এম ইমরান
বিশ্লেষক ও গবেষক
২০২৬ সাল বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সন্ধিক্ষণকাল হিসেবে চিহ্নিত হতে যাচ্ছে। একদিকে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি, অন্যদিকে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে বড় ধরনের রদবদল ঘটার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতি ও সম্ভাবনার একটি বিস্তারিত বিশ্লেষণ এখানে তুলে ধরা হলো।
২০২৬: বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপট
২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতি একটি 'ক্রস-রোড' বা সন্ধিক্ষণে অবস্থান করবে। মাস্টারকার্ড ইকোনমিক ইনস্টিটিউটের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা ধীর হয়ে ৩.১ শতাংশে নামতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্যিক স্নায়ুযুদ্ধ এবং ইউরোপের কার্বন বর্ডার ট্যাক্স (CBAM) বাংলাদেশের মতো রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের ওপর নির্ভর করবে বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ। বিশ্বব্যাংকের মতে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.৮ শতাংশের আশেপাশে থাকতে পারে।
খাতওয়ারী ব্যবসায়িক পূর্বাভাস
তৈরি পোশাক খাত (Garments Sector)
পূর্বাভাস: মাঝারি ঝুঁকি, উচ্চ সম্ভাবনা ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি উত্তরণ শুরু করবে, যার ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়নে শুল্কমুক্ত সুবিধা (GSP) হারানোর একটি প্রচ্ছন্ন ঝুঁকি থাকবে। তবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) মতে, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ২০২৬ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
আবাসন খাত (Real Estate)
পূর্বাভাস: ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ২০২৬ সালে বাংলাদেশের আবাসন খাত ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে সম্প্রসারিত হবে। মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবাসন চাহিদা এবং প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এই খাতকে সচল রাখবে।
স্টিল ও সিমেন্ট শিল্প (Steel & Cement)
পূর্বাভাস: সতর্ক পুনরুদ্ধার ২০২৬ সালে মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ চালু থাকা এবং বেসরকারি নির্মাণ খাতের প্রসারের ফলে এই দুটি খাত ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবে।
পাট শিল্প (Jute)
পূর্বাভাস: পুনর্জাগরণ পাটের সোনালী দিন ফিরতে শুরু করবে ২০২৬ সালে, মূলত বৈশ্বিক প্লাস্টিক বিরোধী কঠোর আইনের কারণে।
২০২৬ সালে বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপটে আমূল পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। পূর্ববর্তী খাতের পাশাপাশি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যবসায়িক পূর্বাভাস ও বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।
ওষুধ শিল্প (Pharmaceuticals)
পূর্বাভাস: উচ্চ ঝুঁকি ও রূপান্তরের বছর ২০২৬ সালের নভেম্বরে এলডিসি (LDC) উত্তরণের ফলে ওষুধ শিল্পে বড় ধরনের পরিবর্তনের জোয়ার আসবে।
চামড়া ও পাদুকা শিল্প (Leather & Footwear)
পূর্বাভাস: রপ্তানি বৃদ্ধির প্রবল সম্ভাবনা ২০২৬ সাল নাগাদ চামড়া শিল্প বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হিসেবে সুসংহত হতে পারে।
খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প (Food Processing)
পূর্বাভাস: অভ্যন্তরীণ বাজারে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে 'রেডি-টু-ইট' এবং হিমায়িত খাদ্যের চাহিদা ২০২৬ সালে তুঙ্গে থাকবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি (Renewable Energy)
পূর্বাভাস: নতুন বিনিয়োগের হটস্পট সরকারের 'ইন্টিগ্রেটেড এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার মাস্টার প্ল্যান' অনুযায়ী ২০২৬ সালে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ কয়েক গুণ বাড়বে।
২০২৬: শেয়ার বাজারের টার্নঅ্যারাউন্ড ও মূল ফ্যাক্টরসমূহ
ডিএসইএক্স (DSEX) ইনডেক্স পূর্বাভাস
২০২৬ সালের নতুন ও উদীয়মান ব্যবসার আইডিয়া
প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে তাল মিলিয়ে কিছু অপ্রচলিত খাতে ২০২৬ সালে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি দেখা যাবে:
স্মার্ট এগ্রিকালচার ও অর্গানিক ফার্মিং: নিরাপদ খাদ্যের চাহিদা বাড়ায় হাই-টেক ফার্মিং ব্যবসায়িক সাফল্যের নতুন নাম হবে।
HealthTech ও টেলিমেডিসিন: প্রান্তিক পর্যায়ে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর স্টার্টআপগুলো লাভজনক হবে।
AI সলিউশন এজেন্সি: ছোট ও মাঝারি শিল্পের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের পরামর্শদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক চাহিদা থাকবে।
পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং: প্লাস্টিকের বিকল্প হিসেবে পাটের এবং কাগজের প্যাকেজিং শিল্পে বিনিয়োগ ২০২৬ সালে সেরা সিদ্ধান্ত হতে পারে।
সার্কুলার ইকোনমি সলিউশন: পোশাক কারখানার ঝুট (Waste) রিসাইকেল করে সুতা বা নতুন পণ্য তৈরির ব্যবসা অত্যন্ত লাভজনক হবে।
ইভি (EV) চার্জিং স্টেশন ও ইকো-ট্যুরিজম: বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে মহাসড়কগুলোতে চার্জিং স্টেশন ব্যবসায়িক সফলতা পাবে। পাশাপাশি সুন্দরবন বা পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট বা 'ইকো-ট্যুরিজম' বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
ফিনটেক ও মাইক্রো-ইনভেস্টমেন্ট অ্যাপ: সাধারণ মানুষের ক্ষুদ্র সঞ্চয়কে শেয়ার বাজার বা বন্ডে বিনিয়োগ করার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর বড় বাজার তৈরি হবে।
পূর্বাভাসে ব্যবহৃত অ্যালগরিদম ও পদ্ধতি
এই ফিচারটি তৈরির ক্ষেত্রে বৈশ্বিক আর্থিক পূর্বাভাসে বহুল ব্যবহৃত নিম্নলিখিত আধুনিক অ্যালগরিদম ও মডেলগুলোর ডেটা বিশ্লেষণ করা হয়েছে:
ফিন্যান্সিয়াল অ্যালগরিদম ও পূর্বাভাস মডেল (শেয়ার বাজারের)
২০২৬ সালের শেয়ার বাজারের এই পূর্বাভাস তৈরিতে বেশ কিছু আধুনিক প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদম ব্যবহৃত হয়েছে:
উপসংহার
২০২৬ সাল হবে টিকে থাকার এবং পরিবর্তনের বছর। যুদ্ধবিগ্রহ ও বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজার এবং ডিজিটাল রূপান্তর নতুন সুযোগ তৈরি করবে। যারা প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় কাঁচামালে গুরুত্ব দেবে, ২০২৬ সালে তারাই হবে ব্যবসার সফল কারিগর।
তথ্যসূত্র (References):
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।