মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের পথে এবং বন্দরে ভিড়ছে ১০টি জাহাজ। হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বাড়ার আগেই পারস্য উপসাগর ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে রওনা হওয়া এসব জাহাজ একে একে বন্দরে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
রোববার (৮ মার্চ) ৮টি জাহাজের তথ্য নিশ্চিত করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম। চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, এসব জাহাজে মোট প্রায় পৌনে ৪ লাখ টন জ্বালানি পণ্য রয়েছে। এর মধ্যে চারটি জাহাজে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি), দুটি জাহাজে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি), এবং বাকি চারটি জাহাজে ডিজেল, ফার্নেস তেল ও কনডেনসেটসহ বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি পণ্য রয়েছে।
কাতার থেকে প্রায় ১ লাখ ২৬ হাজার টন এলএনজি নিয়ে ‘আল জোর’ ও ‘আল জাসাসিয়া’ নামে দুটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এছাড়া ‘লুসাইল’ ও ‘আল গালায়েল’ নামে আরও দুটি এলএনজিবাহী জাহাজ যথাক্রমে সোমবার ও বুধবার বন্দরের জলসীমায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মোট চারটি জাহাজে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। এসব জাহাজ কাতারের রাস লাফান বন্দর থেকে সংঘাত শুরুর দুই থেকে সাত দিন আগে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সম্ভাব্য সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় সরকার খোলাবাজার থেকে তুলনামূলক বেশি দামে দুটি এলএনজি জাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা এখনও বন্দরে পৌঁছায়নি।
বাংলাদেশে এলপিজির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আমদানি করা হয়। সংঘাত শুরুর আগেই ওমানের সোহার বন্দর থেকে ২২ হাজার ১৭২ টন এলপিজি নিয়ে ‘সেভান’ নামে একটি জাহাজ রোববার চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এর আগে একই বন্দর থেকে ‘জি ওয়াইএমএম’ নামে আরেকটি এলপিজিবাহী জাহাজ ১৯ হাজার ৩১৬ টন এলপিজি নিয়ে বন্দরে পৌঁছেছে। দুই জাহাজে মোট ৪১ হাজার ৪৮৮ টন এলপিজি রয়েছে।
এলপিজির মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার টন এনেছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি, বাকি এলপিজি এনেছে জেএমআই ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্যাস লিমিটেড।
এছাড়া দেশের ডিজেল মজুত কমতে থাকায় ৩১ হাজার টন ডিজেল নিয়ে ‘এসপিটি থেমিস’ নামের একটি জাহাজ বন্দরের পথে রয়েছে। জাহাজটি আগামী ১২ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়া থেকে ১৪ হাজার টন কনডেনসেট নিয়ে ‘হুয়া সুন’ নামের একটি জাহাজ ইতোমধ্যে বন্দরে পৌঁছেছে। এই কনডেনসেট থেকে ডিজেল, অকটেন, পেট্রল ও এলপিজি উৎপাদন করা হয়। পাশাপাশি সিঙ্গাপুর থেকে ৪০ হাজার টন ফার্নেস তেল নিয়ে আরও দুটি জাহাজ বন্দরে এসেছে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সারাজীবন আয়ের অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করবেন—এ নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় থাকেন। কেউ বিনিয়োগ করেন স্থায়ী সম্পদে, কেউ সঞ্চয়পত্র বা নানা ব্যবসায়। তবে মধ্যবিত্তদের সঞ্চয়ের অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত মাধ্যম প্রাইজবন্ড। সমাজের সব শ্রেণির মানুষের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ‘বাংলাদেশ প্রাইজবন্ড’ নামে এই বন্ড চালু করে। এটি যেকোনো সময় কেনা ও ভাঙানো যায়। এর ১২৩তম ড্র অনুষ্ঠিত হবে আজ ৩০ এপ্রিল। এতে প্রথম পুরস্কার বিজয়ী পাবেন ৬ লাখ টাকা। এ ছাড়া দ্বিতীয় পুরস্কার হিসেবে প্রতিজন পাবেন ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা। তৃতীয় পুরস্কার এক লাখ টাকা, চতুর্থ পুরস্কার ৫০ হাজার টাকা এবং পঞ্চম পুরস্কার হিসেবে প্রতিজন পাবেন ১০ হাজার টাকা করে। প্রাইজবন্ডের ক্ষেত্রে ঘোষিত নম্বরের প্রতিটি সিরিজ একই পুরস্কারের জন্য প্রযোজ্য হয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট নম্বরের সব বন্ডই পুরস্কারের আওতায় আসে। ড্রয়ে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা অনুসরণ করা হয়। ড্রয়ের তারিখ থেকে ৬০ দিন আগে পর্যন্ত বিক্রি হওয়া প্রাইজবন্ডগুলোই এ ড্রয়ের জন্য বিবেচিত হয়। এখানে বিক্রির তারিখ গণনায় ড্রয়ের দিনটি অন্তর্ভুক্ত করা হয় না। আয়কর আইন ২০২৩ অনুযায়ী প্রাইজবন্ডে প্রাপ্ত পুরস্কারের ওপর ২০ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে নেওয়া হয়। প্রতিবছর নির্ধারিত চারটি তারিখে—৩১ জানুয়ারি, ৩০ এপ্রিল, ৩১ জুলাই ও ৩১ অক্টোবর প্রাইজবন্ডের ড্র অনুষ্ঠিত হয়। তবে এসব তারিখ সাপ্তাহিক ছুটি বা সরকারি ছুটির দিনে পড়লে পরবর্তী কার্যদিবসে ড্র অনুষ্ঠিত হয়।
দেশের পরিবহন খাত থেকে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। মোটরসাইকেল, থ্রি-হুইলার, বাস-মিনিবাস, ট্রাক-কাভার্ড ভ্যান ও প্রাইভেট কার—এই পাঁচটি প্রধান খাত থেকে বর্তমানে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব আয় তিন হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা। কিন্তু বিদ্যমান কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর করা গেলে এই আয় বেড়ে দাঁড়াতে পারে প্রায় সাত হাজার ৫০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নজরদারির ঘাটতি এবং অনিয়মের কারণে বছরে তিন হাজার ৫১৭ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে এমন তথ্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, যানবাহন নিবন্ধন, ফিটনেস ফি, রুট পারমিট ফি, আমদানি শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক ও বার্ষিক কর আদায় সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস হতে পারে। অথচ বাস্তবে তা হচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আইন ও নীতিমালা যথাযথভাবে কার্যকর করা গেলে এই খাত থেকেই রাজস্ব আয় প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব। খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই ঘাটতির মূল কারণ ফিটনেসবিহীন, নিবন্ধনহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনের অবাধ চলাচল।পাশাপাশি রুট পারমিট ছাড়া যান চলাচল এবং কর ফাঁকিও বড় ভূমিকা রাখছে। খাতভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, মোটরসাইকেল খাত থেকেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আসে। তবে এখানেও বড় ঘাটতি রয়েছে। বর্তমানে এই খাত থেকে বছরে প্রায় এক হাজার ৩৬০ কোটি টাকা আদায় হলেও সম্ভাব্য আয় দুই হাজার এক কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ শুধু এই খাত থেকেই প্রায় ৬৪১ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিসাবে, প্রায় চার লাখ মোটরসাইকেল ফিটনেসবিহীন বা নিবন্ধন নবায়ন ছাড়া সড়কে চলছে। সিএনজি ও এলপিজিচালিত থ্রি-হুইলার থেকে বর্তমানে প্রায় ৩৬২ কোটি টাকা আদায় হলেও সম্ভাব্য আয় প্রায় ৮৮০ কোটি টাকা। এ খাতে সরকারের রাজস্ব ক্ষতি প্রায় ৫১৭ কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক খাতে পরিস্থিতি আরো উদ্বেগজনক। এখানে বর্তমানে রাজস্ব আদায় মাত্র ১৭.৫ কোটি টাকা, যেখানে সম্ভাব্য আয় ৯০৫ কোটি টাকার বেশি। অর্থাৎ এই একটি খাত থেকেই প্রায় ৮৮৮ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। দেশে প্রায় চার থেকে পাঁচ লাখ ইজি বাইক অনিবন্ধিত অবস্থায় চলাচল করছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধারণা। বাস ও মিনিবাস খাতে রুট পারমিট ও ফিটনেস জটিলতার কারণে সরকারের বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। বর্তমানে এই খাত থেকে প্রায় ১৯৮ কোটি টাকা আদায় হলেও সম্ভাব্য আয় ৬৭০ কোটি টাকা। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান খাতে বর্তমান রাজস্ব আয় ২৭৫ কোটি টাকা, অথচ বিদ্যমান পরিবহন আইন ও অন্যান্য নীতি যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এ খাতের আয় ৬৯৭ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে। প্রাইভেট কার সেগমেন্টেও কর ফাঁকি ও সময়মতো ফিটনেস নবায়নের অভাবে প্রায় ৫৬০ কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই ক্ষতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশ এবং সড়ক নিরাপত্তার জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য মতে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতিবছর ৩১ হাজার ৫৭৮ জনের মৃত্যু ঘটে, যদিও সরকারি হিসাবে (পুলিশ রেকর্ড অনুযায়ী) ২০২৪ ও ২০২২ সালে এ সংখ্যা যথাক্রমে পাঁচ হাজার ৩৮০ জন ও চার হাজার ৬৩৬ জন মাত্র। সড়কে অননুমোদিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের চলাচল এ ধরনের সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ বলে সড়ক নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন। বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর আলোকে প্রণীত বিভিন্ন সরকারি ও নীতিমালায় বাসের ইকোনমিক লাইফ ২০ বছর, ট্রাকের ২৫ বছর এবং সিএনজি/এলপিজি থ্রি-হুইলারের ক্ষেত্রে ১৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু মোটরসাইকেলের জন্য নির্দিষ্ট ইকোনমিক লাইফ না থাকেলও ফিটনেস সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক। বিদ্যমান সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২ ও মোটরযান স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬-এ ইকোনমিক লাইফ বা মেয়াদোত্তীর্ণ এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ির ডিসপোসাল বা স্ক্র্যাপিংয়ের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অথচ বিআরটিএর তথ্য মতে, সড়কে প্রায় পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার রেজিস্টার্ড যানবাহনের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেই (এপ্রিল ২০২৩), যার সংখ্যা প্রতিবছর প্রায় ২০-৩০ শতাংশ হারে বেড়ে চলছে। এসব যানবাহন, বিশেষত মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন পুরনো বাস ও ট্রাক, ঢাকার সামগ্রিক বায়ুদূষণের প্রায় ১০-১৫ শতাংশ দূষণের জন্য দায়ী। বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়কে নিবন্ধনহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধ চলাচল এই ভয়াবহ পরিবেশদূষণ ও সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ, যা রাজধানীসহ দেশের সার্বিক জননিরাপত্তাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। বাংলাদেশে অটোমোবাইল ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একাধিক নেতার ভাষ্য, পরিবহন খাতটি শুধু চলাচলের মাধ্যম নয়, এটি সরকারের জন্য একটি বড় রাজস্ব উৎস হতে পারত। কিন্তু আইন ও নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও সেসবের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। অনিবন্ধিত ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এই ক্ষতি আরো বাড়বে। তাঁরা বলেন, দেশে এখন যানবাহন উৎপাদন ও সংযোজন শিল্প ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে। এই খাতকে সুরক্ষা দিতে হলে একদিকে যেমন আমদানিনীতি যৌক্তিক করতে হবে, অন্যদিকে যানবাহনের নিবন্ধন ও ফিটনেস ব্যবস্থাকে শতভাগ ডিজিটাল ও বাধ্যতামূলক করার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নীতিমালা ও আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এতে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি শিল্প খাতও লাভবান হবে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন খাতের এক নেতা বলেন, ‘বাস্তবতা হলো—ফিটনেস ও কর পরিশোধের প্রক্রিয়া সহজ হলেও প্রয়োগ দুর্বল থাকায় অনেকে সুযোগ নিচ্ছেন। শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে পরিস্থিতি বদলাবে না।’ অন্যদিকে পরিবহন খাত বিশ্লেষকরা মনে করেন, সমস্যার মূল জায়গা তথ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। নিবন্ধন, ফিটনেস, কর ও রুট পারমিট—এই চারটি তথ্যভাণ্ডার এখনো পুরোপুরি সমন্বিত নয়। ফলে অনেক যানবাহন নজরদারির বাইরে থেকে যাচ্ছে। একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, ‘যদি একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটা বেইস তৈরি করা যায়, যেখানে একটি যানবাহনের সব তথ্য একসঙ্গে থাকবে, তাহলে কর ফাঁকি ও অনিয়ম অনেকটাই কমে যাবে।’ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে ফিটনেস ও নিবন্ধন নবায়ন বাধ্যতামূলক করা, ইজি বাইকসহ অনিবন্ধিত যানবাহন আইনের আওতায় আনা, রুট পারমিট ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা এবং মোবাইল কোর্ট ও নজরদারি জোরদার করা। পাশাপাশি স্ক্র্যাপনীতি কার্যকর করে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে সরিয়ে ফেলাও জরুরি। ভারতে ২০২১ সালে প্রবর্তিত ভলান্টারি ভেহিকল-ফ্লিট মর্ডানাইজেশন প্রোগ্রাম অনুযায়ী ব্যক্তিগত গাড়ির ক্ষেত্রে ২০ বছর এবং বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে ১৫ বছরের বেশি বয়সী যানবাহনের জন্য ফিটনেস টেস্টিং বাধ্যতামূলক করা হয়। পরীক্ষায় অনুত্তীর্ণ যানবাহনগুলো এন্ড-অফ-লাইফ ভেহিকল হিসেবে ঘোষণা করে স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য রেজিস্টার্ড ভেহিকল স্ক্র্যাপিং ফ্যাসিলিটিজে জমা দিয়ে ‘সার্টিফিকেট অব ডিপোজিট’ গ্রহণ করার বিধান রাখা হয়। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারতে ২১টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ১১৭টি কার্যকর আরভিএসএফের মাধ্যমে প্রায় ৩.৯৪ লাখ যানবাহন স্ক্র্যাপ করা হয়েছে (১.৬৫ লাখ সরকারি, ২.৩৯ লাখ বেসরকারি) এবং ২০২৬ সালের মধ্যে বার্ষিক পাঁচ লাখের বেশি যানবাহন স্ক্র্যাপ করার লক্ষ্য রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে পরিবহন খাতই হতে পারে সরকারের অন্যতম বড় রাজস্ব উৎস। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এই সম্ভাবনার বড় অংশই অধরা থেকে যাচ্ছে। সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান আজ বলেছেন, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যবসায়ী সমাজের সাফল্যের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। বেসরকারি খাতের প্রসারে আরো সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি। এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, ‘চলমান বাজেট সম্পর্কিত পদক্ষেপগুলো স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে শুল্ক ও কর যৌক্তিকীকরণের ওপর গুরুত্ব দেবে।’ রাজধানীর একটি হোটেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং এফবিসিসিআই-এর মধ্যে অনুষ্ঠিত পরামর্শক কমিটির ৪৬তম সভায় এসব কথা বলেন এনবিআর প্রধান। ব্যবসা সহজীকরণের গুরুত্ব তুলে ধরে আবদুর রহমান খান বলেন, অতিরিক্ত বিধিনিষেধ এখনো ব্যবসায়ীদের জন্য একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ। তিনি জানান, ব্যবসা পরিচালনায় বাধা সৃষ্টিকারী নির্দিষ্ট রেগুলেটরি বাধাগুলো চিহ্নিত ও অপসারণের জন্য কাজ করছে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ। তিনি বলেন, ‘নিয়মকানুন যাতে কোনোভাবেই প্রতিবন্ধকতা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করতে আমরা প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে সমাধান করব।’ এনবিআর প্রধান বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য রাজস্ব প্রতিপালন প্রক্রিয়া সহজ করার ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, যারা নতুনভাবে বাজারে প্রবেশ করছেন, তাদের জন্য কর-প্রক্রিয়া যেন বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়। তিনি আরো বলেন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করাও জরুরি। ব্যবসায়ী সমাজের প্রস্তাব ও মতামত বিবেচনায় নিয়ে কার্যকর নীতিগত সমাধানে পৌঁছাতে এনবিআর সতর্কতার সঙ্গে কাজ করবে। টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে রাজস্ব কর্তৃপক্ষ ও বেসরকারি খাতের মধ্যে আরো শক্তিশালী সহযোগিতার আহ্বান জানান এনবিআর চেয়ারম্যান।