রাজধানীর বনশ্রীর বাসিন্দা মাসুদ রানা খান। ব্যবসায়িক কারণে তাকে প্রায়ই দেশের বাইরে যেতে হয়, বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় তার যাতায়াত নিয়মিত। বছর দুয়েক আগেও এই রুটে ঢাকা-কুয়ালালামপুর যাতায়াতে (আপ-ডাউন) বিমান খরচ পড়তো ৩০ থেকে ৩৫ হাজার, সর্বোচ্চ ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু বর্তমানে এই ভাড়া ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা বেড়ে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা ছুঁয়েছে। মাসুদ রানা আক্ষেপ করে বলেন, “দেড়-দুই বছরের ব্যবধানে শুধু মালয়েশিয়া রুটে বিমান ভাড়া ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা বেড়েছে।”
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু মালয়েশিয়া নয়, আন্তর্জাতিক প্রায় সব রুটেই ভাড়া একই হারে বা কোনও কোনও ক্ষেত্রে দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক দেশগুলোতে মরশুম ভেদে এই ভাড়া দুই থেকে তিন গুণ পর্যন্ত হয়ে যায়। সাধারণ সময়ে সৌদি আরবের আপ-ডাউন ভাড়া যেখানে ছিল ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা, বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ৮০ থেকে ৮৫ হাজার টাকায়।
আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটের তুলনামূলক চিত্র
বিমান ভাড়ার এই লাগামহীন যাঁতাকলে পড়ে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দুই ধরনের যাত্রীরাই চরম নাজেহাল হচ্ছেন। দেড়-দুই বছরের ব্যবধানে অভ্যন্তরীণ রুটে ২ থেকে ৪ হাজার এবং আন্তর্জাতিক রুটে ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে।
মোয়াজ্জেম হোসেন নামের এক ট্রাভেল এজেন্সির মালিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “বিমান ভাড়া সবসময় এক থাকে না, চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত ওঠানামা করে। তবে গত দুই বছরের তুলনায় সব আন্তর্জাতিক রুটেই ভাড়া বেড়েছে। সদ্য হজ মৌসুম শেষ হওয়ায় এখন ওমরাহর প্রস্তুতি চলছে। এই সময়ে স্বাভাবিক ভাড়া কিছুটা কমে ৮০ থেকে ৮৫ হাজারের মধ্যে থাকলেও মাস দুয়েকের মধ্যে এই ভাড়া আরও বেড়ে যাবে।” এছাড়া ঢাকা থেকে কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, জেদ্দা, রিয়াদসহ বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াতে যাত্রীদের আগের চেয়ে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা বেশি গুনতে হচ্ছে।
এদিকে অভ্যন্তরীণ রুটে আগে যেখানে ৪ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকার মধ্যে ঢাকা থেকে রাজশাহী বা সৈয়দপুর যাওয়া যেতো, বর্তমানে সেখানে ন্যূনতম ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার নিচে টিকিট মিলছে না। শেষ মুহূর্তের টিকিটের ক্ষেত্রে এই দাম ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ রুটের নিয়মিত যাত্রী আব্দুর রহমান বলেন, “দেড়-দুই বছর আগেও যে রুটে সাড়ে ৩ থেকে ৪ হাজারে রাজশাহী গেছি, এখন সেখানে ৭ হাজার টাকার ওপরে লেগে যাচ্ছে। ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় আমরা সাধারণ যাত্রীরা চরম অসহায় বোধ করছি।”
অভ্যন্তরীণ রুটের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল এখন ঢাকা-কক্সবাজার রুট। পর্যটকদের জন্য এই রুটে যাতায়াত এখন বিলাসিতায় পরিণত হয়েছে। আগে সাড়ে ৫ হাজার টাকায় ওয়ান-ওয়ে টিকিট মিললেও এখন ৭ হাজার থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকার নিচে পাওয়া দুষ্কর। এমনকি কখনও কখনও শেষ মুহূর্তে ওয়ান-ওয়ে ভাড়া ১০ হাজার টাকাও ছাড়িয়ে যায়। বাড়তি ভাড়ার কারণে বাধ্য হয়ে অনেক যাত্রী এখন বিমান ছেড়ে সড়ক বা রেলপথের দিকে ঝুঁকছেন।
নেপথ্যে জেট ফুয়েলের মূল্যবৃদ্ধি ও ভূরাজনীতি
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে জেট ফুয়েলের (বিমানের জ্বালানি) মূল্যবৃদ্ধি, অপরদিকে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অশান্ত ও অস্থির পরিস্থিতি বিমান ভাড়ার এই লাগামহীন বৃদ্ধির প্রধান কারণ। বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস, নভোএয়ার ও এয়ার অ্যাস্ট্রা জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ রুটে জেট ফুয়েলের দাম যেভাবে বেড়েছে, তাতে তাদের টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। জ্বালানির দামের সঙ্গে ভাড়া সমন্বয় না করলে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।
উল্লেখ্য, গত ২৪ মার্চ অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে জেট ফুয়েলের দাম ১১২ টাকা ৪১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২০২ টাকা ২৯ পয়সা করা হয়েছিল। আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য প্রতি লিটার শূন্য দশমিক ৭৩৮৪ ডলার থেকে বাড়িয়ে ১ দশমিক ৩২১৬ ডলার করা হয়।
এর আগে ৭ এপ্রিল বিইআরসি সচিব মো. নজরুল ইসলাম সরকারের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে দাম আরও বাড়িয়ে অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার ২২৭ টাকা ০৮ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের ক্ষেত্রে ১ দশমিক ৪৮০৬ ডলার নির্ধারণ করা হয়।
সবশেষ ২৪ মে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে জেট ফুয়েলের দাম লিটারপ্রতি ৩৯ টাকা ৫৭ পয়সা কমানো হয়। নতুন মূল্যহার অনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটে প্রতি লিটার তেলের দাম ২০৫ টাকা ৪৫ পয়সা থেকে কমে ১৬৫ টাকা ৮৮ পয়সা এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে ১ দশমিক ৩৮৮৫ ডলার থেকে কমে ১ দশমিক ০৮২৩ ডলার (শুল্ক ও ভ্যাট ছাড়া) নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দেশের প্রধান বিমানবন্দরগুলো— ঢাকার হযরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের হযরত শাহ আমানত, সিলেটের ওসমানী, যশোর ও কক্সবাজার বিমানবন্দরসহ সব রুটের জন্য নিয়মিত বিরতিতে এই মূল্য সমন্বয় করে থাকে।
কর্তৃপক্ষ ও বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “তেলের
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
সবার জন্য নিরাপদ ও টেকসই আবাসন নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের হল অব ফেমে বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬-এর উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। এবারের বিশ্ব বসতি দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্ব বসতি দিবসের অর্থ শুধু একটি ঘর নয়, এর সঙ্গে নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, গণপরিবহন, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সরাসরি সম্পৃক্ত। সর্বোপরি মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজন একটি নিরাপদ পরিবেশ। তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের জন্য সব নাগরিকের নিরাপদ ও টেকসই বাসস্থান নিশ্চিত করা যতটা সহজ, বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে তা ততটা সহজ নয়। তবে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শহর, বন্দর ও নগরগুলোতে প্রতিনিয়ত মানুষের বসতি বাড়ছে। রাজধানী ঢাকা বর্তমানে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে রয়েছে। দেশের অন্যান্য বড় শহরের চিত্রও প্রায় একই। স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার তুলনায় শহরাঞ্চলে কয়েক গুণ বেশি মানুষের বসবাসের কারণে আবাসন ও নাগরিক সেবার ওপর চাপ বাড়ছে। এ বাস্তবতায় ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ ধারণাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শহরগুলোতে সবার জন্য নিরাপদ, মানসম্মত ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব ও সুপরিকল্পিত নগর গড়ে তোলা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিষয়গুলো বলা যতটা সহজ, দেশের বিদ্যমান বাস্তবতায় তা বাস্তবায়ন করা ততটাই কঠিন। তারপরও ‘সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’ নিশ্চিত করতে সরকার সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সবার জন্য বাসযোগ্য, সাশ্রয়ী, পরিবেশসম্মত, নিরাপদ এবং মৌলিক সেবা-পরিষেবা সংবলিত বাসস্থান নিশ্চিত করা নাগরিকদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। পরিকল্পিত, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর গড়ে তোলাকে সরকারের অন্যতম লক্ষ্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য বাসযোগ্য, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ আবাসনের ব্যবস্থাও সরকারের পরিকল্পনায় গুরুত্ব পাচ্ছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ ও আবাসন নিশ্চিত করা এবং সীমিত আয়ের মানুষের জন্য বাসস্থান সুবিধা প্রদান সরকারের অন্যতম প্রধান নির্বাচনী অঙ্গীকার। প্রধানমন্ত্রী জানান, পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য প্রতিটি সিটি করপোরেশন ও জেলায় মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে সিলেট, ময়মনসিংহ, বরিশাল, কুমিল্লা, রংপুর ও নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে অন্তর্ভুক্তিমূলক, নিরাপদ, সহনশীল ও টেকসই নগর গড়ে তোলার পাশাপাশি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ১১ নম্বর অভীষ্ট অর্জন সহজ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। শহরাঞ্চলে মানুষের চাপ কমাতে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ শহরগুলোর সঙ্গে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা আরও দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ করার পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলে নাগরিক সুবিধা বাড়ানো হলে শহরমুখী মানুষের চাপ কমানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক উন্নয়নের পরিবর্তে দেশের প্রতিটি অঞ্চলকে জাতীয় উন্নয়নের মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য কেন্দ্রীভূত নগরায়ণ নয়; বরং বিকেন্দ্রীভূত ও ভারসাম্যপূর্ণ নগর এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন। এ লক্ষ্যে সারা বাংলাদেশের জন্য স্থানিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং ঢাকার আশপাশে সেকেন্ডারি টাউনশিপ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি বাসযোগ্য আবাসন তৈরির ক্ষেত্রে সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশকে গুরুত্ব দিয়েই জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা শহরে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তোলা হচ্ছে। আবাসন সংকট মোকাবিলায় সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত অংশগ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শহরাঞ্চলের আবাসন সংকট শুধু সরকারের একার পক্ষে মোকাবিলা করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে আবাসন খাতের বেসরকারি উদ্যোক্তাসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের সমন্বিত অংশগ্রহণ কার্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নাগরিকদের মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে ব্লকভিত্তিক আবাসন উৎসাহিত করার পাশাপাশি এলাকাভিত্তিক পার্ক, খেলার মাঠ এবং নির্ধারিত জোনে শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকার পর্যায়ক্রমে গৃহীত সব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হলে ‘সবার জন্য নিরাপদ বাসস্থান’ দেশের নাগরিকদের সামনে একটি বাস্তবতায় পরিণত হবে, ইনশাআল্লাহ। পরে বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬-এর সব কার্যক্রমের সাফল্য কামনা করে দিবসটির কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। রোববার (৪ অক্টোবর) দিবাগত রাতে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানান ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম ও সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহ। বিবৃতিতে ছাত্রশিবিরের নেতারা অভিযোগ করেন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ভিডিও ধারণ ও সংবাদ সংগ্রহের সময় কয়েকটি গণমাধ্যমের সাংবাদিক হামলার শিকার হন। তাদের মধ্যে কয়েকজন আহত হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়। তারা বলেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর হামলা, আহত করা এবং হুমকি দেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক। তাদের ভাষ্য, গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে স্বাধীনভাবে তথ্য প্রকাশের পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ছাত্রশিবিরের নেতারা আরও অভিযোগ করেন, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড ক্যাম্পাসে সহিংসতা ও দখলদারিত্বের রাজনীতির পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ানো এবং শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা কোনোভাবেই স্বাভাবিক ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ ধরনের ঘটনা শিক্ষার পরিবেশ, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অতীতেও শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ছাত্ররাজনীতিতে সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতার প্রবণতা বাড়াচ্ছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। সংগঠনটির নেতারা হামলায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। একই সঙ্গে হামলায় আহত সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের পাশাপাশি হামলার সময় উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ সংশ্লিষ্টদেরও জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে ছাত্রশিবির।
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানোর ঘটনায় নিজের আহত হওয়ার বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন এক জুলাইযোদ্ধা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেছেন, ওই সময় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের নেতৃত্বাধীন একটি সশস্ত্র দল আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ও ককটেল নিক্ষেপ করে। এতে তার বাম পায়ে গুলি লাগে। রোববার (৪ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদের একক বেঞ্চে ওই সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। নারায়ণগঞ্জে ১০ জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে দশম সাক্ষী হিসেবে তিনি সাক্ষ্য দেন। নিরাপত্তার কারণে সাক্ষীর নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। ৩৯ বছর বয়সী ওই সাক্ষী পেশায় প্রাইভেটকার চালক এবং ‘খ’ শ্রেণির জুলাইযোদ্ধা বলে আদালতে জানানো হয়। জবানবন্দিতে সাক্ষী বলেন, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের উকিলপাড়া ২ নম্বর রেলগেট এলাকায় আন্দোলনে যোগ দেন। মিছিল নিয়ে চাষাঢ়ার দিকে যাওয়ার সময় নারায়ণগঞ্জ ক্লাব থেকে একটি দল বের হয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় বলে দাবি করেন তিনি। সাক্ষীর ভাষ্য অনুযায়ী, ওই দলের সদস্যদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল এবং তারা আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ও ককটেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে একটি গুলি তার বাম পায়ের হাঁটুর নিচে লাগে। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি মাটিতে পড়ে যান। পরে কয়েকজন আন্দোলনকারী তাকে নারায়ণগঞ্জ ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে গুলিবিদ্ধ স্থানে প্রাথমিকভাবে গজ বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর তাকে মণ্ডলপাড়া একতা হাসপাতালে নেওয়া হলে এক্স-রে করা হয়। পরে আবার ভিক্টোরিয়া হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান বলে জবানবন্দিতে জানান তিনি। সাক্ষীর অভিযোগ, ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর তাকে প্রায় ছয় ঘণ্টা চিকিৎসা ছাড়াই রাখা হয় এবং তিন দিন পর অস্ত্রোপচার করা হবে বলে জানানো হয়। পরে ডায়াবেটিসের কথা বিবেচনা করে স্বজনরা তাকে নারায়ণগঞ্জের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে অস্ত্রোপচার করা হলেও গুলি বের করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি। এরপর আরেকটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করে তার পা থেকে একটি গুলি বের করা হয়। সাক্ষী আরও জানান, চিকিৎসা শেষে বাড়িতে ফেরার পরও তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কায় পরবর্তীতে বাড়িতেই চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়। একজন চিকিৎসক নিয়মিত বাসায় এসে তার গুলিবিদ্ধ স্থানের ড্রেসিং করতেন। তার দাবি, ক্ষত শুকাতে প্রায় তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও তার বাম পা স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বর্তমানে তিনি খুঁড়িয়ে হাঁটেন। জবানবন্দির একপর্যায়ে সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে নিজের গুলিবিদ্ধ স্থান দেখান। পরে তিনি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিচার দাবি করেন। মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর জহিরুল আমিন। এ সময় প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদার, আবদুল্লাহ আল নোমান, মামুনুর রশিদসহ অন্য প্রসিকিউটররা উপস্থিত ছিলেন।