ইরানে হামলা চালাতে গিয়ে ভূপাতিত এফ–১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমানের দুই ক্রুকেই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এজন্য চালাতে হয় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান। হারাতে হয় উচ্চ প্রযুক্তির দুটি সামরিক বিমান এবং একটি হেলিকপ্টার।
ভূপাতিত যুদ্ধবিমানের পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা গেলেও, দ্বিতীয় বিমান সেনাকে ইরানের বাইরে নিয়ে আসতে রীতিমতো এক যুদ্ধ আয়োজন সাজাতে হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সের কয়েকশ সদস্য অংশ নেন অভিযানে। ইরানের ভিতরেই একটি পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ডকে কবজায় নিয়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টার জন্য ‘অস্থায়ী’ সেনাঘাঁটিতে পরিণত করা হয়।
একজন বিমান সেনাকে উদ্ধারের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানকে সমর ইতিহাসের অন্যতম জটিল এক অপারেশন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি মেইলে অভিযানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে।
সামরিক ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক অভিযান
দ্বিতীয় বিমান সেনা (একজন কর্নেল) সেফটি হারনেস খুলে ক্ষতবিক্ষত ইজেক্টর সিট থেকে সাবধানে নিজেকে বের করে আনলেন। তবে সেই সময়টি ছিল অজানা এক ভয়ংকর অধ্যায়ের শুরুমাত্র।
কয়েক মিনিট আগেও যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনীর এই জ্যেষ্ঠ উইপনস সিস্টেমস কর্মকর্তা একটি এফ-১৫ স্ট্রাইক ঈগলের ককপিটে ছিলেন। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের আকাশে ঘণ্টায় সেটি দেড় হাজার মাইলেরও বেশি গতিতে উড়ছিল।
হঠাৎ বিমানটি শত্রুপক্ষের গুলিতে বিধ্বস্ত হয়। ২০০৩ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এটাই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের কোনো যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা।
ঘটনার পর এই বিমানসেনা ইরানের কোহগিলুয়েহ ও বয়ার-আহমদ প্রদেশের এক জনবিরল পার্বত্য অঞ্চলে আটকা পড়েন। পারস্য উপসাগর থেকে জায়গাটির দূরত্ব ৩০ মাইলেরও বেশি।
দিনটি ছিল শুক্রবার।
পড়ন্ত বিকেলে দুর্ভেদ্য শত্রু অবস্থানের ভেতরে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ একা। তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ছিলেন এফ-১৫ বিমানটির পাইলট। বিধ্বস্ত বিমান ভূপৃষ্ঠ স্পর্শ করার আগে তিনিও হলুদ ‘ইজেক্ট’ লিভার টেনেছিলেন।
তবে দ্বিতীয় বিমান সেনার চেয়ে পাইলট ছিলেন তুলনামূলক বেশি ভাগ্যবান। প্যারাস্যুটের সাহায্যে তিনি বিধ্বস্ত বিমান থেকে কিছুটা দূরে সমতল ভূমিতে অবতরণ করতে সক্ষম হন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক হেলিকপ্টার এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে চিহ্নিত করে উদ্ধারে সক্ষম হয়।
আরেক বিমানসেনার জন্য ভাগ্য অতটা প্রসন্ন ছিল না। তার অবতরণের জায়গাটি ছিল বেশ কিছুটা দূরে। এমনকি বিমান থেকে ইজেক্টের সময় তিনি ‘গুরুতর আহত’ হন। যুদ্ধবিমান থেকে বেরিয়ে আসা সব সময়েই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময়েই ক্রুর হাত-পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, এমনকি মেরুদণ্ডের গুরুতর ক্ষতিও বিরল নয়।
দ্বিতীয় বিমান সেনা হাঁটতে পারলেও প্রচণ্ড ব্যথায় কাতর ছিলেন। মানসিকভাবে ছিলেন ভীষণ বিপর্যস্ত। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান সেনাদের কী করতে হবে সেটা প্রশিক্ষণের সময়েই শেখানো হয়। এসইআরই (সিয়ার) নামের কৌশলটি হলো- সারভাইভাল, ইভেইশন, রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড এস্কেপ; অর্থাৎ ‘বেঁচে থাকা, শত্রুর চোখ এড়িয়ে চলা, প্রতিরোধ এবং পালানো।
আহত বিমান সেনা প্রথমেই ফ্লাইট স্যুটের সারভাইভাল ভেস্টে থাকা মেডিক্যাল কিট দিয়ে নিজের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। এরপর তার প্রথম কাজ ছিল অবতরণস্থল থেকে দ্রুত দূরে সরে যাওয়া। ইজেক্টর সিট অবতরণের জায়গাটি অনেক দূর থেকেও কারো চোখে ধরা পড়া সম্ভব। তাই যতটা সম্ভব দূরে সরে যাওয়ার ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন।
এরপরের সাধারণ নিয়ম হলো, কাছের সবচেয়ে নির্জন কোনো এলাকায় লুকিয়ে পড়া। এই বিমান সেনার জন্য তেমন গন্তব্যটি ছিল বরফঢাকা এক পর্বতচূড়া। এজন্য সন্ধ্যা ও রাতের অনেকটা সময় ধরে তাকে কষ্টকর এক অভিযাত্রায় নামতে হয়।
বিমান সেনার সারভাইভাল ভেস্টে ছিল একটি ছুরি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, হাল্কা কিছু খাদ্য এবং একটি সিগ সাউয়ার এম১৮ পিস্তল। আর ছিল একটি কম্পাস এবং শত্রু চোখ এড়িয়ে চলার উপযোগী এক মানচিত্র। মিশন ব্রিফিংয়ের সময় এই মানচিত্রটি তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি ছোট যন্ত্র, যার নাম ‘কমব্যাট সারভাইভার ইভেশন লোকেটর’ বা সিএসইএল। বোয়িং নির্মিত যন্ত্রটি দেখতে খানিকটা ওয়াকি-টকির মতো। এর সংক্ষিপ্ত এনক্রিপ্টেড বার্তার মাধ্যমে জীবিত ব্যক্তি তার মিশন কমান্ডে নিজের অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে জানাতে পারেন।
ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় দুপুরে (ইরানের সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা) সিএসইএল থেকে প্রথম বার্তাটি পায় কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক ‘পিং’-এর পর যন্ত্রটি কয়েক ঘণ্টার জন্য নীরব হয়ে যায়। ব্যাটারির সংরক্ষণ এবং শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে সাধারণত এমন কৌশল নেয়া হয়।
প্রথম বার্তা পাওয়ার পরপরই জীবিত বিমান সেনাকে উদ্ধারে বিশাল তল্লাশি অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড। এর মাঝেই তাকে ধরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৬০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে ইরানি কর্তৃপক্ষ।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন শনিবার সকালে পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র মিলিশিয়াদের ঢল নামার দৃশ্য সম্প্রচার করে। দাবি করা হয়, পুরস্কারের ঘোষণার পর লুকিয়ে থাকা বিমান সেনার খোঁজে সাধারণ ইরানিরাও নেমে পড়েছেন।
তবে আহত বিমানসেনা ততক্ষণে লুকিয়ে থাকার একটি ভালো জায়গা পেয়ে গিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, শুক্রবার রাতের অন্ধকারে তিনি পর্বতের গা বেয়ে প্রায় ৭ হাজার ফুট উপরে উঠে যান। এরপর একটি দুর্গম জায়গায় আত্মগোপন করেন। দিনের আলোতেও জায়গাটি খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন।
এরপর তার সিএসইএল আরেকটি ‘পিং’ ব্যবহার করে মিশন কন্ট্রোলকে নতুন অবস্থান জানিয়ে দেয়। বার্তাগুলো এক পর্যায়ে উদ্ধারকারীদের মধ্যে কিছুটা সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল। ইরানিদের পাতা ফাঁদে পড়তে যাচ্ছেন কিনা এমন সংশয়ও তৈরি হয়। তবে সিআইএ শেষপর্যন্ত তার সঠিক পরিচয় ও অবস্থান নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়।
এর পরেই দ্রুত এগোতে থাকে চূড়ান্ত অপারেশনের প্রস্তুতি। নির্দিষ্ট এলাকাটি নিরাপদ রাখতে আকাশে টহল দিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলো চালকবিহীন রিপার ড্রোন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিমান সেনার অবস্থানের তিন মাইলের মধ্যে আসা যেকোনো যুদ্ধক্ষম পুরুষকে এ সময় ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমানও একাধিক মিশন পরিচালনা করে। বিমান সেনার অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছানোর কয়েকটি রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরির পাশাপাশি যোগাযোগ টাওয়ার ধ্বংস এবং বিভিন্ন যানবাহনে হামলা চালানো হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব হামলায় অন্তত চারজন নিহত হন।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশন কমান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা শনিবারজুড়ে এক দুঃসাহসী উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করেন। হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুম থেকে সরাসরি এর তদারকি করা হয়।
প্রথম ধাপেই ছিল ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সম্ভাব্য সব আয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সিআইএ শুরুতে একটি ‘প্রতারণামূলক অভিযান’ অভিযানের গুজব ছড়িয়ে দেয়। অন্য একটি অবস্থানের কথা প্রচার করে দাবি করা হয়, বিমান সেনা সেখান লুকিয়ে আছেন। সেখানে অভিযান চালিয়ে স্থলপথে তাকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এই প্রচার ইরান কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে মূল অভিযানের অনেক সূক্ষ্ম বিবরণও এখনো পরিষ্কার নয়। তবে প্রাথমিক ইঙ্গিত বলছে, অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে ভয়ংকর কয়েকশ সেনা অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নেভি সিলস, ডেল্টা ফোর্স অপারেটর এবং ২৪তম স্পেশাল ট্যাকটিকস স্কোয়াড্রনের প্যারা-রেসকিউম্যানরা।
কমান্ডোদের সি-১৩০জে পরিবহন বিমানে চড়িয়ে উদ্ধারস্থলের কাছাকাছি জায়গায় পৌঁছে দেয়া হয়। এই বিমানে ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস অ্যাভিয়েশন রেজিমেন্টের এমএইচ-৬ লিটল বার্ড হেলিকপ্টারও ছিল। ইউনিটটি ‘নাইট স্টকার্স’ নামে পরিচিত এবং তারা ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার মিশনেও অংশ নেয়।
লিটল বার্ড হেলিকপ্টারগুলো কমান্ডোদের পর্বতের নির্দিষ্ট জায়গায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। তারা অবস্থানের কাছে পৌঁছালে লুকিয়ে থাকা বিমানসেনা তার সিএসইএল মোড পরিবর্তন করেন। ফলে সহযোদ্ধারা সঠিক অবস্থান দ্রুত খুঁজে পেতে সক্ষম হন। ভোররাত প্রায় ৪টার দিকে, দেহদাশত শহরের আশপাশের আকাশে বিস্ফোরণের আলো দেখা যায়। জায়গাটির অবস্থান পর্বতমালার ঠিক অন্য পাশে।
কাছাকাছি সময়ে ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আশপাশের রাস্তায় যানবাহনগুলো অবরুদ্ধ হয়ে আছে। কয়েকটি সূত্রের দাবি, ওই অঞ্চলের সরকারবিরোধী বাসিন্দারা ঘটনার সময় ইরানি সেনাদের পাহাড়ে পৌঁছাতে বাধা দিয়েছিলেন।
বিপুল সমরশক্তি সমাবেশের পরেও যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি পরিকল্পনামাফিক শেষ হয়নি। ভোর হওয়ার কিছু পরে বিমান সেনার লুকানোর জায়গার কাছে গোলাগুলির কিছু ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে। অসমর্থিত স্থানীয় সূত্রের দাবি, এতে তিনজন ইরানি বিপ্লবী গার্ড নিহত হন।
পর্বতের ঠিক নিচে মাহিয়ার শহরের অন্য পাশে একটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ইসফাহান শহর থেকে প্রায় ৩০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের এই এয়ারফিল্ডটিকে রাতারাতি অস্থায়ী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করা হয়েছিল। কমান্ডোদের লজিস্টিকস সহায়তা এবং নিখোঁজ বিমান সেনাকে খুঁজে পাওয়ার পর সেনাদের সরিয়ে আনার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়।
তবে দুর্ভাগ্যবশত সেখানে অবতরণের পর দুটি পরিবহন বিমান নরম মাটিতে আটকে যায়। বিশাল এসব সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানের প্রতিটির দাম প্রায় ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড। এগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট সেনাদের সরিয়ে নিতে আরও তিনটি বিমান তড়িঘড়ি করে পাঠাতে হয়েছিল।
নতুন বিমানগুলো পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। এ সময় উদ্ধারকারী দল এবং বিমান সেনাকে ঘিরে তৈরি হয় উদ্বেগ। তারা অপেক্ষা করছিলেন ওই এয়ারফিল্ডে।
শেষপর্যন্ত নতুন তিনটি বিমান সবাইকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এয়ারস্ট্রিপ ছেড়ে আসার আগে অচল দুটি পরিবহন বিমান বিস্ফোরকের সাহায্যে ধ্বংস করেন কমান্ডোরা। ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে একটি হেলিকপ্টারও ধ্বংস করা হয়। শত্রুপক্ষের হাতে পড়া ঠেকাতেই নেয়া হয় এমন সিদ্ধান্ত। এভাবেই শেষ হয় প্রায় দেড় দিনের দুর্ধর্ষ এক সামরিক উদ্ধার অভিযান।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
ইরানে হামলা চালাতে গিয়ে ভূপাতিত এফ–১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমানের দুই ক্রুকেই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এজন্য চালাতে হয় অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক অভিযান। হারাতে হয় উচ্চ প্রযুক্তির দুটি সামরিক বিমান এবং একটি হেলিকপ্টার। ভূপাতিত যুদ্ধবিমানের পাইলটকে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে উদ্ধার করা গেলেও, দ্বিতীয় বিমান সেনাকে ইরানের বাইরে নিয়ে আসতে রীতিমতো এক যুদ্ধ আয়োজন সাজাতে হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের স্পেশাল ফোর্সের কয়েকশ সদস্য অংশ নেন অভিযানে। ইরানের ভিতরেই একটি পরিত্যক্ত এয়ারফিল্ডকে কবজায় নিয়ে প্রায় ২৪ ঘণ্টার জন্য ‘অস্থায়ী’ সেনাঘাঁটিতে পরিণত করা হয়। একজন বিমান সেনাকে উদ্ধারের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানকে সমর ইতিহাসের অন্যতম জটিল এক অপারেশন হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ডেইলি মেইলে অভিযানের সময়কার ঘটনাপ্রবাহ তুলে ধরা হয়েছে। সামরিক ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক অভিযান দ্বিতীয় বিমান সেনা (একজন কর্নেল) সেফটি হারনেস খুলে ক্ষতবিক্ষত ইজেক্টর সিট থেকে সাবধানে নিজেকে বের করে আনলেন। তবে সেই সময়টি ছিল অজানা এক ভয়ংকর অধ্যায়ের শুরুমাত্র। কয়েক মিনিট আগেও যুক্তরাষ্ট্র বিমানবাহিনীর এই জ্যেষ্ঠ উইপনস সিস্টেমস কর্মকর্তা একটি এফ-১৫ স্ট্রাইক ঈগলের ককপিটে ছিলেন। দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানের আকাশে ঘণ্টায় সেটি দেড় হাজার মাইলেরও বেশি গতিতে উড়ছিল। হঠাৎ বিমানটি শত্রুপক্ষের গুলিতে বিধ্বস্ত হয়। ২০০৩ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর এটাই প্রথম যুক্তরাষ্ট্রের কোনো যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার ঘটনা। ঘটনার পর এই বিমানসেনা ইরানের কোহগিলুয়েহ ও বয়ার-আহমদ প্রদেশের এক জনবিরল পার্বত্য অঞ্চলে আটকা পড়েন। পারস্য উপসাগর থেকে জায়গাটির দূরত্ব ৩০ মাইলেরও বেশি। দিনটি ছিল শুক্রবার। পড়ন্ত বিকেলে দুর্ভেদ্য শত্রু অবস্থানের ভেতরে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ একা। তার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ছিলেন এফ-১৫ বিমানটির পাইলট। বিধ্বস্ত বিমান ভূপৃষ্ঠ স্পর্শ করার আগে তিনিও হলুদ ‘ইজেক্ট’ লিভার টেনেছিলেন। তবে দ্বিতীয় বিমান সেনার চেয়ে পাইলট ছিলেন তুলনামূলক বেশি ভাগ্যবান। প্যারাস্যুটের সাহায্যে তিনি বিধ্বস্ত বিমান থেকে কিছুটা দূরে সমতল ভূমিতে অবতরণ করতে সক্ষম হন। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক হেলিকপ্টার এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাকে চিহ্নিত করে উদ্ধারে সক্ষম হয়। আরেক বিমানসেনার জন্য ভাগ্য অতটা প্রসন্ন ছিল না। তার অবতরণের জায়গাটি ছিল বেশ কিছুটা দূরে। এমনকি বিমান থেকে ইজেক্টের সময় তিনি ‘গুরুতর আহত’ হন। যুদ্ধবিমান থেকে বেরিয়ে আসা সব সময়েই বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময়েই ক্রুর হাত-পায়ের হাড় ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, এমনকি মেরুদণ্ডের গুরুতর ক্ষতিও বিরল নয়। দ্বিতীয় বিমান সেনা হাঁটতে পারলেও প্রচণ্ড ব্যথায় কাতর ছিলেন। মানসিকভাবে ছিলেন ভীষণ বিপর্যস্ত। এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান সেনাদের কী করতে হবে সেটা প্রশিক্ষণের সময়েই শেখানো হয়। এসইআরই (সিয়ার) নামের কৌশলটি হলো- সারভাইভাল, ইভেইশন, রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড এস্কেপ; অর্থাৎ ‘বেঁচে থাকা, শত্রুর চোখ এড়িয়ে চলা, প্রতিরোধ এবং পালানো। আহত বিমান সেনা প্রথমেই ফ্লাইট স্যুটের সারভাইভাল ভেস্টে থাকা মেডিক্যাল কিট দিয়ে নিজের প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। এরপর তার প্রথম কাজ ছিল অবতরণস্থল থেকে দ্রুত দূরে সরে যাওয়া। ইজেক্টর সিট অবতরণের জায়গাটি অনেক দূর থেকেও কারো চোখে ধরা পড়া সম্ভব। তাই যতটা সম্ভব দূরে সরে যাওয়ার ওপর তিনি জোর দিয়েছিলেন। এরপরের সাধারণ নিয়ম হলো, কাছের সবচেয়ে নির্জন কোনো এলাকায় লুকিয়ে পড়া। এই বিমান সেনার জন্য তেমন গন্তব্যটি ছিল বরফঢাকা এক পর্বতচূড়া। এজন্য সন্ধ্যা ও রাতের অনেকটা সময় ধরে তাকে কষ্টকর এক অভিযাত্রায় নামতে হয়। বিমান সেনার সারভাইভাল ভেস্টে ছিল একটি ছুরি, পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, হাল্কা কিছু খাদ্য এবং একটি সিগ সাউয়ার এম১৮ পিস্তল। আর ছিল একটি কম্পাস এবং শত্রু চোখ এড়িয়ে চলার উপযোগী এক মানচিত্র। মিশন ব্রিফিংয়ের সময় এই মানচিত্রটি তাকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল একটি ছোট যন্ত্র, যার নাম ‘কমব্যাট সারভাইভার ইভেশন লোকেটর’ বা সিএসইএল। বোয়িং নির্মিত যন্ত্রটি দেখতে খানিকটা ওয়াকি-টকির মতো। এর সংক্ষিপ্ত এনক্রিপ্টেড বার্তার মাধ্যমে জীবিত ব্যক্তি তার মিশন কমান্ডে নিজের অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে জানাতে পারেন। ওয়াশিংটন ডিসির স্থানীয় সময় দুপুরে (ইরানের সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা) সিএসইএল থেকে প্রথম বার্তাটি পায় কর্তৃপক্ষ। প্রাথমিক ‘পিং’-এর পর যন্ত্রটি কয়েক ঘণ্টার জন্য নীরব হয়ে যায়। ব্যাটারির সংরক্ষণ এবং শত্রুপক্ষের গোয়েন্দা বাহিনীর নজরদারি এড়াতে সাধারণত এমন কৌশল নেয়া হয়। প্রথম বার্তা পাওয়ার পরপরই জীবিত বিমান সেনাকে উদ্ধারে বিশাল তল্লাশি অভিযানের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কমান্ড। এর মাঝেই তাকে ধরিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে ৬০ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করে ইরানি কর্তৃপক্ষ। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন শনিবার সকালে পার্বত্য অঞ্চলে সশস্ত্র মিলিশিয়াদের ঢল নামার দৃশ্য সম্প্রচার করে। দাবি করা হয়, পুরস্কারের ঘোষণার পর লুকিয়ে থাকা বিমান সেনার খোঁজে সাধারণ ইরানিরাও নেমে পড়েছেন। তবে আহত বিমানসেনা ততক্ষণে লুকিয়ে থাকার একটি ভালো জায়গা পেয়ে গিয়েছিলেন। ধারণা করা হয়, শুক্রবার রাতের অন্ধকারে তিনি পর্বতের গা বেয়ে প্রায় ৭ হাজার ফুট উপরে উঠে যান। এরপর একটি দুর্গম জায়গায় আত্মগোপন করেন। দিনের আলোতেও জায়গাটি খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। এরপর তার সিএসইএল আরেকটি ‘পিং’ ব্যবহার করে মিশন কন্ট্রোলকে নতুন অবস্থান জানিয়ে দেয়। বার্তাগুলো এক পর্যায়ে উদ্ধারকারীদের মধ্যে কিছুটা সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল। ইরানিদের পাতা ফাঁদে পড়তে যাচ্ছেন কিনা এমন সংশয়ও তৈরি হয়। তবে সিআইএ শেষপর্যন্ত তার সঠিক পরিচয় ও অবস্থান নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়। এর পরেই দ্রুত এগোতে থাকে চূড়ান্ত অপারেশনের প্রস্তুতি। নির্দিষ্ট এলাকাটি নিরাপদ রাখতে আকাশে টহল দিতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র অনেকগুলো চালকবিহীন রিপার ড্রোন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বিমান সেনার অবস্থানের তিন মাইলের মধ্যে আসা যেকোনো যুদ্ধক্ষম পুরুষকে এ সময় ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ-১০ ওয়ারথগ যুদ্ধবিমানও একাধিক মিশন পরিচালনা করে। বিমান সেনার অবস্থানের কাছাকাছি পৌঁছানোর কয়েকটি রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরির পাশাপাশি যোগাযোগ টাওয়ার ধ্বংস এবং বিভিন্ন যানবাহনে হামলা চালানো হয়। ইরানি কর্তৃপক্ষ জানায়, এসব হামলায় অন্তত চারজন নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের মিশন কমান্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা শনিবারজুড়ে এক দুঃসাহসী উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করেন। হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুম থেকে সরাসরি এর তদারকি করা হয়। প্রথম ধাপেই ছিল ইরানি কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করার জন্য সম্ভাব্য সব আয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সিআইএ শুরুতে একটি ‘প্রতারণামূলক অভিযান’ অভিযানের গুজব ছড়িয়ে দেয়। অন্য একটি অবস্থানের কথা প্রচার করে দাবি করা হয়, বিমান সেনা সেখান লুকিয়ে আছেন। সেখানে অভিযান চালিয়ে স্থলপথে তাকে সরিয়ে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এই প্রচার ইরান কর্তৃপক্ষকে বিভ্রান্ত করতে পেরেছিল কি না তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে মূল অভিযানের অনেক সূক্ষ্ম বিবরণও এখনো পরিষ্কার নয়। তবে প্রাথমিক ইঙ্গিত বলছে, অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে ভয়ংকর কয়েকশ সেনা অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন নেভি সিলস, ডেল্টা ফোর্স অপারেটর এবং ২৪তম স্পেশাল ট্যাকটিকস স্কোয়াড্রনের প্যারা-রেসকিউম্যানরা। কমান্ডোদের সি-১৩০জে পরিবহন বিমানে চড়িয়ে উদ্ধারস্থলের কাছাকাছি জায়গায় পৌঁছে দেয়া হয়। এই বিমানে ১৬০তম স্পেশাল অপারেশনস অ্যাভিয়েশন রেজিমেন্টের এমএইচ-৬ লিটল বার্ড হেলিকপ্টারও ছিল। ইউনিটটি ‘নাইট স্টকার্স’ নামে পরিচিত এবং তারা ২০১১ সালে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যার মিশনেও অংশ নেয়। লিটল বার্ড হেলিকপ্টারগুলো কমান্ডোদের পর্বতের নির্দিষ্ট জায়গায় উড়িয়ে নিয়ে যায়। তারা অবস্থানের কাছে পৌঁছালে লুকিয়ে থাকা বিমানসেনা তার সিএসইএল মোড পরিবর্তন করেন। ফলে সহযোদ্ধারা সঠিক অবস্থান দ্রুত খুঁজে পেতে সক্ষম হন। ভোররাত প্রায় ৪টার দিকে, দেহদাশত শহরের আশপাশের আকাশে বিস্ফোরণের আলো দেখা যায়। জায়গাটির অবস্থান পর্বতমালার ঠিক অন্য পাশে। কাছাকাছি সময়ে ধারণ করা বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, আশপাশের রাস্তায় যানবাহনগুলো অবরুদ্ধ হয়ে আছে। কয়েকটি সূত্রের দাবি, ওই অঞ্চলের সরকারবিরোধী বাসিন্দারা ঘটনার সময় ইরানি সেনাদের পাহাড়ে পৌঁছাতে বাধা দিয়েছিলেন। বিপুল সমরশক্তি সমাবেশের পরেও যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্ধার অভিযান পুরোপুরি পরিকল্পনামাফিক শেষ হয়নি। ভোর হওয়ার কিছু পরে বিমান সেনার লুকানোর জায়গার কাছে গোলাগুলির কিছু ঘটনার কথা শোনা যাচ্ছে। অসমর্থিত স্থানীয় সূত্রের দাবি, এতে তিনজন ইরানি বিপ্লবী গার্ড নিহত হন। পর্বতের ঠিক নিচে মাহিয়ার শহরের অন্য পাশে একটি পরিত্যক্ত বিমানবন্দর যুক্তরাষ্ট্রের কমান্ডোদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ইসফাহান শহর থেকে প্রায় ৩০ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের এই এয়ারফিল্ডটিকে রাতারাতি অস্থায়ী সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করা হয়েছিল। কমান্ডোদের লজিস্টিকস সহায়তা এবং নিখোঁজ বিমান সেনাকে খুঁজে পাওয়ার পর সেনাদের সরিয়ে আনার কাজে এটি ব্যবহার করা হয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত সেখানে অবতরণের পর দুটি পরিবহন বিমান নরম মাটিতে আটকে যায়। বিশাল এসব সি-১৩০ হারকিউলিস বিমানের প্রতিটির দাম প্রায় ১০০ মিলিয়ন পাউন্ড। এগুলো কার্যত অচল হয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট সেনাদের সরিয়ে নিতে আরও তিনটি বিমান তড়িঘড়ি করে পাঠাতে হয়েছিল। নতুন বিমানগুলো পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লাগে। এ সময় উদ্ধারকারী দল এবং বিমান সেনাকে ঘিরে তৈরি হয় উদ্বেগ। তারা অপেক্ষা করছিলেন ওই এয়ারফিল্ডে। শেষপর্যন্ত নতুন তিনটি বিমান সবাইকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। এয়ারস্ট্রিপ ছেড়ে আসার আগে অচল দুটি পরিবহন বিমান বিস্ফোরকের সাহায্যে ধ্বংস করেন কমান্ডোরা। ইঞ্জিন বিকল হয়ে পড়ে একটি হেলিকপ্টারও ধ্বংস করা হয়। শত্রুপক্ষের হাতে পড়া ঠেকাতেই নেয়া হয় এমন সিদ্ধান্ত। এভাবেই শেষ হয় প্রায় দেড় দিনের দুর্ধর্ষ এক সামরিক উদ্ধার অভিযান।
জাপানি একটি শিপিং কোম্পানি সোমবার জানিয়েছে, তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ভারতীয় পতাকাবাহী একটি ট্যাংকার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশের পথে রয়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান কার্যত এই প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে, যা বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। এই আন্তর্জাতিক নৌপথ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট ও মূল্যবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে। টোকিও থেকে এএফপি জানায়, মিৎসুই ওএসকে লাইনসের এক মুখপাত্র এএফপিকে জানান, তাদের এলপিজি ট্যাংকার ‘গ্রিন আশা’ প্রণালী অতিক্রম করেছে। তিনি বলেন, ‘ক্রু সদস্য ও জাহাজের পণ্য উভয়ই নিরাপদ রয়েছে।’ এটি ছিল জাপান-সম্পৃক্ত তৃতীয় জাহাজ, যা এই প্রণালী অতিক্রম করেছে। শনিবার ভারতের সরকার জানিয়েছিল, মিৎসুইয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন আরেকটি এলপিজি ট্যাংকার ‘গ্রিন সানভি’ নিরাপদে প্রণালী পার হয়েছে। এর আগের দিন মিৎসুইয়ের সহ-মালিকানাধীন একটিসহ তিনটি ট্যাংকার প্রণালী অতিক্রম করে। মিৎসুইয়ের ‘সোহার এলএনজি’ জাহাজটি ১ মার্চের পর প্রথম এলএনজি ট্যাংকার হিসেবে এই প্রণালী অতিক্রম করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুরুর পর যে অল্পসংখ্যক জাহাজ এই সংকীর্ণ নৌপথ অতিক্রম করেছে, তারা ইরানের অনুমোদিত একটি পথ ব্যবহার করেছে, যা লারাক দ্বীপের কাছ দিয়ে গেছে। প্রখ্যাত শিপিং সাময়িকী ‘লয়েডস লিস্ট’ এই পথকে ‘তেহরান টোল বুথ’ নামে উল্লেখ করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খার্গ দ্বীপ থেকে তেল রপ্তানি বেড়েছে বলে শনিবার দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে। তেহরান থেকে এএফপি জানায়, ইসনা সংবাদ সংস্থা ইরানের পার্লামেন্টের জ্বালানি কমিশনের প্রধান মুসা আহমাদির বরাতে জানায়, ‘খার্গ দ্বীপে সফর ও বৈঠক শেষে আমি বলতে পারি, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে তেল রপ্তানি কমেনি, বরং বেড়েছে।’ ইরানের পশ্চিম উপকূলের কাছে অবস্থিত খার্গ দ্বীপ দেশটির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে দ্রুত কোনো চুক্তি না হলে এবং হরমুজ প্রণালী ‘তাৎক্ষণিকভাবে’ পুনরায় চালু না করা হলে তিনি এই দ্বীপটি ধ্বংস করে দিতে পারেন। গত ১৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, তারা দ্বীপটিতে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা চালিয়েছে, তবে সেখানে থাকা তেল অবকাঠামোতে আঘাত করা থেকে বিরত থেকেছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো স্থল হামলার পরিকল্পনা করছে, বিশেষ করে ইরানের কোনো একটি দ্বীপকে লক্ষ্য করে। তারা এমন পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বারবার সতর্কবার্তা দিয়েছে। এই সতর্কতার মধ্যেই গত সপ্তাহে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মেরিন ও নাবিক বহনকারী উভচর হামলা জাহাজ ‘ইউএসএস ট্রিপোলি’ মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে।