বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের রাস্তায়, অলি-গলিতে গড়ে ওঠা খাবারের দোকানগুলোকেও তাদের ব্যবসার জন্য রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে। পাশাপাশি খাবারের ব্যবসা করতে হলে বা এ ধরনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেই লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করার বিধান রেখে বিধিমালা জারি করেছে সরকার।
এই বিধিমালা অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক বা ফুটপাতের ওপর গড়ে ওঠা খাবারের দোকান, ছোট আকারের রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে খাদ্য আমদানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসার জন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে নিবন্ধন ও লাইসেন্স নিতে হবে।
বাংলাদেশে রাস্তাঘাটে হাজার হাজার অস্থায়ী বা ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান আছে। এ ধরনের বহু দোকান ফুটপাতেই চুলা বসিয়ে রান্না করে খাবার বিক্রি করে। তবে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে ফার্স্ট ফুডের কত দোকান আছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড অ্যান্ড রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান বিজ্ঞানী ড. লতিফুল বারী বলছেন, টং দোকান বলে পরিচিত এসব খাবারের দোকানগুলোর উপকরণ থেকে শুরু করে রেসিপি- সব কিছু নিয়েই প্রশ্ন আছে।
"বিধিমালাটি হওয়ায় এগুলো এখন একটা কাঠামোর ভেতর এলো। যদিও এগুলোর খাদ্য নিরাপদ কি না তা যাচাইয়ের সক্ষমতা সরকারের নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম অবশ্য বলছেন, বিধিমালাটি হওয়ার কারণে এখন এসব দোকান নিবন্ধনের আওতায় আসবে এবং তাদের খাবারের মান যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।
"খুবই ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ হয়েছে এটি। আমরা হয়তো একদিনেই সব পরিবর্তন করতে পারবো না। তবে পর্যায়ক্রমে স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোও লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে তদারকির আওতায় আসবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. ইসলাম।
তবে বাংলাদেশ রেস্তোঁরা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলছেন, বিধিমালাটি একতরফাভাবে করা হয়েছে এবং এতে শুধু লাইসেন্স বাণিজ্য বাড়বে।
এখানে অথরিটির ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তার কোনো নির্দেশনা নেই। ফুড সেফটি একটি বিশাল চেইন। কোন ধাপে কীভাবে নিশ্চিত হবে তার কোনো ভিশনও এতে নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় বিক্রি হওয়া জনপ্রিয় বিভিন্ন স্ট্রিট ফুডে উদ্বেগজনক মাত্রায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে।
২০২৪ সালে প্রকাশ করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ছোলামুড়ি, চটপটি, আখের রস, শরবত, মিশ্র সালাদ এবং স্যান্ডউইচের মতো খাবারে ডায়রিয়ার জন্য দায়ী বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫০টি স্থান থেকে সংগ্রহ করা ৪৫০টি নমুনা পরীক্ষায় প্রতিটি নমুনাতেই তখন ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ হিসেব অনুযায়ী, দেশে খাদ্য পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে চার লাখ। এর মধ্যে হোটেল রেস্তোরার ও চা-স্টলও আছে। ফার্স্ট ফুডের দোকান আছে প্রায় ৬৭ হাজার।
ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষ নাশতা কিংবা দুপুরের খাবারের জন্য ফুটপাতের খাবারের দোকানের ওপর নির্ভর করেন।
ড. লতিফুল বারী বলছেন, এসব দোকানের খাবার কীভাবে ও কোন ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি হয় সেটি দেখভালের কোনো সিস্টেমই দেশে গড়ে ওঠেনি।
"এসব দোকানকে একটা ফরমাল কাঠামোর আনার কথা আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছি। এখন সেই উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত নেওয়া হলো," বলছিলেন তিনি।
নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর আওতায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তৈরি করা নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬ প্রণয়ন করেছে। গত ১৬ই জুলাই এটি সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে।
এই বিধিমালা অনুযায়ী, ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে। আর বিশেষ বা গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য নিয়ে যারা কাজ করে তাদের লাইসেন্সও নিতে হব।
বিধিমালায় বলা হয়েছে, খাদ্যপণ্য বা খাদ্য উপকরণ উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ বা বিক্রয় সংশ্লিষ্ট সবার নাম ও ঠিকানা সংরক্ষণের লক্ষ্যে খাদ্য ব্যবসার সাথে জড়িত কিংবা জড়িত হতে ইচ্ছুক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এসব ব্যবসার জন্য রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে।
"এর ফলে যারা খাদ্যপণ্য বিক্রি করে তারা শৃঙ্খলার আওতায় আসবে। ফলে এই সেক্টরে শৃঙ্খলা আসবে, যা মান ঠিক রেখে খাবার বিক্রি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে," বলছিলেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম।
বিধিমালা অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসার জন্য দেওয়া রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ হবে তিন বছর, যা নবায়ন করা যাবে।
নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী, "খাদ্য ব্যবসা বলতে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, আমদানি, বিতরণ বা বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড এবং মজুদ, যোগান, সরবরাহ ও সেবাসহ খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকরণ অথবা খাদ্যের উপাদান বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে"।
নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া খাদ্য ব্যবসা করা যাবে না। এছাড়া খাদ্যপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ বা আমদানির জন্য প্রতিটি খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদন বা আমদানি লাইসেন্স নিতে হবে।
আবার উৎপাদন ও আমদানির জন্য লাইসেন্স পাওয়ার পর কোনো খাদ্যপণ্য কোনো ব্র্যান্ড নাম ও প্যাকেজিং এর আওতায় বাজারজাত করতে হলে এ ধরনের প্রতিটি খাদ্যপণ্যের ব্র্যান্ড ও প্যাকেজিংয়ের জন্য রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে অফিস পাড়া বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডপ্রধান এলাকাগুলোয় মূল রাস্তায় বা গলির ভেতর অসংখ্য ভাসমান বা অস্থায়ী দোকান চোখে পড়ে। এসব দোকান থেকে সিঙ্গারা, স্যান্ডউইচ, ছোলা ও তেলে ভাজা খাবারের জন্য যেমন ভিড় করেন অনেকে; আবার অনেক দোকানে খিচুড়ি বা ভাত পাওয়া যায়, যেখানে শ্রমজীবী মানুষ বিশেষ করে দোকানের কর্মচারী ও রিকশাচালকদের দুপুর বা রাতের খাবারের জন্যও ভিড় করতে দেখা যায়।
গুলশান এলাকার ১১৩ নম্বর রাস্তায় এরকম কিছু দোকানে নিয়মিতই চা-নাস্তা খান পাশেই থাকা একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা সাইফুল আলম তালুকদার। তিনি বলছিলেন, "আমার স্ট্রিট ফুড ভালো লাগে। ছাত্রজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যানের ওপর বিক্রি হওয়া ভাজাপোড়া খেতাম খুব। এখন অফিসের পাশে বলে এই গলির দোকান থেকে চা-নাস্তা খাই। কিছু কিছু প্যাকেটে মেয়াদের তারিখ দেখে কিনি। আর বাকিগুলোর মান যে ভালো না বুঝতে পারি, কিন্তু খেতে ভালো লাগে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
রাস্তার ওপর বা পাশে গড়ে ওঠার এসব দোকানের প্রতি যেখানে অনেক মানুষের নির্ভরতা, নিবন্ধন না নিলে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব কেমন হবে সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
রমনা এলাকায় ছোট একটি দোকানে চা-বিস্কুট-কেক এ ধরনের খাবার বিক্রি করেন লিটন শেখ। সরকার নিবন্ধন নেওয়ার নতুন যে আইন করেছে, সে সম্পর্কে জানেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা শোনেননি।
পাশেই একটি ভাসমান দোকান চালান আবদুর রহিম, তিনিও জানান সরকারের কাছ থেকে কোনো রকম নিবন্ধন নেওয়ার বিষয়ে কিছু জানেন না।
ড. লতিফুল বারী বলছেন, দেশে খাবারের এত পরিমাণে ভাসমান বা অস্থায়ী দোকান গড়ে ওঠেছে যে এগুলোর তদারকি করার সক্ষমতাই সরকারের নেই।
"এসব দোকানে কোন খাবার কীভাবে তৈরি হয় সেটিই দেখার ব্যবস্থা নেই। গবেষণাগার ও লোকবল সক্ষমতা এখনো সরকারের খুবই কম। সরকার যে বিধিমালাটি করেছে তা যৌক্তিক, কিন্তু তারপরেও কীভাবে এটি কার্যকর করা যাবে সেটি বড় প্রশ্ন আমার কাছেও," বলছিলেন তিনি।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুতে বিএসটিআই-এর সনদ যাদের রয়েছে তাদের ওপর কোনা হস্তক্ষেপ করার পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে আমদানি করা খাদ্যপণ্য ঠিক আছে কি-না তা যাচাইয়ের জন্য বন্দরগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
কিন্তু ফুটপাতে বা রাস্তাঘাটে যে হাজার হাজার খাবারের দোকান সেগুলোর মান যাচাইয়ের উদ্যোগ কার্যকর কীভাবে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেছেন যে, পর্যায়ক্রমে এগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে।
"আমরা চেষ্টা করবো প্রক্রিয়াটা যাতে সহজ হয়। যাতে তারা সহজেই অনলাইনে আবেদন করতে পারে। তাহলে ধীরে ধীরে সবাই নিবন্ধনের আওতায় আসবে বলে মনে করি। যতটা সহজভাবে করা যায়, সেভাবেই হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।
বাংলাদেশ রেস্তোঁরা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলছেন, নিবন্ধন আর লাইসেন্স খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।
"আমরা চেয়েছিলাম খাদ্য ব্যবসার সব কিছু্ একটি কর্তৃপক্ষের আওতায় আসুক। তারাই সবকিছু করবে। কিন্তু এখন যা হয়েছে তাতে শুধু লাইসেন্স বাণিজ্যটাই হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. হাসান।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে 'টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে' আগুন ছড়িয়ে পড়ার মুহূর্তে মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল নিয়ে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন রিসোর্টের কয়েকজন কর্মী। রির্সোটে আগুন লাগার পরপরই কী ঘটেছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী। তাদের অভিযোগ, আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় রিসোর্টের নিরাপত্তাকর্মী ও কয়েকজন কর্মীকে মালিকের পোষা কুকুর-বিড়াল উদ্ধারে ব্যস্ত দেখা গেছে। এ সময় ভেতরে থাকা পর্যটকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে যথাযথ উদ্যোগ দেখা যায়নি। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে আগুনের সূত্রপাতের সময়কার দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে এসব কথা বলেন পাটোয়ারটেক এলাকার বাসিন্দা মো. মামুন। তার দাবি, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সময় রিসোর্টের নিরাপত্তাকর্মী মো. কফিল উদ্দিন কর্মীদের বেরিয়ে যেতে বলছিলেন। একই সময়ে তাকে পোষা প্রাণীগুলোর খোঁজ করতেও দেখা যায়। তখন সে চিল্লাচিল্লি করে বলে কুকুর কই কই? মামুনের ভাষ্য, আগুন ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য দেখে তিনি দিশাহারা মানুষের ছোটাছুটি লক্ষ্য করেন। তার অভিযোগ, ওই সময় নিরাপত্তাকর্মী পর্যটকদের কক্ষ থেকে বের করে আনার উদ্যোগ নিলে আরো কয়েকজনকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে নেওয়া যেত। রিসোর্টের দ্বিতীয় তলায় মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল ছিল বলে জানান মামুন। আগুন লাগার পর রিসোর্টের নিরাপত্তাকর্মীসহ পাঁচজন কর্মী প্রাণীগুলো নিয়ে বাইরে চলে আসেন বলে তার দাবি। রিসোর্টের কাছেই বসবাস করেন মামুন। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে বেরিয়ে দেখি, রিসোর্টে আগুন জ্বলছে। কয়েকজন কর্মী কুকুর-বিড়াল নিয়ে ছোটাছুটি করছেন। তানভীরকে (রিসোর্টের মালিক) আগে অনেকবার পোষা কুকুর নিয়ে সৈকতে হাঁটতে দেখেছি।’ একই এলাকার বাসিন্দা নুর হোসেনও আগুনের সময় কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার অভিযোগ, আগুনের মধ্যে পোষা প্রাণী উদ্ধারের তৎপরতা দেখা গেলেও পর্যটকদের উদ্ধারে কোন ধরনের উদ্যোগ হয়নি, তা স্পষ্ট দেখছি আমরা। নুর হোসেন বলেন, ‘মানুষের জীবন বাঁচানোই তখন সবচেয়ে জরুরি ছিল। আগুনের মধ্যে মানুষকে খুঁজে বের করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা আরো জোরালো হওয়া দরকার ছিল। সেদিন দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানো গেলে হয়তো আরো কিছু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো।’ মালিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখ করে উখিয়া থানায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলার তদন্ত ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি এখন পুলিশের হাতে। তদারকিতে জনবলসংকটের কথা ফায়ার সার্ভিসের রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকির ক্ষেত্রে জনবলসংকটের কথা জানানো হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্ট পরিদর্শনে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ আনোয়ার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করার পরও কয়েক বছর পর আবার সেখানে গিয়ে একই ধরনের অনিয়ম পাওয়া যায়। তিনি আরো বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা নিজেরা সচেতন না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন। আমাদের নিজস্বভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নেই। কাউকে জরিমানা করতে হলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।’ আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের তৎপরতা উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, মামলার প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিয়াসহ অন্য আসামিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
কক্সবাজারের উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্তোরাঁ অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১০ পর্যটক নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন রয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীও রয়েছেন। এ ঘটনায় আহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। মুহূর্তের মধ্যে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে ভেতরে থাকা পর্যটকেরা প্রাণ বাঁচাতে ছোটাছুটি শুরু করেন। কয়েকজন দরজা-জানালা ভেঙে বেরিয়ে আসেন। কেউ কেউ ভবন থেকে লাফ দিয়েও প্রাণে বাঁচার চেষ্টা করেন। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানো ও উদ্ধারকাজ শুরু করে। প্রথম দফায় ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে রিসোর্টের শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ১০ জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তারও অগ্নিকাণ্ডে ১০ জন নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন। তাদের মরদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি। একই পরিবারের ছয়জন নিহত অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চীনা ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা রয়েছেন। নিহত হয়েছেন ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মেলিতা মেহেজাবিন আলভীও। নিহতদের মধ্যে আরও রয়েছেন- ইসরাত জাহান মালিহা, নাফিসতা মীম, ফারিহা কবির এবং পাঁচ বছর বয়সী ফাইজান আহমেদসহ অন্যরা। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নাফিজ তেহামী, নাবিলা, মালিহা ও আলভী পরস্পরের কাজিন। ফারিহা কবির ছিলেন নাফিজের বড় বোন এবং শিশু ফাইজান তার ভাগ্নে। তাদের পরিবারের ৯ সদস্য বেড়াতে গিয়েছিলেন ওই রিসোর্টে। তাদের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে। আশিকুল ইসলামের এক স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগুন লাগার পর আশিকুল ইসলাম রিসোর্টের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে বেঁচেছেন। তবে তার স্ত্রী, স্ত্রীর বোনসহ পরিবারের ছয়জন মারা গেছেন। ওই স্বজন কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন বলে জানান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি সাদিক কায়েম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নাফিজ তেহামীসহ তার পরিবারের ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য জানান। এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করে তিনি আহত ব্যক্তিদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা মারা গেছেন। তার মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রইছ উদ্দীন ও ট্রেজারার অধ্যাপক ড. সাবিনা শরমীন গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন চিকিৎসক ও তার স্ত্রী অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজন দগ্ধ হয়েছেন। তারা হলেন- মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) সবুক্তগীন মাহমুদ সোহেল বলেন, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় পাঁচ শতাংশ পুড়ে গেছে। তাদের হাসপাতালে ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অন্য একজন পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকাজে একাধিক বাহিনী অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), কোস্টগার্ড ও গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজে সহযোগিতা করে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ঘটনার খবর পেয়ে উখিয়া-টেকনাফের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। এ সময় তিনি অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানার চেষ্টা করেন। রিসোর্টটির ইনচার্জ মো. সুমন ইসলাম বলেন, আগুন লাগার পরপরই তা নেভানোর চেষ্টা করা হয়। তবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি) ও সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হলে আগুন দ্রুত পুরো স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ে বলে তারা ধারণা করছেন। স্থানীয় বাসিন্দা কামাল উদ্দিন বলেন, ঘুম থেকে উঠে তিনি রিসোর্টটিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখেন। মুহূর্তের মধ্যেই ভবনটি আগুনে পুড়ে যায়। একই এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। আগুন লাগার পর কয়েকজন পর্যটককে জীবন বাঁচাতে লাফ দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। ইউনুস নামের এক স্থানীয় যুবক অভিযোগ করেন, রিসোর্টটিতে আগুন নেভানোর প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ছিল না। নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দা মোস্তাক মিয়া বলেন, পর্যটন এলাকায় প্রায়ই ছোটখাটো অগ্নিকাণ্ড ঘটে। বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে উখিয়া থেকে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় লাগে। তদন্ত কমিটি গঠন জেলা প্রশাসন গঠিত পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত, প্রাণহানির কারণ এবং রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা খতিয়ে দেখবে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও সম্ভাব্য দায় নির্ধারণ করা হবে। কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে মোট নয়টি কক্ষ ছিল বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। কক্সবাজার শহরের কলাতলী থেকে প্রায় ২৯ থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে এর অবস্থান। আগুনে রিসোর্টটির পুরো স্থাপনা পুড়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের সংরক্ষণ, প্রসার এবং এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কারুশিল্পীদের স্বীকৃতি দেওয়ার লক্ষ্যে বরিশালে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘১৭তম মৃৎশিল্পী সম্মেলন ও সম্মাননা-২০২৬’। শনিবার (১৭ অক্টোবর) দুপুর ১২টায় বরিশাল নগরীর একটি কমিউনিটি সেন্টারে মৃৎশিল্পী সম্মেলন ও সম্মাননা, বরিশাল-এর উদ্যোগে এই ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে ধারাবাহিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে এই সম্মেলন নতুন প্রজন্মের কাছে মাটির শিল্পকে পরিচিত করে তুলছে। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের কনিষ্ঠপুত্র ও শিল্পানুরাগী প্রকৌশলী ময়নুল আবেদিন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ এবং পরিব্রাজক অনু তারেক। এ বছর দেশের বরিশাল, ফরিদপুর, মাদারীপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, নওগাঁ এবং রাজশাহীসহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দেড় শতাধিক মৃৎশিল্পী এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ১৮ জন প্রবীণ ও দক্ষ মৃৎশিল্পীকে বিভিন্ন বিভাগে সম্মাননা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে ‘শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন আজীবন সম্মাননা’ লাভ করেন ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার মনসুরাবাদ ইউনিয়নের প্রবীণ মৃৎশিল্পী নিরঞ্জন পাল। সম্মেলন উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মৃৎশিল্পীরা তাদের নিজেদের হাতে তৈরি বিভিন্ন ধরনের মাটির পাত্র, মনসার ঘট, পুতুল, শখের হাঁড়ি, মাটির খেলনাসহ নানাবিধ ঐতিহ্যবাহী লোকজ শিল্পসামগ্রী প্রদর্শন ও বিক্রি করেন। এ সময় মৃৎশিল্পীরা তাদের অঞ্চলের এক সময়ের প্রসিদ্ধ ও প্রায় বিলুপ্তপ্রায় মৃৎ উপকরণের সাথে দর্শনার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন। এছাড়া সকালে শিশুদের জন্য একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাও অনুষ্ঠিত হয়। উদ্বোধকের বক্তব্যে প্রকৌশলী ময়নুল আবেদিন বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বাবা জয়নুল আবেদিনের মৃৎশিল্প সংগ্রহের সঙ্গে বেড়ে ওঠায় এই শিল্পের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সেই আগ্রহ আরও গভীর হয়েছে। মৃৎশিল্প বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই শিল্পের বৈচিত্র্য, history ও নান্দনিকতা নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পকে সংরক্ষণ এবং এর প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে শিল্পাঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা জরুরি।’ সামিট পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) ড. মনিরুল ইসলাম আখন্দ তাওর বক্তব্যে বলেন, “সৃজনশীল কাজের সঙ্গে সামিট গ্রুপ সবসময় ছিল, আগামীতেও থাকবে। ১৭টি বছর ধরে মৃৎশিল্পীদের এই কাজের উৎসাহ ধরে রাখতেই তাদেরকে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে। সেই শুরুর দিনটি থেকে আজও এই মহৎ কাজের সঙ্গে সামিট গ্রুপ আছে।’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন বলেন, ‘মৃৎশিল্প আমার দেশের ঐতিহ্য। এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে আমাদের এগিয়ে আসতে হবে। তাহলে যেমন পরিবেশ বাঁচবে, তেমনি মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষ বাঁচবে।’ অনুষ্ঠানে পরিব্রাজক অনু তারেক জানান, বরিশালে এই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানটি প্রতিবছর নিয়মিত আয়োজনের চেষ্টা চলছে। আড়ালে থাকা মৃৎশিল্পীদের জনসমক্ষে নিয়ে আসার মাধ্যমে প্রায় বিলুপ্ত হতে বসা এই শিল্পধারাটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে। সম্মেলনে আসা দর্শনার্থীরা এমন আয়োজনের ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং যুগের তালে হারিয়ে যেতে বসা এই শিল্প ও শিল্পীদের বাঁচিয়ে রাখতে সরকারি ও বেসরকারি জোর হস্তক্ষেপ ও সবার প্রতি মাটির জিনিস ব্যবহারের আহ্বান জানান। উক্ত অনুষ্ঠানে দেশের বিশিষ্ট গবেষক, শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।