ইরান যুদ্ধকে ন্যায্যতা দেওয়ার গল্পটা ডনাল্ড ট্রাম্পের নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা, প্রশ্নটা আর সে জায়গায় নেই।
সবশেষ প্রশ্ন যেটা দাঁড়িয়েছে, যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণটা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কব্জায় আছে তো?
একবার শুরু হয়ে গেলে একটা যুদ্ধ কখনো কখনো নিজেই গতিপথ ঠিক করে নেয়। হোয়াইট হাউজের আভাসের সঙ্গে সেই গতিপথ নাও মিলতে পারে।
পরিবর্তিত সেই পরিস্থিতিতে একজন প্রেসিডেন্ট যদি ঠিকঠাক দিক দেখাতে না পারেন, তাহলে রাজনৈতিক চোরাবালিতে তার আটকে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে ট্রাম্প প্রশাসন ভেবেছিল, তিন সপ্তাহ পরে গিয়ে পরিস্থিতি হয়ত আরও অনুকূলে থাকবে। কিন্তু তিন সপ্তাহ পরে এসে যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ মিলছে না।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তেহরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করে দিতে পেরেছে ঠিকই, কিন্তু ইরান যুদ্ধটা ছড়িয়ে দিয়েছে। তারা হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথও কার্যত বন্ধ রেখেছে।
হরমুজ বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে ইতোমধ্যেই এর প্রভাব পড়েছে; গ্যালনপ্রতি তেলের দাম চলে গেছে ৪ ডলারের কাছাকাছি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। কারণ, উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরায়েল যে ইরানের দক্ষিণ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে হামলা চালাবে, সেটা তিনি জানতেন না।
কিন্তু সিএনএন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যে যোগাযোগ ব্যবস্থা, তাতে ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্বাস করা কঠিন।
পরে অবশ্য আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে ট্রাম্প বলেন, তিনি নাকি ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে বলেছিলেন, ‘এ কাজ করো না’।
এ ঘটনা ট্রাম্পের সমর্থকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কেউ কেউ বলা শুরু করেছেন, এ যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের নয়; এ যুদ্ধ ইসরায়েলের।
ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মধ্যে পড়ে যাওয়া উপসাগরীয় দেশগুলো ক্ষুব্ধ।
এসব দেশ বলছে, তাদের আধুনিক নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন এমন এক যুদ্ধের কারণে হুমকিতে পড়ে গেছে, যে যুদ্ধ তারা চায়নি, যে যুদ্ধ শুরু করেছে তাদের মিত্র যুক্তরাষ্ট্র।
এদিকে হরমুজ খোলা রাখার লড়াইয়ে ইউরোপের দেশগুলোকে পাশে না পেয়ে প্রায়ই ক্ষোভ ঝাড়ছেন ট্রাম্প।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিক ফ্রিডরিশ ম্যার্ৎস চলতি সপ্তাহে বলেছেন, এটি আমাদের যুদ্ধ নয়।
ইরানের পারমাণবিক হুমকিকে যুদ্ধের যৌক্তিকতা হিসেবে তুলে ধরা হলেও ট্রাম্প প্রশাসন এখনো বিষয়টি জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘শিগগিরই যুদ্ধ শেষ হবে’। কিন্তু সেই ‘শিগগিরই’ কখন আসবে, তা কখনো তিনি বলেননি।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বৃহস্পতিবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ শেষ হওয়ার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই।
আমরা যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় লক্ষ্য অর্জন করেছি— এ ঘোষণা কখন দেব, সেই সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টই নেবেন।
কিন্তু যুদ্ধ কত দিন চলবে, এই প্রশ্ন ট্রাম্পকে শুনতেই হবে। ইরান যুদ্ধের জন্য পার্লামেন্টে গিয়ে যখন তিনি ২০ হাজার কোটি ডলার চাইবেন, তখন আইনপ্রণেতারা যুদ্ধের মেয়াদ নিয়ে ঠিকই প্রশ্ন তুলবেন।
সেনেটর লিসা মুরকোস্কি বলেন, আলাস্কার মানুষ আমাকে জিজ্ঞেস করছে, এই যুদ্ধ কতদিন চলবে? এতে কি স্থলসেনা পাঠানো হবে? এর খরচ কত হবে?
আলাস্কায় এই প্রশ্নগুলো জোরেশোরে উঠেছে, কারণ যুদ্ধে যাওয়া সেনার সংখ্যা সেখানে বেশি।
সিএনএন লিখেছে, সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া রিপাবলিকানরা সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে।
ট্রাম্পের সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে যদি আপত্তি ওঠে, তাহলে মধ্যবর্তী নির্বাচনের বছরে ডেমোক্র্যাটরা কী ট্রাম্পের যুদ্ধে অর্থায়নে সম্মতি দেবে?
একটা উত্তর অবশ্য হাউস স্পিকার মাইক জনসনের মুখ থেকে এসেছে, আমরা বিষয়টা দেখব।
‘চিরস্থায়ী যুদ্ধ নয়’
প্রেসিডেন্ট তার অবস্থানে এখনো দৃঢ় আছেন। বৃহস্পতিবার ওভাল অফিসে তিনি বলেন, ধ্বংস করার মতো যা কিছু ছিল, আমরা প্রায় সবই ধ্বংস করে ফেলেছি।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ সাংবাদিকদের সমালোচনা করে বলেন, এই সংঘাত শুরু হওয়ার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় কেউ কেউ ভাবছেন আমরা যেন এক অন্তহীন অতল গহ্বরের দিকে যাচ্ছি। কেউ কেউ আবার বলছেন, এটা চিরস্থায়ী যুদ্ধ বা এক জটিল ফাঁদে পরিণত হচ্ছে।
একদিক থেকে দেখলে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কথায় যুক্তি আছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের টানা বিমান হামলা নিঃসন্দেহে সামরিক দিক থেকে একটি সফলতা এনে দিয়েছে। কারণ ইরানের আঞ্চলিক হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা অনেকটা কমে গেছে।
কিন্তু এই হামলা কি দেশটির শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক ভিত্তিতে বড় ধরনের আঘাত হানতে পেরেছে?
জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসি গ্যাবার্ড বুধবার বলেন, ইরান দুর্বল হয়ে পড়েছে, তবে ‘এখনো টিকে আছে বোধহয়’।
সেই হিসাবে, ইরান হয়তো ট্রাম্পের যুদ্ধে হারছে, কিন্তু নিজের যুদ্ধে জিতছে।
তারা বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। এর প্রভাবে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে ট্রাম্পের উপর।
তেহরান ইতোমধ্যেই দেখিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার সক্ষমতা তাদের রয়েছে।
এক্ষেত্রে অবাক করার মতো বিষয় হলো, ইরান যে হরমুজ বন্ধ করে দিতে পারে, সেই শঙ্কায় ট্রাম্প প্রশাসন গুরুত্ব দেয়নি।
যুদ্ধ শুরুর সাত দিন আগেও হেগসেথ এই সমুদ্রপথ নিয়ে বলেছিলেন, এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।
সমুদ্র বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, প্রণালিটি পুনরায় চালু করা বিপজ্জনক হবে। আকাশ থেকে বোমা ফেলে সব সমস্যার সমাধান করা যায় না।
প্রণালির আশপাশের পাহাড় থাকায় ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ধ্বংস করতে বড় ধরনের স্থলবাহিনী প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
সব কিছু মিলিয়ে ট্রাম্প এমন এক কঠিন সিদ্ধান্তের কাছাকাছি চলে যাচ্ছেন, যার মুখোমুখি প্রায় সব কমান্ডারকেই হতে হয়— যুদ্ধ শেষ করতে চাইলে আগে কি সেটা বাড়িয়ে নিতে হবে?
বৃহস্পতিবার ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, আমি কোথাও সেনা পাঠাচ্ছি না। পাঠালে আপনাদের বলতাম না, কিন্তু আমি পাঠাচ্ছি না।
বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমাতে অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট প্রস্তাব দিয়েছেন, সমুদ্রে থাকা ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যেতে পারে।
বাইডেন প্রশাসনে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে ইরান বিষয়ক পরিচালক ছিলেন নেট সোয়ানসন। ২০২৫ সালের শুরুতে ট্রাম্পের ইরান বিষয়ক মধ্যস্থতাকারী দলের হয়েও কাজ করেছেন তিনি।
সিএনএনকে তিনি বলেন, আমাদের লক্ষ্য কী, সেটাই এখনো পরিষ্কার নয়। আর প্রতিদিনই লক্ষ্য বদলাচ্ছে। আসলে শুরুতেই বোঝা উচিত ছিল যে, এটা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হবে, কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি।
কবে ট্রাম্প বিজয় ঘোষণা করবেন এবং সেনাদের দেশে ফিরিয়ে আনবেন, ওয়াশিংটন এখন সেই অপেক্ষায় আছে।
কিন্তু সংঘাত যেভাবে বাড়ছে, তাতে হয়তো তার সামনে আর সেই সুযোগ নেই।
হেগসেথ অবশ্য বলেছেন, যুদ্ধের সময় নিয়ে কেউই নিখুঁত কোনো ধারণা দিতে পারে না।
সিএনএন লিখেছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এ কথা সত্য। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন ‘নিখুঁত ধারণার’ ধারেকাছেও নেই। নতুন একটি যুদ্ধ বাধালেও ট্রাম্প আর সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না।
যুদ্ধ কতদিন চলবে, কতদূর ছড়াবে, কত খরচ হবে এবং মূল্যস্ফীতিই বা মানুষকে কতটা ভোগাবে, সেই নিয়ন্ত্রণ ট্রাম্পের হাতে আর নেই।
বরং ট্রাম্পকে ইতিহাস কীভাবে মনে রাখবে, সেই ফয়সালাও ইরান যুদ্ধের মধ্য দিয়ে হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
টানা ছয় সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর চরম সংশয় আর অবিশ্বাসের মাঝেই পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইসলামাবাদে শুরু হয়েছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা। শনিবার সকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দুই দেশের প্রতিনিধিদের পৃথক বৈঠকের পর সন্ধ্যায় প্রথমবার সরাসরি এক টেবিলে বসেন দুই চিরবৈরী রাষ্ট্রের শীর্ষ কর্মকর্তারা। টানা দুই ঘণ্টা তাদের এই আলোচনা চলে। মার্কিন হামলার ভয়াবহতা তুলে ধরতে কালো পোশাক পরে এবং নিহত স্কুল শিক্ষার্থীদের জুতা ও ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে পাকিস্তানে আসেন ইরানি প্রতিনিধিরা। হাইভোল্টেজ এ বৈঠকে মূলত সাতটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্ব পাচ্ছে। লেবাননে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি, সব ধরনের মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম ধমনি হরমুজ প্রণালির ওপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের দাবিতে অনড় ইরান। অন্যদিকে হরমুজকে শর্তহীনভাবে উন্মুক্ত করা এবং ইরানের পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচি চিরতরে বন্ধের শর্তে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর দুই দেশের এ শীর্ষ পর্যায়ের সরাসরি আলোচনা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকে খাদের কিনারা থেকে ফেরাতে পারবে কি না, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। একটি পাকিস্তানি সূত্র জানিয়েছে, আলোচনা ইতিবাচক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেরেনা হোটেলে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির এই আলোচনা দুই ঘণ্টা চলে। এরপর নৈশভোজের বিরতি দেওয়া হয়েছে। আবার এ আলোচনা শুরু হবে। এ সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধানও উপস্থিত ছিলেন। শুরুতে বলা হচ্ছিল, দুই দেশের প্রতিনিধিরা পরোক্ষভাবে আলোচনায় অংশ নেবেন। তবে পরে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে সরাসরি আলোচনা শুরু হয়। এটিকে বড় অগ্রগতি হিসাবে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে অনেক বিষয় আলোচনায় এসেছে। লেবানন ইস্যুতেও কিছু অগ্রগতি হয়েছে। কিছু সূত্র ইঙ্গিত দিয়েছে, ইসরাইলের অভিযান এখন লেবাননের দক্ষিণে সীমাবদ্ধ থাকবে, বৈরুতে আর কোনো হামলা হবে না। ইরানের সূত্র অনুযায়ী, দেশটির আটকে থাকা প্রায় ৬০০ কোটি ডলার ছাড়ে রাজি হয়েছে ওয়াশিংটন। তবে যেহেতু রুদ্ধদ্বার বৈঠক, তাই তাৎক্ষণিকভাবে সব তথ্য যাচাই করা যায়নি। খবর রয়টার্স, আলজাজিরা, তাসনিম নিউজ, ডন, এএফপিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের। এর আগে শনিবার সকালে মার্কিন বিমানবাহিনীর দুটি বিশেষ বিমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল ইসলামাবাদ বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বাধীন এই দলে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তাদের স্বাগত জানান পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির নেতৃত্বে ইরানি প্রতিনিধিদল শুক্রবারই ইসলামাবাদে পৌঁছায়। সদ্য নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং যুদ্ধে নিহত অন্য ইরানিদের স্মরণে তারা কালো পোশাক পরে এসেছিলেন। মার্কিন হামলায় নিহত শিক্ষার্থীদের স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে তারা নিহতদের জুতা ও ব্যাগ সঙ্গে করে নিয়ে আসেন। শান্তি আলোচনার আগে শনিবার দুপুরে ইসলামাবাদে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করে ইরানের প্রতিনিধিদল। এর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে মার্কিন প্রতিনিধিদল শাহবাজ শরিফের সঙ্গে বৈঠক করে। পরে এক বিবৃতিতে শাহবাজ শরিফ আশা প্রকাশ করেন, এ আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে একটি বড় ধাপ হিসাবে কাজ করবে। একই সঙ্গে দুই পক্ষকে সম্ভাব্য সব ধরনের সহযোগিতা দিতে পাকিস্তানের অঙ্গীকারের কথা তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন। পরে ইরানের প্রতিনিধিদলটি পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসীম মুনিরের সঙ্গেও বৈঠক করে। দুই বৈঠকে ইরানি প্রতিনিধিদল জানায়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং পূর্ব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অগ্রগতি মূল্যায়ন করবে। নিশ্চিদ্র নিরাপত্তায় রেড জোন: এই হাইভোল্টেজ আলোচনাকে কেন্দ্র করে ২০ লাখ মানুষের শহর ইসলামাবাদকে নজিরবিহীন নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। শহরের মোড়ে মোড়ে হাজার হাজার সেনাসদস্য ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে এবং মূল কেন্দ্রটিকে রেড জোন হিসাবে ঘোষণা করা হয়েছে। লেবাননে সংঘাত অব্যাহত: দক্ষিণ লেবাননে শনিবারও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত ছিল। বৈরুতের আকাশে ইসরাইলি ড্রোন এবং যুদ্ধবিমানের শব্দ শোনা গেছে। অন্যদিকে, হিজবুল্লাহও ইসরাইলি অবস্থানে একাধিক পালটা হামলা চালিয়েছে। মঙ্গলবার ওয়াশিংটনে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে আলাদা বৈঠক হওয়ার কথা থাকলেও এর আলোচ্যসূচি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিভ্রান্তি রয়েছে। লেবানন বলছে, এটি যুদ্ধবিরতির আলোচনা আর ইসরাইল একে ‘আনুষ্ঠানিক শান্তি আলোচনা’ হিসাবে অভিহিত করছে। যে ৭ ইস্যুতে আলোচনায় গুরুত্ব: বৈঠকে দুই পক্ষের মধ্যে মূলত সাতটি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এগুলো হলো-১. ইরান লেবাননে অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি চায়। মার্চ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় সেখানে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহর প্রায় ২ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, লেবাননে ইসরাইলি অভিযান মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতির অংশ নয়; তবে তেহরানের দাবি, এটি চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২. ইরান চায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের আটকে থাকা সম্পদ ছাড় করুক এবং অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়া সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করুক। ওয়াশিংটন ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা উলেখযোগ্য মাত্রায় নিষেধাজ্ঞা শিথিল করতে রাজি, তবে এর বিনিময়ে ইরানকে তাদের পারমাণবিক ও মিসাইল কর্মসূচিতে ছাড় দিতে হবে। ৩. ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের কর্তৃত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি চায়। তারা এ পথ দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের কাছ থেকে ট্রানজিট ফি আদায় এবং প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বিশাল পরিবর্তন আনবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চায় কোনো ধরনের টোল বা সীমাবদ্ধতা ছাড়াই তেলের ট্যাংকার ও অন্যান্য বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য প্রণালিটি পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকুক। ৪. ছয় সপ্তাহের এই যুদ্ধে হওয়া সব ক্ষয়ক্ষতির জন্য ইরান ক্ষতিপূরণ চেয়েছে। ৫. ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি চায়। তবে ওয়াশিংটন এটি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেছেন যে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র আপস করা হবে না। ৬. ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় দেশই চায় ইরানের মিসাইল সক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমিয়ে আনা হোক। কিন্তু তেহরান সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের শক্তিশালী মিসাইল ভান্ডারের বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে রাজি নয়। ৭. ইরান চায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন যুদ্ধকামী বাহিনী প্রত্যাহার করা হোক, সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ হোক এবং ভবিষ্যতে আর কোনো আগ্রাসন না চালানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হোক। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শান্তিচুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বজায় রাখার অঙ্গীকার করেছেন। আটকে থাকা সম্পদ ও লেবানন ইস্যু: ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, সরাসরি আলোচনা শুরুর আগেই কাতারসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের ৬০০ কোটি ডলার ছাড় করতে যুক্তরাষ্ট্র সম্মত হয়েছে। ইরান এটিকে আলোচনার প্রতি ওয়াশিংটনের ‘আন্তরিকতা’ হিসাবে দেখছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্পদ ছাড়ের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। এই ৬০০ কোটি ডলার মূলত ২০১৮ সালে প্রথমবার আটকে দেওয়া হয়। এরপর ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তির অংশ হিসাবে এটি ছাড় করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইরানের মিত্র ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাস ইসরাইলে আকস্মিক হামলা চালানোর পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন আবারও ওই অর্থ আটকে দেয়। সেসময় মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, অদূরভবিষ্যতে ইরান এই অর্থের নাগাল পাবে না এবং হিসাবটি পুরোপুরি জব্দ রাখার অধিকার ওয়াশিংটনের রয়েছে। মূলত দক্ষিণ কোরিয়ায় ইরানের তেল বিক্রির অর্থ ছিল এগুলো। ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে ২০১৮ সালে পারমাণবিক চুক্তি বাতিল করে ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাংকে এই অর্থ আটকে যায়। পরে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে দোহার মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় অর্থগুলো কাতারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। ওই চুক্তির অধীনে ইরানে বন্দি পাঁচ মার্কিন নাগরিকের মুক্তির বিনিময়ে এই অর্থ ছাড় করা এবং যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি পাঁচ ইরানিকে মুক্তি দেওয়ার কথা ছিল।
ইরানের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ শুরুর প্রাক্কালে ‘সতর্ক আশাবাদ’ ব্যক্ত করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পরোক্ষ কূটনৈতিক আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যায় এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, আলোচনার ফলাফল আগে থেকে নির্ধারিত নয়। তবে তিনি প্রতিনিধি দলের দক্ষতার ওপর আস্থা প্রকাশ করেন। ট্রাম্প বলেন, “দেখা যাক কী হয়। সেখানে জেডি (ভ্যান্স), স্টিভ এবং জ্যারেড রয়েছে। আমাদের একটি শক্তিশালী দল আছে—তারা আগামীকাল বৈঠকে বসছে।” তিনি ইঙ্গিত দেন, আলোচনাটি কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ, যেমন হরমুজ প্রণালি, এই আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রে রয়েছে। ট্রাম্প বলেন, “হরমুজ প্রণালি খুলে যাবে। আমরা যদি এটি ছেড়ে দিই, তাহলে এটি এমনিতেই খুলে যাবে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি এই নৌপথের ওপর নির্ভরশীল না হলেও অন্যান্য দেশ এ ক্ষেত্রে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে। আলোচনা ব্যর্থ হলে কোনো বিকল্প পরিকল্পনা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “কোনো ব্যাকআপ প্ল্যানের প্রয়োজন নেই।” তবে তিনি স্বীকার করেন, পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ হবে না। অন্যদিকে, ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বদানকারী ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স আলোচনাকে ইতিবাচক বলে মন্তব্য করেছেন। তবে একই সঙ্গে ইরানকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, তারা যেন কোনো ধরনের কৌশলী আচরণ বা ‘চতুরতা’ প্রদর্শনের চেষ্টা না করে। এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান নিজেকে আলোচনার মধ্যস্থতাকারী নয়, বরং একটি সহায়ক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থাপন করেছে। দেশটি মূলত সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে কাজ করছে। ওয়াশিংটনে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত রিজওয়ান সাঈদ শেখ জানান, এই পর্যায়ে পৌঁছাতে ব্যাপক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, “এটি একটি যৌথ কূটনৈতিক সাফল্য, যেখানে তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরসহ একাধিক দেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।” তিনি আরও জানান, প্রতিনিধি দলগুলো ইতোমধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছাতে শুরু করেছে এবং আলোচনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক সমঝোতাগুলো মেনে চলাই হবে আলোচনার সফলতার প্রধান শর্ত। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া এই সংলাপে দুই পক্ষের গঠনমূলক মনোভাবই ফলাফল নির্ধারণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। সূত্র : ডন
রাস্তাঘাট নতুন করে রং করা হচ্ছে, বেড়েছে নিরাপত্তার কড়াকড়ি; সব মিলিয়ে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এখন টানটান উত্তেজনা, তাতে প্রত্যাশার সঙ্গে মিশে আছে উৎকণ্ঠা। ইসলামাবাদে বসতে যাচ্ছে এমন এক বৈঠক, যার দিকে তাকিয়ে আছে পুরো বিশ্ব। ঠিক ছয় সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলা চালিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যা করে। সেই হামলা থেকেই শুরু হয় এক যুদ্ধ, যাতে হাজারো মানুষ নিহত হয়েছেন, বন্ধ হয়ে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ, জ্বালানির দাম আকাশ ছুঁতে চাইছে। এমনই এক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা শনিবার ইসলামাবাদে বসছেন যুদ্ধবিরতির আলোচনায়। এই বৈঠক হচ্ছে এমন এক সময়ে, যখন ওয়াশিংটন ও তেহরান পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও শর্ত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। ইসরায়েল লেবাননে তীব্র হামলা অব্যাহত রাখায় সেই যুদ্ধবিরতিও ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েল ছাড়াও উপসাগরীয় প্রতিবেশীদের ওপর ইরানের পাল্টা হামলার কারণে বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি রপ্তানি কেন্দ্র এবং বাণিজ্য-পর্যটন-উদ্ভাবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলো ডুবেছে অস্থিরতা আর অনিশ্চয়তায়। যুদ্ধ শুরুর পরপরই তেহরান হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেয়। সংকীর্ণ ওই জলপথ দিয়েই বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর জেরে বিশ্ববাজার অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে এবং জ্বালানির দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। সেই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টায় যুদ্ধের প্রধান পক্ষগুলো মারগাল্লা পাহাড়ের পাদদেশে সবুজ শহর ইসলামাবাদে সমবেত হতে যাচ্ছেন। সেখানে কারা থাকবেন, কী নিয়ে আলোচনা হবে, সমঝোতার আশাই বা কতটুকু-সেসব প্রশ্নের উত্তর এক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে আল জাজিরা। কখন এবং কোথায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পূর্ণাঙ্গ সমাধানের লক্ষ্যে দুই পক্ষকে আলোচনার জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানোর পর এ সপ্তাহান্তে ইসলামাবাদে আলোচনা শুরু হচ্ছে। হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, স্থানীয় সময় শনিবার সকালেই আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হবে। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ৮ এপ্রিল জানিয়েছে, এই আলোচনা ১৫ দিন পর্যন্ত চলতে পারে। তাতে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে, প্রতিনিধি দলের অন্তত কিছু সদস্য শনিবারের পরও ইসলামাবাদে অবস্থান করতে পারেন বা পরবর্তী দফার বৈঠকের জন্য আবার ফিরে আসতে পারেন। রাজধানীর রেড জোনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশে সেরেনা হোটেলে থাকবে প্রতিনিধি দলগুলো। বুধবার সন্ধ্যা থেকে রোববার পর্যন্ত হোটেলটির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে সরকার। সাধারণ অতিথিদের চলে যেতে বলা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এ হোটেলেই আলোচনার মূল পর্ব অনুষ্ঠিত হবে। নিরাপত্তার কারণে ৯ ও ১০ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। তবে পুলিশ, হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ-গ্যাসের মত জরুরি পরিষেবাগুলো এর আওতামুক্ত থাকবে। পুরো শহরে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে; রেড জোন সিল করে দেওয়ার পাশাপাশি ইসলামাবাদে প্রবেশের প্রধান পথগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। কারা থাকছেন আলোচনায় হোয়াইট হাউস নিশ্চিত করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। তার সঙ্গে থাকবেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। ইরানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির। তেহরানের সামরিক অভিযানের নেতৃত্বে থাকা ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) কোনো প্রতিনিধি থাকছেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে গালিবফ নিজে আইআরজিসির সাবেক কমান্ডার ছিলেন। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা অবশ্য সতর্ক করেছেন। তারা বলেছেন, প্রতিনিধি দলগুলো পৌঁছানোর আগে নিশ্চিত করে কিছুই বলা যাচ্ছে না। পাকিস্তানে ইরানের রাষ্ট্রদূত রেজা আমিরি মোগাদ্দাম একসময় এক্স-এ লিখেছিলেন, কূটনৈতিক উদ্যোগ নস্যাৎ করতে ইসরায়েল বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করায় ইরানের জনমনে সংশয় থাকা সত্ত্বেও প্রতিনিধি দল ইরানের প্রস্তাবিত ১০ দফার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্য আসছে। তবে পোস্ট করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তিনি সেটি মুছে ফেলেন। আলোচনার রূপরেখা কেমন হবে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আনুষ্ঠানিকভাবে এই বৈঠকের আয়োজক হিসেবে থাকবেন এবং প্রতিনিধি দলগুলোর আগমনের সময় অনুযায়ী শুক্র বা শনিবার সকালে দুই পক্ষের সঙ্গে আলাদাভাবে প্রাথমিক বৈঠক করতে পারেন। উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সংঘাতের পুরো সময়টা কূটনৈতিক তৎপরতায় যুক্ত ছিলেন। শনিবার মূল আলোচনায় তিনি সমন্বয়কের ভূমিকা পালন করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির আলোচনায় অংশ নেবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সামরিক বাহিনীর জনসংযোগ শাখা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধি দল আলাদা দুটি কক্ষে বসবেন এবং পাকিস্তানি কর্মকর্তারা তাদের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান করবেন। এ আলোচনায় জে ডি ভ্যান্সের অন্তর্ভুক্তিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনারের সঙ্গে ফেব্রুয়ারি মাসে মাস্কাট ও জেনিভায় আলোচনা চলাকালেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে বোমা হামলা শুরু করায় তাদের নিয়ে তেহরানের গভীর সংশয় রয়েছে। ইরানের কর্মকর্তারা ভ্যান্সকে সংঘাত অবসানের বিষয়ে তুলনামূলক বেশি আন্তরিক বলে মনে করছেন। ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির মনোনয়নের সম্ভাব্য দাবিদার হিসেবে বিবেচিত ভ্যান্স মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সবসময়ই সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বৈঠকের খবর সংগ্রহ করতে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো থেকে তিন ডজনের বেশি ভিসার আবেদন জমা পড়েছে, যার মধ্যে অন্তত ২০ জন সাংবাদিককে অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৩০ সদস্যের একটি মার্কিন নিরাপত্তা দল এরই মধ্যে ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। কেন পাকিস্তান? গত কয়েক সপ্তাহে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অন্যতম প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান। দেশ দুটির সঙ্গে অতীতে সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও বর্তমানে ইসলামাবাদের সঙ্গে দুই পক্ষেরই কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে। কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার ফোনালাপ করেছেন। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং ইরানের পর পাকিস্তানেই সবচেয়ে বেশি শিয়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর বসবাস। তেহরানের কাছে পাকিস্তানের গুরুত্ব বাড়ার পেছনে এগুলো বড় কারণ। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশের মত পাকিস্তানে কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই, যা ইরানের কাছে দেশটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়েছে। আর ২০০৪ সাল থেকেই পাকিস্তান নেটোর বাইরে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে স্বীকৃত। এত কিছুর পরও ইসলামাবাদে মার্কিন রাষ্ট্রদূতের পদটি প্রায়ই শূন্য থেকে গেছে। ২০১৮ সালের পর একমাত্র ডনাল্ড ব্লুমি রাষ্ট্রদূত হিসেবে পুরো মেয়াদ দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে পদটি শূন্য। সর্বশেষ ২০০৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ পাকিস্তান সফর করেছিলেন। আর সর্বশেষ ২০১১ সালে জো বাইডেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে সেখানে যান। ১৫ বছর পর জে ডি ভ্যান্সের এই সম্ভাব্য সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চেয়ে যুদ্ধ থামানোর দিকেই সবার মনোযোগ থাকবে। বিষয়টি ইসলামাবাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের সম্পৃক্ততারও ইঙ্গিত দেয়। কোনো দেশে রাষ্ট্রদূত নেই, অথচ ভাইস প্রেসিডেন্ট সফর করছেন—এমন ঘটনা বিরল। আলোচনার টেবিলে কী থাকছে? উভয় পক্ষই বড় ধরনের মতপার্থক্য নিয়ে আলোচনায় বসছে। ইরানের ১০ দফা শান্তি প্রস্তাবের মধ্যে হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ইরানের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে এসব শর্ত মেনে নেয়নি, তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১০ দফা পরিকল্পনাটিকে ‘কার্যকরযোগ্য’ বলেছেন। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ছেড়ে দিতে রাজি আছে। মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট বলেছেন, এ বিষয়ে আপসের কোনো সুযোগ নেই। অবশ্য ইরান এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সম্মতি জানায়নি। আরেকটি বড় বিরোধের বিষয় লেবানন। বুধবার উত্তর লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ২০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যা বর্তমান যুদ্ধের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান যুদ্ধবিরতি থেকে সরে আসতে পারে। তিনি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে হয় যুদ্ধবিরতি নয়ত ইসরায়েলের মাধ্যমে যুদ্ধ—এই দুটোর একটি বেছে নিতে হবে। তিনি পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সেই বক্তব্যের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, যেখানে বলা হয়েছিল, যুদ্ধবিরতির আওতায় লেবাননসহ পুরো অঞ্চলেই হামলা বন্ধ থাকবে। তবে বুদাপেস্টে দেওয়া বক্তব্যে ভ্যান্স বলেছেন, যুদ্ধবিরতির শর্তে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। ট্রাম্প এবং হোয়াইট হাউসের অবস্থানও এক্ষেত্রে একই। চীনে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ আল জাজিরাকে বলেন, আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই পরিবেশ ‘বিষিয়ে’ উঠেছে। তিনি বলেন, “ইসরায়েল এই প্রক্রিয়াকে ভণ্ডুল করতে বাধা সৃষ্টি করছে। লেবাননে অবিরাম হামলা চালিয়ে তারা এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যাতে পক্ষগুলো আরও কঠোর অবস্থান নেয় এবং আলোচনা ভেঙে পড়ে। এই পর্যায়ে আমরা কেবল সতর্কভাবে আশাবাদী হতে পারি, কারণ আলোচনা নিশ্চিতভাবেই জটিল ও দীর্ঘ হবে এবং তা ১৫ দিনের সময়সীমা ছাড়িয়ে যেতে পারে। ওয়াশিংটনভিত্তিক স্বাধীন বিশ্লেষক সাহার খানও একই মত পোষণ করেছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেছেন, ‘আস্থার সংকটই’ সবচেয়ে বড় বাধা। ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই এখন সর্বোচ্চ দাবি তুলে ধরে নিজেদের ‘বিজয়ী’ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করছে। তবে এই যুদ্ধবিরতি যদি টিকে থাকে এবং তারা শেষ পর্যন্ত বৈঠকে বসে, সেটাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। সম্ভাব্য ফলাফল ও অন্তরায় বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের গভীর অবিশ্বাসের কারণে স্বল্পমেয়াদে চূড়ান্ত সমাধান আসার সম্ভাবনা কম। ইসলামাবাদে ইরানের রাষ্ট্রদূত আমরি মোগাদ্দাম তার মুছে দেওয়া পোস্টে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, লেবাননে ইসরায়েলি হামলাকে তেহরান আলোচনা নস্যাৎ করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে। লেবানন এখন দুই পক্ষের মধ্যে মূল বিভাজন রেখা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাসুদ খালিদ বলেন, শাহবাজ শরিফের বক্তব্যে লেবাননের স্পষ্ট উল্লেখ ইঙ্গিত দেয় যে এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আগে আলোচনা হয়েছিল। তিনি বলেন, “নেতানিয়াহু তাৎক্ষণিকভাবে পাকিস্তানের অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও পরে যুদ্ধবিরতির আওতা থেকে লেবাননকে বাদ দেন। অন্যদিকে ইরান লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধে অনড় এবং তারা ফ্রান্সের মত কিছু দেশের সমর্থনও পাচ্ছে। চাবিকাঠি এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে। সাহার খানের মতে, লেবানন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্কের ‘ব্রেকিং পয়েন্ট’ বা চরম সংকটের জায়গা। তিনি বলেন, টেকসই সমাধান কেবল তখনই সম্ভব যদি ইসরায়েল হামলা বন্ধ করে। আগের সব দফার বৈঠকে ইসরায়েলই ইরানে হামলা চালিয়ে আলোচনা ভেঙেছে। শেষ পর্যন্ত এটা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করছে—তারা কি যুদ্ধবিরতি বাতিল করে ইরানে হামলা করবে, নাকি ইসরায়েলকে থামতে বলবে। গালফ ইন্টারন্যাশনাল ফোরামের নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফের মনে করেন, আলোচনায় ইসরায়েলের অনুপস্থিতি একটি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। তিনি বলেন, ইসরায়েল এই যুদ্ধের একটি পক্ষ এবং এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পেছনে তাদের স্বার্থই সবচেয়ে বেশি। তাই আলোচনা ও চূড়ান্ত সমাধানে তাদের অংশ হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে তারা সবসময়ই যুক্তি দিতে পারবে যে তারা কোনো চুক্তির শর্তে একমত ছিল না। সাবেক রাষ্ট্রদূত মাসুদ খালিদ অবশ্য মনে করেন, শেষ পর্যন্ত চরম অবস্থানগুলো কিছুটা নরম হতে পারে। তার মতে, পারমাণবিক শক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কিছুটা সমঝোতা এবং হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে বহুপক্ষীয় বোঝাপড়া সম্ভব হতে পারে, কারণ দুই পক্ষই এখন ক্লান্ত এবং সংঘাত থেকে বিরতি চায়। তবে এই শান্তি চুক্তির গ্যারান্টার বা জামিনদার কেউ হাতে চাইবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত নন। মাসুদ খালিদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের পক্ষে গ্যারান্টার হওয়ার ঝুঁকি কোনো একক দেশ নিতে চাইবে না। চীন অন্তত এই ঝুঁকি নেবে না। তার মতে, যে কোনো চুক্তির ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলো এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের সমর্থন প্রয়োজন হবে এবং সব পক্ষের জন্য সেই চুক্তি মানার বাধ্যবাধকতা থাকতে হবে। সাহার খান মনে করেন, গ্যারান্টার কে হবে, সেই প্রশ্ন তোলার সময় এখনো আসেনি। এই দফার আলোচনায় চীনের থাকার প্রয়োজন নেই। যুদ্ধবিরতি হল একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং এর প্রথম লক্ষ্য হল আস্থা তৈরি করা। যুক্তরাষ্ট্র যদি এই আলোচনার সময় ইসরায়েলকে নিয়ন্ত্রণে রেখে লেবাননে হামলা থামাতে পারে, সেটাই হবে বড় সাফল্য এবং ট্রাম্প তখন একে বিজয় হিসেবে দাবি করতে পারবেন।