নগরের ভেতরে বন বা ঘন সবুজ এলাকা গড়ে তোলা গেলে নগর তাপমাত্রা অনেকাংশে কমবে। তবে এর জন্য প্রকৃতি ও মানুষের চাহিদা দুটোই বুঝে পরিকল্পনা করতে হবে। ইংল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টারের জলবায়ু অভিযোজন বিষয়ে গবেষক ধনপাল গোবিন্দরাজুলু তার এক গবেষণায় বলেন, ভারতের দ্রুত নগরায়নের ফলে শহরগুলোতে তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে চেন্নাইয়ের মতো শহরে গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠে।
গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতের এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ খরচ হবে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) যন্ত্রে। পরিকল্পিত নগর বন বাড়ানো গেলে এ বিদ্যুৎচাহিদা কমানো সম্ভব।
চেন্নাই শহরে বর্তমানে প্রায় ২৬ বর্গমাইল এলাকায় গাছ ও সবুজ আছে। এর বড় অংশই একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। তবে শহরের আশপাশে আরও প্রায় ৯ বর্গমাইল জমি রয়েছে, যা নগর বন গড়ে তোলার জন্য উপযোগী। কোয়েম্বাটোর ও তিরুচিরাপল্লির মতো অন্যান্য ভারতীয় শহরেও এমন সম্ভাবনা আছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সুপারিশ অনুযায়ী, শহরে প্রতি নাগরিকের জন্য অন্তত ৯ বর্গমিটার সবুজ জায়গা থাকা উচিত। শহরের মোট এলাকার অন্তত ৩০ শতাংশ গাছপালা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ভারতের বেশিরভাগ শহর এই মানদণ্ড পূরণ করতে পারেনি।
তবে গবেষণায় সতর্ক করে বলা হয়েছে, শুধু শহর ঠান্ডা করার জন্য গাছ লাগালেই সমস্যার সমাধান হবে না। চেন্নাইয়ের মতো গরম ও পানির সংকটপূর্ণ শহরে কিছু ক্ষেত্রে গাছ উল্টো তাপ ধরে রাখতে পারে। এ ছাড়া সব গাছই বন্যপ্রাণীর জন্য উপযোগী নয়—বিশেষ করে বিদেশি প্রজাতির গাছ পাখি ও কীটপতঙ্গের উপকারে কম আসে।
গবেষকরা আরও বলেন, অনেক সময় নগর এলাকায় থাকা খোলা জমি বা ঘাসভূমিকে অব্যবহৃত জমি ধরে নিয়ে সেখানে গাছ লাগানো হয়। অথচ এসব জমি দরিদ্র মানুষের পশুচারণ ও জ্বালানি সংগ্রহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এতে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নগর বন পরিকল্পনায় স্থানীয় প্রজাতির গাছ, বন্যপ্রাণীর চলাচলের পথ এবং মানুষের প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাস্তার ধারে বা খালের পাশে গাছ লাগিয়ে শহরের সবুজ এলাকাগুলোকে সংযুক্ত করা যেতে পারে।
গবেষকরা মনে করেন, বৃক্ষরোপন বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ঠিকভাবে নগর পরিবেশ নকশা করতে হবে। এতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং সহনশীল, বাসযোগ্য ও সবুজ শহর নির্মাণ সম্ভব হবে।
তথ্যসূত্র : দ্য কনভারসেশন
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর পাকিস্তানের সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে গেছে। একসময় আফগানিস্তানে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা পাকিস্তান এখন সেই গোষ্ঠীর সঙ্গেই সীমান্ত নিরাপত্তা, টিটিপি ও শরণার্থী ইস্যুতে বিরোধে জড়িয়েছে। দিল্লি পলিসি গ্রুপের ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রামের গবেষণা সহযোগী শ্রেয়াস দেশমুখের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্ক এখন সহিংসতা, অবিশ্বাস ও পাল্টাপাল্টি চাপের একটি চক্রে আটকে আছে। তাঁর মতে, তালেবানবিরোধী পাকিস্তানি নীতি কিছু ক্ষেত্রে উল্টো তালেবানের আঞ্চলিক যোগাযোগ ও অভ্যন্তরীণ অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে। টিটিপি নিয়ে পুরোনো বিরোধ পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে আফগান তালেবানের বিরুদ্ধে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপিকে আশ্রয় ও সহযোগিতা দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে। তবে দেশমুখের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই অভিযোগের পক্ষে পাকিস্তান এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি। অন্যদিকে তালেবান বলে আসছে, টিটিপি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয়। টিটিপি পাকিস্তানের পশতুন অধ্যুষিত উপজাতীয় এলাকাগুলোতে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি জোট। গত দুই দশকে পাকিস্তানের জন্য এটি অন্যতম বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক অভিযান ও পরে ২০১৪ সালের পেশোয়ার স্কুল হামলার পর টিটিপির বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালানো হয়। ২০১৪ সালে পাকিস্তান ‘অপারেশন জারব-ই-আজব’ শুরু করলে টিটিপির অনেক যোদ্ধা আফগানিস্তানের সীমান্তবর্তী এলাকায় চলে যায়। সংগঠনটির কয়েকটি অংশ পরে আফগান তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে। আবার কিছু সদস্য ইসলামিক স্টেটের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আইএস খোরাসান বা আইএসকেপি গঠন করে। দেশমুখের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আফগান ভূখণ্ডে টিটিপির উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের সামরিক অভিযান তালেবান সরকারের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। লেখকের মতে, টিটিপি ইস্যুটি পাকিস্তানের জন্য তালেবানের ওপর চাপ বজায় রাখার একটি মাধ্যম হিসেবেও কাজ করছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে আফগানিস্তানে একাধিক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের উপস্থিতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে আফগানিস্তানভিত্তিক কোনো সংগঠনের সীমান্তপারের বড় ধরনের হামলার প্রমাণ তুলনামূলকভাবে সীমিত, আইএসকেপির কর্মকাণ্ড এর ব্যতিক্রম। আইএসকেপি রাশিয়ার মস্কোর ক্রোকাস সিটি হল হামলার দায় স্বীকার করেছিল। মধ্য এশিয়াতেও সংগঠনটির তৎপরতা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে রাশিয়া, মধ্য এশিয়ার দেশগুলো ও চীন তালেবান সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়িয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানের পুরোনো কৌশলই কি এখন সমস্যার কারণ আফগান তালেবানের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক সবসময় সরল ছিল না। দেশমুখের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তান একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসবিরোধী জোটকে সহযোগিতা করেছে, অন্যদিকে আফগান তালেবানের সঙ্গেও যোগাযোগ ও সমর্থনের সম্পর্ক বজায় রেখেছে। উদ্দেশ্য ছিল আফগানিস্তানে নিজেদের কৌশলগত প্রভাব ধরে রাখা। তবে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর সেই সম্পর্কের সমীকরণ বদলে যায়। তালেবান এখন পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে এমন একটি শক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডুরান্ড লাইন নিয়ে বিরোধ। তালেবান আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তের ডুরান্ড লাইনকে আন্তর্জাতিক সীমান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। পশতুন অধ্যুষিত পাকিস্তানি অঞ্চলগুলোর অবস্থান নিয়েও তালেবানের ঐতিহাসিক অবস্থান পাকিস্তানের জন্য উদ্বেগের কারণ। দোহা চুক্তিতে তালেবান আফগান ভূখণ্ডকে অন্য কোনো সশস্ত্র সংগঠনের কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যবহার করতে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু টিটিপিকে ঘিরে পাকিস্তানের অভিযোগ ও তালেবানের অবস্থানের মধ্যে এ নিয়ে টানাপোড়েন অব্যাহত রয়েছে। আফগান শরণার্থীদের অবস্থান বদলেছে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে। তবে ২০০১ সালের পর দেশটির রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে আফগানদের বহিষ্কারের মাত্রাও বেড়েছে। বিশ্লেষণে ২০১৬ সালের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। ওই বছর টিটিপির তৎপরতা এবং পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের অবনতির মধ্যে প্রায় ছয় লাখ আফগানকে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। বর্তমান বহিষ্কার নীতির পেছনে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও ভূমিকা রাখছে বলে মনে করেন দেশমুখ। তাঁর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালে ইমরান খানের নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ বা পিটিআই ক্ষমতায় আসার পর আফগান শরণার্থীদের বিষয়ে তুলনামূলক নমনীয় অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। ইমরান খান পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া আফগান শরণার্থীদের পরিচয়পত্র দেওয়ার এবং তাদের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবান কাবুল দখলের পর তিনি মন্তব্য করেছিলেন, তালেবান ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভেঙেছে’। একই বছরের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক কাবুল সফর করেন। তখন তিনি আফগানিস্তান নিয়ে উদ্বেগ না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ডিসেম্বরে ইমরান খানের সরকার তালেবানকে সমর্থন দিতে ইসলামি দেশগুলোর একটি বৈঠকও আয়োজন করে। দেশমুখের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ইমরান খানের এই নীতি পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধুভিত্তিক রাজনৈতিক পরিবারগুলোর মধ্যে পশতুন রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করতে পারে। ২০২৩ সালের ৯ মে ইমরান খানের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে সহিংসতার পর পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজ ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতৃত্বাধীন জোট সরকার আফগানদের বহিষ্কারের নীতি জোরদার করার সুযোগ পায় বলে লেখক মনে করেন। কেন আফগানদের ফেরত পাঠাচ্ছে পাকিস্তান বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আফগান শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর পেছনে পাকিস্তান সরকারের একাধিক রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত হিসাব থাকতে পারে। এর একটি হলো ইমরান খানের রাজনৈতিক সমর্থনভিত্তিকে দুর্বল করা। অন্যদিকে সরকার এটিকে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করছে। পাকিস্তানের দাবি, বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে এবং তাদের কেউ কেউ টিটিপির জন্য সমর্থনভিত্তি তৈরি করছে। দেশমুখের মতে, শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর মাধ্যমে পাকিস্তান তালেবান সরকারের ওপরও চাপ তৈরি করতে পারছে। কারণ আফগানিস্তানে ফিরে যাওয়া বিপুলসংখ্যক মানুষের পুনর্বাসন ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত তালেবান সরকারের ওপরই পড়ছে। বিশ্লেষণে আরও বলা হয়েছে, অতীতে পাকিস্তান আফগান শরণার্থীদের আন্তর্জাতিক সহায়তা ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবহার করেছে। আফগান তালেবানের অনেক নেতা ও সদস্য পাকিস্তানের শরণার্থী শিবিরে বেড়ে উঠেছেন এবং দেশটির দেওবন্দি মাদ্রাসায় শিক্ষা নিয়েছেন। কিন্তু এখন যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশ দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের আফগান। তাঁদের অনেকেই জীবনে কখনো আফগানিস্তানে যাননি। ফলে লেখকের বিশ্লেষণে প্রশ্ন উঠেছে, অতীতে পাকিস্তানের কাছে যে ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল, বর্তমান প্রজন্মের শরণার্থীদের ক্ষেত্রে সেই গুরুত্ব কতটা অবশিষ্ট আছে। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অবস্থানও বদলেছে আফগানিস্তানকে ঘিরে পাকিস্তানের নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পরিবর্তিত অবস্থান। রাশিয়া, চীন ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছে। এর পেছনে নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও মানবিক স্বার্থও রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে আইএসকেপির হুমকি মোকাবিলায় তালেবান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগকে প্রয়োজনীয় মনে করছে কিছু দেশ। এদিকে বিশ্বজুড়ে শরণার্থী সহায়তার অর্থায়নও চাপের মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বাড়ায় শরণার্থী নীতিতেও পরিবর্তন আসছে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের আফগান শরণার্থী প্রত্যাবাসন আরও জটিল আঞ্চলিক রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে। সামনে পাকিস্তানের জন্য কী পথ দেশমুখের বিশ্লেষণে পাকিস্তান-আফগানিস্তান সম্পর্কের বর্তমান পরিস্থিতিকে একটি পুনরাবৃত্ত চক্র হিসেবে দেখা হয়েছে। একদিকে টিটিপির হামলা ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ, অন্যদিকে আফগান শরণার্থী প্রত্যাবাসন এবং আফগানিস্তানে পাকিস্তানি সামরিক অভিযানের অভিযোগ, সব মিলিয়ে দুই দেশের অবিশ্বাস আরও বাড়ছে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিমান হামলায় বেসামরিক হতাহতের অভিযোগ এবং শরণার্থী প্রত্যাবাসনের মতো পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত টিটিপির জন্য রাজনৈতিক সুবিধা তৈরি করতে পারে। একই সময়ে পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে টিটিপির হামলা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। দেশমুখের মতে, পাকিস্তানের তালেবানবিরোধী অবস্থান উল্টো আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীনদের নিজেদের দেশের মানুষের মধ্যে সমর্থন বাড়াতে এবং আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করতে সহায়তা করতে পারে। তবে এটি লেখকের বিশ্লেষণ, কোনো পক্ষের স্বীকৃত অবস্থান নয়। পাকিস্তানের অভ্যন্তরেও নীতিটি নিয়ে চাপ রয়েছে। পশতুন জাতীয়তাবাদী দল ও ধর্মীয় নেতাদের একটি অংশ তুলনামূলক নমনীয় নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে দেশটির নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলায় টিটিপির বিভিন্ন অংশকে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে পাকিস্তানে মতভেদ রয়েছে। বর্তমানে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় পিটিআইয়ের রাজনৈতিক প্রভাবও এই সমীকরণকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে পশতুন জাতীয়তাবাদ, কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে প্রাদেশিক বিরোধ এবং নিরাপত্তা সংকট একে অন্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সামনে দুটি কঠিন পথ রয়েছে বলে মনে করেন লেখক। একটি হলো আফগানিস্তানের তালেবান সরকার পরিবর্তনের চেষ্টা করা, যা নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী তালেবান বিদ্রোহের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অন্যটি হলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রক্সি বা সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যবহারের পুরোনো কৌশল থেকে সরে আসা। দুই পথের কোনোটিই সহজ নয়। তবে দেশমুখের বিশ্লেষণের মূল বক্তব্য হলো, আফগানিস্তানকে ঘিরে পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা ও কৌশলগত নীতি এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পুরোনো কৌশলগুলোই নতুন সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে। লেখক: শ্রেয়াস দেশমুখ, গবেষণা সহযোগী, ন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রোগ্রাম, দিল্লি পলিসি গ্রুপ (ডিপিজি) সূত্র: ন্যাশনাল সিকিউরিটি
দক্ষিণ আফ্রিকায় দেশব্যাপী গণবিক্ষোভের ডাক দিয়েছে ‘মার্চ অ্যান্ড মার্চ’। অনিবন্ধিত বিদেশি নাগরিকদের ইস্যুর পাশাপাশি সাম্প্রতিক নারী হত্যা, জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা ও অপরাধের প্রতিবাদে আগামী বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ‘মেনস মার্চ’ কর্মসূচিরও ঘোষণা দিয়েছে সংগঠনটি। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বরকে অনিবন্ধিত বিদেশিদের দক্ষিণ আফ্রিকা ছাড়ার ‘ডেডলাইন’ ঘোষণা করেছিল মার্চ অ্যান্ড মার্চ। তবে এই ডেডলাইনের কোনো আইনগত ক্ষমতা নেই। বিদেশি নাগরিকদের বহিষ্কার বা অভিবাসন আইন প্রয়োগের দায়িত্ব সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা জেনোফোবিয়া, অসহিষ্ণুতা ও সহিংসতার মাধ্যমে পরিচিত হতে পারে না। তিনি দেশবাসীকে বর্ণবৈষম্যহীনতা, সমতা, গণতন্ত্র ও মানবিক মর্যাদার সাংবিধানিক মূল্যবোধ মেনে চলার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে নারীর ওপর সহিংসতা, ধর্ষণ ও হত্যার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলেন তিনি। অন্যদিকে মার্চ অ্যান্ড মার্চ জানিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরের কর্মসূচিতে পুরুষদের বিশেষভাবে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। সংগঠনটির ভাষ্য, নারীদের হত্যা ও জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে পুরুষদের নীরব না থেকে সোচ্চার হওয়া প্রয়োজন। গৌতেং ও কোয়াজুলু-নাটালসহ কয়েকটি এলাকায় মিছিলের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে তারা। ডারবানসহ কয়েকটি এলাকায় বিদেশি নাগরিক ও শরণার্থীদের মধ্যে কর্মসূচিকে ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর ডারবান রিফিউজি রিসেপশন সেন্টারের সামনে বিদেশি শরণার্থী ও মার্চ অ্যান্ড মার্চের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত চারজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পুলিশ জানিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বরও স্বাভাবিক আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং বিক্ষোভকারীদের অবশ্যই আইনের মধ্যে থেকে কর্মসূচি পালন করতে হবে। মার্চ অ্যান্ড মার্চও কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ রাখার কথা জানিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত বিদেশি নাগরিকদের সম্ভাব্য বিক্ষোভস্থল ও বড় জমায়েত এড়িয়ে চলা, প্রয়োজন ছাড়া বাইরে না যাওয়া এবং স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের নির্দেশনা অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
ভারত জুড়ে ইথানল উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে অভ্যন্তরীণ বাজার ও চাহিদা তৈরি না হওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন দেশটির ইথানল উৎপাদকরা। বর্তমানে বার্ষিক বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত ইথানল হাতে নিয়ে নতুন ক্রেতা এবং বিকল্প ব্যবহারের পথ খুঁজতে হন্যে হয়ে ঘুরছেন তারা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে বার্ষিক ইথানল উৎপাদন সক্ষমতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার কোটি লিটারে এবং চলতি বছরের মধ্যেই এতে আরও চারশত কোটি লিটার যুক্ত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু উৎপাদিত এই বিশাল জ্বালানির সিংহভাগ ব্যবহারের পর্যাপ্ত জায়গা এখনো তৈরি হয়নি। বর্তমানে দেশটির বহুল আলোচিত ই-২০ পেট্রোল মিশ্রণ কর্মসূচির আওতায় বছরে প্রায় এক হাজার একশত কোটি লিটার ইথানল ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে, জ্বালানি খাতের বাইরে অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়, ওষুধ ও রাসায়নিক শিল্পে আরও তিনশত থেকে সাড়ে তিনশত কোটি লিটার ইথানল ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে সব খাত মিলিয়ে ব্যবহারের পরও দেশটির প্রায় সাতশত কোটি লিটার ইথানলের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বাজার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন সক্ষমতা বহুগুণ বেশি হওয়ায় ভারতীয় ইথানল কারখানাগুলো তাদের ক্ষমতার পুরোটা ব্যবহার করতে পারছে না। কারখানাগুলো বর্তমানে গড়ে মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, আগামী অন্তত তিন বছর এই সক্ষমতা সর্বোচ্চ ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রাজ্যভিত্তিক তথ্যে দেখা গেছে, কেবল মহারাষ্ট্রেই উদ্বৃত্ত ইথানলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭৭ কোটি লিটারে। ২০২৫-২৬ সরবরাহ বর্ষে তেল বিপণনকারী কোম্পানিগুলোর সঙ্গে এক হাজার কোটি লিটার ইথানল সরবরাহের চুক্তি থাকলেও গত আগস্ট পর্যন্ত শেষ পর্যন্ত সরবরাহ সম্ভব হয়েছে মাত্র ৮৯৫ কোটি লিটার। উদ্বৃত্ত এই ইথানল সংকট নিরসনে উৎপাদকরা সরকারের দ্বারস্থ হলেও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান মিলছে না। সরকার পেট্রোলে ইথানলের মিশ্রণের মাত্রা ই-২০ থেকে বাড়িয়ে ই-২৫ বা ই-৩০ বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে পুরনো গাড়ির ইঞ্জিনে উচ্চমাত্রার ইথানল ব্যবহারে ক্ষতির আশঙ্কা থাকায় ২০২৬ সালের ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত ই-২০ ব্যবহারের বর্তমান নিয়ম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এ অবস্থায় শিল্প বিশেষজ্ঞরা ব্রাজিল বা যুক্তরাষ্ট্রের আদলে নমনীয় জ্বালানি নীতির পরামর্শ দিচ্ছেন। উইলো ইন্ডিয়ার প্রধান বিক্রয় কর্মকর্তা রবীন্দ্র উতগিকর জানান, সবার জন্য একই মিশ্রণ বাধ্যতামূলক না করে জ্বালানির ধরন অনুযায়ী আলাদা মূল্য নির্ধারণ করা উচিত, যাতে চালকেরা গাড়ির বয়স ও প্রযুক্তি বুঝে ই-১০, ই-২০ কিংবা ই-৮৫ জ্বালানি বেছে নিতে পারেন। অভ্যন্তরীণ চাহিদার ঘাটতির মুখে আন্তর্জাতিক বাজারও ভারতীয় ইথানলের জন্য খুব বেশি সহায়ক হয়ে উঠতে পারেনি। প্রথম প্রজন্মের ইথানল রপ্তানিতে সরকারি বিধি নিষেধ থাকায় বিদেশের বাজারে প্রবেশাধিকার সীমিত। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দ্বিতীয় প্রজন্মের ইথানল রপ্তানির সুযোগ উন্মুক্ত হওয়ার পর ভারত বর্তমানে তানজানিয়া, অ্যাঙ্গোলা এবং কেনিয়ার মতো কয়েকটি দেশে সামান্য পরিমাণ অ-জ্বালানি ইথানল রপ্তানি করছে। এছাড়া গ্রেইন ইথানল প্রস্তুতকারক সংস্থা বা জিইএমএ প্রতিবেশী দেশ নেপালে ইথানল সরবরাহের জন্য জোর আলোচনা চালাচ্ছে। নেপাল তাদের ব্যবহৃত পেট্রোলে ১০ শতাংশ ইথানল মেশানোর পরিকল্পনা করলেও সেখানে নিজস্ব প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা না থাকায় ভারত এই সুযোগটি কাজে লাগাতে চায়। ভবিষ্যতে বাজার সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে পেট্রোলের বাইরে ডিজেল চালিত যানবাহনে ইথানল থেকে প্রস্তুতকৃত বায়ো-আইসোবুটানল মেশানোর নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাঞ্জ ইন্ডিাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিস গাইকোয়াড় জানান, এই বায়ো-আইসোবুটানল প্রযুক্তি এখন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ভারতে পেট্রোলের চেয়ে ডিজেলের ব্যবহার বহু গুণ বেশি হওয়ায় দিজেলে মাত্র দুই শতাংশ বায়ো-আইসোবুটানল মেশানো সম্ভব হলেও তা প্রায় তিন হাজার কোটি রুপিরও বেশি নতুন বাণিজ্যিক প্রকল্পের দ্বার উন্মোচন করতে পারে। বর্তমানে ভারতে অ-জ্বালানি খাতে মোট ইথানল চাহিদার প্রায় ১৮.৭ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে এক্সট্রা নিউট্রাল অ্যালকোহল বা ইএনএ-এর বাজার ২০২৫ সাল নাগাদ প্রায় ৩৮০ কোটি লিটারে পৌঁছেছে, যা প্রতি বছর গড়ে পাঁচ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ মানুষের পানীয় অভ্যাসে পরিবর্তন আসায় এবং দেশি মদের বদলে উন্নত ব্র্যান্ডের মদের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় এ খাতের ব্যবহার কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছে। তা সত্ত্বেও, দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো ইথানল কারখানাগুলোকে স্থায়ী অর্থনৈতিক লোকসান থেকে বাঁচাতে হলে সরকারকে দ্রুত নতুন নীতি গ্রহণ করে দেশীয় বাজার ও আন্তর্জাতিক রপ্তানি পথ সহজ করতে হবে। সূত্র: দ্য ইকোনোমিক টাইমস