ইসলামী ব্যাংকের চলমান অস্থিরতার কারণে একজন পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটির কার্যক্রম নিবিড়ভাবে তদারকি, ব্যাংকের স্বার্থ সংরক্ষণ, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং বৃহত্তর জনস্বার্থ নিশ্চিত করতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র শাহরিয়ার সিদ্দিকী এক বিজ্ঞপ্তিতে তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ধারা ৪৯(১)(ঘ)(আ) প্রদত্ত ক্ষমতাবলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আশরাফুল আলমকে ইসলামী ব্যাংকের পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, পর্যবেক্ষক হিসেবে মোহাম্মদ আশরাফুল আলম ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভাসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে অংশ নেবেন। পাশাপাশি ব্যাংকের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পর্যবেক্ষণ প্রদান করবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, দেশের ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগের এ উদ্যোগ ব্যাংকটির কার্যক্রমে আস্থা, শৃঙ্খলা ও সুশাসন আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ও নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে একদল গ্রাহকদের মধ্যে মতবিরোধ এবং বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। টানা বিক্ষোভ কর্মসূচির কারণে আতঙ্কে ব্যাংকটি থেকে আমানত তোলা শুরু করেছেন গ্রাহকরা।
জানা গেছে, গত ১ থেকে ৭ জুন পর্যন্ত আমানতকারীরা ব্যাংক থেকে ৪ হাজার ২৪০ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে, যার কারণে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকে নগদ জমা বা সিআরআর রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চাওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
কক্সবাজারে মহেশখালীতে এক্সেলারেট এনার্জি পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি পুরো সক্ষমতায় ফেরাতে, সেটি আবার সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। জুলাইয়ের শেষের দিকে টার্মিনালটিতে ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ পর বৃহস্পতিবার টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু করা হয়। ভাসমান এলএনজি টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরাতে আবার বন্ধ রাখার কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেছেন, কোন সময়ে টার্মিনালটি বন্ধ রাখলে শিল্প, বিদ্যুৎ ও অন্য গ্রাহকের ওপর সবচেয়ে কম প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে এক্সেলারেট এনার্জির সঙ্গে আলোচনা চলছে। মঙ্গলবার ঢাকা ক্লাবে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “এক্সেলারেট এনার্জি পরিচালিত এফএসআরইউতে সমস্যার কারণে দেশে গ্যাস সরবরাহে সংকট তৈরি হয়েছে। দেশি ও বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় টার্মিনালটির কার্যক্রম আংশিকভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। “এর একটি অংশ এখন চালু রয়েছে। তবে অন্য অংশটি এখনও পুরোপুরি সচল হয়নি। দ্বিতীয় অংশটি সচল করতে গেলে বর্তমানে চলমান অংশটিও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে।” ফোরাম ফর এনার্জি রিপোর্টার্স বাংলাদেশ-এফইআরবি আয়োজিত ‘জ্বালানি খাতের সংকট: সম্ভাবনা ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার এখন এমন একটি সময় ঠিক করার চেষ্টা করছে, যখন এলএনজি টার্মিনালটি বন্ধ রাখলে মানুষের কষ্ট সবচেয়ে কম হবে। টার্মিনালটি পুরো সক্ষমতায় ফেরানোই সরকারের লক্ষ্য বলে তুলে ধরেন তিনি। অনুষ্ঠানে এ প্রসঙ্গ ধরে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু মন্ত্রী টুকুও এফএসআরইউর সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে বলেন, একটি এলএনজি টার্মিনালে সমস্যা হওয়ার পর সারা দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় চাপ তৈরি হয়েছে। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য আগে থেকেই বিকল্প অবকাঠামো থাকা দরকার ছিল। আগের সরকারের সমালোচনা করে মন্ত্রী বলেন, “উন্নয়নের নামে এমন জায়গায় বিনিয়োগ হয়েছে যেখানে অর্থ খরচের সুযোগ ছিল। কিন্তু কোথায় অবকাঠামো করলে উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে, সেদিকে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।” একটি টার্মিনালে সমস্যা হলে সারা দেশের গ্যাস সরবরাহে এমন প্রভাব পড়ার বিষয়টিকে সেই দুর্বলতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন তিনি। ‘বিনিয়োগ করতে চায় বিদেশি উদ্যোক্তা’ দেশে নতুন ও বড় পরিসরের এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনে একটি বিদেশি বেসরকারি উদ্যোক্তা গোষ্ঠী আগ্রহ দেখিয়েছে বলে তুলে ধরেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। তবে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেননি। অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “উদ্যোক্তা গোষ্ঠীটির প্রতিনিধিরা সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তারা বড় পরিসরে এলএনজি টার্মিনাল করতে আগ্রহ দেখিয়েছেন। সরকার তাদের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব চেয়েছে।” প্রস্তাব পাওয়ার পর তা পরীক্ষা করে দেখা হবে, বলেন তিনি। বর্তমান গ্যাস সংকটের প্রেক্ষাপটে এলএনজি গ্রহণ ও সরবরাহের অবকাঠামো বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তাও সেমিনারের আলোচনায় উঠে আসে। একটি নতুন এফএসআরইউ প্রকল্প নিয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বলেন, কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির প্রকল্প সরাসরি অনুমোদন করা হয়নি। “সরকার নীতিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, প্রকল্পটি সরকার পর্যায়ে বা জিটুজি পদ্ধতিতে করা হবে। এই পদ্ধতিতে সরকার অন্য দেশের সরকার বা সরকার-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি কাজ করে।” তিনি বলেন, “প্রথমে যারা আগ্রহ দেখিয়েছিল, তাদের মধ্যে জিটুজি পদ্ধতিতে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। এরপর একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা ধরে প্রক্রিয়া এগোনো হয়েছে।” দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজন থেকেই জিটুজি পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে, বলেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে বিস্তারিত প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। সেই প্রস্তাব পাওয়ার পর সরকার দরকষাকষি করবে। আলোচনা সন্তোষজনক হলে তবেই চুক্তির পর্যায়ে যাওয়া হবে। ‘উৎপাদন না বাড়ালে সমাধান নেই’ দেশে গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া বর্তমান জ্বালানি সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হবে না বলে মনে করেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে মার্চে দেশে জ্বালানি সংকট তৈরি হয়। বাড়ানো হয় জ্বালানির দাম। কয়েক দিন আগে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বিকল হয়ে গেলে গ্যাস সংকটও তীব্র হয়। এ অবস্থা প্রতিমন্ত্রী অমিত বলেছেন, দেশে উৎপাদন বাড়াতে না পারলে যত আলোচনা করা হোক, তাতে স্থায়ী সমাধান আসবে না। “সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য সরকার নতুন দরপত্র দিয়েছে। আগামী নভেম্বরে এই দরপত্রের সময় শেষ হবে।” তিনি বলেন, “সরকার আশা করছে, আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলো এবার বাংলাদেশের ‘অফশোর ব্লকে’ আগ্রহ দেখাবে। “বাংলাদেশের অতীতে সফল অফশোর বিডিং রাউন্ডের অভিজ্ঞতা রয়েছে।” সমুদ্রের পাশাপাশি স্থলভাগেও নতুন তেল-গ্যাস অনুসন্ধান দরপত্র আনার প্রস্তুতি চলছে তুলে ধরে তিনি বলেন, যত দ্রুত সম্ভব এ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে। হিউস্টন যেতে চান টুকু সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে আনতে সরাসরি প্রচারের পরিকল্পনার কথা বলেছেন জ্বালানিমন্ত্রী টুকু। তিনি বলেন, এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে তার কথা হয়েছে। তিনি হিউস্টনে যেতে চান। সেখানে বড় তেল-গ্যাস কোম্পানির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে বাংলাদেশের ‘অফশোর’ দরপত্রে অংশ নেওয়ার জন্য তাদের আমন্ত্রণ জানাতে চান। মন্ত্রীর মতে, বাংলাদেশের সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর সামনে সরাসরি তুলে ধরার প্রয়োজন রয়েছে। বাপেক্স কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “শুধু নতুন যন্ত্রপাতি কিনে দিলেই বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়বে না। প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের দীর্ঘমেয়াদী কারিগরি প্রশিক্ষণও প্রয়োজন।” অতীতে সাত থেকে ১০ দিনের জন্য কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর উদাহরণ তুলে ধরে অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, “এত কম সময়ে বাস্তব কাজ শেখার সুযোগ থাকে না। এ কারণে বাপেক্স কর্মকর্তাদের ছয় মাস থেকে দুই বছর মেয়াদী বিভিন্ন সার্টিফিকেট কোর্সে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।” বিদেশি তেল-গ্যাস কোম্পানিতে অনেক বাংলাদেশি দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন তুলে ধরে তিনি বলেন, যথাযথ প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে বাপেক্সের কর্মকর্তারাও দেশের জন্য আরও কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবেন। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের প্রস্তাব জ্বালানিমন্ত্রী টুকু বলেন, জ্বালানি সংকট নিয়ে শিল্পোদ্যোক্তাদের পাশাপাশি দেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হওয়া দরকার। সেমিনারের আলোচনা শোনার পর তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কাছে এমন একটি বৈঠকের প্রস্তাব দেবেন। জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট, ভবিষ্যৎ অবকাঠামো এবং দেশীয় সম্পদ ব্যবহারের বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত সরাসরি শোনা প্রয়োজন, বলেন জ্বালানিমন্ত্রী।
বাংলাদেশ ব্যাংক বিভিন্ন ব্যাংকে নিয়োগ দেওয়া পরিচালনা পর্ষদের সর্বোচ্চ দুই বছরের মেয়াদসীমা বাতিল করেছে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়োগ করা পরিচালনা পর্ষদ প্রয়োজন হলে দুই বছরের বেশি সময়ও দায়িত্ব পালন করতে পারবে। সোমবার (১০ আগস্ট) ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১২১ ধারার ক্ষমতাবলে এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংক-কোম্পানির ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদ বাতিলের আদেশের মেয়াদসংক্রান্ত ৪৭(২) ধারার বিধান সাধারণভাবে প্রযোজ্য হবে না। এতদিন ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৭(২) উপধারায় বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বাতিল করা পরিচালনা পর্ষদের আদেশের মেয়াদ সময় সময় বাড়ানোর সুযোগ থাকলেও বর্ধিত মেয়াদসহ মোট মেয়াদ দুই বছরের বেশি হতে পারত না। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংক-কোম্পানির ক্ষেত্রে সেই সীমাবদ্ধতা আর কার্যকর থাকছে না। এর ফলে কোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বাতিল করে বাংলাদেশ ব্যাংক যে নতুন পরিচালনা পর্ষদ নিয়োগ করবে, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী দুই বছরের পরও দায়িত্ব পালন করতে পারবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪টি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে পুনর্গঠন করেছিল। এসব পুনর্গঠিত পরিচালনা পর্ষদের দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাপের মুখে ছিল। এই প্রেক্ষাপটে পরিচালনা পর্ষদের মেয়াদসংক্রান্ত বিধানে পরিবর্তন আনা হলো বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে। ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, নতুন এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংককে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা ও শাসনব্যবস্থা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আরও দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির সুযোগ দেবে। তবে একই সঙ্গে নিয়োগপ্রাপ্ত পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি, কার্যকারিতা এবং পুনর্মূল্যায়নের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
সংসারের ছোটখাটো জরুরি খরচ মেটাতে হঠাৎ টাকার প্রয়োজন হলেও অনেকের হাতে তখন পর্যাপ্ত নগদ থাকে না। বিশেষ করে মাসের শেষ দিকে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি কিংবা মোবাইল ফোনের বিল পরিশোধ অথবা প্রয়োজনীয় রিচার্জ করতে গিয়ে অনেককে পরিচিতজনের কাছ থেকে ধার করতে হয়। কেউ কেউ আবার ক্ষুদ্র ঋণের জন্য ব্যাংক বা অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হন। এবার এই ধরনের ছোট অঙ্কের জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ডিজিটাল মাধ্যমে ঋণের সুযোগ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন এই ব্যবস্থায় মোবাইল ব্যাংকিং বা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ৫০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ নেওয়া যাবে। ঋণ নেওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে পুরো অর্থ পরিশোধ করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঋণের ওপর কোনো সুদ আরোপ করা হবে না। তবে ঋণের পরিমাণ অনুযায়ী নির্দিষ্ট হারে সেবামূল্য নেওয়ার সুযোগ থাকবে ব্যাংকগুলোর। বাংলাদেশ ব্যাংকের খসড়া নীতিমালায় ক্ষুদ্র অঙ্কের এই ডিজিটাল ঋণ চালুর কথা বলা হয়েছে। জনসাধারণ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়ার জন্য খসড়াটি প্রকাশ করা হয়েছে। মতামত ও পরামর্শ পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত নীতিমালা জারি করা হবে। কেন এই ক্ষুদ্র ঋণের উদ্যোগ বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন দ্রুত বাড়লেও এখনো বিপুলসংখ্যক মানুষ দৈনন্দিন ছোটখাটো প্রয়োজন মেটাতে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে মাসের শেষ দিকে হাতে নগদ টাকা না থাকলে বিদ্যুৎ বা অন্যান্য ইউটিলিটি বিল পরিশোধ কিংবা মোবাইল ফোনে রিচার্জ করা অনেকের জন্য সমস্যার হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিকল্পিত এই ব্যবস্থা মূলত সেই জায়গাটিই পূরণ করতে চায়। অর্থাৎ গ্রাহকের হাতে তাৎক্ষণিক নগদ টাকা না থাকলেও ডিজিটাল মাধ্যমে অল্প পরিমাণ অর্থ ধার নিয়ে প্রয়োজনীয় বিল বা রিচার্জ করা যাবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতে, এ ধরনের ব্যবস্থা দেশের নগদবিহীন অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার ব্যবহার বাড়াতে ভূমিকা রাখবে। এটি বড় অঙ্কের ভোগ্যঋণ নয়; বরং দৈনন্দিন জীবনের খুব ছোট ও তাৎক্ষণিক আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য একটি স্বল্পমেয়াদি ঋণব্যবস্থা। ফলে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বা ব্যাংক থেকে প্রচলিত ঋণ নেওয়ার সুযোগ না পাওয়া অনেক মানুষও এর আওতায় আসতে পারেন। ৫০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ খসড়া নীতিমালায় ঋণের পরিমাণ সর্বনিম্ন ৫০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঋণের অঙ্ক যত বাড়বে, নির্ধারিত সেবামূল্যও তত বাড়বে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ৫০ থেকে ২৫০ টাকা পর্যন্ত ঋণে সর্বোচ্চ ৫ টাকা সেবামূল্য; ২৫১ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত ১০ টাকা; ৫০১ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত ১৫ টাকা; ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত ২৫ টাকা; ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত ৩৫ টাকা; ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৫০ টাকা সেবামূল্য নেওয়া যাবে। অর্থাৎ কেউ সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা ঋণ নিলে ৩০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫০ টাকা পরিশোধ করতে হবে। এর বাইরে কোনো সুদ বা অতিরিক্ত চার্জ নেওয়ার সুযোগ থাকবে না। সুদ নেই, তবে সেবামূল্য থাকবে প্রস্তাবিত ব্যবস্থার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—ঋণের ওপর কোনো সুদ নেওয়া হবে না। এর পরিবর্তে ঋণের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত সেবামূল্য নেওয়া যাবে। তবে ব্যাংকগুলো ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত অর্থ আদায় করতে পারবে না। অনুমোদিত সেবামূল্যের বাইরে সুদ, জরিমানা, প্রক্রিয়াকরণ ফি কিংবা অন্য কোনো অতিরিক্ত চার্জ নেওয়া নিষিদ্ধ থাকবে। এমনকি কোনো গ্রাহক নির্ধারিত ৩০ দিনের আগেই ঋণ পরিশোধ করে দিলে তার কাছ থেকে বাড়তি কোনো আগাম পরিশোধ ফি নেওয়া যাবে না। এর ফলে ক্ষুদ্র ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহকের ওপর অতিরিক্ত খরচের চাপ কম থাকবে। একই সঙ্গে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও সেবাটি পরিচালনার একটি নির্দিষ্ট কাঠামো তৈরি হবে। পুরো প্রক্রিয়াই হবে ডিজিটাল নতুন ব্যবস্থায় ঋণ নিতে গ্রাহককে ব্যাংকের শাখায় গিয়ে কাগজপত্র জমা দিতে হবে না। পুরো প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল মাধ্যমে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। কাগজে স্বাক্ষরের পরিবর্তে গ্রাহকের জীবমিতিক পরিচয় যাচাই এবং ডিজিটাল সম্মতি নেওয়া হবে। অর্থাৎ গ্রাহকের পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমেই ঋণের আবেদন, অনুমোদন, অর্থ ছাড় এবং পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যাবে। এতে একদিকে যেমন সময় ও কাগজপত্রের ঝামেলা কমবে, অন্যদিকে ছোট অঙ্কের ঋণ দেওয়ার পরিচালন ব্যয়ও কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। জরুরি সময়ে বড় সুবিধা হতে পারে ধরা যাক, মাসের শেষ দিকে একজন গ্রাহকের হাতে নগদ অর্থ নেই। অথচ বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের শেষ সময় চলে এসেছে। আবার কারও মোবাইল ফোনে জরুরি রিচার্জ প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে পরিচিতজনের কাছ থেকে টাকা ধার করা কিংবা কোনো অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে অর্থ নেওয়ার বদলে ডিজিটাল মাধ্যমেই প্রয়োজনীয় অর্থ পাওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য এই সুবিধা তাৎক্ষণিক আর্থিক চাপ সামলানোর একটি বিকল্প তৈরি করতে পারে। এ ছাড়া ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস তৈরি হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে গ্রাহকের আর্থিক আচরণ মূল্যায়নের সুযোগও তৈরি হতে পারে। নিয়মিত ঋণ নিয়ে সময়মতো পরিশোধ করলে একজন গ্রাহকের আর্থিক সক্ষমতা ও পরিশোধের অভ্যাস সম্পর্কে ব্যাংকগুলোর কাছে তথ্য জমা হতে পারে। নগদ অর্থের ব্যবহার কমানোর সুযোগ বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বাড়লেও দৈনন্দিন ছোটখাটো লেনদেনে নগদের ব্যবহার এখনো উল্লেখযোগ্য। বিল পরিশোধ ও মোবাইল রিচার্জের মতো প্রয়োজনীয় খরচও যদি ডিজিটাল ঋণের মাধ্যমে সম্পন্ন করা যায়, তাহলে নগদ অর্থের ওপর নির্ভরতা আরও কমতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যও হচ্ছে একটি আধুনিক ও কম নগদনির্ভর অর্থনীতি তৈরি করা। সেই বিবেচনায় ক্ষুদ্র ডিজিটাল ঋণব্যবস্থা ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তারে নতুন একটি স্তর যোগ করতে পারে। এতে শুধু ঋণ নেওয়াই নয়, ঋণ পরিশোধও হবে ডিজিটাল মাধ্যমে। ফলে একজন গ্রাহকের পুরো লেনদেন একটি ডিজিটাল ব্যবস্থার মধ্যে চলে আসবে। তবে ঝুঁকিও রয়েছে ক্ষুদ্র ঋণ সহজলভ্য হলে এর অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে একজন গ্রাহক যদি প্রয়োজনের তুলনায় বেশি বা বারবার ঋণ নিতে থাকেন, তাহলে অল্প অঙ্কের ঋণও একসময় বড় আর্থিক বোঝায় পরিণত হতে পারে। কারণ ৫ হাজার টাকা খুব বড় ঋণ না হলেও একই ব্যক্তি যদি নিয়মিত একাধিকবার এই সুবিধা ব্যবহার করেন, তাহলে তার মোট দায় উল্লেখযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে গ্রাহকের পরিশোধ সক্ষমতা, আগের ঋণ পরিশোধের ইতিহাস এবং একই সময়ে অন্য কোনো ডিজিটাল ঋণ রয়েছে কি না—এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে গ্রাহক যেন সেবামূল্য, পরিশোধের সময়সীমা এবং ঋণ খেলাপি হলে কী হবে—এসব বিষয় সহজ ভাষায় বুঝতে পারেন, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি। আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে নতুন সম্ভাবনা বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল আর্থিক সেবা ব্যবহার করেন। কিন্তু তাদের অনেকেরই প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত ঋণ পাওয়ার সুযোগ নেই। বিশেষ করে খুব ছোট অঙ্কের প্রয়োজনের জন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। সেই জায়গায় ৫০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকার এই ডিজিটাল ঋণব্যবস্থা একটি নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে। কারণ এখানে ঋণের অঙ্ক ছোট, সময়সীমা মাত্র ৩০ দিন এবং আবেদন থেকে অর্থ গ্রহণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই ডিজিটাল। ফলে ব্যাংক ও গ্রাহক—উভয়ের জন্যই এটি তুলনামূলকভাবে সহজ হতে পারে। খসড়া থেকে চূড়ান্ত নীতিমালার অপেক্ষা তবে এখনই এই সুবিধা চালু হচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে খসড়া নীতিমালা নিয়ে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নিচ্ছে। মতামত ও পরামর্শ পর্যালোচনার পর চূড়ান্ত নীতিমালা জারি করা হবে। চূড়ান্ত নীতিমালায় ঋণ দেওয়ার যোগ্যতা, গ্রাহকের সীমা, ঋণ পরিশোধের পদ্ধতি, তথ্য সংরক্ষণ, গ্রাহক সুরক্ষা এবং ঋণ খেলাপি হলে করণীয়সহ বিভিন্ন বিষয় আরও স্পষ্ট হতে পারে। সবকিছু ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ক্ষুদ্র অঙ্কের জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি ডিজিটাল সেবা হয়ে উঠতে পারে। বড় ঋণ নয়, ছোট প্রয়োজনেই নজর সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণের নতুন কোনো কর্মসূচি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি ব্যবস্থা, যার লক্ষ্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনের ছোট কিন্তু জরুরি আর্থিক প্রয়োজন মেটানো। হাতে টাকা না থাকলেও যাতে বিদ্যুৎ বিল, অন্যান্য ইউটিলিটি বিল কিংবা মোবাইল রিচার্জ আটকে না থাকে—সেই প্রয়োজন থেকেই এই উদ্যোগের পরিকল্পনা। সুদবিহীন এবং নির্ধারিত সেবামূল্যের এই ঋণব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা গেলে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার পাশাপাশি ছোট অঙ্কের জরুরি অর্থের জন্য অনানুষ্ঠানিক ধারদেনার ওপর মানুষের নির্ভরতাও কমতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে সহজলভ্যতার সঙ্গে দায়িত্বশীল ঋণ ব্যবস্থাপনা, গ্রাহক সুরক্ষা এবং অতিরিক্ত ঋণগ্রহণ ঠেকানোর কার্যকর ব্যবস্থার ওপর। কারণ ডিজিটাল ঋণের আসল সাফল্য শুধু কত টাকা বিতরণ হলো, তা দিয়ে নয়; বরং কত মানুষ নিরাপদে, স্বচ্ছভাবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারলেন—তার ওপরই নির্ভর করবে।