বছর দুয়েক ধরে ভারতের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে বাংলাদেশের, তবে রাজনৈতিক সংকটের বিপরীত চিত্রের দেখা মিলছে অর্থনীতিতে। বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে, আর প্রতিবেশী দেশটি থেকে পণ্য আমদানি চলছে আগের মতই।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) মঙ্গলবার রপ্তানি আয়ের দেশভিত্তিক যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে— গত ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-অগাস্ট) ভারতে ৩৩ কোটি ৫২ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।
এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৭ দশমিক ৬৭ শতাংশ বেশি। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই-অগাস্ট সময়ে ভারতের বাজারে ৩১ কোটি ১৩ লাখ ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল।
এই প্রবৃদ্ধি অপ্রচলিত বা নতুন বাজারের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। অপ্রচলিত বাজারের মধ্যে এই দুই মাসে চীনে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ২ দশমিক ৫১ শতাংশ। অস্ট্রেলিয়াতেও বেড়েছে ২ দশমিক ৫১ শতাংশ।
জাপানে শূন্য দশমিক ৩০ শতাংশ নেতিবাচক (নেগেটিভ) প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
ইপিবির এ তথ্যই বলছে, ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপড়েনের প্রভাব পড়েনি বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যে। ভারত থেকে পণ্য আসা যেমন কমেনি; তেমনই বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি তো কমেইনি, বরং বাড়ছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখন ৯০০ কোটি (১২ বিলিয়ন) ডলারের বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশ যত পণ্য আমদানি করে, তার অনেক কমই রপ্তানি করে থাকে।
অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২১-২২ অর্থবছরে ভারতে পণ্য রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ আয় করেছিল ১৯৯ কোটি ১৪ লাখ (১.৯৯ বিলিয়ন) ডলার, যা ছিল ২০২০-২১ অর্থবছরের চেয়ে ৫৫ দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। ভারতে রপ্তানি করে বাংলাদেশের ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় সেটিই প্রথম।
তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেই রপ্তানিতে ভাটা পড়ে; এক ধাক্কায় প্রায় ১১ দশমিক ৬৩ শতাংশ কমে নেমে আসে ১৫৬ কোটি ৯২ লাখ (১.৫৭ বিলিয়ন) ডলারে।
পরের বছরেই (২০২৪-২৫ অর্থবছর) অবশ্য ঘুরে দাঁড়ায়; সাড়ে ১২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। ওই আর্থিক বছরে ভারতে ১৭৬ কোটি ৪২ লাখ (১.৭৬ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ।
গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরে সার্বিক পণ্য রপ্তানিতে শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ নেতিবাচক (নেগেটিভ) প্রবৃদ্ধি হয়। প্রায় সব দেশেই রপ্তানি কমে; ভারতে কমে মাত্র ১ শতাংশ।
বাংলাদেশ গত অর্থবছরে ভারতের বাজারে ১৭৪ কোটি ৬২ লাখ (১.৭৫ বিলিয়ন) ডলারের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে; ২০২৪-২৫ আর্থিক বছরে এই অঙ্ক ছিল প্রায় একই, ১৭৬ কোটি ৪২ লাখ (১.৭৬ বিলিয়ন) ডলার।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের শুরুতে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়; তা অগাস্টের শুরুতেই জনবিস্ফোরণে রূপ নিলে পতন ঘটে শেখ হাসিনার সরকারের। তিনি আশ্রয় নেন ভারতে।
এরপর থেকে ঢাকা-নয়া দিল্লি কূটনৈতিক টানাপড়েন চললেও নভেম্বরে এসে তা তীব্রতা পায় হিন্দু ধর্মীয় নেতা চিন্ময় ব্রহ্মচারীকে গ্রেপ্তার ঘিরে।
তার জেরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে এক বিক্ষোভ থেকে বাংলাদেশের সহকারী হাই কমিশনে হামলা হয়। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতারা বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধেরও হুমকি দেন।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালের ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ষষ্ঠ বিমসটেক শীর্ষ সম্মেলনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বহু প্রতীক্ষিত বৈঠক হয়। তবে ওই বৈঠকেও দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক উষ্ণ হয়নি।
এসবের মধ্যেই গত বছরের ৯ এপ্রিল ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে ভারতের বন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে বাংলাদেশের পণ্য যাওয়ার ব্যবস্থা প্রত্যাহার করে ভারত সরকার।
ভারতে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাতপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং প্লাস্টিক দ্রব্য। এছাড়া কিছু সুতা ও বস্ত্রজাত পণ্যও রপ্তানি হয়। প্রতিবেশী দেশটিতে মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই তৈরি পোশাক।
গত বছরের ১৭ মে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর (ডিজিএফটি) ঘোষণা দেয়, শুধু ভারতের নবসেবা ও কলকাতা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে দেশটির আমদানিকারকেরা বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি করতে পারবেন।
পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামে ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন (এলসিএস)/ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট (আইসিপি) দিয়ে ফল, ফলের স্বাদযুক্ত পানীয়, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য, সুতা, সুতার উপজাত, আসবাবপত্র রপ্তানি করা যাবে না।
পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্ধা ও ফুলবাড়ী শুল্ক স্টেশন বা এলসিএসের জন্যও একই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।
এরপর ২৭ জুন বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কাপড় আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত।
ভারতে প্রায় সব পণ্যই স্থলপথে রপ্তানি হত। এর মধ্যে বেশিরভাগই যেত বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে।
ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির তালিকায় পাট ও পাটজাত পণ্য অন্যতম প্রধান। দেশটিতে মোট রপ্তানি আয়ের ২৫ শতাংশের মত আসে এই খাত থেকে।
১৭ মের প্রজ্ঞাপনে ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ডিজিএফটি জানায়, বাংলাদেশ থেকে এসব পণ্য নবসেবা বা জওহরলাল নেহরু সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতে ঢুকতে পারবে। বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটানে এসব পণ্য রপ্তানিতে কোনও বিধিনিষেধ নেই।
তবে এসব পণ্য পুনরায় রপ্তানি করা যাবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের মধ্য দিয়ে যেসব পণ্য নেপাল ও ভুটানে যাবে, সেসব পণ্য নেপাল বা ভুটান থেকে ভারতে যেতে পারবে না।
দেশের বস্ত্র ও স্পিনিং শিল্প সুরক্ষার জন্য ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে বাংলাদেশ সরকার।
তার জেরেই ভারত সরকার ধাপে ধাপে স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করেছে বলে ধারণা করা হয়।
মাঝে বাংলাদেশের ক্রিকেটার মোস্তাফিজুর রহমানকে নিয়েও দুদেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। মোস্তাফিজকে আইপিএলে খেলতে না দেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় ভারতে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ। এ নিয়ে দুদেশের সম্পর্কের আরও অবনতি দেখা দিয়েছিল।
উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হুমকির মুখে গত ৩ জানুয়ারি মোস্তাফিজকে আইপিএল থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দেয় ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড বিসিসিআই। এ বছরের আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সে (কেকেআর) খেলার কথা ছিল তার।
নিলামের মাধ্যমে দলভুক্ত করা মোস্তাফিজকে এভাবে বাদ দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয় বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় অন্তবর্তী সরকার।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। বিষয়টি নিয়ে অন্তবর্তী সরকারের দেড় বছরে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু দুদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি।
এরই মধ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার এখন দেশ পরিচালনা করছে।
এই সরকারের সাড়ে ছয় মাস পার হয়েছে। কিন্তু দুদেশের সম্পর্কের কোনো উন্নতি হয়নি। আগের মতই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ চলছে।
সবশেষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আমন্ত্রণের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখনো ভারত সফরে না যাওয়ায় টানাপড়েন কাটেনি।
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ মনে করেন, সম্পর্ক ভালো থাকলে ভারতে রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “নানা বাধাবিপত্তির মধ্যেও ভারতে আমাদের রপ্তানি কিন্তু ভালোই বাড়ছিল। মাঝে আমরা ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিলাম। অনেক দেশে আমাদের রপ্তানি কমলেও বৈরি সম্পর্কের মধ্যেও কিন্তু ভারতে বাড়ছে।”
তিনি বলেন, “ভারতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের কদর বাড়ছে। দেড়শ কোটি লোকের চাহিদা মেটাতে ভারতকে বাংলাদেশ থেকে পোশাক কিনতেই হবে।
“ভারতে পোশাক তৈরি করতে যে খরচ হয়, বাংলাদেশ থেকে আমদানি করলে তার চেয়ে অনেক কম পড়ে। সে কারণে সব হিসাব-নিকাশ করেই তারা বাংলাদেশ থেকে বেশি করে পোশাক কিনবে।”
ভারতের বাজারে যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিক কারণে তা যেন নষ্ট হয়ে না যায় তা চাইছেন পোশাক ব্যবসায়ীরা।
নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের তৈরি পোশাকের খুবই সম্ভাবনা এবং ভালো বাজার হয়ে উঠছিল ভারত। এটা ধরে রাখতে হবে। সেজন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে যে সম্পর্ক দেখা দিয়েছে, তার সম্মানজনক সমাধান করতে হবে। মনে রাখতে হবে, পাশের দেশ হওয়ায় ভারতে পণ্য রপ্তানি করতে আমাদের পরিবহন খরচ অনেক কম হয়। সে কারণে ভারতে আমাদের রপ্তানি যত বাড়বে, ততই ভালো।
“তবে সবার আগে একটা কথা—গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার দ্রুত সমাধান করতে হবে। তা নাহলে অন্যান্য বাজারের পাশাপাশি ভারতের বাজারও হাতছাড়া হয়ে যাবে। মহাবিপদে পড়ব আমরা।”
বাংলাদেশের ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক সম্পর্কের যে অবনতি হয়েছে, তার উন্নতি না হলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের ইতিবাচক ধারা ধরে রাখা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান।
তিনি বলেন, “ভারতে বাংলাদেশি পণ্যের রপ্তানি আরও বাড়ানো সম্ভব। সেজন্য রপ্তানিকারকদের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে।
“ভারতের বাজারে অনেক সময় অযৌক্তিকভাবে অশুল্ক বাধা আরোপ করা হয়। এই বাধা দূর করার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগের পাশাপাশি বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং রপ্তানিকারকদের নেগোসিয়েশন দক্ষতা বাড়াতে হবে।”
এখনও বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি
ভারতের ডিজিএফটি’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ ভারতীয় অর্থবছরে দুই দেশের মধ্যে মোট ১ হাজার ২৩৬ কোটি ৭৫ লাখ (১২.৩৬ বিলিয়ন) ডলারের বাণিজ্য হয়েছে।
এর মধ্যে বাংলাদেশ ভারত থেকে ১ হাজার ৫৮ কোটি ৭৪ লাখ (১০.৫৮ বিলিয়ন) ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য আমদানি করেছে। বিপরীতে দেশটিতে পণ্য রপ্তানি করে ১৭৮ কোটি ১৭ লাখ (১.৭৮ বিলিয়ন) ডলার আয় করেছে বাংলাদেশ।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ২০২৫-২৬ ভারতীয় আর্থিক বছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৮৮০ কোটি ৫৭ লাখ ডলার।
ভারতে আর্থিক বছর শুরু হয় এপ্রিল মাস থেকে; শেষ হয় মার্চে।
গত ২৪ আগস্ট সচিবালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
ওই বৈঠক শেষে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলারের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। তবে গত দেড় বছরে কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হওয়ায় বাণিজ্যিক কার্যক্রমে কিছুটা ধীরগতি এসেছে।
“এসব সমস্যা চিহ্নিত করে কীভাবে ভবিষ্যতে দুই দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক আরো সহজ ও কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।”
ভারতীয় হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, “পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই একটি স্থায়ী সমাধান। বাংলাদেশের উন্নয়নের জন্য আমরা একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। এ পারস্পরিক নির্ভরশীলতাই আমাদের একটি পরিবারের মতো করে তোলে। আমরা এ সম্পর্ককে আরো এগিয়ে নিতে চাই।”
তিনি বলেছিলেন, “যখন অর্থনীতি রাজনীতির চেয়ে এগিয়ে যায়, তখন রাজনীতিও ধীরে ধীরে তার পেছনে চলে আসে।”
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
প্যাথলজি ও রেডিওলজি রিপোর্টে শুধু সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ বা চিকিৎসকের নিজ হস্তে স্বাক্ষর থাকা বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একইসঙ্গে রিপোর্টে এখন থেকে ইলেকট্রনিক বা অনলাইন স্বাক্ষর আর গ্রহণযোগ্য হবে না বলেও জানানো হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহ) ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে। নতুন নির্দেশনায় বলা হয়েছে, যে চিকিৎসক বা বিশেষজ্ঞ রিপোর্টে স্বাক্ষর করবেন, তিনি অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এছাড়া, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকৃত বিশেষজ্ঞ বা মেডিকেল অফিসারের স্বাক্ষর ছাড়া কোনো রিপোর্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এর মাধ্যমে রোগীর জন্য নির্ভরযোগ্যতা এবং স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত করা হবে। আদেশে বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোকে শুধু তাদের ট্রেড লাইসেন্সে উল্লিখিত ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করতে হবে। কোনো স্থাপনা বা ঠিকানা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা নিষিদ্ধ। এমনকি অটো-জেনারেটেড বা সফটওয়্যার-ভিত্তিক রিপোর্ট থাকলে, তা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যাচাই ও স্বাক্ষরিত না হলে গ্রহণযোগ্য হবে না। রিপোর্ট স্বাক্ষরকারী চিকিৎসকরা অবশ্যই বিএমডিসির রেজিস্টার্ড মেডিকেল গ্র্যাজুয়েট হতে হবে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে রিপোর্টে তথ্যের সঠিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি, সব যন্ত্রপাতি ও রি-এজেন্ট ব্যবহার করার ক্ষেত্রে ২০১৫ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন গাইডলাইন অনুসরণ করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ল্যাবগুলোর যন্ত্রপাতি নিয়মিত ক্যালিব্রেশন করতে হবে। এটি পরীক্ষার ফলাফলের নির্ভুলতা বজায় রাখতে অপরিহার্য। এছাড়া ল্যাবে রেজিস্টার মেইনটেইন করা এবং সমস্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার রেকর্ড সংরক্ষণ করাও বাধ্যতামূলক। একইসঙ্গে ল্যাবের বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ করতে হবে বলেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অধিদপ্তর বলছে, এর মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং পরিবেশ দূষণ কমানো সম্ভব। এসব নিয়মাবলি বাস্তবায়ন করলে বেসরকারি ল্যাবগুলোকে তাদের সেবা আরও মানসম্মত করতে হবে বলেও জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনলাইন বা অটোমেটেড রিপোর্টে ত্রুটি বা জালিয়াতির সম্ভাবনা থাকে। নতুন নিয়মের মাধ্যমে রোগীর রিপোর্টে সঠিকতা নিশ্চিত হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা আরও নিরাপদ হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, এই নতুন নিয়মাবলির উদ্দেশ্য স্বাস্থ্যসেবা প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধি করা। এই পদক্ষেপ রোগীদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
পণ্য রপ্তানিতে বৈচিত্র্য আনতে গত সেপ্টেম্বরে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টি বা নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তবে নিয়মের কড়াকড়িতে সুবিধাটি নিতে খুব বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে না রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো। ফলে সরকারের উদ্দেশ্য সফল হচ্ছে না। রপ্তানিও বাড়ছে না। একাধিক রপ্তানিকারক বলছেন, ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে শুল্ক-কর ছাড়া কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও এ ক্ষেত্রে বেশ কিছু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা রেখে দিয়েছে এনবিআর। সে কারণে বাড়তি সময় ও অর্থ খরচের পাশাপাশি হয়রানির আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা এ সুবিধা নিতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এদিকে ব্যবসায়ীরা খুব বেশি আগ্রহ না দেখালেও এ সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন করে মোটরসাইকেল, স্পিডবোট, মৎস্য প্রক্রিয়াজাত, হস্তশিল্পপণ্য, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, ডায়াপার ও স্যানিটারি ন্যাপকিন, ক্রোকারিজ, তাঁবু, রিসাইকেলড কটন ব্যাগ এবং টেরিটাওয়েল খাতে বন্ড লাইসেন্স ছাড়া শুধু ব্যাংক নিশ্চয়তার বিপরীতে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ বিস্তৃত করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে রপ্তানি খাতের জন্য এ সুবিধা দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে এনবিআর। তাতে বলা হয়, শুল্কমুক্ত এ সুবিধা গ্রহণের জন্য কাঁচামাল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে আমদানি করা পণ্যের ওপর কাস্টমসের পক্ষ থেকে নিরূপিত শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থের ব্যাংক নিশ্চয়তা জমা দিতে হবে। জানতে চাইলে ফুটওয়্যার, লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সহসভাপতি নাছির খান প্রথম আলোকে বলেন, সরকার যে সুবিধা দিয়েছে, সেটি কাজে লাগাতে হলে কাঁচামাল আমদানির আগে ও পরে একাধিক অনুমতি নিতে হবে। শুরুতে কাঁচামাল আমদানির আগে একবার অনুমতি নিতে হবে। আবার আমদানির পর ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় করতেও অনুমতি লাগবে। এই আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুবিধাটি কোনো কাজে লাগছে না। সুবিধাটি কার্যকর করতে হলে মূল্য সংযোজন পদ্ধতিতে যেতে হবে। ১০০ মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানি করলে ১২০-১৩০ ডলারের রপ্তানি করতে হবে—এমন শর্তে শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দিতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জাপানে এ ব্যবস্থা চালু রয়েছে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। এই রপ্তানি তার আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, প্রকৌশলপণ্য ও হিমায়িত পণ্য রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হলেও তৈরি পোশাক ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। কেন সুবিধাটি নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা এনবিআরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রপ্তানির ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় কাঁচামালের ওপর প্রযোজ্য শুল্ক–করের সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংক নিশ্চয়তার মাধ্যমে কাস্টম হাউস বা স্টেশনে জমা দিতে হবে। প্রতি একক পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তালিকা কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের কমিশনারের কাছে দাখিল করতে হবে। কমিশনার সেটি যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যয় আমদানিকারককে বহন করতে হবে। এরপর কমিশনার অনুমতিপত্র দিলে কাঁচামাল আমদানি করা যাবে। তারপর পণ্য রপ্তানির পর কমিশনারের ছাড়পত্র প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যাংক নিশ্চয়তার অর্থ ছাড় হবে। প্রজ্ঞাপন জারির সময় এনবিআর আশা প্রকাশ করে বলেছিল, বন্ড লাইসেন্স না থাকা সত্ত্বেও শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়ার ফলে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারবে। এতে রপ্তানিযোগ্য পণ্যের বৈচিত্র্যের পাশাপাশি দেশের রপ্তানি-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে। আসবাব খাতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান হাতিলের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম এইচ রহমান বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, সেখানে কারিগরি কিছু সমস্যা রয়েছে। ক্রয়াদেশ পাওয়ার পর অনুমতি নিয়ে কাঁচামাল আমদানি করতে হবে। আমাদের খাতে ১২-২০-২৫ হাজার ডলারের ছোট ছোট ক্রয়াদেশ আসে। ফলে বারবার অনুমতি নেওয়া খুবই কঠিন। আবার আসবাবের জন্য প্রয়োজনীয় লেকার ও বোর্ড আমদানিতে এ সুযোগ নেই। ফলে আমরা এ সুবিধার আওতায় কাঁচামাল আমদানির পথে যাইনি।’ সেলিম এইচ রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের আগে সহজে আমদানির এ সুযোগ দিতে হবে। তারপর কোথাও কোনো নিয়মের ব্যত্যয় হলে শাস্তি দিতে হবে। কিন্তু সুবিধা দেওয়ার আগেই হাত-পা বেঁধে রাখা হয়েছে। এ কারণে বাস্তবে এ ধরনের সুবিধা কাজে লাগছে না। এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, গত সেপ্টেম্বরে চালু হওয়ার পর অল্প কিছু প্রতিষ্ঠান সুবিধাটি নিয়েছে। যে বিধান করা হয়েছে, তাতে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা যদি কোনো সমস্যায় পড়েন, তাহলে তা পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়ার সঙ্গে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনায় মামলা হলে নিজেকেই প্রধান আসামি করার কথা বলেছেন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। শনিবার (২৪ অক্টোবর) দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। পরে তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী জাকির হোসেন সাংবাদিকদের কাছে বক্তব্যটি পৌঁছে দেন। গত বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) রাতে সরাইল থানা ভবনে ওসির সঙ্গে রুমিন ফারহানার কথা-কাটাকাটির ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় পুলিশ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নিজের অবস্থান তুলে ধরে এ বক্তব্য দেন তিনি। লিখিত বক্তব্যে রুমিন ফারহানা জানান, ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে গত ২৩ অক্টোবর জেলা পুলিশ সুপারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি। প্রশাসনের প্রতি সম্মান রেখে অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপের অপেক্ষায় রয়েছেন। তাঁর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওসির বিরুদ্ধে কী ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা দেখার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবেন বলেও জানান তিনি। যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করবেন বলে উল্লেখ করেন সংসদ সদস্য। এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে সরাইল থানায় ওসির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁর বাগ্বিতণ্ডা হয়। অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ এবং দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের সময় পুলিশি নিরাপত্তা না পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় রুমিন ফারহানার সঙ্গে থাকা এক ব্যক্তি ওসির বিরুদ্ধে তাঁর কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ করেন। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেন ওসি মঞ্জুর কাদের ভূঁইয়া। তাঁর দাবি, ওই ব্যক্তিকে শিখিয়ে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে রুমিন ফারহানা ওসিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘আপনি তো বিরাট আওয়ামী লীগ ছিলেন। আপনার হিস্ট্রি তো আমি জানি, স্যার। যাই হোক, সেটা নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই।’
চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের একটি মিছিলের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবার (২৪ অক্টোবর) ভোরে অনুষ্ঠিত ওই মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ৮ থেকে ১০ জনকে শনাক্ত করার কথা জানিয়েছে পুলিশ। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হচ্ছে। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শনিবার ভোর আনুমানিক ৬টার দিকে বাঁশখালী উপজেলার কাথরিয়া ইউনিয়নে মিছিলটি বের করা হয়। বাঁশখালী উপজেলা ছাত্রলীগ এবং বোরহান উদ্দিন নামের এক নেতার ব্যানারে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয় বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া প্রায় দুই থেকে আড়াই মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, গ্রামের একটি কাঁচা সড়ক ধরে ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি দল মিছিল করছে। তাদের হাতে ব্যানার ও আওয়ামী লীগের পতাকা ছিল। মিছিলে বহন করা ব্যানারে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘শিক্ষা শান্তি প্রগতি’, ‘ডিসেম্বর বিজয় মাসে স্বাগত মিছিল’ এবং ‘শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে’সহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা ছিল। এ ছাড়া ব্যানারে শেখ হাসিনার আগমনকে স্বাগত জানিয়ে বাঁশখালী উপজেলা ছাত্রলীগ, চট্টগ্রাম দক্ষিণের নাম উল্লেখ করা হয়। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে মিছিলকারীদের বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তারা স্থানীয় একটি বাজার এলাকায় পৌঁছে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। পরে আবার মিছিল নিয়ে সেখান থেকে চলে যান। তবে মিছিল শেষে অংশগ্রহণকারীরা কোন দিকে চলে গেছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে বাঁশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রবিউল হক জানিয়েছেন, মিছিলের ভিডিওটি পুলিশের নজরে এসেছে। প্রাথমিকভাবে ভিডিও পর্যালোচনা করে ৮ থেকে ১০ জনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তিনি আরও জানান, শনিবার ভোর ৬টার দিকে মিছিলটি অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে পুলিশ জানতে পেরেছে। শনাক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত অন্যদের পরিচয় শনাক্ত করতেও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে পুলিশের বক্তব্য থেকে জানা গেছে।
মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে গত ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) সারাদেশে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৮৯৮ জন। শনিবার (২৪ অক্টোবর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়াল ৩৭৬ জনে। অন্যদিকে মোট আক্রান্তের সংখ্যা হয়ে গেল ১ লাখ ২১ হাজার ৬৯৯ জন। এর আগে গত বছর সারাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ১ লাখ ২ হাজার ৮৬১ জন। মারা যান ৪১৩ জন। ২০২৪ সালে আক্রান্ত হন ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন এবং মারা যান ৫৭৫ জন।