দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে মস্কো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের প্রধান সমর্থক হিসেবে কাজ করেছে। জাতিসংঘের প্রস্তাব থেকে তেহরানকে আড়াল করা, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার চেষ্টা এবং ইরানকে বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রির মাধ্যমে রাশিয়া ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি হত্যাকাণ্ডকে “মানবিক নীতি ও আন্তর্জাতিক আইনের সব মানদণ্ডের নির্মম লঙ্ঘন” বলে আখ্যা দেন।
পুতিনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও একসময়কার উত্তরসূরি দিমিত্রি মেদভেদেভ বিদ্রূপ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-কে “নিজের আসল চেহারা দেখানো শান্তিরক্ষক” বলে মন্তব্য করেন।
রাশিয়ার পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ স্টেট ডুমার চেয়ারম্যান ভিয়াচেস্লাভ ভলোদিন এই যুদ্ধকে ১৯৯০-এর দশকে রাশিয়াকে অস্থিতিশীল করার পশ্চিমাদের প্রচেষ্টার সঙ্গে তুলনা করেন। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা “সরাসরি আগ্রাসনে পরিণত হয়েছে।”
তেল রাজস্বে তাৎক্ষণিক লাভ
মস্কোর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক লাভ হলো তেল আয়ে বৃদ্ধি।
ইউক্রেন যুদ্ধের জেরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে বড় ছাড় দিয়ে বিক্রির ফলে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে রাশিয়ার ইউরালস ক্রুডের দাম নেমে ব্যারেলপ্রতি ৪০ ডলারে পৌঁছায়।
কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সোমবার ১৩ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮২ ডলারে ওঠায় ইউরালসের দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৫৭ ডলারে।
ইরানের রপ্তানি স্থগিত হওয়ায় ভারী অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাত করার জন্য নকশা করা রিফাইনারিগুলোকে রাশিয়ার ইউরালস তেলের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
কিয়েভভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইগর টাইশকেভিচ বলেন, রিফাইনারির প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া বদলাতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল ব্যয় লাগে। ফলে রুশ তেলের চাহিদা বাড়বে এবং ছাড়ের হারও পরিবর্তিত হবে।
তেলের দাম আরও বাড়লে ক্রেমলিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আংশিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে সরবরাহ বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে। এতে নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমতে পারে।
মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা?
দীর্ঘমেয়াদে দ্বিতীয় সম্ভাব্য লাভ হতে পারে—তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে রাশিয়ার ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা।
২০২৫ সালের মার্চে পুতিন ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় মধ্যস্থতার প্রস্তাব দেন এবং পরবর্তীতেও একই প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন। তবে ওয়াশিংটন তা গ্রহণ করেনি।
ইউক্রেন ও বৈশ্বিক প্রভাব
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন মনোযোগ সরে যাওয়ায় ইউক্রেন প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতিতে পড়তে পারে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র রুশ ব্যালিস্টিক হামলা প্রতিহত করতে ব্যবহৃত হয় এবং বর্তমানে সেগুলোর কিছু অংশ মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হচ্ছে।
রাশিয়া একদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না, অন্যদিকে তেহরানও ক্রেমলিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিত্র—ফলে পুতিনের জন্য কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষক রুসলান সুলেইমানভ বলেন, খামেনি হত্যাকাণ্ডকে পশ্চিমাদের ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে রুশ প্রচারণা সুবিধা নিতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি পুতিনের ভাবমূর্তিতে আঘাত, কারণ এতে বোঝা যায় তিনি মিত্রদের কার্যকরভাবে রক্ষা করতে পারছেন না।
লন্ডনভিত্তিক মধ্য এশিয়া বিশেষজ্ঞ আলিশের ইলখামভ বলেন, ইরান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক আইনের কর্তৃত্ব আরও দুর্বল করেছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এতদিন যে আন্তর্জাতিক আইনের যুক্তি তুলে ধরা হতো, তা এখন আরও প্রশ্নের মুখে।
সব মিলিয়ে, ইরান যুদ্ধ রাশিয়ার জন্য তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধা ও কৌশলগত সুযোগ তৈরি করলেও, দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ক্ষেত্রে জটিল চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।