যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে ইরানে হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণের জেরে বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান। পাশাপাশি আশঙ্কা তৈরি হয়েছে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার। প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রায় ৬০ শতাংশ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করেন। সেখান থেকেই আসে দেশের মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৯ শতাংশ।
ইরান হামলার জবাবে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, কুয়েত, বাহরাইন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। এসব দেশে প্রায় ৪০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি কর্মরত। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বন্ধ হওয়ার আশঙ্কার পাশাপাশি দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গতকাল রোববার বাংলাদেশ ব্যাংক–এর মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বিদায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০২ কোটি ১০ লাখ ডলার। প্রতিদিন গড়ে এসেছে ১০ কোটি ৭৯ লাখ ডলার। গত বছরের একই সময়ে এসেছিল ২৫২ কোটি ৮০ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছর ব্যবধানে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে। গত ডিসেম্বরে দেশে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩২২ কোটি ৬৭ লাখ ডলার, যা দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এবং চলতি অর্থবছরের কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ প্রবাসী আয়। গত নভেম্বরে দেশে এসেছিল ২৮৮ কোটি ৯৫ লাখ ২০ হাজার ডলার।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, মোট রেমিট্যান্সের ৪৯ শতাংশ আসে মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশ থেকে। রেমিট্যান্স আহরণের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে ছয়টিই মধ্যপ্রাচ্যের—সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, ওমান ও বাহরাইন।
বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, সৌদি আরবে ২৫ লাখের বেশি বাংলাদেশি কাজ করছেন। দেশটি থেকে মোট রেমিট্যান্সের ১৫ শতাংশ বা তার বেশি আসে। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে ১৩ শতাংশ; সেখানে কর্মরত রয়েছেন ১২ লাখের বেশি বাংলাদেশি। কুয়েতে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার, কাতারে ৪ লাখ ৫০ হাজারের বেশি, ওমানে ১ লাখ ৮৮ হাজার এবং বাহরাইনে প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশি কর্মরত। এছাড়া ইরাকসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক হোটেল, রেস্তোরাঁ, দোকানপাটসহ নানা ব্যবসায় জড়িত।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে অনেক শ্রমিক ও ব্যবসায়ী বেকার হয়ে দেশে ফিরতে বাধ্য হতে পারেন, যা দেশের অর্থনীতিতে বড় চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সি–এর সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে গেছে। নতুন শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা বা বন্ধ বাজার পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়নি। উপরন্তু মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপে ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে বহু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যেতে পারে এবং শ্রমিকরা নিঃস্ব অবস্থায় দেশে ফিরতে পারেন।
তিনি সরকারের প্রতি প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, হটলাইন চালু রাখা এবং শ্রমিকদের দেশে ফেরত আসা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধাক্কা লাগলে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হতে পারে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব ড. নেয়ামত উল্ল্যা ভূঁইয়া বলেন, ইতোমধ্যে ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে হটলাইন চালু করা হয়েছে এবং শ্রমিকদের নিরাপদে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি জানান।
