক্তি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের কল্যাণে নতুন অধিদপ্তর গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। রোববার সকালে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় এ সংক্রান্ত পর্যালোচনা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে। নতুন অধিদপ্তর হবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এ বিষয়ে আহমেদ আযম খান বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য যেমন জুলাই গণঅভ্যুত্থান অধিদপ্তর হয়েছে, তেমনি দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে যাদের অপরিসীম ত্যাগ রয়েছে, যারা গুম হয়েছেন, নির্মমভাবে খুন বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়ে আর পরিবারে ফিরে আসেননি, দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কিংবা শত শত মিথ্যা মামলায় নিঃস্ব হয়ে বছরের পর বছর জেল খেটেছেন, রাষ্ট্র তাদের এই ত্যাগকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে চায়।” অধিদপ্তর গঠনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, “ভবিষ্যতে যেন কোনো ফ্যাসিস্ট শক্তি এভাবে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করতে না পারে এবং কোনো মা-বাবা, স্বামী-স্ত্রী বা সন্তানকে যেন মধ্যযুগীয় বর্বরতার শিকার হয়ে স্বজন হারাতে না হয়, সেটির স্থায়ী প্রতিরোধ গড়ে তুলতেই এ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও অধিদপ্তর গঠনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।” সভায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, “১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল, মানুষ স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করবে, মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে, রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগ বন্ধ হবে এবং প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের মাধ্যমে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে। ইশরাক বলেন, “তবে ২০০৯ সালের পর থেকে ভোটের অধিকার হরণ, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সেই মৌলিক ভাবমূর্তি পদদলিত করা হয়েছে। “তাই আমাদের উপর একটা দায়িত্ব বর্তায় যে, এই যে বিশাল একটা জনগোষ্ঠী, যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে আদর্শ, সেটাকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে জীবন দিল, অত্যাচারের শিকার হল, গুম হল, আর্থিকভাবে তারা নিঃস্ব হয়ে গেল, তাদের জন্য আমরা কিছু করতে পারি কি না।