বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরকালে তাঁর সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় শ্রম অভিবাসন প্রসঙ্গটি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
আলোচনায় আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ, দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্তকরণ, অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভাব্য প্রত্যাবাসনের বিষয় উঠে এসেছে। উভয় পক্ষই একমত হয়েছে যে শ্রমিক নিয়োগপ্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও কম ব্যয়বহুল, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমে এবং শ্রমিকেরা প্রকৃত সুবিধা পান।
একই সঙ্গে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে শ্রমিক নিয়োগব্যবস্থাকে ঘিরে শোষণ, অস্বচ্ছতা ও মানবিক উদ্বেগের বিষয়গুলো বাস্তব এবং এগুলো মোকাবিলায় দুই দেশকেই সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
বৈঠকের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ফলাফল হলো বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করতে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আয়োজন এবং একটি নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রণয়নের সিদ্ধান্ত। তবে এ অগ্রগতি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে ঘোষণাগুলো বাস্তবে শ্রমিকবান্ধব সংস্কারে রূপ নেয় কি না, তার ওপর।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি শুধু নতুন শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ নিয়ে উচ্ছ্বসিত হব, নাকি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি ন্যায়সংগত ও টেকসই শ্রম অভিবাসনকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করব? কারণ, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল সাফল্যের নয়; এটি অনিয়ম, শোষণ, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের প্রভাবের ইতিহাসও।
অতিরঞ্জিত প্রত্যাশার আড়ালে অস্বস্তিকর বাস্তবতা
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের আগে দেশের গণমাধ্যমের একটি বড় অংশ (কিছু সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টাল) ধারণা তৈরি করেছিল যে এ সফরের মূল অর্জন হবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত আবার উন্মুক্ত হওয়া। একাধিক প্রতিবেদনে বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
একই সময়ে কিছু দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার বক্তব্যও সেই প্রত্যাশাকে আরও বাড়িয়ে দেয়, যেখানে ইঙ্গিত ছিল যে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে এবং শুধু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি। ফলে শ্রমিক, পরিবার ও সংশ্লিষ্ট মহলে অতিরিক্ত আশাবাদ তৈরি হয়। কিন্তু বাস্তবে সফরের প্রধান ফল ছিল তাৎক্ষণিক বাজার উন্মুক্তকরণ নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থাকে স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও টেকসই করার বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্য।
এখানেই গণমাধ্যম ও সরকারি যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট। উচ্ছ্বাসের কেন্দ্রে বাজার খোলার সম্ভাবনা থাকলেও শ্রম অভিবাসনের কাঠামোগত সমস্যা, অর্থাৎ সিন্ডিকেট, অস্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা ও উচ্চ ব্যয় প্রায় অনুপস্থিত ছিল। খুব কমই আলোচিত হয়েছে অতীতে কেন মালয়েশিয়া বারবার নিয়োগ স্থগিত করেছে বা কেন বহু শ্রমিক উচ্চ ব্যয় সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত কাজ ও সুরক্ষা পাননি। জনপরিসরে প্রশ্ন ছিল ‘বাজার খুলছে কি না’, অথচ গুরুত্বপূর্ণ ছিল—কী ধরনের বাজার, কোন শর্তে, কত ব্যয়ে এবং কতটা স্বচ্ছতায় তা খুলছে। এসব প্রশ্ন উপেক্ষা করে কেবল বাজার উন্মুক্তকরণকে সাফল্য হিসেবে দেখানো নীতিগতভাবে বিভ্রান্তিকর।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রম অভিবাসনের ইতিহাস এক সফরে সমাধানযোগ্য নয়। গত এক দশকে এই বাজার বারবার বন্ধ বা স্থগিত হয়েছে, আবার সীমিত এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট অভিযোগও উঠেছে। অনেক শ্রমিক কয়েক লাখ টাকা খরচ করে গিয়ে প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি, কম মজুরিতে কাজ করেছেন, অনিয়মিত হয়েছেন বা অমানবিক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন।
দুঃখজনকভাবে গণমাধ্যমের একটি অংশ বাস্তবতাকে আড়াল করে শিরোনামনির্ভর উচ্ছ্বাসকে গুরুত্ব দিয়েছে। একইভাবে কিছু সরকারি বক্তব্যও প্রত্যাশাকে বাস্তবতার চেয়ে বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ দায়িত্বশীল যোগাযোগের কাজ হলো সম্ভাবনার পাশাপাশি শর্ত ও ঝুঁকি স্পষ্ট করা। শ্রমবাজার খোলা গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা যদি সংস্কার ও শ্রমিক সুরক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তবে তা ‘প্রত্যাশার রাজনীতি’কেই শক্তিশালী করে।
এ কারণেই মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যখন শ্রমিক শোষণ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেন, তা কেবল কূটনৈতিক বক্তব্য নয়; বরং কাঠামোগত সমস্যার স্বীকৃতি। প্রকৃতপক্ষে এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বাজার খোলা নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ, ন্যায়সংগত ও শ্রমিককেন্দ্রিক করার প্রয়োজনীয়তা। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—কী ধরনের শ্রমবাজার খোলা হচ্ছে এবং সেখানে শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে।
দালাল চক্রের লাভের হিসাব: শ্রমিকের ভাগ কোথায়
মালয়েশিয়ার শ্রম অভিবাসনে সবচেয়ে মৌলিক প্রশ্ন হলো—এ ব্যবস্থার প্রকৃত সুবিধাভোগী কে, শ্রমিক নাকি মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী?
গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া নিয়োগব্যবস্থাকে ঘিরে ‘সিন্ডিকেট’–বিতর্ক স্পষ্ট করেছে যে শ্রম অভিবাসন কেবল শ্রমবাজার নয়; বরং একটি উচ্চ মূল্যের নিয়ন্ত্রিত ব্যবসা। নিয়োগ সীমিত গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হলে প্রতিযোগিতা কমে, ব্যয় বেড়ে যায় এবং স্বচ্ছতার জায়গা সংকুচিত হয়। তখন বাজার পরিচালিত হয় নীতি বা স্বচ্ছতার বদলে প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে, যেখানে শ্রমিকের স্বার্থ নয়, বাণিজ্যিক লাভই মুখ্য হয়ে ওঠে।
এর ফলে শ্রমিক ক্রমে পণ্যসদৃশ হয়ে পড়েন, বিদেশে যেতে একজন শ্রমিককে অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়, অনেক সময় ঋণ নিতে হয়। সেই ঋণের চাপেই তাঁর প্রথম কয়েক বছর কেটে যায় কেবল ঋণ পরিশোধে; সঞ্চয় বা উন্নয়নের সুযোগ কমে যায় এবং অভিবাসনের প্রকৃত অর্থনৈতিক সুফলও হ্রাস পায়।
এর পরিপ্রেক্ষিতে নতুন এমওইউ বা সমঝোতা স্মারকের মূল পরীক্ষা হবে নিয়োগব্যবস্থাকে কতটা উন্মুক্ত, প্রতিযোগিতামূলক ও ডিজিটাল করা যায়, তার ওপর। স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে শ্রমবাজার খুললেও পুরোনো কাঠামোই ফিরে আসবে—সুফল শ্রমিকের কাছে না গিয়ে আবারও সীমিত কিছু মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হবে আর শোষণের চক্র অপরিবর্তিত থাকবে।
শুধু শ্রমিক পাঠানো নয়, শ্রমিক সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি শ্রমিকদের শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখেননি; বরং তাঁদের মানবিক মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।
বাংলাদেশে অভিবাসননীতির আলোচনায় শ্রমিকদের প্রায়ই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলা হয়। কিন্তু তাঁদের অধিকারের প্রশ্নটি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অথচ আধুনিক শ্রম অভিবাসনের মূলনীতি হওয়া উচিত ‘রাইটস-বেজড মাইগ্রেশন’, অর্থাৎ অধিকারভিত্তিক অভিবাসন। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রবণতা দেখা যায়—কতজন শ্রমিক বিদেশে গেলেন, কত রেমিট্যান্স এল, এসব সূচককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, আইনি সুরক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়।
যেকোনো নতুন শ্রমচুক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত শ্রমিকের অধিকার। চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরি, কর্মঘণ্টা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, পাসপোর্ট জব্দ নিষিদ্ধকরণ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের জন্য আইনি সহায়তা ও কনস্যুলার সেবা জোরদার করা জরুরি।
মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তিতে ন্যূনতম মজুরি, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, নিরাপদ আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য রোধ এবং দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি দূতাবাস ও শ্রম উইংয়ের সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে শ্রমিকেরা বাস্তব সহায়তা পান।
অনিয়মিত শ্রমিক: সমস্যা নয়, নীতিগত ব্যর্থতার লক্ষণ
বৈঠকে অনিয়মিত বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণের বিষয়টি আলোচিত হয়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিষয়টিকে শুধু মানবিক ইস্যু হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি আসলে বিদ্যমান শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার দুর্বলতার একটি প্রতিফলন। যখন একজন শ্রমিক বৈধ পথে বিদেশে গিয়ে পরবর্তী সময়ে অনিয়মিত হয়ে পড়েন, তখন এর পেছনে প্রায়ই নিয়োগব্যবস্থার ত্রুটি, তথ্যের ঘাটতি, চুক্তি লঙ্ঘন বা কর্মসংস্থানের সংকট কাজ করে। ফলে অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ প্রয়োজনীয় হলেও এটি সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।
মালয়েশিয়ায় বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত অবস্থানে চলে গেছেন। কেউ ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও থেকে গেছেন, কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউ চাকরি হারিয়ে অনিশ্চিত অবস্থায় পড়েছেন।
এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ দেশটির অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত। তাই বৈধকরণ কর্মসূচি শুধু মানবিক উদ্যোগ নয়; এটি অর্থনৈতিকভাবেও যুক্তিসংগত। বৈধ মর্যাদা পেলে শ্রমিকেরা আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির অংশ হতে পারবেন, কর দিতে পারবেন এবং শোষণের ঝুঁকি কমবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশও নিয়মিত রেমিট্যান্সপ্রবাহের সুবিধা পাবে। তবে বৈধকরণকে এককালীন সমাধান হিসেবে দেখলে চলবে না।
ভবিষ্যতে নতুন অনিয়মিত শ্রমিক তৈরি হওয়া ঠেকাতে নিয়োগব্যবস্থার ত্রুটি দূর করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রকৃত সমাধান হলো এমন একটি কাঠামো তৈরি করা, যেখানে শ্রমিকের কর্মপরিস্থিতি, চুক্তির বাস্তবায়ন এবং নিয়োগকর্তার জবাবদিহি নিশ্চিত থাকবে। অন্যথায় বৈধকরণ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর আবারও একই সমস্যা তৈরি হবে।
দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ নেই
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের শ্রমিকদের বড় অংশ এখনো অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ খাতে নিয়োজিত। এর ফলে তাঁদের আয় সীমিত থাকে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে অবস্থানও দুর্বল হয়। অন্যদিকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, নির্মাণ, সেবা ও আধুনিক উৎপাদন খাতে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশ এখন প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, আধুনিক উৎপাদন ও বিশেষায়িত সেবা খাতে দক্ষ জনশক্তি খুঁজছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে শ্রম অভিবাসনের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে হবে। শুধু বেশি শ্রমিক পাঠানো নয়; বরং বেশি দক্ষ শ্রমিক পাঠানোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সুতরাং নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত হওয়ার সুযোগকে শুধু সংখ্যাগত বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যায়ন করা উচিত নয়। বাংলাদেশকে কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল দক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একজন দক্ষ কর্মী শুধু বেশি আয় করেন না; তিনি কম ঝুঁকিতে থাকেন এবং দেশের জন্যও বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে সক্ষম হন। তাই দক্ষতা উন্নয়নকে অভিবাসননীতির কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে দেখতে হবে।
নতুন এমওইউ: কাগজের চুক্তি নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুযোগ
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে নতুন এমওইউর আলোচনা ইতিবাচক হলেও অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, কাগজে চুক্তি থাকলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না, বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। তাই মালয়েশিয়ার সঙ্গে নতুন চুক্তিতে নিয়োগপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আনা, নিয়োগ ব্যয়ের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ, যৌথ মনিটরিং ব্যবস্থা এবং স্বাধীন অভিযোগ নিষ্পত্তি কাঠামো বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ, শ্রম অধিকার সংগঠন ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করে পুরো ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
এমওইউকে কেবল প্রশাসনিক দলিল নয়; বরং শ্রম অভিবাসনব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারের সুযোগ হিসেবে দেখা প্রয়োজন। এর সাফল্য শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যায় নয়; বরং শ্রমিকের নিরাপত্তা, ব্যয় হ্রাস ও মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সক্ষমতায় নির্ধারিত হবে।
সবশেষে বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যাভিত্তিক সাফল্যের ধারণা থেকে সরে শ্রমিক সুরক্ষাকেন্দ্রিক নীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের আলোচনায় স্বচ্ছতা, বৈধকরণ ও শ্রমিক সুরক্ষার বিষয় উঠে আসা ইতিবাচক সংকেত হলেও এগুলো বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপ না নিলে অগ্রগতি টেকসই হবে না।
নতুন এমওইউ যদি নিয়োগব্যবস্থাকে স্বচ্ছ করে, দালালতন্ত্র কমায়, শ্রমিকের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করে এবং অধিকার ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করে, তবে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে; অন্যথায় অতীতের ব্যর্থতাই নতুন রূপে ফিরে আসবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ে ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে দিনের ও রাতের তাপমাত্রা। গত কয়েকদিন ধরে তাপমাত্রা ১৮ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করলেও আজ সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছে ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আজ রোববার সকাল ৯টায় তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে এ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। এর আগে, গতকাল শনিবার একই সময়ে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড হয়েছিল ১৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ওইদিন পঞ্চগড়ে দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩১ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। রাত থেকে ভোর পর্যন্ত জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘন কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। ভোরের দিকে সড়ক-মহাসড়ক ও খোলা মাঠ কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। কুয়াশার কারণে সকালে যানবাহনগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে। স্থানীয়রা জানান, সন্ধ্যার পর থেকেই ঠান্ডার অনুভূতি বাড়তে থাকে। ভোরে কুয়াশার সঙ্গে হিমেল বাতাস শীতের আবহ আরও স্পষ্ট করে তুলছে। তবে দিনের বেলায় রোদ উঠলে শীতের অনুভূতি কমে যাচ্ছে। তেঁতুলিয়া আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জিতেন্দ্রনাথ রায় জানান, তাপমাত্রা ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে। রাত ও ভোরে কুয়াশার প্রবণতাও বাড়ছে। তবে দিনের বেলায় তাপমাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকায় বেশ গরম এবং রাতে ও ভোরে ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে তাপমাত্রা আরও কমে শীতের অনুভূতি বাড়তে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল তরুণের টিউশনির সঞ্চিত সামান্য টাকায় ফুটপাতের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বর্ণমালা শেখানোর মধ্য দিয়ে ২০১২ সালে শুরু হয়েছিল একটি নীরব মানবিক বিপ্লবের। ১৪ বছর পেরিয়ে তা আজ রূপান্তরিত হয়েছে এক সুবিশাল আশার বাতিঘরে। ‘মাস্তুল ফাউন্ডেশন’ নামের সেই স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাটি আজ কেবল দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিঃস্ব, আশ্রয়হীন ও প্রবীণদেরই ভরসাস্থল নয়; বরং সীমানা পেরিয়ে ফিলিস্তিনের গাজা, নেপাল ও সুদানের যুদ্ধ ও দুর্যোগকবলিত বিপন্ন মানুষের কাছেও পৌঁছে দিচ্ছে বাংলাদেশের ভালোবাসা ও মানবিকতার স্পর্শ। বাংলাদেশ এনজিও বিষয়ক ব্যুরো, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (যৌথ স্টক) নিবন্ধিত এই অলাভজনক ও অরাজনৈতিক সংস্থাটি কেবল জরুরি ত্রাণ বিতরণের মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ থাকছে না। বরং শিক্ষা, পুষ্টি, স্বাবলম্বিতা, স্বাস্থ্যসেবা ও আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তার মাধ্যমে এক টেকসই সামাজিক রূপান্তর ঘটিয়ে চলেছে। মাস্তুল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাকালীন দর্শন ও লক্ষ্য তুলে ধরে সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক কাজী রিয়াজ রহমান রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস’কে বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি কাজের মূল উদ্দেশ্য মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আমরা বিশ্বাস করি, একজন মানুষকে সাময়িকভাবে সাহায্য করার পাশাপাশি তাকে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ। একইভাবে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে মানুষ যখন মানবিক সংকটে পড়ে, তখন সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।’ তিনি জানান, মাস্তুল ফাউন্ডেশন তার অগ্রযাত্রার ১৫ বছরে পদার্পণ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অবদান, নিজস্ব সেবামূলক প্রকল্পসমূহ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংকট মোকাবিলায় বহুমুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক সংঘাত ও দুর্যোগকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে মাস্তুল ফাউন্ডেশন। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্যমতে, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ ও চরম অবরোধের প্রেক্ষাপটে বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন রক্ষায় নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে সংস্থাটি। আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গাজায় জরুরি ভিত্তিতে সুপেয় পানি, শুকনো ও রান্না করা পুষ্টিকর খাবার এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছানোর পাশাপাশি আহত শিশু ও রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা হচ্ছে। একইভাবে নেপালে সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত দুর্গতদের মাঝে জরুরি খাদ্য সামগ্রী ও বিশুদ্ধ পানি বিতরণের পাশাপাশি ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়া পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে নগদ অর্থ ও নির্মাণসামগ্রী দিয়ে সহায়তা করা হয়েছে। এছাড়া সুদান সংকট ও গৃহযুদ্ধের ফলে সৃষ্ট তীব্র দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুচ্যুত পরিবার ও অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের মাঝে জরুরি খাদ্য সহায়তা পার্সেল বিতরণ কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করেছে সংস্থাটি। বৈশ্বিক অঙ্গনে এই মানবিক কার্যক্রম প্রসঙ্গে কাজী রিয়াজ রহমান বাসস’কে বলেন, ‘যুদ্ধ ও সংঘাতের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে শিশুরা। গাজা থেকে শুরু করে সুদান কিংবা নেপালে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখে পড়া মানুষের করুণ চিত্র আমাদের ব্যথিত করে। দেশের মানুষের ভালোবাসা ও সহযোগিতাকে পাথেয় করে আমরা বিশ্বের যেখানেই বিপন্ন মানুষ পাই, সেখানেই মানবিক সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’ টেকসই স্বাবলম্বিতা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুধা মুক্তি ও মানসম্মত শিক্ষা অর্জনে সরকারের সহযোগী হিসেবে মাস্তুল ফাউন্ডেশন কার্যকর ভূমিকা রাখছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, জাকাত ও সাদকার শরিয়াহসম্মত ব্যবহারের মাধ্যমে দরিদ্র ও কর্মক্ষম মানুষকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার মতো কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। অসচ্ছল পরিবারগুলোর হাতে সেলাই মেশিন, উন্নত জাতের গাভী, ছাগল, হাঁস-মুরগি, রিকশা-ভ্যান এবং বীজ ও সার তুলে দিয়ে উপার্জনের স্থায়ী পথ তৈরি করা হচ্ছে, যাতে তারা ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে বেকার তরুণ-তরুণীদের বিনামূল্যে আইটি প্রশিক্ষণ, মোটর ড্রাইভিং ও কারিগরি শিক্ষা দিয়ে স্বাবলম্বী করা হচ্ছে বলে জানায় প্রতিষ্ঠানটি। এ বিষয়ে মাস্তুল প্রধান বলেন, ‘মাস্তুলের লক্ষ্য হলো সহায়তা পাওয়া একজন মানুষ যেন ভবিষ্যতে নিজের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতা অর্জনের পাশাপাশি আরও অসচ্ছল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যোগ্য হয়ে ওঠে। মানুষের দেওয়া জাকাত, সাদকা ও দানের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা তৈরি করতে চাই— যা জীবন পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করে।’ ১৫ স্থানে ‘মেহমানখানা’ ও বিনামূল্যে খাবার সংস্থাটি জানায়, দেশে একটি ক্ষুধামুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের নিয়মিত উদ্যোগ ‘মেহমানখানা’র মাধ্যমে রাজধানীর ১৫টি নির্ধারিত জনবহুল পয়েন্টে প্রতিদিন হাজারো অসহায়, পথচারী, দিনমজুর ও প্রবীণদের মাঝে বিনামূল্যে মানসম্মত রান্না করা খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। খাদ্য সহায়তার ক্ষেত্রে কোনো করুণা নয়, বরং গ্রহীতার আত্মমর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করাকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয় ফাউন্ডেশন। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় ৩০ লাখ বৃক্ষরোপণ মাস্তুল ফাউন্ডেশন জানায়, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা এবং সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে সংস্থাটি দেশব্যাপী ৩০ লাখ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তিক ও উপকূলীয় অঞ্চল, উত্তরবঙ্গের খরাপ্রবণ এলাকা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এতিমখানা এবং মহাসড়কের দুই পাশে কয়েক লাখ ফলজ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ ও নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। আশ্রয়হীনদের জন্য প্রবীণ নিবাস ও শেষ বিদায়ের মর্যাদা সংস্থাটি জানিয়েছে, রাজধানীর হাজারীবাগের বারইখালিতে নিজস্ব ভবনে এতিম ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য আবাসিক মাদ্রাসা, স্কুল ও এতিমখানা পরিচালনা করছে মাস্তুল। এছাড়া নিঃসঙ্গ প্রবীণদের জন্য একটি ১০ তলা বিশিষ্ট ‘ইসলামিক শেল্টারহোম কমপ্লেক্স’ নির্মাণাধীন রয়েছে—যেখানে আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম, চিকিৎসাকেন্দ্র ও কারিগরি প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থাকবে। এর পাশাপাশি আর্সেনিকপ্রবণ ও সামুদ্রিক উপকূলীয় দুর্গম এলাকায় গভীর নলকূপ ও ওয়াটার ফিল্টারিং প্ল্যান্ট স্থাপন করে সুপেয় পানির সংস্থান করা হয়েছে। একইসাথে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ অনুমোদনে বেওয়ারিশ ও পরিচয়হীন মরদেহের ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী গোসল, জানাজা ও দাফনকাজ পরিচালনা করছে সংস্থাটি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একটি আধুনিক গোসলখানা স্থাপনের উদ্যোগও এতে রয়েছে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জানা যায়, মাস্তুল ফাউন্ডেশন তাদের সেবা কার্যক্রমকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করতে সরকারের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের প্রশাসনিক কাঠামোতে যুক্ত করেছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠাতা কাজী রিয়াজ রহমানের নেতৃত্বে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সাবেক সিনিয়র সচিব এম এ আকমল হোসেন আজাদ, ডিরেক্টর হিসেবে মেজর জেনারেল (অব.) কাজী ইফতেখার-উল-আলম এবং চিফ পাবলিক রিলেশনস অফিসার হিসেবে পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মতিউর রহমান দায়িত্ব পালন করছেন। প্রতিবছর আন্তর্জাতিক মানের অডিট ফার্মের মাধ্যমে আর্থিক হিসাব নিরীক্ষা এবং শরিয়াহ বোর্ডের তদারকিতে জাকাত তহবিল পরিচালিত হয়। কাজী রিয়াজ রহমান বলেন, ‘একটি শিশুর নিরাপদ শৈশব ও শিক্ষার সুযোগ, একটি দরিদ্র পরিবারের স্থায়ী উপার্জন, একজন প্রবীণের নিরাপদ আশ্রয় কিংবা যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি পরিবারের মুখে খাবার পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল অঙ্গীকার। নতুন এই অধ্যায়ে দেশের মানুষের সহযোগিতাকে শক্তি করে বাংলাদেশে মানবিক কার্যক্রম আরও বিস্তৃত করার পাশাপাশি বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে বিপন্ন মানুষের পাশে আমরা থাকতে চাই।’
মাগুরায় পৌর যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সাকের হোসেনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। বুধবার (২১ অক্টোবর) দুপুরে মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের সময় তার মাথার ভেতর থেকে একটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় হত্যার কারণ অনুসন্ধান এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবিতে শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। ময়নাতদন্তে মিলল গুলি মাগুরা সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত মেডিকেল অফিসার ডা. কৃষ্ণ দাস বিশ্বাস জানান, বুধবার দুপুর দেড়টার দিকে ময়নাতদন্তের সময় সাকের হোসেনের মাথা থেকে ছোট আকারের একটি গুলি বের করা হয়। এটি পিস্তল অথবা রিভলভারের গুলি হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও তদন্তের পরই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। এর আগে বুধবার ভোর ৬টার দিকে মাগুরা বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টারের ভেতর থেকে সাকের হোসেনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়রা তাকে সেখানে পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করে মাগুরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক পরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। চিকিৎসকেরা তার মাথার পেছনে ক্ষতচিহ্ন দেখতে পান। পরে বিষয়টি পুলিশকে জানানো হয়। বাস কাউন্টারের ভেতর থেকে মরদেহ উদ্ধার নিহত সাকের হোসেন মাগুরা শহরের পারনান্দুয়ালী বেপারীপাড়া এলাকার মৃত কুতুব উদ্দিনের ছেলে। তিনি পৌর যুবদলের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি বাস টার্মিনালের রয়েল এক্সপ্রেস কাউন্টারে কাউন্টার মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। তার বড় ভাই ঠিকাদার রাজমীর হোসেন দাবি করেন, তার ভাইকে পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। তবে কারা এবং কী কারণে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো তথ্য দিতে পারেননি তিনি। হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভ সাকের হোসেনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। পরে বাস টার্মিনাল এলাকায় প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে বক্তব্য দেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মনোয়ার হোসেন খান। এ সময় বক্তারা হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। তদন্ত করছে পুলিশ মাগুরার পুলিশ সুপার মোল্লা আজাদ হোসেন জানান, ময়নাতদন্তে সাকের হোসেনের মাথা থেকে একটি গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর বিষয়ে আরও বিস্তারিত জানা যাবে। তিনি আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান এবং জড়িতদের শনাক্ত করতে পুলিশ প্রযুক্তিগত ও প্রচলিত তদন্তপদ্ধতি ব্যবহার করে কাজ করছে। তদন্তে অগ্রগতি হলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে। পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করাই এখন তদন্তের প্রধান লক্ষ্য।