সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব আদায়ে চাপ, বৈদেশিক অর্থায়নের ধীরগতি এবং ব্যয় সংকোচনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সংশোধিত এডিপি অনুযায়ী, চলমান অর্থবছরের উন্নয়ন ব্যয়ের আকার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। কাটছাঁটের ফলে নতুন প্রকল্প গ্রহণে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে এবং চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যেও অগ্রাধিকারভিত্তিতে বরাদ্দ পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। বিশেষ করে কম অগ্রগতি, দীর্ঘসূত্রতা ও তুলনামূলক কম জরুরি প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমদানি ব্যয়ের চাপ, সুদের হার বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের গতি প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় উন্নয়ন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়ে। একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চ্যালেঞ্জ থাকায় সামগ্রিক ব্যয় ব্যবস্থাপনায় সংযমী অবস্থান নেওয়া হয়েছে।
খাতভিত্তিকভাবে পরিবহন ও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, স্থানীয় সরকার এবং কিছু অবকাঠামো খাতে বরাদ্দ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা ও গ্রামীণ উন্নয়ন খাতে তুলনামূলকভাবে কম কাটছাঁট রেখে মৌলিক সেবা ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বরাদ্দ কমলেও বাস্তবায়ন দক্ষতা বাড়ানো, প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা এবং সময়মতো কাজ শেষ করার ওপর জোর দেওয়া হবে। অগ্রাধিকার প্রকল্পগুলোতে অর্থ ছাড় অব্যাহত থাকবে, যাতে অর্থনীতিতে বিনিয়োগের গতি পুরোপুরি থেমে না যায়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, স্বল্পমেয়াদে এডিপি সংকোচন কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি কমাতে পারে, তবে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় এটি বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। রাজস্ব আদায় বাড়ানো, বৈদেশিক অর্থায়ন ত্বরান্বিত করা এবং প্রকল্প বাছাইয়ে কঠোরতা আরোপ করা গেলে মাঝামাঝি সময়ে উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়া সম্ভব হবে বলে তারা মনে করেন।
সংশোধিত এডিপি কার্যকর হলে বাস্তবায়ন অগ্রগতি ও খাতভিত্তিক প্রভাব পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনে পরবর্তী সময়ে আরও সমন্বয়ের সুযোগ রাখছে সরকার।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী দেশে পৌঁছেছেন। শুক্রবার (১২ জুন) বেলা ১১টার দিকে বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে সড়কপথে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেন তিনি। এসময় বেনাপোল নোম্যাসল্যান্ডে তাকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ভারতীয় দূতাবাস ও বেনাপোল স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা তাকে অভ্যর্থনা জানান। এসময় বাংলাদেশী সাংবাদিকদের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যা আর বাংলাদেশের ২০ কোটি যদি একসঙ্গে করা হয় তাহলে ১৬০ কোটি। দুই গণতান্ত্রিক দেশের শক্তি এক হলে বিশ্ব শক্তিতে পরিনত হবে এবং আন্তর্জাতিকভাবে তা বৃহৎ একটি জনশক্তিতে রুপান্তরিত হবে। এজন্য দুই দেশের সহযোগিতা থাকা দরকার। এসময় পুশইন নিয়ে সীমান্ত উত্তাপ এবং ভ্রমণ ও বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ভারত-বাংলা একই আকাশ একই বাতাস একই যন্ত্র। যা দুই দেশের জন্য ভালো হয় সেই পদক্ষেপ সামনের দিনে নেব। দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, শুধু ভারতের ১৪০ কোটি মানুষই নয়, আমি এর সঙ্গে বাংলাদেশের আরও ২০ কোটি মানুষকেও যুক্ত করছি। ১৬০ কোটি মানুষের জন্য যা কিছু মঙ্গলজনক, আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের মানুষ আমাকে আশীর্বাদ করবেন; যাতে আমরা একসঙ্গে থাকতে পারি এবং আমরা যা অর্জন করতে যাচ্ছি, তাতে যেন সফল হই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, তার দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক আরও গভীর হবে, অচিরে টুরিস্ট ভিসা চালু করা হবে। গত ২৪ সালের এপ্রিল মাসে ভারত সরকার ভারতের সাবেক রেলমন্ত্রী ও ব্যারাকপুরের সাবেক এমএলএ বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশের ১৮ তম হাই কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। তিনি বর্তমান হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মার স্থলাভিষিক্ত হলেন। বেনাপোল বন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আসার সময় তার সঙ্গে তার সহধর্মিনী মৃণাল ত্রিবেদী এসেছেন। পরে সড়কপথে দুপুর সাড়ে ১২টায় তিনি ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর ধারণার কারণে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে পাঠিয়েছে ভারত সরকার। সীমান্ত সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি পুশইন নিয়ে দুই দেশের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে বেশ উত্তাপ বিরাজ করছে। চলমান এ পরিস্থিতে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসাবে দায়িত্ব নিতে আজ সকালে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ঢাকায় আসছে দীনেশ ত্রিবেদী। তার দায়িত্ব গ্রহণ সীমান্ত উত্তাপ, পুশইন রোধ এবং বাণিজ্য ও ভ্রমণ খাতে নিষেধাজ্ঞা শিথিলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। দিনেশ ত্রিবেদী বাংলাভাষী এবং দির্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। হাইকমিশনার হিসেবে বাংলাদেশে তার দায়িত্ব গ্রহণ দুই দেশের মধ্য চলমান সীমান্ত উত্তাপ বন্ধ, ভিসা ও বাণিজ্য সহজীকরণসহ নানান বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশে ভারতীয় মিশনে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন পেশাদার কূটনীতিক প্রণয় ভার্মা। তাকে এরই মধ্যে বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তার জায়গায় দায়িত্ব নিচ্ছেন ৭৫ বছর বয়সী এই প্রবীণ রাজনীতিক। গুজরাটি ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য হলেও ঝরঝরে বাংলা বলতে পারেন দীনেশ ত্রিবেদী। দলীয় সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সুসম্পর্ক, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বাঙালি ও বাংলার সংস্কৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকায় তাকে বাংলাদেশে পাঠানো হচ্ছে। ভারতের কূটনৈতিক প্রথায় সাধারণত অভিজ্ঞ ইন্ডিয়ান ফরেন সার্ভিস (আইএফএস) কর্মকর্তাদের এমন পদে নিয়োগ দেয়া হয়। দীনেশ ত্রিবেদীর ক্ষেত্রে তার ব্যতিক্রম ঘটছে। একটা সময় সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দূত ছিলেন দীনেশ। ২০১৬ সালের পর তাদের সম্পর্কে অবনতি ঘটতে শুরু করে। শেষমেশ ২০২১ সালে বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। দীনেশের রাজনৈতিক যাত্রার শুরু অবশ্য ৮০ দশকে। সে সময় তিনি কংগ্রেসে ছিলেন। পরে যোগ দেন জনতা দলে। ১৯৯০ সালে প্রথমবার রাজ্যসভার সংসদ সদস্য হন। এরপর তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে আবারও রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন। প্রথমবার ভোটে লড়েন ২০০৯ সালে। দ্বিতীয় দফায় ইউপিএ সরকারের সময় তৃণমূল কংগ্রেসের সদস্য হিসেবে তিনি কেন্দ্রের রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলান। ২০১৯ সালে বারাকপুরে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে বিজেপির অর্জুন সিংয়ের কাছে পরাজিত হন তিনি। এরপর তৃণমূল তাকে রাজ্যসভায় পাঠায়। ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করেন দীনেশ ত্রিবেদী। একই বছরের ৬ মার্চ তিনি বিজেপিতে যোগ দেন।
চট্টগ্রাম-৪ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী লায়ন আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার বিরুদ্ধে ব্যাংকের করা আপিল আবেদনের ওপর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের শুনানি আজ। বুধবার (২০ জুন) প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের বিচারপতির আপিল বিভাগের বেঞ্চে প্রথম দিনের মতো শুনানি শেষে আজকে আবারও পরবর্তী দিন রাখা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় আজ (বুধবার) সেটি শুনানির জন্য কজলিস্টে রয়েছে। এর আগে, মঙ্গলবার (৯ জুন) চট্টগ্রাম-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার বিরুদ্ধে ব্যাংকের করা আপিল আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে। এদিন চট্টগ্রাম-৪ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষিত বিএনপির লায়ন আসলাম চৌধুরীর প্রার্থিতা নিয়ে আপিল শুনানি শুরু হয়। প্রথম দিনের মতো শুনানি শেষে বুধবার পরবর্তী দিন রাখা হয়েছিল। আদালতে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী মো. আজিম উদ্দিন পাটোয়ারী। আসলাম চৌধুরীর পক্ষে ছিলেন সিনিয়র আইনজীবী মিফতাহ উদ্দিন চৌধুরী ও ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সম্পূর্ণ বিদ্যুৎবিহীন এক অভিনব ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এক অধ্যাপক। পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ ঘর্ষণ শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এ ডিভাইসটি ভবনের তীব্র কম্পন শুষে নিতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের দুর্যোগে অসংখ্য মানুষের প্রাণ ও ভবন রক্ষা করবে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট স্ল্যাশগিয়ার। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘ইউনিভার্সিটি অফ শারজাহ’-এর সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক মুসা লেবলুবা সহজ, কার্যকর ও সম্পূর্ণ বিদ্যুৎবিহীন একটি সমাধান তৈরি করেছেন। যন্ত্রটি একটি সিলিন্ডার, যার কেন্দ্র বরাবর একটি রড রয়েছে এবং এর দুই প্রান্ত সিলিন্ডারের বাইরে প্রসারিত অবস্থায় থাকে। সিলিন্ডারের ভেতরে থাকা রডের অংশটি থেকে ছোট ছোট আরও কিছু রড শাখার মতো চারদিকে ছড়িয়ে থাকে এবং পুরো সিলিন্ডারটি ছোট ছোট স্টিলের বল বা মার্বেল দিয়ে ঠাসা। মূল পরিকল্পনাটি হচ্ছে, এ যন্ত্রটি ভূমিকম্পের তীব্র আঘাত নিজে শুষে নিয়ে তা নিষ্ক্রিয় করে দেবে। শুনতে যতটা জটিল মনে হচ্ছে বিষয়টি ততটা কঠিন নয়। ‘ইউরেকঅ্যালার্ট!’-এর সঙ্গে আলাপকালে লেবলুবা বলেছেন, এ যন্ত্রটির কাজ করার জন্য কেবল পদার্থবিজ্ঞানের শক্তির প্রয়োজন। “মূল স্থাপনা বা ভবনটি যখন কাঁপতে শুরু করবে তখন সিলিন্ডারের ভেতরের মূল দণ্ডটি সামনে-পেছনে নড়াচড়া করবে এবং এর সঙ্গে থাকা ছোট আকারের বিভিন্ন রড ঠাসাঠাসি করে থাকা স্টিলের বলগুলোর ভেতর দিয়ে যাতায়াত করবে। এসব বল ও রডের মধ্যকার ঘর্ষণের ফলেই কম্পনজনিত শক্তি শোষিত ও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে।” পরীক্ষামূলকভাবে যন্ত্রটি প্রায় ১৪ শতাংশ হারে ড্যাম্পিং রেশিও বা কম্পন কমাতে পেরেছে, যার থেকে প্রমাণ মেলে, বেশ ভালোভাবেই নিজের কাজ সম্পন্ন করতে পারে এ যন্ত্র। অধ্যাপক লেবলুবা ২০২৫ সালে এ ভূমিকম্প-প্রতিরোধী যন্ত্রটির পেটেন্ট বা স্বত্ব পেয়েছেন। তবে বাণিজ্যিকভাবে বা বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে এখনও যন্ত্রটির অনেক কাজ বাকি। বাস্তব ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা পুরোপুরি প্রমাণের জন্য আরও পরীক্ষানিরীক্ষার প্রয়োজন। এখনো দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি মুসা লেবলুবার এ যন্ত্রটির বেশ কিছু অনন্য সুবিধা রয়েছে। কোনো বিদ্যুৎশক্তির প্রয়োজন না হওয়ায় যন্ত্রটি পুরানো ভবনগুলোতেও যেমন সহজে যোগ করা সম্ভব তেমনই ‘মডিউলার’ বা সহজে খণ্ড খণ্ড অংশ আলাদা করার উপযোগী। যার মানে, প্রকৌশলীরা প্রয়োজন অনুসারে এর যে কোনো অংশ খুলে পরিবর্তন করতে পারবেন, যা যন্ত্রটিকে সবসময় সচল রাখতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি, যন্ত্রটির গঠনশৈলী সহজ হওয়ায় এটি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচও কম। এ সরলতার কারণেই প্রকৌশলীরা যে কোনো ভবনের আকার, ওজন ও নির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুসারে যন্ত্রটিকে সহজেই মানিয়ে নিতে পারবেন। তবে এতসব সুবিধার পরেও কিছু বড় বাধা এখনও রয়ে গেছে। গবেষণা দলটি এ পর্যন্ত যন্ত্রটিকে কেবল ১ থেকে ৫ মিলিমিটারের মতো সূক্ষ্ম কম্পনের মধ্যে পরীক্ষা করেছে। এসব ক্ষুদ্র পরিসরে যন্ত্রটি প্রতি মিলিমিটারে ৫ কিলোনিউটন বল প্রতিরোধের মাধ্যমে ভালো কার্যকারিতা দেখালেও বড় পরিসরে ব্যবহারের আগে গবেষণাগারের বাইরে বাস্তব পৃথিবীর পরিস্থিতিতে একে পরীক্ষা করা জরুরি। অধ্যাপক লেবলুবা বলেছেন, তাদের গবেষণা দলটি এখন এ যন্ত্রটির আরও বড় সংস্করণ তৈরির পরিকল্পনা করছে। যার মাধ্যমে ভবনের কৃত্রিম মডেল ব্যবহার করে ভূমিকম্পের বাস্তবসম্মত পরিস্থিতির সিমুলেশন বা মহড়া চালিয়ে এর নকশাটি নিখুঁত করা হবে। ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে থামানো সম্ভব নয় তবে এর জন্য যথাসম্ভব সেরা প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। এ দুর্যোগের সময় ‘হারবার ফ্রেইট’-এর মতো জরুরি বিভিন্ন সরঞ্জাম হয়ত সাময়িক সাহায্য করতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্ভাবনই ভূমিকম্পের মতো কঠিন পরিস্থিতি পার হওয়াকে আরেকটু সহজ ও নিরাপদ করে তুলবে।