গত বছরের জুলাই-আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হলেও এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমা চাইতে রাজি নন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভারতের নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনার দেওয়া সাক্ষাৎকার বুধবার আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্স, এএফপি ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টে প্রকাশিত হয়।
সাক্ষাৎকারে তিনি তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ ‘প্রত্যাখ্যান’ করেছেন এবং চলমান বিচারকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন না করে লাখো মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে যাচ্ছে। হাসিনার অভিযোগ, তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘ক্যাঙ্গারু কোর্টে মামলা চলছে, অপরাধী বানিয়ে রায় আগেই নির্ধারিত হয়ে গেছে। মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হলে তিনি অবাক বা ভীত হবেন না বলেও উল্লেখ করেন।
শেখ হাসিনা আরও বলেন, আওয়ামী লীগকে আগামী বছরের নির্বাচনে অংশ নিতে না দেওয়া হলে দলটির লাখ লাখ সমর্থক এই নির্বাচন বয়কট করবে। হাসিনা জানান, তার দলকে বাদ দিয়ে হওয়া নির্বাচনের মাধ্যমে যেই সরকারই হোক তাদের সময়ে তিনি দেশে ফিরবেন না এবং তিনি ভারতেই অবস্থান করবেন। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথম তিনি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন।
শেখ হাসিনা বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ দেশের ভবিষ্যৎ ভূমিকা পালনে ফিরে আসবে, সেটা সরকারে হোক আর বিরোধী দলে হোক এবং এখানে তার পরিবারের নেতৃত্ব দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তিনি বলেন, এটা আসলে আমার বা আমার পরিবারের ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের জন্য আমরা সবাই যা চাই, সেখানে সাংবিধানিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা পরিবার আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের স্বাধীন প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, জুলাই অভ্যুত্থানে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতা নিহত এবং কয়েক হাজার মানুষ আহত হন। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউটররা শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ চেয়েছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আগামী ১৩ নভেম্বর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায় ঘোষণার তারিখ জানাবে।
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে শেখ হাসিনা বলেন, আমি নিহত প্রতিটি শিশু, ভাইবোন, আত্মীয় ও বন্ধুর জন্য শোক জানাই। তবে এজন্য আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে অস্বীকৃতি জানান তিনি। তার দাবি, সরকার উৎখাতের জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা অস্থিরতা তৈরি করে চক্রান্ত করেছিল। ব্যাপক প্রাণহানির জন্য তিনি মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা বাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়াকে দায়ী করে বলেন, একজন নেতা হিসাবে আমি চূড়ান্তভাবে নেতৃত্বের দায় নিচ্ছি, কিন্তু আমি নিরাপত্তা বাহিনীকে ভিড়ের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দিয়েছিলাম বা চেয়েছিলাম, এই দাবিটি পুরোপুরি ভুল।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাইয়ের একটি ফোন রেকর্ডিং প্রকাশ হয়, যেখানে হাসিনা তার ভাতিজা, ঢাকা দক্ষিণ সিটির সাবেক মেয়র ফজলে নূর তাপসকে বলেন, ‘আমার নির্দেশনা দেওয়া আছে। ওপেন নির্দেশনা দিয়ে দিছি এখন। এখন লেথাল ওয়েপন ব্যবহার করবে। যেখানেই পাবে সোজা গুলি করবে। এটা বলা আছে।’ তবে এএফপির কাছে হাসিনা দাবি করেছেন, অডিওটির কথাগুলো ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ, আমি নিজে বাহিনীগুলোকে আন্দোলনে গুলি চালাতে বলেছি, এটা মিথ্যা।’ তবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, ‘চেইন অব কমান্ডের ভেতরে কিছু ভুল অবশ্যই হয়েছিল।’
শেখ হাসিনা অভিযোগ করেন, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন ‘অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার’ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তিনি বলেন, এটা জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার কেড়ে নিচ্ছে, যা একটি বিপজ্জনক নজির হতে যাচ্ছে।
রয়টার্সকে শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্যায় নয়, এটি আত্মঘাতীও। উল্লেখ্য, হাসিনা সরকার ২০২৪ সালে পতনের মাত্র কয়েকদিন আগে জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করেছিল।
হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগসহ প্রধান সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া নির্বাচন বিশ্বাসযোগ্য হবে না। কার্যকর রাজনৈতিক ব্যবস্থা চাইলে, আপনি লাখ লাখ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেন না। উল্লেখ্য, বিগত আমলে বিরোধী দলগুলো ছাড়াই নির্বাচন করেছিল শেখ হাসিনা সরকার, যেগুলোতে লাখ লাখ ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছিল।
এএফপির কাছে হাসিনা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, মামলাগুলো কোনো প্রমাণসাপেক্ষে করা হয়নি। ট্রাইব্যুনালটি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা গঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি রয়টার্সকে বলেন, পরবর্তী সরকারের নির্বাচনের মাধ্যমে বৈধতা থাকা আবশ্যক। দেশের লাখ লাখ মানুষ আওয়ামী লীগকে সমর্থন করে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তারা ভোট দেবে না। সমর্থকদের অন্য দলেও ভোট দিতে বলেননি শেখ হাসিনা। তার আশা, নির্বাচনের আগে তার দল কার্যক্রম চালাতে পারবে।
দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টকে হাসিনা বলেন, তার বিরুদ্ধে মামলাগুলো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ। ভারতের বাইরে কোথাও আশ্রয় নেওয়ার কোনো ইচ্ছা নেই বলেও জানান তিনি। হাসিনা বলেন, তিনি দিল্লিতে নিরিবিলি ও স্বাধীনভাবে বসবাস করছেন। মাঝে মাঝে শহরের লোধি গার্ডেনে হাঁটতে যান। তবে অতীতে তার পরিবারের সদস্যদের হত্যার ঘটনার কারণে তিনি সতর্ক আছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য সাংবিধানিক শাসন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসা জরুরি। দেশের ভবিষ্যৎ কোনো একক ব্যক্তি বা পরিবার নির্ধারণ করে দিতে পারে না।
এএফপিকে হাসিনা বলেন, তার এখন অগ্রাধিকার বাংলাদেশের কল্যাণ ও স্থিতিশীলতা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনগণ যা চায়, সেটা দিতে হলে ইউনূসকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম পুনর্বহাল করতে হবে। রয়টার্সকে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা শুধু অন্যায্যই নয়, বরং আত্মঘাতী।
তিনি আরও বলেন, পরবর্তী সরকারের অবশ্যই নির্বাচনি বৈধতা থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের লাখ লাখ সমর্থক, এমন পরিস্থিতি থাকলে, ভোটে অংশ নেবে না। একটি কার্যকর রাজনৈতিক সিস্টেম চাইলে আপনি লাখ লাখ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে পারেন না।
রয়টার্স লিখেছে, বাংলাদেশে ১২ কোটি ৬০ লাখেরও বেশি ভোটার আছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দীর্ঘকাল ধরে দেশটির রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। আগামী নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করবে বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন গত মে মাসে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছে। এর আগে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে।
হাসিনা বলেন, আমরা আওয়ামী লীগের ভোটারদের অন্য দলকে সমর্থন করতে বলছি না। আমরা এখনো আশা করি শুভবুদ্ধির উদয় হবে এবং আমরা নিজেরাই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাব।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে পদোন্নতিতে অনিয়ম ও অসঙ্গতির অভিযোগে দায়ের করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন। একই সঙ্গে আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি সংক্রান্ত যেকোনো কার্যক্রম অবৈধ হিসেবে গণ্য হবে। দেশের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত বিশেষায়িত ব্যাংকটির ১০ম গ্রেডের পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা দীর্ঘদিন ধরে ন্যায্য পদোন্নতির দাবিতে শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করে আসছিলেন। দাবি আদায়ে বারবার কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন ও মানববন্ধন করেও সাড়া না পেয়ে তারা শেষ পর্যন্ত আদালতের দ্বারস্থ হন। সূত্র জানায়, পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা গত বছরের ১৪ সেপ্টেম্বর (শনিবার) ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ছুটির দিনে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন, যাতে গ্রাহকসেবা ব্যাহত না হয়। তাদের দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করে তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শওকত আলী খান দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন। তবে তিন মাস পার হলেও প্রতিশ্রুত আশ্বাস বাস্তবায়িত না হওয়ায় তারা পুনরায় ওই বছরের ৩০ নভেম্বর মানববন্ধনের আয়োজন করেন। এতে সারা দেশের শাখা থেকে ১২০০–এর বেশি কর্মকর্তা অংশ নেন। পরদিন (১ ডিসেম্বর) বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী পদোন্নতির বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস দিলে আন্দোলনকারীরা কর্মস্থলে ফিরে যান। পরে কর্মকর্তাদের জানানো হয়, সুপারনিউমারারি পদ্ধতিতে মার্চের মধ্যে পদোন্নতির বিষয়টি সমাধান করা হবে। কিন্তু এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। অন্যদিকে অগ্রণী, জনতা, রূপালী ও সোনালী ব্যাংকে ইতোমধ্যে মোট ৭,৩১৬ কর্মকর্তা এই পদ্ধতিতে পদোন্নতি পেয়েছেন, যা অর্থ মন্ত্রণালয়ও অনুমোদন করেছে। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের এই উদাসীনতা তাদের প্রতি কর্মীবান্ধবহীন মনোভাব ও কর্তৃপক্ষের অনীহারই প্রকাশ। তারা বলেন, গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচার পতনের পর অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তন এলেও কৃষি ব্যাংকে আগের প্রশাসনিক কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে, যা ন্যায্য দাবি আদায়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের অভিযোগ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক ও মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন একাধিক বৈঠকে আশ্বাস দিলেও বাস্তব পদক্ষেপ না নিয়ে বরং আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী কর্মকর্তাদের হয়রানি ও নিপীড়ন করা হয়েছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে এ বছরের চলতি মাসে হাইকোর্টে রিট দায়ের করেন (রিট মামলা নং: ১৬৪২৮/২০২৫, মো. পনির হোসেন গং বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য)। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ অক্টোবর হাইকোর্ট রুল জারি করে জানতে চেয়েছেন, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের পদোন্নতিতে দেখা দেওয়া অনিয়ম ও অসঙ্গতি কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না। পাশাপাশি আদালত নির্দেশ দিয়েছেন, রুল নিষ্পত্তির আগে কোনো পদোন্নতি কার্যক্রম শুরু করা হলে তা অবৈধ ও আদালত–অবমাননার শামিল হবে। রিটে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে ১০৭৩ জন কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে মূখ্য কর্মকর্তা) এবং ৫১ জন মূখ্য কর্মকর্তা (ঊর্ধ্বতন মূখ্য কর্মকর্তা পদে) অনিয়মের মাধ্যমে পদোন্নতি পেয়েছেন। এদিকে জানা গেছে, পূর্বে দুর্নীতির অভিযোগে আলোচিত মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক জাহিদ হোসেন এখনো পদোন্নতি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। পদোন্নতি–বঞ্চিত কর্মকর্তারা বলেন, হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করে যদি পুনরায় অনিয়মের পথে যাওয়া হয়, তাহলে তা আদালতের অবমাননা ও রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল হবে। তারা আশা করছেন, এ বিষয়ে দ্রুত ন্যায়বিচার ও সমাধান মিলবে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে পদোন্নতি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তাদের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন ‘বৈষম্য বিরোধী অফিসার্স ফোরাম’ এর কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক মো. পনির হোসেন ও সদস্য সচিব এরশাদ হোসেনকে শৃঙ্খলাজনিত মোকদ্দমা এবং মুখ্য সংগঠক মো. আরিফ হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া মুখপাত্র তানভীর আহমদকে দুর্গম অঞ্চলে বদলি করা হয় এবং সারাদেশের দুই শতাধিক কর্মকর্তাকে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে, মো. আরিফ হোসেনকে বরখাস্ত করার নথিতে তাকে ‘ব্যাংক ও রাষ্ট্রবিরোধী’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, অথচ ব্যাখ্যা তলবপত্রে বলা হয় তিনি ‘রাজনৈতিক কাজে তহবিল সংগ্রহ করেছেন।’ ফরেনসিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তার ব্যাখ্যাতলবের জবাব প্রদানের পরও বরখাস্ত চিঠি আগেই তৈরি করা হয়েছিল, যা অনেক কর্মকর্তার মধ্যে প্রশ্ন তোলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তারা যদি সংবিধান বা আইন অনুযায়ী দায়িত্ব না পালন করেন, হাইকোর্ট তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ বা অপব্যবহার রোধের জন্য আদেশ দিতে পারে। অন্য একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, এ সিদ্ধান্তের পেছনে ব্যাংকের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী একটি সিন্ডিকেট রয়েছে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, পদোন্নতি ও ন্যায়বিচারের জন্য আন্দোলন এবং আইনি লড়াই চলবে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শিগগিরই বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান উপদেষ্টার কাছে এ বিষয়ে প্রতিকার চাইবেন। এ ব্যাপারে মো. আরিফ হোসেন ও পনির হোসেনের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে একটি ভুয়া কর্মচারী ইউনিয়নের সভায় জোরপূর্বক কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ করানোর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্যাংকের ভিজিল্যান্স স্কোয়াডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ হোসেন। গত ২০ অক্টোবর প্রধান কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ নামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) নামে তারা এটির আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির কার্যনির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির খান ও উদ্বোধক হিসেবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদলের সভাপতি আনোয়ার হোসাইনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তারা প্রকাশিত খবরের মাধ্যমে ভুয়া নেতাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে অবগত হয়ে অনুষ্ঠানটি বয়কট করেন। অভিযোগ রয়েছে, তাসলিমা আক্তার লিনা হেড অফিসের বিভিন্ন দপ্তরের নারী কর্মকর্তা এবং তার স্বামী মিরাজ হোসেন পুরুষ কর্মকর্তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে ওই সভায় অংশগ্রহণে বাধ্য করেন। অংশগ্রহণে অস্বীকৃতি জানালে বদলি বা পদোন্নতি রোধের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। হেড অফিসের কয়েকজন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, লিনা তার স্বামীর প্রভাব খাটিয়ে নারী সহকর্মীদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে অনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। কেউ আপত্তি জানালে মিরাজের সহযোগীরা এসে অশালীন আচরণ ও গালিগালাজ করে থাকে বলেও অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া, লিনা ‘উইমেনস ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন গড়ে মাসিক চাঁদা সংগ্রহ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই কর্মকাণ্ডে অনেক নারী কর্মকর্তা বিব্রতবোধ করলেও চাকরির স্বার্থে নীরব থাকছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তাসলিমা আক্তার লিনা ও তার স্বামী মিরাজ ব্যাংকের অভ্যন্তরে প্রভাব বিস্তার করছেন। এ ঘটনায় নারী কর্মকর্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তারা কর্তৃপক্ষের কাছে তাসলিমা আক্তার লিনা ও মিরাজ হোসেনকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে জানতে তাসলিমা আক্তার লিনার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছি, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন। অন্যদিকে, মিরাজ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিনব কায়দায় চাঁদাবাজিতে নেমেছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের একদল ভুয়া সিবিএ নেতা। অভিযোগ উঠেছে, তারা বিশেষ সাধারণ সভা আয়োজনের নামে সারা দেশের শাখাগুলো থেকে কোটি টাকারও বেশি চাঁদা আদায় করছে। তথ্যসূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন (সিবিএ), রেজি. নং বি-৯৮৫-এর নাম ব্যবহার করে আগামী ২০ অক্টোবর ‘বিশেষ সাধারণ সভা’ শিরোনামে একটি অনুষ্ঠান আয়োজনের ঘোষণা দেয় একদল ভুয়া নেতা। এ উপলক্ষে তারা ব্যাংকের প্রায় ১ হাজার ২৫০টি ইউনিট থেকে ১০-২০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে ১ কোটি ২৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উঠে। গোপন সূত্র জানায়, তাদের নিয়ন্ত্রিত লোকজন শাখা পর্যায়ে বদলি ও পদোন্নতির ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপ-মহাব্যবস্থাপক জানিয়েছেন, তারা এসব কর্মকাণ্ডে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করলেও এ সিন্ডিকেটের ভয়ে কিছু বলার সাহস পাচ্ছেন না। এ ঘটনায় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেনের প্রত্যক্ষ মদদ ও আস্কারায় চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রাপ্ত আমন্ত্রণপত্রে দেখা গেছে, ভুয়া সভাপতি দাবিকারী কৃষি ব্যাংকের সাবেক পিয়ন ফয়েজ আহমেদ ও ভুয়া সাধারণ সম্পাদক মিরাজ হোসেন স্বাক্ষরিত পত্রে প্রধান অতিথি হিসেবে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হুমায়ুন কবির, উদ্বোধক হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন এবং প্রধান বক্তা হিসেবে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম খান নাসিমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কয়েকজন মহাব্যবস্থাপক জানান, তারা বিভিন্ন শাখা থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ পেয়েছেন এবং বিষয়টি ব্যবস্থাপনা পরিচালক অবগত আছেন বলে জানানো হয়েছে। অনুষ্ঠানটি কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত হওয়ায় তারা কার্যত কিছু করতে পারছেন না। অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও একই সিন্ডিকেট শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ৪৪তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে প্রায় ৫০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করেছিল। সেই টাকা তারা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, চাঁদাবাজ ও তাদের মদদদাতাদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তারা বহিরাগত অনুপ্রবেশকারী। বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসব ভুয়া সিবিএ নেতাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও অবাঞ্ছিত ঘোষণা দাবি করেছেন। তাদের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ডের নেতিবাচক প্রভাব আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে সংঘটিত এজাহারভুক্ত হত্যা মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ ও মিরাজ হোসেন পলাতক রয়েছেন। ব্যাংক প্রশাসন বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খুনের শিকার কৃষি ব্যাংকের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আব্দুল হালিম ছিলেন কৃষি ব্যাংক এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের (সিবিএ) সভাপতি। তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলায়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি স্থানীয়ভাবে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ১ নম্বর আসামি হিসেবে অবসরপ্রাপ্ত পিয়ন ফয়েজ উদ্দিন আহমেদ এবং ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেনের নাম রয়েছে। তারা বর্তমানে নিজেদের সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দাবি করে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন। ব্যাংক সূত্রে গেছে, তারা চাঁদাবাজি, ঘুষ আদায় ও নানা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত। সূত্র জানায়, ব্যাংকের ভেতরে একটি সিন্ডিকেটের প্রভাবেই এসব আসামিরা এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছেন। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে আছেন মানবসম্পদ বিভাগের ডিজিএম জাহিদ হোসেন। এতে আরও যুক্ত রয়েছেন ডিজিএম সৈয়দ লিয়াকত হোসেন, হাবিব উন নবী, ডিএমডি খালেকুজ্জামান জুয়েল ও ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্চিয়া বিনতে আলী। গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে মতিঝিলের বিমান অফিসের সামনে আব্দুল হালিমের মৃত্যু হয়। পরদিন সকালে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক সজীব কুমার সিং সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে জানান, পুরনো সহকর্মীদের সঙ্গে বিরোধের জেরে ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং রাত ১টা ৪০ মিনিটে হাসপাতালে মারা যান। হালিমের ছেলে ফয়সাল বলেন, তার বাবা ২০১৪ সাল থেকে কৃষি ব্যাংক সিবিএর সভাপতি ছিলেন এবং বোয়ালখালী উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন। ইউনিয়নের নেতৃত্ব ও পদ নিয়ে সহকর্মীদের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। এ নিয়ে গত নভেম্বরেই মতিঝিল থানায় একটি জিডি (নং ০৫/১১/২০২৪ - ৩৩৫) করেছিলেন তার বাবা। তিনি আরও বলেন, বুধবার রাতে আমার বাবাকে তার অফিসের সহকর্মীরা মারধর করে হত্যা করেছে। সিবিএর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জানান, ২০১৪ সালে আমরা নির্বাচিত হই। এরপর আর কোনো নির্বাচন হয়নি। কিন্তু গত ৫ আগস্ট বিনা নির্বাচনে নতুন কমিটি ঘোষণা করে আমাদের অফিস দখল করে নেয় ফয়েজ ও মিরাজ। এ নিয়ে মামলা চলছে। মামলার তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা অস্থায়ী জামিনে ছিলেন। সম্প্রতি তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকজন পলাতক রয়েছেন—যাদের মধ্যে আছেন ড্রাইভার সাইফুল, শাহেদ, ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মেহেদী ও অবসরপ্রাপ্ত ক্লিনার সিরাজ। এদিকে, মামলার ২ নম্বর আসামি মিরাজ হোসেন নৈমিত্তিক ছুটির আবেদন করে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। যদিও ওয়ারেন্টভুক্ত আসামির নৈমিত্তিক ছুটি পাওয়ার কোনো এখতিয়ার নেই। মানবসম্পদ বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক এ বিষয়ে বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু স্থানীয় মুখ্য কার্যালয়ের প্রধান মহাব্যবস্থাপক জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করতে চান না। কারণ ব্যবস্থাপনা পরিচালক মন্তব্য না করার নির্দেশ দিয়েছেন। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি। অভ্যন্তরীণ এই পরিস্থিতিতে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
নির্বাচন-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ সদর দপ্তর কঠোর বার্তা দিয়েছে। নির্বাচন শেষে ৪৮ ঘণ্টায় সারা দেশে ৭৬টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৮৩ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনার পর পুলিশের সদর দপ্তর থেকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়েছে যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হলে পুলিশ কর্মকর্তাদের এর দায় নিতে হবে এবং প্রয়োজনে বিভাগীয় শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। পুলিশ সদর দপ্তর জানায়, নির্বাচনের দুই দিন আগে থেকেই দেশের সব জেলাকে বিশেষ মনিটরিংয়ে রাখা হয়েছিল এবং ভোট গ্রহণের পর সহিংসতা, প্রতিহিংসামূলক হামলা, ভাঙচুর এবং সংঘর্ষ রোধে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়। সারা দেশে সংঘটিত ৬৬টি সহিংস ঘটনার মধ্যে বেশ কিছু ঘটনার কারণে নির্বাচনের পর উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মধ্যে বাগেরহাটে বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সমর্থক এক ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে, এবং বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষে আরও অনেকে আহত হয়েছেন। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, নির্বাচনের পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে, বিজয়ী ও পরাজিত পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে তাৎক্ষণিকভাবে হস্তক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ভার্চুয়াল বৈঠকে বলেছেন, নির্বাচনের পর কোথাও অস্থিরতা সৃষ্টি না হয় এবং গুজব ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি রাখতে হবে। এছাড়া, জেলার পুলিশ সুপারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অতিরিক্ত টহল ও নজরদারি নিশ্চিত করতে। নির্বাচনের পর যেকোনো ধরনের নাশকতা বা সহিংসতার ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে এবং প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করতে হবে। আইজিপি পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ছোটখাটো বিরোধ বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে, তাই গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সকল থানাকে তাদের এলাকার রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য বলা হয়েছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক আরও বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। কোনো অবস্থাতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যাবে না, বলেও তিনি সতর্ক করেছেন। এভাবে, পুলিশ সদর দপ্তরের কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা প্রতিরোধে সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
তিন রাজনৈতিকদলের শীর্ষ নেতার হাতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অভিনন্দন বার্তা পৌঁছে দেয়া হয়েছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পৃথকভাবে এ বার্তা পৌঁছে দেওয়া হয়। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং জানিয়েছে, প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিব সজীব এম খায়রুল ইসলাম আজ তিন নেতার হাতে এই বার্তা তুলে দেন।
কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দল গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে স্বচ্ছ, অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আজ কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের চেয়ারপার্সন ও ঘানার সাবেক প্রেসিডেন্ট নানা অ্যাডো আকুফো-অ্যাডো বলেন, ‘নির্বাচনটি গ্রহণযোগ্য ছিল, পুরোটা সময় শান্তিপূর্ণ ছিল এবং স্বচ্ছ ছিল।’ ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন এবং ‘জুলাই সনদের’ ওপর গণভোট পর্যবেক্ষণ শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সামগ্রিকভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ, শৃঙ্খলাপূর্ণ এবং মূলত স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি সারা দেশে ভোটগ্রহণের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করায় বাংলাদেশের জনগণ, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (বিইসি), আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনারের আমন্ত্রণে আসতে পেরে কমনওয়েলথ সম্মানিত বোধ করছে।’ তিনি উল্লেখ করেন, কমনওয়েলথ মহাসচিব শার্লি বোচওয়ে ১৩ সদস্যের পর্যবেক্ষক দলটি গঠন করেন, যেখানে রাজনীতি, আইন, গণমাধ্যম, জেন্ডার এবং নির্বাচন প্রশাসনে অভিজ্ঞ বিভিন্ন কমনওয়েলথ অঞ্চলের বিশেষজ্ঞরা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রতিনিধি দলটি ভোটের আগে বাংলাদেশের আটটি বিভাগে গিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ, প্রচারণা কার্যক্রম ও ভোটের দিন প্রক্রিয়া মূল্যায়ন করে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভোটের দিন শান্তিপূর্ণ ছিল, ভোটকেন্দ্রগুলো সময়মতো খোলা হয় এবং ভোটগ্রহণ পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন হয়। ভোটের উপকরণ যথাসময়ে বিতরণ করা হয় এবং কর্মকর্তারা নির্ধারিত নির্দেশনা মেনে প্রস্তুতি নেন। দলটির মতে, ভোটগ্রহণ শান্তিপূর্ণভাবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও তা সামগ্রিকভাবে নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় পদ্ধতিগত কোনো প্রভাব ফেলেনি। পর্যবেক্ষকরা আরও জানান, ভোটকেন্দ্রে প্রয়োজনীয় ভোটার তথ্য স্পষ্টভাবে প্রদর্শিত ছিল, নারী ও পুরুষের জন্য পৃথক সারির ব্যবস্থা ছিল এবং অধিকাংশ কেন্দ্রে একাধিক লাইন ব্যবস্থাপনা ছিল। তারা বিভিন্ন আসনে ভোটকেন্দ্র থেকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় পর্যন্ত ফলাফল প্রক্রিয়া অনুসরণ করেন এবং ডাকযোগে ভোটসহ ব্যালট গণনাকে স্বচ্ছ হিসেবে অভিহিত করেন। নিরাপত্তা ব্যবস্থা সমন্বিত ও কার্যকর ছিল। ভোটকেন্দ্রে পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা সদস্য উপস্থিত ছিলেন এবং তদারকি জোরদারে সিসিটিভি ও বডি-ওয়র্ন ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। প্রবাসী ভোটার ও কারাবন্দিদের জন্য ডাকযোগে ভোটের সুযোগ সম্প্রসারণকে ‘প্রশংসনীয় উদ্যোগ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা ও জনআস্থা আরও জোরদারে অতিরিক্ত প্রচেষ্টার প্রয়োজন রয়েছে বলে দলটি মত দেয়। অংশগ্রহণ ও অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে পর্যবেক্ষক দলটি নারী ভোটারদের ব্যাপক উপস্থিতিকে প্রশংসা করে এবং ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা কর্মী হিসেবে নারীদের দৃশ্যমান অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ করে। তবে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে যে, নারী প্রার্থীর হার ছিল মাত্র চার শতাংশ এবং মাত্র সাতজন নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ভবিষ্যতে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে অনলাইন হয়রানি ও রাজনৈতিক দলের কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা দূর করার বিষয়ও পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। রাজনৈতিক কার্যক্রমে তরুণদের অংশগ্রহণ ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে -উল্লেখ করা হলেও, আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যে তরুণদের প্রাতিষ্ঠানিক অন্তর্ভুক্তি আরও বাড়ানো গেলে গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ শক্তিশালী হবে বলে পর্যবেক্ষকরা মত দেন। দলটি আরও জানায়, নির্বাচন ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রবীণ ভোটারদের সহায়তা করেছেন। ‘জুলাই সনদ’ গণভোট প্রসঙ্গে কমনওয়েলথ জানায়, এটি সংস্কারের জরুরি দাবির প্রেক্ষাপটে গৃহীত উদ্যোগ হলেও, প্রক্রিয়াটির পরামর্শমূলক গভীরতা ও যোগাযোগের স্পষ্টতা নিয়ে কিছু অংশীজন উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে প্রাণবন্ত ও সক্রিয় হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং বলা হয়, নির্বাচন সংক্রান্ত ব্যাপক সংবাদ কভারেজ জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক আলোচনাকে শক্তিশালী করেছে। দলটি নির্বাচনের পর কিছু বিচ্ছিন্ন উত্তেজনার খবর স্বীকার করে এবং সকল অংশীজনকে শান্ত থাকার ও আইনসম্মত উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির আহ্বান জানায়। ভবিষ্যতের জন্য তারা নির্বাচন কমিশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করার এবং পর্যবেক্ষক দলের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য দেশীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানায়। এছাড়া তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নে একটি অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া গঠনেরও আহ্বান জানানো হয়। আকুফো-অ্যাডো বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণ তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করে নিজেদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের চেষ্টা করেছেন।’ তিনি নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ঐক্য ও উদারতার আহ্বান জানান। কমনওয়েলথ পর্যবেক্ষক দলের চূড়ান্ত প্রতিবেদনটি মহাসচিবের কাছে জমা দেওয়া হবে, যাতে বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ থাকবে। পরবর্তীতে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট জাতীয় অংশীজনদের সঙ্গে শেয়ার করা হবে।