জার শাসনামলে পারস্যে রাশিয়ার দূত ছিলেন আলেক্সান্ডার গ্রিবোয়েদভ, যাকে আজও একজন আদর্শ রুশ কূটনীতিক হিসেবে দেখা হয়।
এখন থেকে ১৯৭ বছর আগে তেহরানে গুলিতে মৃত্যু হয় তার। তার মরদেহ বিকৃত করা হয় এবং আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেওয়া হয়।
রুশ অভিজাত শ্রেণির কাছে ৩৪ বছর বয়সী এই রাষ্ট্রদূত ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার এক ব্যক্তিত্ব।
অও ফ্রম উয়েট’ নামে তিনি একটা জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক নাটক রচনা করেছিলেন, যা এখনো রাশিয়ার পাঠ্যপুস্তকের অংশ।
বহু ভাষায় তার দখল ছিল। নির্ভীকে সেনা ও বিচক্ষণ কূটনীতিক হিসেবেও সুনাম ছিল তার।
গ্রিবোয়েদভ একবার ইরানের শাহ ফাতহ-আলির একটি দাবি প্রত্যাখান করার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। ওই সময় রাশিয়ার আশ্রয়ে থাকা আর্মেনীয়দের হস্তান্তরের দাবি তুলেছিল ইরানের তৎকালীন শাসক গোষ্ঠী।
গ্রিবোয়েদভের এই প্রত্যাখ্যানের কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে হাজার হাজার উত্তেজিত পারসিয়ান ১৮২৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রুশ দূতাবাসে হামলা চালায়। এতে রাষ্ট্রদূতসহ বহু কূটনীতিক এবং অশ্বারোহী সেনার প্রাণ যায়।
তবে রাশিয়াবিরোধী এই দাঙ্গার শিকড় ছিল অনেক গভীরে।
‘রক্তাক্ত হীরা’
১৮২৯ সালের জানুয়ারিতে গ্রিবোয়েদভকে তেহরান থেকে ২ কোটি রুবল (বর্তমান মূল্যে প্রায় ২০০০ কোটি ডলার) আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
১৮২৬ থেকে ১৮২৮ সাল পর্যন্ত চলা রুশ-পারস্য যুদ্ধে পরাজয়ের পর ইরানের ওপর এই ক্ষতিপূরণ চাপানো হয়েছিল, যা রাশিয়ার নতুন ক্ষমতার প্রতীক হয়ে ওঠে।
গ্রিবোয়েদভ বুঝতে পেরেছিলেন, এই বিশাল জরিমানা পারস্যের অর্থনীতিতে বড় রকমের প্রভাব ফেলবে।
তিনি একে ‘বর্ণনাতীত দুর্দশা’ ডেকে আনার সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেন।
তার ভাষায়, এই ক্ষতিপূরণ পারস্যকে প্রায় নিঃস্ব করে দিয়েছিল। এই ক্ষতিপূরণ মেটাতে গিয়ে শাহ’র পরিবারকে সোনার ঝাড়বাতি এবং পোশাকের মূল্যবান পাথরের বোতামও দিয়ে দিতে হয়েছিল।
জারশাসিত রাশিয়া তখন বর্তমান আজারবাইজান, আর্মেনিয়া ও জর্জিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে নেয়। দাগেস্তানও দখল হয় তখন, যা এখনও রাশিয়ার সবচেয়ে ‘বহুজাতিক’ প্রদেশ হিসেবে পরিচিত।
দূতাবাসের হত্যাকাণ্ড এবং গ্রিবোয়েদভের মৃত্যুর পর পারস্যের লোকজন রাশিয়ার প্রতিশোধের আশঙ্কা করছিল। এই আশঙ্কা থেকে ১৮২৯ সালের অগাস্টে শাহ’র নাতিকে পাঠানো হয় সেন্ট পিটার্সবার্গে।
ওই সময় সেখানকার রাজপ্রাসাদে গিয়ে রাশিয়ার সম্রাট প্রথম নিকোলাসের হাতে উপহার হিসেবে ‘পারস্য ডায়মন্ড’ তুলে দেন তিনি।
৮৯ ক্যারেট ওজনের হলদেটে অষ্টভুজাকৃতির হীরাটি একসময় ভারতের মুঘল সম্রাটদের সম্পদ ছিল। হীরাটি এখনও মস্কোতে সংরক্ষিত আছে।
মস্কোর কেন্দ্রস্থলে ব্রোঞ্জের মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রিবোয়েদভ আজও রুশ কূটনীতিকদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধার প্রতীক।
২০২০ সালের এক বক্তৃতায় রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ তাকে স্মরণ করে বলেন, গ্রিবোয়েদভ ছিলেন আমাদের মহান পূর্বসূরিদের একজন, যিনি মাতৃভূমির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলে।
কিয়েভভিত্তিক রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পেন্টা সেন্টারের প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কোর ভাষায়, “রাশিয়া ও ইরানের দ্বন্দ্বের ইতিহাসে গ্রিবোয়েদভের মৃত্যু সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা।
কোসাক থেকে শাহ
উনবিংশ শতকের বাকি সময়জুড়ে দক্ষিণ ককেশাস ও মধ্য এশিয়ায় পারস্যের উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের ভূখণ্ড দখল করতে থাকে রাশিয়া।
তারা পারস্যকে এশিয়ার দুর্বল মিত্র রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে শুরু করে। এছাড়া এশিয়া নিয়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে চলা ‘গ্রেট গেইমে’ তারা এ অঞ্চলকে একটা গুটিতে পরিণত করে।
তবে পারস্যে ব্রিটিশ প্রভাব মোকাবেলার লক্ষ্যে দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৭৯ সালে রুশ-পারস্য ‘কোসাক ব্রিগেড’ গঠনে সহায়তা করেন।
এই সামরিক ইউনিট গড়ে ওঠে কোসাকদের আদলে, যারা রুশ সাম্রাজ্যের বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
এখনকার মধ্য ইউক্রেইন অঞ্চল থেকে তাদের উৎপত্তি। তারা অশ্বারোহী যুদ্ধকৌশল ও আগ্নেয়াস্ত্রের সমন্বয়ে ভয়ংকর এক সামরিক শক্তিতে রূপ নেয়।
পারস্যে কয়েক বছরের মধ্যেই সবচেয়ে শক্তিশালী ও ভীতিকর সামরিক বাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয় এই ব্রিগেড। এটা অনেকটা রোমান সাম্রাজ্যের প্রেটোরিয়ান গার্ড বা তুর্কি জেনিসারিদের মতো হয়ে ওঠে, যারা সম্রাট বা সুলতানদের ক্ষমতায় বসানো বা সরানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখত।
এই বাহিনীই একসময় শাহ রেজা পাহলভির উত্থানে সহায়তা করেছিল।
১৯২০ সালে নবগঠিত সোভিয়েত সরকার উত্তর পারস্যকে ‘গিলান সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র’ নামে কমিউনিস্ট অঞ্চলে রূপান্তরের চেষ্টা করে। কিন্তু ১৯২১ সালের শেষ দিকে রেজা খানের বাহিনীর আক্রমণে সেই প্রজাতন্ত্র ভেঙে পড়ে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সোভিয়েত নেতা স্টালিন ইরানের কাছে একচেটিয়া তেল সুবিধা দাবি করেন। না দিলে ইরানের ভেতরে কুর্দিস্তানকে স্বাধীন রাষ্ট্রে রূপ দেওয়ার হুমকি দেন তিনি।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভি তেলসংক্রান্ত সংকট কাটিয়ে ওঠা এবং কুর্দিস্তানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর মস্কো থেকে দূরত্ব বজায় রাখেন। অন্যদিকে পশ্চিমাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন তিনি।
এমনকি ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে পাহলভি রাজবংশের পতনের পরও ইরানের নতুন ধর্মীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সোভিয়েত রাশিয়াকে প্রায়ই ‘ছোট শয়তান’ বলে আখ্যায়িত করত, যে শব্দটি সাধারণত ইসরায়েলের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো।
তবে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
কৌশলগত মিত্র?
১৯৯০-এর দশকে এসে ইরানের মধ্যে আর রুশ দখলদারত্ব নিয়ে ভয়ের কারণ ছিল না। বরং রাশিয়া তখন মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব ধরে রাখার ক্ষেত্রে ইরানকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখা শুরু করে।
মস্কো ওই সময় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে আনা অনেক নিষেধাজ্ঞার প্রস্তাব আটকে দেয়।
অন্যদিকে তেহরান রাশিয়ার অস্ত্র, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ছোট অস্ত্র কেনায় কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে।
১৯৯৭ সালে সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র তাজিকিস্তানে গৃহযুদ্ধের অবসানে ১৯৯৭ সালে যে শান্তি চুক্তি হয়, তাতে মস্কো ও তেহরানের ভূমিকা ছিল। তাজিকিস্তানের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক সম্পর্কও আছে।
সম্প্রতি রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটম জার্মান নকশায় বুশেহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ সম্পন্ন করেছে। দক্ষিণ ইরানে আরো চারটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গেল বছর ২৫ বিলিয়ন ডলারের একটি চুক্তিও করেছে উভয় পক্ষ।
ইরান বর্তমানে যে পরিমাণ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদন করে, তার প্রায় ৬ শতাংশ উত্তোলন করে দেয় রাশিয়ার জ্বালানি কোম্পানিগুলো।
এছাড়া রাশিয়ার তেল ভারত মহাসাগর দিয়ে পরিবহনের জন্য উত্তর-দক্ষিণ অঞ্চলে মস্কো একটি করিডোরও বানিয়েছে।
২০২২ সালে ইরানকে মহাকাশ কেন্দ্র ব্যবহার করে খাইয়াম নামে ইরানের প্রধান অপটিক্যাল ইমেজিং স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অনুমতি দেয় রাশিয়া।
এর ক্যামেরার যে ক্ষমতা, তা দিয়ে সহজেই মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরে যুদ্ধজাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক রাশিয়া-ইরান সম্পর্ককে ‘স্বার্থের দেনাপাওনা’ হিসেবে দেখেন বলে আল জাজিরা বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
রাশিয়া-ইরান সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ নিকিতা স্মাগিন আল জাজিরাকে বলেন, “তাদের কাছাকাছি আসার মূল কারণটা একেবারেই বাস্তববাদী— দুই দেশই আন্তর্জাতিকভাবে কিছুটা বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রয়েছে।
কিন্তু তারা একে অপরকে সত্যিকারার্থে পছন্দ করে না।
স্মাগিন আরও বলেন, “ঐতিহাসিকভাবে ইরানিদের কাছে রাশিয়াকে নিয়ে ইতিবাচক স্মৃতি নেই বললেই চলে। ইরানে রক্ষণশীল গণমাধ্যমও বলে— রাশিয়াকে বিশ্বাস করা যায় না।
তবে ইউক্রেন, মধ্য এশিয়া, আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো তাদের পূর্ববর্তী প্রভাব বলয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির প্রতি দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস এই দেশ দুটিকে এক করেছে।
কিয়েভভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পেন্টা সেন্টারের ফেসেঙ্কো বলেন: তাদেরকে এক করেছে একটি অভিন্ন শত্রু, কিংবা বলা যায় অভিন্ন এক ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
আদর্শিক ও ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমেরিকার বিরুদ্ধে এই বন্ধুত্বের মূল কারণ সেটাই।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এই সম্পর্ককে তুলে ধরেছেন ‘কৌশলগত অগ্রাধিকার’ হিসেবে।
২০২৪ সালে ব্রিকস সম্মেলনে পুতিন বলেন, আমাদের সম্পর্ক প্রকৃতপক্ষে মিত্রদের মতোই।
পশ্চিমা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব মোকাবেলার লক্ষ্যে পুতিন ২০২৩ সালে ব্রিকসে ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন।
পরের বছরের শুরুতে ইরান এই জোটে যোগ দেয়। এরপর থেকে এর নাম হয় ‘ব্রিকস প্লাস’।
রুশ নেতা তেহরানকে পশ্চিম এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখেন, যা মস্কোকে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করতে পারে।
একইসঙ্গে এটি রাশিয়াকে ‘মুসলমানবান্ধব’ রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি তৈরিতেও ভূমিকা রাখে। যদিও নিজ দেশের মুসলমান জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ক্রেমলিনের সম্পর্কটা বেশ জটিল।
এই জোটের বেশ জোরালো ভূমিকা দেখা যায় সম্ভবত ২০১৫ সালে। ওই বছর মস্কো ও তেহরান মিলে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পতন ঠেকাতে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রুশ সেনারাই প্রথম বিদেশি, যারা ইরানের মাটিতে সামরিক কার্যক্রম চালিয়েছে।
গত এক দশকে চীনও ইরান ও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে তাদের সঙ্গে অবস্থান নিয়েছে।
আজারবাইজানের বাকুভিত্তিক ‘মিনভাল পলিটিকা’ সাময়িকীর প্রধান সম্পাদক এমিল মুস্তাফায়েভ বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাশিয়া, ইরান ও চীনের মধ্যে স্বার্থের একটি স্থিতিশীল কাঠামো তৈরি হয়েছে।
আল জাজিরাকে তিনি বলেন, এটি প্রচলিত অর্থে আনুষ্ঠানিক কোনো জোট নয়, বরং এটি পশ্চিমা চাপের প্রতি অভিন্ন বিরোধিতা। এই সম্পর্ককে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর কৌশলগত আকাঙ্ক্ষা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
স্মাগিনের মতে, এই ত্রিভুজ সম্পর্কে চীন সবচেয়ে শক্তিশালী এবং এখন পর্যন্ত সবচেয়ে সতর্ক পক্ষ।
চীন ইরানকে রক্ষা করতে তেমন তাড়াহুড়া করেনি। রাশিয়া তুলনামূলকভাবে বেশি সক্রিয়, কিন্তু চীনের মতো এত সম্পদ ও সক্ষমতা রাশিয়ার নেই।
গত বছরের শুরুতে মস্কো ও তেহরান সমন্বিত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি সই করে। কিন্তু তাদের মধ্যে এখনো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়নি। এর কারণও মূলত অঞ্চলটিতে রাশিয়ার অন্যান্য সম্পর্কের সঙ্গে জড়িত।
‘স্বার্থের সম্পর্ক’
মস্কো কখনোই পশ্চিম এশিয়ায় ইরানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিন্ন করেনি।
ইউক্রেইনে যুদ্ধ জড়ানোর প্রতিবাদে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চাকরি ছেড়ে দেওয়া রাশিয়ার কূটনীতিক বোরিস বোন্দারেভ বলেন, "রাশিয়া স্বাভাবিকভাবেই এই অঞ্চলে তার প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা এবং সব পক্ষকে খুশি রাখার চেষ্টা করে।"
রাশিয়া ইসরায়েলের সঙ্গেও সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলে।
২০০৯ সালে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেস মস্কো সফরে গিয়েছিলেন। ওই সময় আল জাজিরাকে তিনি বলেন, তার সফরের উদ্দেশ্য হলো, তেহরানের কাছে উন্নত 'এস-৩০০' বিমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিক্রির বিষয়টি ক্রেমলিন যেন ‘পুনর্বিবেচনা’ করে দেখে।
মস্কো ২০১৬ সাল পর্যন্ত ওই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা বিক্রির সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখে। ফলে ২০২৪ সালে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইসরায়েলের ‘এফ-১৬’ যুদ্ধবিমানের কাছে অনেকটা অসহায় প্রমাণিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ওই যুদ্ধবিমান ইরানের রাডারগুলোকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়েছিল এবং অনেকগুলো ধ্বংস করেছিল।
এর আগে ২০১২ সালে জেরুজালেমে পুতিনকে স্বাগত জানান ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি বলেছিলেন, তারা দুই দেশই একমত হয়েছেন যে, ইরানের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র একটি গুরুতর বিপদ। এই বিপদ শুধু ইসরায়েলের জন্য নয়, এই অঞ্চল এবং পুরো বিশ্বের জন্যও।
অন্যদিকে পুতিন বলেছিলেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনাই একমাত্র সমাধানের পথ। তবে ইসরায়েলে শান্তি বজায় থাকার সঙ্গে রাশিয়ার ‘জাতীয় স্বার্থের’ সম্পর্ক থাকার কথাও বলেন তিনি।
অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের বাজার নিয়েও মস্কো এবং তেহরানের মধ্যে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা রয়েছে।
লন্ডন ইউনিভার্সিটির মিডল ইস্টার্ন অ্যান্ড ইরানিয়ান স্টাডিজের প্রভাষক সাইয়েদ আলী আলাভি ২০২৩ সালে লিখেছিলেন, "রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্ককে একটি আনুষ্ঠানিক জোটের চেয়ে ‘স্বার্থের সম্পর্ক’ হিসেবে বর্ণনা করাটাই যুক্তিযুক্ত।"
এখন প্রশ্ন উঠেছে, ইরানে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা এবং চলমান ইউক্রেইন যুদ্ধ এই স্বার্থের সম্পর্ককে পরীক্ষার মুখে ফেলে দিয়েছে কিনা।
ইউক্রেইনের আকাশে ড্রোন
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া যখন ইউক্রেইনের সঙ্গে পুরোদমে যুদ্ধে জড়ায়, তখন ইরান তার ‘নিরপেক্ষতার’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করে। যুদ্ধের নিন্দা জানিয়ে তারা জাতিসংঘে আনা প্রস্তাবগুলোতে ভোট দেওয়া থেকে বিরত; এমনকি রাশিয়ার বিপক্ষেও ভোট দেয়।
কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে রাশিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখার চেষ্টা করতে দেখা গেছে।
২০২২ সালের ১ মার্চ আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বলেছিলেন, ওয়াশিংটনের ‘মাফিয়া শাসনের’ জন্য ‘সারা বিশ্বে সংকট বাধানোর প্রয়োজন ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র এজন্য ইউক্রেইনকে ‘বলির পাঠা’ বানিয়েছে।
এর চার মাস পর পুতিন যখন তেহরান সফর করেন, তখন তিনি খামেনির মুখ থেকে পশ্চিমাবিরোধী আরেকটি বক্তব্য শুনতে পান।
খামেনি পুতিনকে বলেছিলেন, ইউক্রেইনের ক্ষেত্রে আপনি যদি নিজে উদ্যোগী না হতেন, তবে অপর পক্ষই যুদ্ধ শুরু করত।
তিনি আরো বলেন, ইউক্রেইনে যদি (নেটো) থামানো না হতো, তবে তারা ক্রিমিয়াকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বাধিয়ে দিত।
খামেনির এই বক্তব্যে পুতিনকে সন্তুষ্ট মনে হয়েছিল। তিনি প্রতিক্রিয়ায় বলেছিলেন, পশ্চিমারা যেভাবে আচরণ করছে, তা রাশিয়ার সামনে অন্য কোনো বিকল্প রাখেনি।
তবে রাশিয়ার নেতা আরো বেশি খুশি হয়েছিলেন যখন ইরান নিরপেক্ষতা ভেঙে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়া শুরু করে এবং 'শাহেদ' ড্রোনও সরবরাহ করে।
ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলা শুরুর পর মস্কো সেই উপকারের প্রতিদান দেয়। তারা আগের চেয়ে উন্নত করা কিছু ‘শাহেদ ড্রোন’ ইরানে ফেরত পাঠায়।
এগুলোতে 'কোমেটা-বি' স্যাটেলাইট নেভিগেশন মডিউল যুক্ত ছিল, যা ‘জ্যামিং’ এড়াতে সাহায্য করে।
যুক্তরাজ্যের 'দ্য টাইমস' পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে একটি ড্রোন ১ মার্চ সাইপ্রাসের একটি ব্রিটিশ বিমানঘাঁটিতে আঘাত হানে।
সামরিক বিশেষজ্ঞ পাভেল লুজিনের দাবি, মস্কো তেহরানকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অবকাঠামোর অবস্থান সম্পর্কে ‘লিয়ানা’ স্যাটেলাইট সিস্টেম থেকে তথ্য সরবরাহ করেছে।
ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যে হামলায় খামেনি নিহত হন, রাশিয়া সেই হামলার নিন্দাও জানিয়েছিল। কিন্তু পুতিন যে বিষয়টি কখনোই বিবেচনা করেননি, সেটা হলো ইরানকে সাহায্য করার জন্য সেনা পাঠানো।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান 'নিউ ইউরেশিয়ান স্ট্র্যাটেজিস সেন্টারের' সহযোগী গবেষক রুসলান সুলেইমানভ বলেন, এই পরিস্থিতি পুতিনের ভাবমূর্তির জন্য একটি বড় ধাক্কা। এটি আবারও সামনে এসেছে যে, পুতিন তাদের মিত্রদের সত্যিই সাহায্য করতে অক্ষম।
কিছু বিশ্লেষক এমন ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন যে, ইরান সংঘাতের পর মস্কো-তেহরান জোট আর টিকবে না।
কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ইউক্রেন ইস্যুতে ওয়াশিংটনের কাছ থেকে কিছু সুবিধা বা ছাড় পাওয়ার বিনিময়ে ক্রেমলিন ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করতে আগ্রহী ছিল।
সাবেক কূটনীতিক বোন্দারেভ বলেন, ইউক্রেইনের বিনিময়ে ইরানকে হাতবদল করার প্রস্তাব মস্কো ‘অবশ্যই দিতে পারে’।
শান্তি আলোচনার শর্ত হিসেবে ডনবাস অঞ্চলের বাকি অংশ ছেড়ে দেওয়ার যে দাবি রাশিয়ার রয়েছে, সেটির দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, তারা (ইরানের ক্ষেত্রে) যুক্তরাষ্ট্রকে যা প্রস্তাব করতে পারে, তা স্পষ্টতই ইউক্রেইনে তারা যা পেতে চায়, তার চেয়ে কম।
স্মাগিন বলেন, "ইউক্রেইন নিয়ে বড় কোনো ছাড় পেলে তার বিনিময়ে মস্কো সানন্দে ইরানকে ত্যাগ করবে।
ইউক্রেইনের স্বার্থে ইরানকে হাতবদল করা নিঃসন্দেহে ক্রেমলিনের জন্য লাভজনক হতো এবং সেটা তা করত।
কিন্তু সেই সময় পার হয়ে গেছে বলে মনে করেন স্মাগিন। কারণ, ইউক্রেইন শান্তি আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূমিকার কারণে এখন এমন চুক্তির সম্ভাবনা নেই।
রাশিয়া-ইউক্রেইন যুদ্ধকে ইইউয়ের জন্য অস্তিত্বের সংকট হিসেবে দেখে ব্রাসেলস। এ কারণ তারা যুদ্ধ নিয়ে ওয়াশিংটনের শান্তির প্রস্তাব এবং ইউক্রেইনের সশস্ত্র বাহিনীকে সীমিত করার রুশ দাবির বিরোধিতা করে আসছে।
স্মাগিন বলেন, ইউক্রেইনের সেনাবাহিনীকে ওয়াশিংটন গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া বন্ধ করলে রাশিয়াও ইরানকে দেবে না, এমন শর্ত মস্কো দিয়ে থাকতে পারে।
তবে সুলেইমানভ বিশ্বাস করেন, মস্কো এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে কেবল তখনই কিছু ‘দর কষাকষি’ সম্ভব, যদি মস্কোকে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
কিন্তু বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে রাশিয়া সহায়তা দিলেও ইরান যুদ্ধের শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী বানানো হয়েছে পাকিস্তানকে।
মুস্তাফায়েভের মতে, এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে মস্কোর তুচ্ছতা এবং ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্কের গুরুত্বহীনতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
মস্কোকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে বেছে না নেওয়ার পেছনে আরেকটি কারণ রয়েছে। সেটি হলো, রাশিয়ার আগের বিশ্বাসভঙ্গের কথা ইরানের খুব কম মানুষই ভুলে গেছে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর কিয়েভের কাছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার ছিল।
১৯৯৪ সালের বুদাপেস্ট স্মারকপত্রে ইউক্রেইন তাদের পারমাণবিক অস্ত্র ত্যাগ করার বিনিময়ে মস্কো ও ওয়াশিংটন কিয়েভের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েছিল।
এর ত্রিশ বছর পর মস্কো ক্রিমিয়াকে নিজের সঙ্গে যুক্ত করে এবং দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেইনের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সমর্থন দেয়।
মুস্তাফায়েভ বলেন, মধ্যস্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের আস্থা অর্জনের প্রয়োজন পড়ে। এই আস্থা এমন এক সম্পদ, যা আজ রাশিয়ার হাতে নেই।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
অধিকৃত পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এক কিশোরসহ ছয় ফিলিস্তিনিকে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফা জানিয়েছে, স্থানীয় সময় পশ্চিম তীরের নাবলুস, তুলকারেম ও জেনিন এলাকায় এসব অভিযান চালানো হয়। ওয়াফার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাবলুসের দক্ষিণে বেইতা শহর থেকে ১৭ বছর বয়সী মাহমুদ দাহের মাহমুদ দাউদকে আটক করা হয়েছে। এ সময় তার আটকের কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। তুলকারেমের শুওয়েইকা এলাকায় একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাজেদ দাবাস ও তার ২০ বছর বয়সী ছেলে আহমেদ দাবাসকেও আটক করে ইসরায়েলি সেনারা। তাদের বাড়িতে অভিযান চালানোর পর বাবা-ছেলেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় বলে জানিয়েছে ওয়াফা। এ ছাড়া জেনিনের মাসলিয়া গ্রামে অভিযান চালিয়ে আরও তিন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। তারা হলেন, ইসাম রাসেম আবু আল-রুব, খালেদ ফারুক আবু আল-রুব ও হানি আবু আল-রুব। এদিকে, গাজার পশ্চিম তীরে অভিযান ও গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অঞ্চলটিতে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান, ফিলিস্তিনিদের গ্রেপ্তার এবং সহিংসতার ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। তথ্যসূত্র : আল-জাজিরা
ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ একটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রোস্তভ অঞ্চলের নোভোশাখতিনস্ক তেল শোধনাগারটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অঞ্চলটির গভর্নর ইউরি স্লিউসার। শুক্রবার স্লিউসার জানান, রাতভর রোস্তভ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৫০টি ড্রোন ধ্বংস করেছে রুশ আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী। তবে হামলায় নোভোশাখতিনস্ক তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কেউ হতাহত হয়নি বলে প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- নোভোশাখতিনস্ক শোধনাগারটির বার্ষিক অপরিশোধিত তেল পরিশোধন সক্ষমতা প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন, যা দৈনিক প্রায় ১ লাখ ব্যারেলের সমান। প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত জ্বালানির বড় অংশ রপ্তানি করা হয়। ফলে হামলার কারণে শুধু রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নয়, দেশটির জ্বালানি রপ্তানিতেও প্রভাব পড়তে পারে। রোস্তভ অঞ্চলের গভর্নরের তথ্য অনুযায়ী, নোভোশাখতিনস্ক ও কামেনস্ক-শাখতিনস্ক শহরসহ অঞ্চলের ছয়টি জেলায় রাতভর ড্রোন হামলা হয়। রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব এলাকায় প্রায় ৫০টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। হামলার পর শোধনাগারে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের কাজ চলছে। নোভোশাখতিনস্ক শোধনাগারটি রোস্তভ অঞ্চলের একমাত্র কার্যকর তেল শোধনাগার এবং দক্ষিণ রাশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে পরিচিত। এর উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে পেট্রোল, ডিজেল, জাহাজের জ্বালানি, ফার্নেস ফুয়েলসহ বিভিন্ন ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য রয়েছে। রাশিয়ার তেল স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা নতুন নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেন রাশিয়ার বিভিন্ন তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিক ড্রোন হামলা চালিয়েছে। কিয়েভের দাবি, রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ ও অর্থনৈতিক সক্ষমতায় চাপ তৈরি করাই এসব হামলার অন্যতম উদ্দেশ্য। নোভোশাখতিনস্ক শোধনাগারে এবারের হামলার সময়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বন্ধের সম্ভাব্য সমঝোতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা বন্ধের বিষয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এর আগে জেলেনস্কি জাতিসংঘে সতর্ক করে বলেছিলেন, জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে সমঝোতা না হলে ইউক্রেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা চালিয়ে যাবে এবং আসন্ন শীতে রাশিয়ার জন্য পরিস্থিতি কঠিন করে তুলবে। একই সময়ে রাশিয়াও ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোয় নিয়মিত হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। শুক্রবারের হামলায় শুধু নোভোশাখতিনস্ক শোধনাগারই নয়, রাশিয়ার আরও কয়েকটি অঞ্চলের শিল্প ও জ্বালানি স্থাপনাও আক্রান্ত হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, রাতভর হামলায় রাশিয়ার একটি তেল শোধনাগার ও একটি যাত্রীবাহী ট্রেনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, পুরো দেশজুড়ে ওই রাতে মোট ৫৯২টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ধারাবাহিক হামলা এবং ইউক্রেনের জ্বালানি স্থাপনায় রুশ হামলা- দুই পক্ষের এই পাল্টাপাল্টি আক্রমণ যুদ্ধের সামরিক ক্ষেত্রের পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহ ও বৈশ্বিক বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে একের পর এক সামরিক চোখধাঁধানো কৌশল দেখিয়ে বিশ্বমঞ্চে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে ইরান। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক ঘাঁটিতে চালানো ধারাবাহিক সামরিক অভিযানে দেশটির অস্ত্রাগারে থাকা এমন এক মারাত্মক ড্রোন সামনে এসেছে, যা দেখে ঘুম হারাম হয়ে গেছে পশ্চিমা সামরিক বিশ্লেষকদের। ড্রোনটির নাম ‘শাহেদ-২৩৮’। কম খরচে তৈরি হলেও এর অবিশ্বাস্য গতি ও ধ্বংসক্ষমতা আধুনিক মাল্টিলেয়ার্ড বা বহুদলীয় আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। ইরানের পুরোনো ও জনপ্রিয় শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের ভিত্তি ধরে তৈরি করা এই শাহেদ-২৩৮ সংস্করণটিতে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে এর ইঞ্জিনে। এতদিন ধরে প্রপেলার চালিত পিস্টন ইঞ্জিন ব্যবহার করা হলেও এই নতুন মডেলে যুক্ত করা হয়েছে একটি শক্তিশালী কমপ্যাক্ট টার্বোজেট ইঞ্জিন। ইরানের বিখ্যাত ‘শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ’ ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রথম এই ঘাতক ড্রোনটির পর্দা উন্মোচন করে। তবে এটিকে প্রদর্শনীতেই সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি, খুব দ্রুততম সময়ে ছোট মাত্রায় উৎপাদন শুরু করে যুদ্ধের সরাসরি ময়দানে এটি নামিয়ে দেওয়া হয়। শাহেদ-২৩৮-এর মূল জাদু লুকিয়ে আছে এর গতির মধ্যে। আগের শাহেদ-১৩৬ যেখানে প্রতি ঘণ্টায় মাত্র ১৮৫ কিলোমিটার গতিতে উড়তে পারত, সেখানে এই নতুন জেট চালিত ড্রোনটি ঘণ্টায় সহজে ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার গতি তুলতে সক্ষম। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত আঘাত হানার মুহূর্তে এর গতি প্রতি ঘণ্টায় ৭০০ কিলোমিটারও ছাড়িয়ে গেছে। সাড়ে তিন মিটার দীর্ঘ এবং তিন মিটার ডানার এই ড্রোনটির উড্ডয়ন সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ফুট পর্যন্ত হতে পারে এবং এটি ৫০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে। যদিও পিস্টন ইঞ্জিনের বদলে জেট ইঞ্জিন বসানোর কারণে ড্রোনের জ্বালানি ধারণক্ষমতা এবং পাল্লা কিছুটা কমেছে, কিন্তু গতি ও আঘাতের সক্ষমতা কয়েক গুণ বাড়িয়ে ইরান শত্রুর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় প্রায় শূন্যের কোঠায় নিয়ে এসেছে। ইরানের এই প্রযুক্তির কারণে প্রতিপক্ষের সব হিসাব-নিকাশ একদম ওলটপালট হয়ে গেছে। আধুনিক ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলো মূলত তৈরি করা হয়েছিল ধীরগতির ড্রোনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে তা প্রতিহত করার জন্য। কিন্তু কোনো ড্রোন যখন ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার বেগে কোনো লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুটে আসে, তখন আকাশ প্রতিরক্ষা রাডারের পক্ষে তা শনাক্ত করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার জন্য কয়েক সেকেন্ডের বেশি সময় থাকে না। এর ওপর শত্রুর রাডার নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার জন্য এতে ব্যবহার করা হয়েছে বিশেষ ইনফ্রারেড এবং রাডার-হোমিং প্রযুক্তি, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শত্রুর রাডার লক্ষ্য করে আঘাত হানতে পারে। কৌশলগত দিক থেকে ড্রোনটিকে ইরান অর্থনৈতিক যুদ্ধের এক অন্যতম অস্ত্র বানিয়ে ফেলেছে। একেকটি সস্তা মূল্যের শাহেদ-২৩৮ ধ্বংস করতে গিয়ে শত্রুপক্ষকে কোটি কোটি টাকার উচ্চমানের ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র খরচ করতে হচ্ছে। আবার কোনো কোনো অভিযানে ধীরগতির শাহেদ-১৩৬ ড্রোনের ঝাঁকের সাথে এই অতিগতির শাহেদ-২৩৮ ড্রোনকে মিলিয়ে ছুড়ে দেওয়া হয়, যা প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা প্রতিরক্ষাকে পুরোপুরি বিভ্রান্ত ও দিশেহারা করে তোলে। বর্তমানে ইরানের কারখানাগুলো থেকে মাসে শত শত শাহেদ ড্রোন উৎপাদিত হচ্ছে, যার মধ্যে একটি বড় অংশ এই শাহেদ-২৩৮। এটি যুদ্ধক্ষেত্রে কতটা শেষ মুহূর্তের জয় এনে দেবে তা নিয়ে তর্ক থাকতে পারে, তবে অল্প খরচের কোনো ড্রোন কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে এবং এর দ্রুত গতি কীভাবে কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে নিমেষেই অকার্যকর করে দিতে পারে, তা শাহেদ-২৩৮ তৈরি করে বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে ইরান। সূত্র: প্রেস টিভি।