ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ইরানের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে একের পর এক আঘাত লেগেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিন সপ্তাহে নিহত গুরুত্বপূর্ণ ইরানি কর্মকর্তাদের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে।
সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি
১৯৮৯ সাল থেকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার দায়িত্বে ছিলেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি বিমান হামলায় নিজের বাড়িতেই পরিবারের আরও অনেক সদস্যসহ মারা যান ৮৬ বছর বয়সী এই নেতা।
আলি লারিজানি
উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি আলি লারিজানি মঙ্গলবার তেহরানের পারদিস এলাকায় বিমান হামলায় ছেলে ও এক সহকারীসহ নিহত হন। রেভল্যুশনারি গার্ডের সাবেক কমান্ডার ও খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে তিনি ইরানের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্র নীতি গড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
আলি শামখানি
খামেনির আরেক ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা আলি শামখানি ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে নিহত হন। সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও দীর্ঘদিনের নিরাপত্তা কর্মকর্তা শামখানি ছিলেন ইরানের যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধেও ইসরাইল তাকে লক্ষ্য করেছিল, সেবার বেঁচে গিয়েছিলেন।
ইসমাইল খতিব
ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খতিব মঙ্গলবার রাতে ইসরাইলি হামলায় নিহত হন। বুধবার ইরান এই খবর নিশ্চিত করেছে।
মোহাম্মদ পাকপৌর
শীর্ষ সামরিক কমান্ডারদের মধ্যে যুদ্ধের শুরুর দিনই তেহরানে হামলায় আইআরজিসির কমান্ডার ইন চিফ মোহাম্মদ পাকপৌর নিহত হন। গত বছরের জুনের যুদ্ধে পূর্বসূরী হোসেইন সালামি নিহত হওয়ার পর এই পদে আনা হয়েছিল পাকপৌরকে।
আজিজ নাসিরজাদেহ
একই দিন ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহও নিহত হন। বিমান বাহিনীর সাবেক কমান্ডার ও সশস্ত্র বাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় ইরানের সামরিক ও প্রতিরক্ষা নীতিতে তার ব্যাপক ভূমিকা ছিল।
আবদুলরহিম মুসাভি
সশস্ত্র বাহিনীর চিফ অব স্টাফ আবদুলরহিম মুসাভি ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে উর্ধ্বতন নেতাদের বৈঠকের সময় হামলায় নিহত হন। সেনাবাহিনীর নিয়মিত শাখাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করাই ছিল তার মূল দায়িত্ব।
গোলামরেজা সোলেইমানি
বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর কমান্ডার গোলামরেজা সোলেইমানি মঙ্গলবার হামলায় নিহত হয়েছেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে। অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার দায়িত্বে থাকা এই বাহিনীর নেতৃত্ব দিতেন তিনি।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এই নামগুলোর বাইরেও আইআরজিসির একাধিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সেনা কমান্ডার ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই মারা গেছেন ২৮ ফেব্রুয়ারির প্রথম হামলায়। সেদিন মার্কিন-ইসরাইলি বাহিনী ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠককে লক্ষ্যবস্তু করেছিল।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত গ্যাস পরিবাহনকারী কৌশলগত পানিপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ট্রানজিট ফি বা টোল আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছে ইরান। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) দেশটির একজন সংসদ সদস্য এ তথ্য জানিয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথের ওপর সম্প্রতি তেহরানের যে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তেহরান এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী সেইসব জাহাজের যাতায়াতে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, যেগুলোকে তারা শত্রুপক্ষ বা তাদের মিত্রদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে মনে করে। ইরানিয়ান স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সির বরাতে ওই সংসদ সদস্য জানান, পার্লামেন্টে এমন একটি বিল নিয়ে আলোচনা চলছে, যার অধীনে শিপিং, জ্বালানি পরিবহন এবং খাদ্য সরবরাহের জন্য এই প্রণালি ব্যবহারকারী দেশগুলোকে ইরানকে টোল ও ট্যাক্স দিতে হবে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার একজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, যুদ্ধের অবসান ঘটলে 'হরমুজ প্রণালির জন্য একটি নতুন নীতিমালা' চালু করা হবে। এর ফলে যেসব দেশ ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, তাদের ওপর তেহরান সামুদ্রিক বিধিনিষেধ প্রয়োগ করতে পারবে। মেহের নিউজ এজেন্সির তথ্যানুযায়ী, মোহাম্মদ মোখবার বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) বলেন, 'হরমুজ প্রণালির কৌশলগত অবস্থান ব্যবহার করে আমরা (পাশ্চাত্যের ওপর) নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারি এবং এই পানিপথ দিয়ে তাদের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিতে পারি।
ইরানের হামলার কারণে শিল্পাঞ্চলে আগুন লেগেছে বলে জানিয়েছে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশ সময় বৃহস্পতিবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে তারা এক বিবৃতিতে বলেছে, রাস লাফফান শিল্পাঞ্চলে লাগা আগুন নেভাতে কাজ করছে জরুরি পরিষেবা সংস্থার সদস্যরা। তবে ইরানের এ হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এর আগে কাতার বলেছিল লাস রাফফানের গ্যাস অবকাঠামোতে হামলার ফলে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা পরে দেশটি জানিয়েছে, ওই শিল্পাঞ্চলে আগুন লেগেছে। যা নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। সূত্র: আলজাজিরা
ইরানে হামলা করার আগে যুক্তরাষ্ট্র যদি ধরে নিয়ে থাকে যে নিজের তেল রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার ভয়ে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করতে সাহস করবে না, তাহলে তাদের অনুমান ছিল ভুল। এক প্রতিবেদনে সিএনএন লিখেছে, যুদ্ধ শুরুর আগে ইরান যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করেছিল, এখনও কাছাকাছি পরিমাণ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে পাঠাচ্ছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হলে ইরান হরমুজে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। তাতে ওই পথ দিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রপ্তানি ব্যাপকভাবে বিঘ্নিত হয়। হরমুজ পার হতে গিয়ে এ পর্যন্ত অন্তত ১৬টি জাহাজ ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর কিছু হামলার দায় ইরান স্বীকার করেছে। সিএনএন এর প্রতিবেদন বলছে, ইরান সফলভাবে অন্যদের তেলের জাহাজ আটকে দিতে পেরেছে এবং নিজেদের রপ্তানিও অব্যাহত রাখতে পেরেছে। দেশের অর্থনীতি এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার খরচ যোগাতে ইরানের জন্য তেল রপ্তানি গুরুত্বপূর্ণ। আর যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই কোটি কোটি ব্যারেল তেল নিয়ে সমুদ্রে বিক্রেতার জন্য অপেক্ষা করছিল ইরানি জাহাজ। ট্যাংকার ট্র্যাকিং ডেটা এবং স্যাটেলাইট ছবি দেখাচ্ছে, যুদ্ধের মধ্যেও ইরানি তেলবাহী জাহাজ ওই প্রণালি দিয়ে গেছে, যদিও উপসাগরীয় অন্য দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বাণিজ্যিক ডেটা বিশ্লেষণ সংস্থা কপ্লারের বিশেষজ্ঞদের অনুমান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করতে সক্ষম হয়েছে ইরান। আর মেরিন ইনটেলিজেন্স কোম্পানি ট্যাংকারট্র্যাকার্সের ধারণা, গত সপ্তাহের মাঝামাঝি পর্যন্ত ১ কোটি ৩৭ লাখ ব্যারেল তেল ইরান এই সময়ে হরমুজ দিয়ে পার করেছে। এই পরিসংখ্যান ঠিক হলে দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে ইরান। কপ্লারের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর ইরানের দৈনিক গড় রপ্তানি ছিল ১৬.৯ লাখ ব্যারেল। সিএনএন লিখেছে, ইরানি ট্যাংকার আটকাতে যুক্তরাষ্ট্র কোনো কার্যকর চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে না, যদিও তারা ইরানের নৌবাহিনীর বড় অংশ ধ্বংস করার দাবি করেছে। ইরানের তেল অবকাঠামো যেমন শোধনাগার, পাইপলাইন ও রিজার্ভ ট্যাংকে হামলাও এড়িয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইসরাইলি হামলায় তেহরানসহ রাজধানীর আশেপাশের তেল মজুদের অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরানের তেলের বড় অংশ খার্ক দ্বীপের গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে রপ্তানি করা হয়, যা ইরানি উপকূল থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। শুক্রবার ওই দ্বীপে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে যুক্তরাষ্ট্র তীব্র আক্রমণ চালালেও তেল অবকাঠামোতে কোনো আঘাত করা হয়নি। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প পরে সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান যদি হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে থাকে, তাহলে তিনি খার্কের তেল অবকাঠামো এড়িয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে পারেন। জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের দূত মাইক ওয়াল্টজ সিএনএনকে বলেছেন, ট্রাম্প তার পরিকল্পনা থেকে কোনো বিকল্প বাদ দিচ্ছেন না। "আমি নিশ্চিত, তিনি যদি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করতে চান, তাহলে সেটা তিনি করবেন।" মার্কিন অর্থমন্ত্রীর স্বীকারোক্তি মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সোমবার সিএনবিসিকে বলেছেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে কিছু ইরানি, ভারতীয় ও চীনা জাহাজ চলাচল করছে, ওয়াশিংটন আপাতত তাতে বাধা দিচ্ছে না। ট্যাংকারট্র্যাকার্স জানিয়েছে, খার্কের তেল অবকাঠামো শনিবারও কার্যকর ছিল। স্যাটেলাইট ছবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দ্বীপের ৫৫টি অপরিশোধিত তেলের ট্যাংকের সবই অক্ষত এবং দুটি ইরানি ট্যাংকার শনিবার ২৭ লাখ ব্যারেল তেল লোড করছিল। আরও অনেক ইরানি ট্যাংকার দ্বীপ থেকে রওনা হয়ে থাকতে পারে। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার জন্য এসব জাহাজ প্রায়ই ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে রাখে, ফলে সেগুলোর অবস্থান পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। মেরিন ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, শুক্রবারও ছয়টি ইরানি জাহাজ ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রেখে ভুয়া অবস্থান দেখাচ্ছিল। এনার্জি ডেটা সংস্থা ভর্টেক্সা জানায়, যুদ্ধ শুরুর আগেই কোটি কোটি ব্যারেল তেল নিয়ে ইরানি জাহাজ বিক্রেতার জন্য সমুদ্রে অপেক্ষ করছিল। কেবল জানুয়ারি মাসেই সাগরে ছিল প্রায় ১.৭ কোটি ব্যারেল তেলবাহী জাহাজ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি হামলা শুরু করার আগে ফেব্রুয়ারি মাসেই রপ্তানি বাড়িয়ে দেয় ইরান। ফেব্রুয়ারিতে দৈনিক গড়ে ২০.৪ লাখ ব্যারেল তেল নিয়ে খার্ক ছেড়ে গেছে ইরানি জাহাজ, যা গত বছরের গড়ের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ বেশি। ইরানের আধা সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, ইরান প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিও বৃদ্ধি করতে পেরেছে। ইরাকের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়কে উদ্ধৃত করে ফার্স জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরান থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি তিনগুণ বেড়ে দৈনিক ১৮ মিলিয়ন ঘনমিটার হয়েছে। হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণের সুবিধা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের জন্য, বিশেষ করে এশীয় গ্রাহকদের সঙ্গে দরকষাকষির সুযোগ দিচ্ছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্বাস অরাকচি বলেছেন, "হরমুজ প্রণালী খোলা আছে, শুধুমাত্র আমাদের শত্রুদের জাহাজ ও যারা আমাদের এবং তাদের মিত্রদের ওপর হামলা করছে, তাদের জন্য বন্ধ। অন্যরা স্বাধীনভাবে চলতে পারবে।" ইরানি সংবাদপত্র শরক লিখেছে, ভারত গত মাসে আটকানো তিনটি ইরানি ট্যাংকার ছেড়ে দিয়েছে, যাতে ইরান দুটি ভারতীয় জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সুযোগ দেয়। সমুদ্র নিরাপত্তা ও তেল বাণিজ্য নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনাও চলছে। ভারতের শিপিং মন্ত্রণালয় সিএনএনকে বলেছে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলপিজিবাহী দুটি জাহাজ শুক্রবার রাত থেকে শনিবারের মধ্যে নিরাপদে হরমুজ প্রণালি পার হয়েছে। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে বলেছেন, কৌশলগত কূটনীতি কতটা ফলপ্রসূ হতে পারে, ভারতীয় ট্যাংকার পার করার আলোচনা তার উদাহরণ। তিনি বলেন, "আমি এই মুহূর্তে তাদের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত এবং আমার আলোচনা কিছু ফল দিয়েছে।" একজন ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, চীনা মুদ্রা ইউয়ানে তেল বিক্রির শর্তে কিছু ট্যাংকারকে প্রণালি পার হতে দেওয়ার প্রস্তাব তারা বিবেচনা করছে। তেল বাণিজ্যের প্রায় পুরোটাই ডলারে হয়। তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার তেল কেনাবেচা হয় রুবল বা ইউয়ানে। চীন কয়েক বছর ধরেই ইউয়ানে তেল কিনতে চেষ্টা করছে, বিশেষ করে সৌদি আরবে। সিএনএন লিখেছে, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা অন্য দেশগুলোর মত ইরানের জন্যও জরুরি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র যদি চায়, ইরানি জাহাজও ওই প্রণালি পার হতে গিয়ে বিপদে পড়বে।