বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী যৌন অপরাধী ও অর্থদাতা জেফরি এপস্টেইনের অপকর্ম নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে নারী পাচার ও নির্যাতন কার্যক্রম চালিয়েছিলেন এপস্টেইন।
বিবিসির এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারির দাবি সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে কেনসিংটন এবং চেলসির মতো এলাকায় নারী ও তরুণীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন এই মার্কিন ধনকুবের।
এমনকি ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পরও সেখানকার পুলিশ তদন্ত না করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার পরবর্তী সময়েও এপস্টেইন নির্বিঘ্নে এসব ফ্ল্যাটে ভুক্তভোগীদের নিয়ে যাতায়াত করেছিলেন।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত এপস্টাইন ফাইলসের রশিদ, ইমেইল ও ব্যাংক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে চারটি বিশেষ ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে বিবিসি। এসব ফ্ল্যাটে অবস্থান করা নারীদের মধ্যে অন্তত ছয়জন ইতোমধ্যে এপস্টেইনের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এপস্টেইনের অপকর্মের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে ২০১৫ সালে যখন লন্ডনে পাচার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন, মেট্রোপলিটন পুলিশ তখন বিষয়টি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তারপরেই এই ৬ নারীকে লন্ডনে নেওয়া হয়েছিল।
যদিও লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের দাবি, তারা সেই সময়ে তদন্তের যুক্তিসঙ্গত পথ অনুসরণ করেছিল। জিউফ্রের অভিযোগের পর তারা কয়েক দফায় তার সাক্ষাৎকার নেয় এবং মার্কিন তদন্তকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে।
ফাইলগুলোতে থাকা ইমেইল অনুসারে, নথিপত্র অনুযায়ী, এপস্টেইন কেবল তাদের নির্যাতনই করতেন না, বরং লন্ডনের ফ্ল্যাটে থাকা কিছু নারীকে তার চক্রের জন্য নতুন নারী সংগ্রহ ও নিয়োগ দিতে বাধ্য করতেন। তাদের নিয়মিত ইউরোস্টার ট্রেনের মাধ্যমে প্যারিসে তার সঙ্গে দেখা করতে পাঠানো হতো।
২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত এপস্টেইন অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছেন। নারীদের যুক্তরাজ্যে আনা-নেওয়ার জন্য ইউরোস্টার ব্যবহার করতেন। জীবনের শেষ কয়েক বছরে তরুণীদের জন্য তার ট্রেনের টিকিট কেনার পরিমাণ বেড়েছিল।
বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এপস্টেইন ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে নারীদের যাতায়াতের জন্য অন্তত ৫৩টি টিকিট কিনেছিলেন, যার অধিকাংশ ছিল ২৫ বছরের কম বয়সী তরুণীদের জন্য। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ২৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ইউরোস্টারের ‘ইউথ ফেয়ার’ বা কম ভাড়ার সুবিধা নিতেন।
আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ব্রিটিশ পুলিশ বারবার দাবি করেছে, তারা তদন্তের যুক্তিসঙ্গত পথ অনুসরণ করেছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ২০২০ সালেও এক নারী লন্ডনে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন।
তবে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না তা জানতে পারেনি বিবিসি। তবে একটি নথি অনুযায়ী বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালেই জানতো—এপস্টেইন লন্ডনে অন্তত একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন।
মানবাধিকার আইনজীবী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পুলিশের এই উদাসীনতাকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন। হিউম্যান রাইটস আইনজীবী টেসা গ্রেগরি বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মানবপাচারের মতো গুরুতর ও নির্ভরযোগ্য অভিযোগ থাকার পরও রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল দ্রুত তদন্ত শুরু করা।
যুক্তরাজ্যের প্রথম স্বতন্ত্র দাসত্ববিরোধী কমিশনার কেভিন হিল্যান্ড সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার সিদ্ধান্তে এই তদন্ত বন্ধ রাখা হয়েছিল। তিনি মনে করেন, লন্ডনের ফ্ল্যাটগুলোতে নারীদের রাখা এবং যাতায়াতের প্রমাণ একটি অপরাধী চক্র শনাক্ত করার জন্য যথেষ্টর চেয়েও বেশি ছিল।
এপস্টেইন গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক মাস আগেও লন্ডনে অবস্থানরত এক রুশ তরুণীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। নথিতে দেখা যায়, তিনি নিজেকে ওই নারীর ‘বাড়িওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দিতেন।
এপস্টেইন লন্ডনের একটি ফ্ল্যাটে থাকা ওই রুশ তরুণীর সঙ্গে স্কাইপিতে মেসেজ আদান-প্রদান করেছিলেন। এপস্টেইন তাকে একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন এবং নিজেকে তার ‘বাড়িওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি রসিকতা করে বলেন, সাধারণ বাড়িওয়ালারা ভাড়া নিলেও তিনি উল্টো ভাড়া দিয়ে দেন।
পরবর্তীতে ওই নারী এপস্টেইনের কাছে লন্ডনে ইংরেজি শেখার ক্লাসের খরচ এবং আসবাবপত্র কেনার জন্য টাকা চেয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি অন্য এক রুশ নারীর ভিসার বিষয়েও পরামর্শ চেয়েছিলেন।
২০১৯ সালের এই কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, এপস্টেইন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লন্ডনে থাকা নারীদের সঙ্গে কতটা নিবিড় যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়েও জড়িত ছিলেন।
মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের বাধ্যবাধকতা পালনের দাবি করলেও সমালোচকদের মতে, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের জড়িত থাকার আশঙ্কায় পুলিশ হয়তো এই বিশাল অপকর্মের দিকে চোখ বন্ধ করে ছিল।
সেন্টার ফর উইমেন’স জাস্টিস-এর প্রতিষ্ঠাতা হ্যারিয়েট উইস্ট্রিচ বলেন, ‘এপস্টেইনের এমন কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দেয়—ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের মধ্যে এক ধরনের ‘‘ভয়’’ কাজ করছিল।’
সব মিলিয়ে, লন্ডনকে কেন্দ্র করে এপস্টেইনের যে গোপন অপরাধ জগৎ বিস্তৃত ছিল, তা ব্রিটিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও সদিচ্ছাকেই এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী যৌন অপরাধী ও অর্থদাতা জেফরি এপস্টেইনের অপকর্ম নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। জানা গেছে, যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের অভিজাত এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে নারী পাচার ও নির্যাতন কার্যক্রম চালিয়েছিলেন এপস্টেইন। বিবিসির এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারির দাবি সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে কেনসিংটন এবং চেলসির মতো এলাকায় নারী ও তরুণীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন এই মার্কিন ধনকুবের। এমনকি ২০১৫ সালে তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠার পরও সেখানকার পুলিশ তদন্ত না করার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার পরবর্তী সময়েও এপস্টেইন নির্বিঘ্নে এসব ফ্ল্যাটে ভুক্তভোগীদের নিয়ে যাতায়াত করেছিলেন। অনুসন্ধানে প্রাপ্ত এপস্টাইন ফাইলসের রশিদ, ইমেইল ও ব্যাংক রেকর্ড বিশ্লেষণ করে চারটি বিশেষ ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে বিবিসি। এসব ফ্ল্যাটে অবস্থান করা নারীদের মধ্যে অন্তত ছয়জন ইতোমধ্যে এপস্টেইনের হাতে নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। ভুক্তভোগীদের বড় একটি অংশ রাশিয়া, পূর্ব ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক। এপস্টেইনের অপকর্মের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী ভার্জিনিয়া জিউফ্রে ২০১৫ সালে যখন লন্ডনে পাচার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন, মেট্রোপলিটন পুলিশ তখন বিষয়টি তদন্ত না করার সিদ্ধান্ত নেয়, ঠিক তারপরেই এই ৬ নারীকে লন্ডনে নেওয়া হয়েছিল। যদিও লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের দাবি, তারা সেই সময়ে তদন্তের যুক্তিসঙ্গত পথ অনুসরণ করেছিল। জিউফ্রের অভিযোগের পর তারা কয়েক দফায় তার সাক্ষাৎকার নেয় এবং মার্কিন তদন্তকারীদের সঙ্গে সহযোগিতা করে। ফাইলগুলোতে থাকা ইমেইল অনুসারে, নথিপত্র অনুযায়ী, এপস্টেইন কেবল তাদের নির্যাতনই করতেন না, বরং লন্ডনের ফ্ল্যাটে থাকা কিছু নারীকে তার চক্রের জন্য নতুন নারী সংগ্রহ ও নিয়োগ দিতে বাধ্য করতেন। তাদের নিয়মিত ইউরোস্টার ট্রেনের মাধ্যমে প্যারিসে তার সঙ্গে দেখা করতে পাঠানো হতো। ২০১৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার আগ পর্যন্ত এপস্টেইন অত্যন্ত সুসংগঠিতভাবে এই নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেছেন। নারীদের যুক্তরাজ্যে আনা-নেওয়ার জন্য ইউরোস্টার ব্যবহার করতেন। জীবনের শেষ কয়েক বছরে তরুণীদের জন্য তার ট্রেনের টিকিট কেনার পরিমাণ বেড়েছিল। বিবিসির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০১১ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে এপস্টেইন ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মধ্যে নারীদের যাতায়াতের জন্য অন্তত ৫৩টি টিকিট কিনেছিলেন, যার অধিকাংশ ছিল ২৫ বছরের কম বয়সী তরুণীদের জন্য। অনেক ক্ষেত্রে তিনি ২৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ইউরোস্টারের ‘ইউথ ফেয়ার’ বা কম ভাড়ার সুবিধা নিতেন। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ব্রিটিশ পুলিশ বারবার দাবি করেছে, তারা তদন্তের যুক্তিসঙ্গত পথ অনুসরণ করেছে, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। ২০২০ সালেও এক নারী লন্ডনে নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছিলেন। তবে সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পরবর্তীতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না তা জানতে পারেনি বিবিসি। তবে একটি নথি অনুযায়ী বিবিসি জানিয়েছে, ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ২০২০ সালেই জানতো—এপস্টেইন লন্ডনে অন্তত একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন। মানবাধিকার আইনজীবী ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা পুলিশের এই উদাসীনতাকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন। হিউম্যান রাইটস আইনজীবী টেসা গ্রেগরি বিস্ময় প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মানবপাচারের মতো গুরুতর ও নির্ভরযোগ্য অভিযোগ থাকার পরও রাষ্ট্রের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল দ্রুত তদন্ত শুরু করা। যুক্তরাজ্যের প্রথম স্বতন্ত্র দাসত্ববিরোধী কমিশনার কেভিন হিল্যান্ড সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার সিদ্ধান্তে এই তদন্ত বন্ধ রাখা হয়েছিল। তিনি মনে করেন, লন্ডনের ফ্ল্যাটগুলোতে নারীদের রাখা এবং যাতায়াতের প্রমাণ একটি অপরাধী চক্র শনাক্ত করার জন্য যথেষ্টর চেয়েও বেশি ছিল। এপস্টেইন গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক মাস আগেও লন্ডনে অবস্থানরত এক রুশ তরুণীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। নথিতে দেখা যায়, তিনি নিজেকে ওই নারীর ‘বাড়িওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দিতেন। এপস্টেইন লন্ডনের একটি ফ্ল্যাটে থাকা ওই রুশ তরুণীর সঙ্গে স্কাইপিতে মেসেজ আদান-প্রদান করেছিলেন। এপস্টেইন তাকে একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন এবং নিজেকে তার ‘বাড়িওয়ালা’ হিসেবে পরিচয় দেন। তবে তিনি রসিকতা করে বলেন, সাধারণ বাড়িওয়ালারা ভাড়া নিলেও তিনি উল্টো ভাড়া দিয়ে দেন। পরবর্তীতে ওই নারী এপস্টেইনের কাছে লন্ডনে ইংরেজি শেখার ক্লাসের খরচ এবং আসবাবপত্র কেনার জন্য টাকা চেয়েছিলেন। এছাড়াও তিনি অন্য এক রুশ নারীর ভিসার বিষয়েও পরামর্শ চেয়েছিলেন। ২০১৯ সালের এই কথোপকথন থেকে বোঝা যায়, এপস্টেইন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত লন্ডনে থাকা নারীদের সঙ্গে কতটা নিবিড় যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়েও জড়িত ছিলেন। মেট্রোপলিটন পুলিশ ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের বাধ্যবাধকতা পালনের দাবি করলেও সমালোচকদের মতে, প্রভাবশালী ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের জড়িত থাকার আশঙ্কায় পুলিশ হয়তো এই বিশাল অপকর্মের দিকে চোখ বন্ধ করে ছিল। সেন্টার ফর উইমেন’স জাস্টিস-এর প্রতিষ্ঠাতা হ্যারিয়েট উইস্ট্রিচ বলেন, ‘এপস্টেইনের এমন কর্মকাণ্ড ইঙ্গিত দেয়—ক্ষমতাবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশের মধ্যে এক ধরনের ‘‘ভয়’’ কাজ করছিল।’ সব মিলিয়ে, লন্ডনকে কেন্দ্র করে এপস্টেইনের যে গোপন অপরাধ জগৎ বিস্তৃত ছিল, তা ব্রিটিশ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা ও সদিচ্ছাকেই এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় যেকোনো হামলার জবাবে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, দেশটি ঐক্যবদ্ধ এবং কোনো আগ্রাসনের জবাব শক্তভাবে দেওয়া হবে। তিনি অভ্যন্তরীণ বিভাজনের কথা নাকচ করে বলেন, আমরা সবাই বিপ্লবী। তিনি আরও জানান, সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির প্রতি জনগণের সমর্থন রয়েছে এবং যেকোনো হামলার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘেই জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা আলোচনার প্রস্তুতি চলছে। তবে এতে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তিনি বলেন, ইরান সব পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েল আবারও সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাষ্ট্রের ‘সবুজ সংকেতের’ অপেক্ষায় আছে। সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে ইরানের নেতৃত্ব ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মার্কিন বাহিনীও অঞ্চলে উপস্থিতি বাড়িয়েছে। এক মার্কিন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ১৯টি যুদ্ধজাহাজ, যার মধ্যে দুটি বিমানবাহী রণতরী আছে।
ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর এই ঘোষণা দেন তিনি। পরে নিজের সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, এই সময়ের মধ্যে লেবানন ও ইসরায়েলের নেতারা ওয়াশিংটনে বৈঠক করতে পারেন। ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র লেবাননকে সহায়তা করবে যাতে দেশটি হিজবুল্লাহর হুমকি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে। একইসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন, ইরানকে হিজবুল্লাহর জন্য অর্থায়ন বন্ধ করতে হবে। এর আগে ইসরায়েলি গণমাধ্যমে খবর আসে, ওয়াশিংটনে আসন্ন আলোচনায় লেবাননের সেই আইন বাতিলের বিষয়টি তুলতে চায় ইসরায়েল, যে আইনে দেশটি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার অবস্থান বজায় রেখেছে।